somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মহিউদ্দিন হায়দার
"জীবন শেখায়, আমি লিখে রাখি। গল্প অনুভূতি আর অভিজ্ঞতার মিশেলে এটাই আমার ছোট্ট জগৎ" গতানুগতিক সাধারণ মানুষ

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখেই তার বাদ্যযন্ত্রের প্রতিভা প্রদর্শন করেছে।
​আর ঠিক এখানেই আমাদের সমাজের একাংশের ‘ধর্মীয় ঠিকাদারদের’ গায়ে ফোস্কা পড়েছে। কারণ, তাদের তৈরি করা চেনা ছকে নাজিয়াকে ফেলা যাচ্ছে না। শুরু হয়েছে ফতোয়া, সাইবার বুলিং আর হেনস্থার অপচেষ্টা।
​আজকে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এই তথাকথিত ধার্মিকতার ধ্বজাধারীদের দ্বিমুখী নীতিকে কিছু নির্মম বাস্তবতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই:
১. আন্দোলনের 'সিলেক্টিভ' ভণ্ডামি:
​আমাদের দেশের এই স্বঘোষিত ইজারাদারদের আন্দোলনের ধরনটা একটু খেয়াল করুন। দেশের সাধারণ মানুষের পকেট কেটে যখন কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়, ব্যাংক লুট হয়, মেগা প্রজেক্টের নামে অনিয়ম হয়—তখন এদের কোনো রাজপথ কাঁপানো আন্দোলন দেখা যায় না।
​দেশজুড়ে যখন চাঁদাবাজির মহোৎসব চলে, এরা নীরব।
​সমাজে যখন সুদ, ঘুষ আর মাদক তরুণ সমাজকে ধ্বংস করে দেয়, এরা নির্বিকার।
​সিন্ডিকেটের কারণে যখন সাধারণ মানুষের ডাল-ভাত খাওয়ার জো থাকে না, তখন এদের কোনো ফতোয়া আসে না। ​এদের যাবতীয় ক্ষোভ, আন্দোলন আর জিহাদী জোশ শুধু কারোর বিয়ে, নারীর পোশাক, আর প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের বিরুদ্ধে! সমাজ ধ্বংসকারী আসল অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে এদের টু শব্দটিও করার সাহস বা ইচ্ছা নেই।
​২. সংস্কৃতির টুঁটি চেপে ধরা বনাম অপরাধের নীরব লাইসেন্স
​এদের ফতোয়ার তালিকাটা বেশ দীর্ঘ: আপনি ড্রাম বাজাতে পারবেন না, সংগীত চর্চা করতে পারবেন না, সিনেমা দেখাতে পারবেন না, ছবি আঁকা বা খেলাধুলা করা যাবে না; এমনকি অন্য কেউ তার বিশ্বাসের প্রতিমাও বানাতে পারবে না।
​অথচ, এই একই গোষ্ঠীর নাকের ডগায় যখন মাদরাসা কিংবা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোমলমতি শিশুদের ওপর বলাৎকার করা হয়, যখন বিকৃত যৌনাচারের মাধ্যমে শিশুদের শৈশব ধ্বংস করা হয়—তখন এদের মুখে কুলুপ পড়ে যায়। তখন কোনো জাতীয় আন্দোলন হয় না, অপরাধীকে আড়াল করতে পুরো সিন্ডিকেট নেমে পড়ে।
​৩. অধিকারের বুলি বনাম চরম সুবিধাবাদ:
​যে সমাজ একজন নারীর হিজাব পরে ড্রাম বাজানোকে ‘ধর্মের অবমাননা’ বলে রায় দেয়, সেই সমাজই কিন্তু স্ত্রীর গর্ভাবস্থার মতো চরম সংকটাপন্ন মুহূর্তেও পুরুষের একাধিক বিয়ের অধিকার নিয়ে কোমর বেঁধে যুক্তি সাজায়। দায়িত্ব পালন বা মানবিকতার চেয়ে সেখানে জৈবিক সুবিধাবাদই প্রধান হয়ে ওঠে।
​তাহলে সমীকরণটা কী দাঁড়াল? শিল্প, সংস্কৃতি, প্রগতি, আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বন্ধ থাকবে; কিন্তু অন্ধকারের ভেতরের যত বিকৃতি, পাশবিকতা, আর চেনা অপরাধ—তা সমাজের নীরবতায় বৈধতা পেয়ে যাবে?
​৪. রাষ্ট্রের নীরবতা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ:
​সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, যখন এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীটি একজন প্রতিভাবান তরুণীর পেছনে লেগে তাকে সামাজিকভাবে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেয়, তখন রাষ্ট্র ও প্রশাসন রহস্যজনকভাবে নীরব থাকে।
​যদি শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাকে এভাবে অপরাধ বানিয়ে, আর প্রকৃত অপরাধ ও বিকৃতিকে সমাজ প্রশ্রয় দিতেই থাকে, তবে সরকারের উচিত এই 'বিশেষ বিজ্ঞানীদের' জাতীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া! আসুন, আমরা প্রতিবাদের ভাষায় বলি—ধন্যবাদ এই সমাজকে, ধন্যবাদ এই নীরব প্রশাসনকে।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশ খুব দ্রুতই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার ‘অনন্য’ বিকৃতির জন্য পরিচিতি লাভ করবে।
​আমাদের স্পষ্ট বার্তা:
​নাজিয়া সামান্তা কোনো অপরাধ করেননি। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রেখে শিল্পচর্চা করা কোনো পাপ হতে পারে না। আসল পাপ লুকিয়ে আছে আপনাদের মগজে, যা দেশের দুর্নীতি, চাদাবাজি, সুদ-ঘুষ আর শিশুর ওপর নির্যাতন দেখলে জাগে না, কিন্তু নারীর হাতে বাদ্যযন্ত্র দেখলে কিংবা প্রগতিশীল চিন্তা দেখলেই কেঁপে ওঠে।
​এই প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। নাজিয়াদের আলো নিভে যেতে দেওয়া যাবে না।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৩
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিসাব বিষয়ক ভাবনা

লিখেছেন করুণাধারা, ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৩



সংখ্যাওয়ালা কোনো লেখা দেখলে হিসাব ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা আমার অভ্যাস। ইদানিং বিভিন্ন রকম সংখ্যাওয়ালা কিছু বিজ্ঞাপন সামনে আসছে, এগুলো ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনে যেসব সংখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুনাফেকি নাকি Diplomatic situationship?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০


গত শনিবার (৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় উদযাপিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক অংশীদারিত্ব আরো জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আরেকটা পদ্মা সেতু না বানিয়ে দেশ উন্নয়নের নিনজা টেকনিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:৪৫




আগে জানতাম উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ লাগে, চাহিদা অনুযায়ী শিল্প গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় - তারপর দেশের উন্নতি হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনতা ২.০-এ এসে উন্নয়নের সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে।

এখন উন্নয়নের নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭১-কখনোই ৫০/৫৫বছরের পুরোনো কোনো ঘটনা নয় ।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:০১




৭১-হলো আমাদের বাংলাদেশের বাঙালি জাতির প্রতিদিনের এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা । ৭১ আমাদের অস্তিত্ব,একাত্তর আমাদের আত্মপরিচয়ের ইতিহাস । একাত্তর যদি মলিন বা বিলীন হয়,তখন আমি আর আমি,আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভুল, অনুতাপ ও ভালোবাসা

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


আজকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরবা? আমি রান্নাঘর থেকে মাথা বের করে আনিসকে বললাম। সে জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতেই ছোট্ট করে উত্তর দিল,
- চেষ্টা করব। আমি হেসে বললাম,
- তোমার এই চেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×