somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ দাগের খিদা

২৭ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমার দাদা মাটিতে টানা দাগ পার হতে পারতেন না।

কথাটা যত সহজে লিখে ফেললাম, ব্যাপারটা তত সহজ না। দড়ি পার হতেন। বাঁশ পার হতেন। ক্ষেতের আইল, হালের ফালে ওল্টানো মাটি, সাঁকো, সবই পার হতেন। আটকাতেন শুধু মানুষের হাতে টানা সরু দাগে। চকের দাগ, কয়লার দাগ, লাঠির মাথা দিয়ে ধুলায় আঁকা দাগ। ওইসবের সামনে গেলে দাদার পা থেমে যেত। উনি দাগের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকতেন, তারপর ঘুরপথ ধরতেন। পঁচাত্তর বছরের জীবনে উনি একটা দাগও ডিঙাননি।

আমরা মজা পেতাম ঠিকই, তবে দাদা থাকতেন একেবারেই শান্ত। বলতেন, "তোরা দাগ চিনোস না, এর লাইগা ডরাস না। আমি চিনি।"

দাদা নেই আজ চার বছর। আমি এখন আমিন। কুড়িগ্রাম শহরে ছোট্ট একটা অফিস, চেইন, ফিতা, খুঁটি, নকশা। মানুষের জমি মাপি, ভাগ করি, দাগ টানি। দাগ টানাই আমার পেশা, দাগই আমার ভাত।

আর গত মঙ্গলবার আমার সাথে একটা ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনা বলার জন্যই এত রাতে লিখতে বসা। তবে ওটা শেষের জন্য তোলা থাক। সব কিছুর একটা তরতিব আছে। আগে দাগের কথা।

আমার বয়স তখন আট। চাচাতো ভাই মিলন একদিন দুষ্টামি করে দাদার জলচৌকির চারপাশে চক দিয়ে একটা গোল দাগ টেনে দিলো। দাদা চৌকিতে বসে তামাক টানছিলেন, টের পাননি। আসরের ওয়াক্তে উঠতে গিয়ে দাগ চোখে পড়ল। উনি বসে রইলেন।

মাগরিবের আজান পড়ে গেল। দাদা বসা। দাদি খুঁজতে খুঁজতে উঠানে এসে এক নজরেই সব বুঝলেন। আঁচল দিয়ে দাগ মুছলেন, আর মিলনের পিঠে বসালেন দুই ঘা। দাদা তখনো শান্ত। মিলনকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "তর দোষ নাই রে ব্যাটা। দোষ দাগের। দাগ মানুষ পাইলেই আটকাইতে চায়। এইটা ওর জাত-স্বভাব।"

রাতে খেতে বসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "দাদা, দাগ ডিঙাইলে কী হয়?"

দাদা অনেকক্ষণ ভাতের থালায় আঙুল চালালেন। তারপর নিচু গলায় বললেন, "গুলি করে।"

আমি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। আট বছর বয়সে 'গুলি' শব্দটা রূপকথার রাক্ষস-খোক্কসের মতোই অবাস্তব শোনায়।

দাদা তখনও গম্ভীর।

আমার দাদার নাম জমির উদ্দিন। নামের মধ্যে জমি আছে, লোকে বলত। বাজারের মুনশি সাহেব একবার শুধরে দিয়েছিলেন, আরবি জমির অর্থ বিবেক, অন্তর। যেটাই ধরি, দুটোর একটাও দাদার কপালে সোজা পথে জোটেনি। জমি ছিল, দলিল ছিল না। বিবেক ছিল, দাম ছিল না।

দাদার জন্ম উনিশশো সাতচল্লিশ সালের শ্রাবণ মাসে, দাসিয়ারছড়ায়। চেনেন? কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার পেটের ভিতরে ভারতের সবচেয়ে বড় ছিটমহলগুলোর একটা। একটু ভেঙে বলি, কারণ না ভাঙলে গল্পের বাকিটা দাঁড়াবে না।

চারদিকে বাংলাদেশ। মাঝখানে কয়েক হাজার বিঘার এক দ্বীপ, যেটা কাগজে-কলমে ভারত। কাঁটাতার নাই, পিলার নাই, বিএসএফ নাই, বিজিবি নাই। সীমানার দাগ ছিল শুধু ম্যাপে। মাটিতে ওই দাগের কোনো চিহ্নই নাই। কোন উঠান কোন দেশে, কোন সুপারিগাছ কোন রাষ্ট্রে, তা জানতেন শুধু মুরুব্বিরা। মুখে মুখে, বাপ থেকে ছেলেতে।

আর দাদার জন্মের সেই মৌসুমেই, দিল্লিতে বসে এক সাহেব ম্যাপের ওপর কলম চালাচ্ছিলেন।

সাহেবের নাম সিরিল র‍্যাডক্লিফ। বিলাতের ব্যারিস্টার। জীবনে সেই প্রথম ভারতবর্ষে পা রেখেছেন, আর হাতে সময় পেয়েছেন মোটে পাঁচ সপ্তাহ। যেই জেলাগুলো কাটছেন, তার একটাও নিজের চোখে দেখেননি। পুরনো ম্যাপ আর আদমশুমারির খাতা দেখে দেখে কোটি মানুষের কপালের ওপর দিয়ে টেনে দিলেন কয়েকটা লম্বা দাগ। কাজ শেষ করে দেশে ফিরে গেলেন এবং জীবনে আর কোনোদিন এই মুখো হননি। নিজের পারিশ্রমিক পর্যন্ত নেননি। কেন নেননি, সেই প্রশ্নের জবাব উনি কোনোদিন দেননি। শুধু শোনা যায়, ফেরার আগে নিজের সব কাগজপত্র উনি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।

যে লোক দাগ টানছে, সে-ই যদি নিজের কাগজ পোড়াইয়া পালায়, তাইলে বোঝো দাগ কী জিনিস। কথাটা আমার না। দাদার।

অবশ্য দাদাদের দাগ র‍্যাডক্লিফ সাহেবেরও আগের। ইতিহাসের বই বলে, মোগল আমলে কোচবিহারের মহারাজা আর রংপুরের ফৌজদারের যুদ্ধ আর সন্ধির হিসাব-নিকাশে এই ছিটগুলোর জন্ম। লোকমুখে অন্য গল্প। মহারাজা আর ফৌজদার নাকি তাস-পাশা খেলতেন, বাজি ধরতেন আস্ত গ্রাম। যে পক্ষ হারে, গ্রাম হাতবদল। সত্য মিথ্যা আল্লাহ জানেন। আমি শুধু মাঝে মাঝে ভাবি, তিনশো বছর আগে কোনো এক জলসায় কোনো বাজিকরের হাত থেকে একটা ঘুঁটি পিছলে গিয়েছিল, আর সেই ঘুঁটির তলায় চাপা পড়ে গেল আমার দাদার গোটা জীবন।

সাতচল্লিশে সেই পুরনো খেলাঘরগুলো রাতারাতি হয়ে গেল বিদেশ। শেষ হিসাবে দাঁড়াল, বাংলাদেশের ভিতরে ভারতের একশো এগারোটা ছিট, ভারতের ভিতরে বাংলাদেশের একান্নটা। এর মধ্যে সবচেয়ে আজব জিনিস ছিল পঞ্চগড়ে। এক টুকরা পাটখেত। খেত ভারতের। খেতের চারপাশের জমি বাংলাদেশের। সেই জমি আবার একটা ভারতীয় ছিটের ভিতরে, আর সেই ছিট বাংলাদেশের ভিতরে। পৃথিবীতে ওই একটাই। খেতের মালিক ছিলেন এক বাংলাদেশি চাষি। ভদ্রলোক সকালবেলা নিজের উঠান থেকে কাগজে-কলমে তিনটা আন্তর্জাতিক সীমানা পার হয়ে নিজের খেতে নিড়ানি দিতে যেতেন। মাটিতে অবশ্য কিছুই ছিল না।

খালি হাঁটাপথ।

মাটিতে দাগ নাই, অথচ দাগ ছিল জীবনের সব জায়গায়। ছিটের ভিতরে ইশকুল নাই, হাসপাতাল নাই, কারেন্ট নাই, থানা নাই। ভারত ছিল শুধু নামে, আর নামও মুখে আনা যেত না।

আমার বাবাকে ইশকুলে ভর্তি করানো হয়েছিল মিথ্যা ঠিকানায়। শুধু ঠিকানা না। খাতায় বাবার বাপের নাম লেখা হলো হাশেম মুন্সি। দাদার দূর সম্পর্কের ভাই, বাংলাদেশি। মানে বোঝেন? নিজের ছেলের কাগজে দাদার নিজের নাম পর্যন্ত ওঠানোর উপায় ছিল না। দাদা আমাকে একবার সেই ভর্তির রসিদ দেখিয়েছিলেন। টিনের বাক্সে যত্নে রাখা, ভাঁজে ভাঁজে হলুদ হয়ে যাওয়া একটা কাগজ। দেখিয়ে বলেছিলেন, "এই কাগজে আমার পোলা আরেকজনের পোলা। এই কাগজে আমি নাই। বুঝলি? দাগ মানুষরে খালি আটকায় না রে ভাই। দাগ মানুষরে মোছেও।"

দাদিকে একবার মরণদশা নিয়ে ফুলবাড়ী হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল। মিথ্যা নামে, মিথ্যা ঠিকানায়, খাতায় স্বামীর ঘরে সেই হাশেম মুন্সি। দাদা সারারাত বারান্দায়। ভিতরে ঢুকতে গেলেই প্রশ্ন, রোগীর কে হন আপনি? প্রশ্নের সত্য জবাব দেওয়ার উপায় দাদার ছিল না। নিজের বউয়ের জ্বরের পাশে দাদা ছিলেন কেউ না।

রাতের বেলা ব্যাপার সবচেয়ে পরিষ্কার বোঝা যেত। চারপাশের গ্রামগুলোতে কারেন্টের বাতি, আর মাঝখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার এক দ্বীপ। দেশ কোথায়, ম্যাপ লাগত না।

অন্ধকার দেখলেই বোঝা যেত।

দাদাকে একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমি তখন সবে কলেজে উঠেছি, প্রশ্ন করার সাহস হয়েছে। "দাদা, আপনি দাগ ডিঙান না ক্যান? দাগ তো খালি কালির আঁচড়।"

দাদা তামাকে লম্বা টান দিলেন। "কালির আঁচড়?" উনি এমনভাবে হাসলেন, যেন আমি বলেছি সাপ একটা লম্বা রশি। "শোন। দাগ হইলো দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জাদু। মন্ত্র লাগে না, তাবিজ লাগে না, খালি একটা টান। এক টানে জমিন দুই ভাগ। এক টানে ভাই হয় বিদেশি, মামার বাড়ি হয় বিদেশ, মানুষ নিজের উঠানে বইসা হয় অনুপ্রবেশকারী। আর সবচেয়ে ডরের কথা কী জানোস? দাগ জিনিসটা জ্যান্ত। দাগের খিদা আছে।"

"খিদা?" আমি হাসব কি না বুঝছিলাম না। "দাগ কী খায়?"

"মানুষ খায়।" দাদা আগুনের দিকে তাকিয়ে বললেন। "আমার আব্বায় কইতো, দুনিয়ায় যত রক্ত পড়ছে, তার অর্ধেক গেছে দাগের প্যাটে। হিসাব বাড়ায়া কওয়া, মানলাম। এখন তুই কমা। কতখানি কমাবি?"

আমি বইয়ে পড়া বিদ্যা ফলালাম। বললাম কোরিয়ার কথা। আটত্রিশ নম্বর একটা লাইন, ম্যাপের ওপর টানা, যেটা সত্তর বছর ধরে ভাইকে ভাইয়ের থেকে আলাদা করে রেখেছে। বললাম বার্লিনের কথা, যেখানে মানুষ দাগ মানতে চায়নি বলে দাগের ওপর আস্ত একটা দেয়াল তুলে দিতে হয়েছিল। দাদা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর মাথা নাড়লেন। "দেখলি। দাগ সব জায়গায় এক। খালি ভাষা আলাদা।"

তারপর একটু থেমে যোগ করলেন, "দুনিয়ায় দাগ মানে না খালি তিনজন। পাখি, নদী, আর মরণ। এই তিনজনরে কোনো ম্যাপ আইজ পর্যন্ত আটকাইতে পারে নাই। আর মানুষের নিজের দেশ কয়খান জানোস? একখান। সাড়ে তিন হাত। ওই দেশে ঢুকতে পাসপোর্ট লাগে না, আর ওই দেশ থাইকা কেউ কোনোদিন কাউরে বাইর কইরা দিতে পারে না।"

কথাগুলো তখন আমার কাছে বুড়া মানুষের দর্শন মনে হতো। শুনতে ভালো লাগত, বিশ্বাস হতো না।

তারপর এগারো সালের জানুয়ারিতে, আমাদের এই ফুলবাড়ীরই সীমান্তে, কাঁটাতারের গায়ে পনেরো বছরের এক মেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুলে রইল। দেশ-বিদেশে পত্রিকায় ছবি ছাপা হলো। দাদা সাত দিন ঠিকমতো ভাত খেলেন না। শুধু একবার বললেন, "দেখলি? কইছিলাম না। দাগ খায়।"

দুই হাজার পনেরো সালের জুলাই মাসে ছিটে গণনা হলো। ঘরে ঘরে ফরম। কোন দেশের নাগরিক হতে চান, টিক দেন। ভারত, না বাংলাদেশ।

আটষট্টি বছর বয়সে দাদা জীবনে প্রথমবার নিজের হাতে একটা দাগ টানলেন। ছোট্ট একটা টিক, বাংলাদেশের ঘরে। টেনে অনেকক্ষণ কলমের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গণনার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, "লেখলেই হয়া যাইবো?"

ছেলে হাসল। "হ চাচা। লেখলেই হয়া যাইবো।"

দাদা আস্তে করে মাথা নাড়লেন। বিড়বিড় করে বললেন, "এই তাইলে কলমের ক্ষেমতা।"

দাদার জানের দোস্ত আজগর আলী টিক দিলেন অন্য ঘরে। উনি যাবেন ভারতে। যে দেশের নাগরিক হয়ে জন্মেছেন, মরার আগে সেই দেশ একবার চোখে দেখবেন। নভেম্বর মাসে বুড়িমারী দিয়ে বাস ছাড়ল। যাওয়ার দিন দুই বুড়া অনেকক্ষণ হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। আজগর আলী বললেন, "দেশ দেইখা আসি রে জমির।"

দাদা বললেন, "তুই দেখবি মাটি। দেশ তো থাকে কাগজে।"

মাস কয়েক পরে ওপার থেকে খবর এলো। আজগর আলী আছেন দিনহাটার পুনর্বাসন ক্যাম্পে। চিঠিতে লিখেছেন, এইখানে সবই আছে। খালি ক্যাম্পের চারপাশে তারের বেড়া। জমির রে, দাগ দেখি এইখানেও।

একত্রিশে জুলাইয়ের রাত দাসিয়ারছড়ার কেউ কোনোদিন ভুলবে না। রাত বারোটা এক মিনিটে আটষট্টি বছরের অপেক্ষা শেষ হলো। মানুষ আটষট্টিটা মোমবাতি জ্বালালো, আটষট্টি বছরের অন্ধকারের জন্য একটা করে। বাঁশের মাথায় উঠল লাল-সবুজ। মসজিদে দোয়া, মন্দিরে উলুধ্বনি, শাঁখ। মানুষ কাঁদছে আর হাসছে, হাসছে আর কাঁদছে। আমার বয়স তখন বিশ। পতাকা হাতে সারা রাত মিছিলে ঘুরলাম।

ঘরে ফিরলাম রাত দুইটায়। উঠানে হারিকেন জ্বলছে। জলচৌকিতে দাদা বসা। একা। অন্ধকারের দিকে মুখ করে।

"উৎসবে গেলেন না?"

"কিয়ের উৎসব রে।"

"আইজ থাইকা আমরা বাংলাদেশ।"

দাদা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "মানুষ মরলে জানাজা হয়। চল্লিশা হয়, কুলখানি হয়। আর দেশ মরলে হয় আতশবাজি।"

আমি জলচৌকির পাশে মাটিতে বসলাম। দাদা আকাশের দিকে তাকিয়ে। "যেই দেশের নাগরিক হয়া জন্মাইলাম, সেই দেশরে জীবনে চোখে দেখলাম না। আইজ রাইতে সে মইরা গেল। একটা মানুষ তার লাইগা একটা দোয়াও পড়লো না। ভাবতেছি, দেশের কি কষ্ট হইতেছে?"

আমি কিছু বললাম না। কী বলব।

"মাটির দিকে চায়া দ্যাখ," দাদা বললেন। "মাটি যা আছিল, তা-ই আছে। ধরলার পানি যেই দিকে যাইতো, সেই দিকেই যাইতেছে। বদলাইলো খালি কাগজ। আর ওই কাগজের লাইগা মানুষ আটষট্টি বছর কানলো, আইজ সারা রাইত নাচবো। এর পরেও কবি, দেশ মানে মাটি? না রে ভাই। মাটি আল্লার। দেশ মানুষের বানানো জিনিস। আর মানুষ যা বানায়, কাগজেই বানায়।"

উনি দূরে জ্বলতে থাকা মোমবাতিগুলোর দিকে তাকালেন। "আটষট্টিটা বাত্তি জ্বালাইছে। গুনছোস? আমার বয়সও আটষট্টি। বুঝতেছি না, বাত্তিগুলা কার জন্মদিনের, আর কার কুলখানির।"

সবাই ভেবেছিল, এইবার দাদার অসুখ সারবে। দাগ তো আর নাই। ম্যাপ থেকে মুছে গেছে, খাতাপত্রে দাসিয়ারছড়া এখন ফুলবাড়ীর আর দশটা গ্রামের মতোই গ্রাম। কারেন্ট এলো, পাকা রাস্তা হলো, ইশকুল হলো। বাবার ভোটার কার্ড হলো, আর সেই কার্ডে বাপের নামের ঘরে জীবনে প্রথমবার উঠল দাদার নিজের নাম। বাবা কার্ড এনে দাদার হাতে দিলেন। দাদা অনেকক্ষণ নামের ওপর আঙুল বুলালেন। মাঝবয়সী বাবা সেদিন বাচ্চাদের মতো কাঁদলেন।

দাদার পা কিন্তু সারল না। চকের দাগের সামনে গেলে আগের মতোই থামতেন। শুধু একটা জিনিস বদলাল। আগে দাগ দেখলে উনার চোখে থাকত ভয়। এখন থাকত পুরনো শত্রুকে চেনার ক্লান্তি। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, "দাদা, দাগ তো গেছেই। এখনো ঘুরপথে যান ক্যান?"

উনি বললেন, "দাগ যায় না রে। দাগ খালি ম্যাপ বদলায়।"

আমি আমিনের কাজ শিখলাম দুই হাজার সতেরো সালে। সবাই ধরে নিয়েছিল দাদা কষ্ট পাবেন। যে দাগ মানুষটাকে সারা জীবন আটকে রাখল, নাতি নিলো সেই দাগ টানার চাকরি। দাদা কষ্ট পেলেন না। শুধু বললেন, "শিখ। মন দিয়া শিখ। দাগ যে টানে আর দাগ যে মানে, এই দুইজন কোনোদিন এক মানুষ না। টানার হাতে থাকিস। মানার পায়ে নামিস না।"

তারপর একটু থেমে যোগ করলেন, "তয় একটা কথা মনে রাখিস। দাগ কলমে জন্মায়, রক্তে বাঁচে। আর তুই যেই দাগ টানবি, সেই দাগ তরে চিনা রাখবো।"

কথার মানে আমি সেদিন বুঝিনি।

গত মঙ্গলবারের আগ পর্যন্ত বুঝিনি।

দাদা মারা গেলেন দুই হাজার বাইশ সালের শ্রাবণে। যে মাসে জন্মেছিলেন, যে মৌসুমে দাগ জন্মেছিল, সেই মাসেই। মরার আগের রাতে আমাকে ডেকে টিনের বাক্স হাতে দিলেন। বললেন, "রাখিস।"

বাক্সে তিনটা জিনিস।

বাবার সেই ভর্তির রসিদ, যে কাগজে আমার বাবা আরেকজনের ছেলে। পনেরো সালের গণনার স্লিপ, যেখানে দাদার জীবনের একমাত্র নিজ হাতে টানা দাগ, ছোট্ট একটা টিক। আর সবার নিচে, চার ভাঁজ করা, তেলচিটে পুরনো একটা কাগজ।

সেই কাগজ একটা ম্যাপ। হাতে আঁকা। দাসিয়ারছড়ার ম্যাপ। এঁকেছিলেন দাদার আব্বা। কোন বাড়ি কোথায়, কোন পুকুর, কোন মসজিদ, বড় কড়ইগাছ পর্যন্ত আঁকা আছে। নাই শুধু একটা জিনিস।

সীমানা।

ম্যাপে দাসিয়ারছড়ার চারপাশে কোনো দাগ নাই। গ্রাম শেষ হয়েছে কাগজের সাদা শূন্যতায়।

"আব্বায় কইতো," দাদা ফিসফিস করে বললেন, "দাগ আঁকলেই সত্য হয়া যায়। হেয় কইতো, সরকারের ম্যাপে দাগ আছে, থাকুক। আমার ম্যাপে থাকবো না। আর কিছু না পারি, আমার হাতে অন্তত এইটা সত্য হইবো না।"

জানাজার পরে গোরস্থানে দাঁড়িয়ে কবর খোঁড়া দেখছিলাম। গোরখোদক প্রথমে কোদালের মাথা দিয়ে মাটিতে মাপমতো একটা চারকোনা দাগ কাটল। তারপর খুঁড়ল। পঁচাত্তর বছরে একটাও দাগ পার না হওয়া মানুষটাকে আমরা ধরাধরি করে চার দাগের ভিতরে নামালাম।

উনি আপত্তি করলেন না। প্রথমবার।

মাটি দিতে দিতে দাদার কথা মনে পড়ছিল। মানুষের নিজের দেশ একটাই। সাড়ে তিন হাত।

দাদা দেশে ফিরলেন।

এইবার মঙ্গলবারের কথা বলি।

লোকে ভাবে আমার পেশা মাপজোকের। আসলে বলা যায় মানুষ দেখার পেশা। জমি ভাগ করতে গিয়ে মানুষের যে চেহারা আমি দেখি, সেই চেহারা মানুষ নিজে আয়নায় দেখলে আয়না ভেঙে ফেলত।

মঙ্গলবারের কাজ ছিল ফুলবাড়ীরই এক গ্রামে। দুই ভাই। বাপের রেখে যাওয়া জমি, বাইশ বছর মামলার পরে আপোষ-বণ্টন। আমি মাপলাম, খুঁটি পুঁতলাম, সুতা টানলাম। সুতার তল ধরে কোদালে দাগ কাটা হলো। গোল বাধল এক জায়গায়। ভাগে বাপ-মায়ের কবর পড়েছে বড় ভাইয়ের অংশে। ছোট ভাই অনেকক্ষণ কবরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর যা বলল, তা আমি বহুদিন ভুলতে পারব না।

বলল, "কবর তর জমিতে পড়ছে। যা। মা-ও তর।"

বলে হাঁটা দিলো। একটা কোদালের দাগ একটা মানুষকে তার মায়ের কবর থেকে আলাদা করে দিলো। আমার চোখের সামনে। আমার টানা সুতা ধরে।

সন্ধ্যায় জিনিসপত্র গুছিয়ে ফিরছি। ভ্যান রাস্তার ওই পারে। মাঝখানে আমারই কাটানো দাগ। সোজা, টাটকা, ভেজা মাটির বুকে লম্বা এক টান।

আমার পা থেমে গেল।

বিশ্বাস করেন, আমি চেষ্টা করেছি। ডান পা উঠছিল না। মনে হচ্ছিল দাগের ওই পার আরেকটা দেশ, আর আমার কোনো কাগজ নাই। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। শেষে যা করলাম, দাদা পঁচাত্তর বছর ধরে যা করেছেন। ঘুরপথ ধরলাম। দাগের মাথা যেখানে শেষ, সেই খুঁটি ঘুরে ওপারে গেলাম।

ভ্যানে উঠে প্রথমে হাসি পেলো।

আপনি বলবেন, সারাদিনের ধকল। দুই ভাইয়ের ঘটনা মাথায় চাপ ফেলেছে। হতে পারে। রংপুরের এক ডাক্তার বহু বছর আগে দাদাকে দেখে বলেছিলেন শুচিবাই, ওষুধে সারে। দাদি বলতেন, দাদাকে ছোটবেলায় দাগে পেয়েছিল, যেভাবে মানুষকে জিনে পায়। দাদা নিজে বলতেন, উনি শুধু দাগ চিনেন।

আমি কোনটা বিশ্বাস করি? জানি না। শুধু জানি, কিছু জিনিস বিশ্বাস অবিশ্বাসের ধার ধারে না। ঘটে যায়। ব্যস।

আর আপনার কাছে যদি পুরোটাই গ্রাম্য গল্প মনে হয়, এক কাজ করেন। ঘরের আলমারি খুলে দেখেন। দলিল, পর্চা, খতিয়ান, জন্মসনদ, কাবিননামা, এনআইডি, পাসপোর্ট। আপনার জমি, আপনার বিয়ে, আপনার জন্ম, এমনকি আপনি যে আপনিই, তার প্রত্যেকটা প্রমাণ শুয়ে আছে কাগজে। মানুষ ভাবে কাগজগুলো তার। অথচ আগুন লাগলে মানুষ আগে কাগজ বাঁচায়, তারপর বাকি সব। কে কার, বুঝে নেন।

ওই রাতে ঘুম এলো না। টিনের বাক্স নামালাম। কারেন্ট ছিল না, মোমবাতি জ্বালিয়ে দাদার আব্বার ম্যাপ বিছানায় মেললাম। মোমের আলোয় বেড়াহীন খোলা গ্রামের দিকে তাকিয়ে আছি।

আমার মেয়ে কখন ঘুম থেকে উঠে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, টের পাইনি। ওর বয়স পাঁচ। ওর নাম নদী। নাম আমার রাখা। দাদা বলতেন, দুনিয়ায় দাগ মানে না তিনজন। পাখি, নদী আর মরণ। মরণের নামে মেয়ের নাম রাখা যায় না। পাখি ছিল দাদির নাম। বাকি রইল নদী।

নদী অনেকক্ষণ ম্যাপ দেখল। তারপর যে প্রশ্ন করল, পাঁচ বছর বয়স ছাড়া ওই প্রশ্ন কারো মাথায় আসে না।

"বাবা, ছবিটার চাইরপাশে বেড়া নাই ক্যান?"

আমি জবাব দেওয়ার আগেই সে টেবিল থেকে পেনসিল তুলে নিলো। গ্রামের চারপাশে দাগ টানবে। ছবি শেষ করে দেবে।

আমি ওর হাত ধরলাম। যত আস্তে সম্ভব।

"আঁকিস না, মা।"

"ক্যান?"

কী জবাব দেবো? চার পুরুষের ইতিহাস? র‍্যাডক্লিফ সাহেব? আটষট্টিটা মোমবাতি? কাঁটাতারে ঝুলে থাকা সেই মেয়ে? আমি শুধু ওর দাদার দাদার কথাই বললাম।

"আঁকলে সত্য হয়া যায়।"

নদী কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পেনসিল রেখে দিয়ে ঘুমাতে চলে গেল। আমি ম্যাপ ভাঁজ করে বাক্সে তুললাম।

মুশকিল খালি একটাই।

আমার মেয়ে ভীষণ জেদি।

আর ঘরে পেনসিলের অভাব নাই।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নদীর টানে, সবুজের গানে

লিখেছেন মাকার মাহিতা, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫

বয়ে চলে নদী দূর হতে দূরে,
অনন্তকালের শান্ত এক সুরে।
তার দুই কূলে রূপের মেলা,
সবুজ প্রকৃতির মিষ্টি খেলা।
হাওয়ায় দোলে ঘাস আর বন,
আকাশের সাথে মেলায় মন।
নদীর জলে আলোর ঝিলিক,
বাতাসে মেশে পাখির কিচিরমিচির।
গাছের ছায়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৩)

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:০৩

৩. নিষিদ্ধ স্বর্গ


পরদিন দুপুরবেলা। ইলির আকাশ আজ কিছুটা পরিষ্কার, মেঘের ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে রোদ উঁকি দিচ্ছে।
ক্লারা তার ট্রাভেল এজেন্সির অফিসের ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছিল। গতকাল ব্যাংকের সেই তরুণ এশীয় অফিসারটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফ্যাসিবাদের দোসর কোনো সাংবাদিককে কেনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শাস্তি দিচ্ছে না?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৪৭

ফ্যাসিবাদের দোসর কোনো সাংবাদিককে এখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শাস্তি দিচ্ছে না কেন?

মানবাধিকার সংস্থা Odhikar আয়োজিত Human Rights Abuses and Access to Justice for Victims বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন আইন... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রেরণা

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৫৬

প্রেরণা
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

যখন জানতে পেরেছি
পড় তোমার প্রভুর নামে
যখন জানতে পেরেছি
যে জানে আর যে জানে না
তারা কখনো সমান না
উক্ত বাণীতে পাই অত্যন্ত প্রেরণা।
শুরু করি পড়াশোনা খুব
জাগে জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ।
ইচ্ছে জাগে দর্শনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে মাপা যায় না...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬



একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে মাপা যায় না...

বিউটি রাণী পালঃ ২০২৬ সালে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। একটি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×