somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে তার পাখিদের কথোপকথন

২৭ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ভোর হওয়ার আগেই পাখিরা বুঝে গিয়েছিল, আজকের সকালটা অন্য রকম। কুয়াশার বদলে বাতাসে ভাসছে ডিজেলের গন্ধ। শিশিরের শব্দকে ঢেকে দিচ্ছে করাতের দাঁতের চিৎকার। সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি, কিন্তু মানুষের লোহার যন্ত্রগুলো যেন সূর্যেরও আগে জেগে উঠেছে।

একটি শালিক ডাল বদলাতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। যে ডালটিতে সে প্রতিদিন বসে গান গাইত, সেটি মাটিতে পড়ে আছে। পাশে একটি বাবুই নিজের ছেঁড়া বাসার দিকে তাকিয়ে নির্বাক। বাসাটি আর বাসা নেই; বাতাসে উড়ে যাওয়া শুকনো খড়ের মতো ছড়িয়ে আছে চারদিকে।

শালিক ধীরে ধীরে বলল, "মানুষ কি নতুন কোনো ঋতুর নাম দিয়েছে? এ কেমন বসন্ত, যেখানে ফুলের বদলে গাছ ঝরে পড়ে?"

বাবুই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "এটাকে তারা উন্নয়ন বলে।"

একটি দোয়েল এসে বসল গুঁড়ির ওপর। তার চোখে ঘুম নেই, ভয় আছে। "উন্নয়ন মানে কী?"

কেউ উত্তর দিল না।

অনেকক্ষণ পর একটি বৃদ্ধ পেঁচা বলল, "মানুষের অভিধানে উন্নয়ন মানে অনেক সময় পুরোনো কিছু মুছে ফেলে নতুন কিছু বানানো। কিন্তু তারা ভুলে যায়, পুরোনো জিনিসগুলোরও প্রাণ আছে, স্মৃতি আছে, ইতিহাস আছে।"

এক কোণে বসে থাকা টিয়া হঠাৎ মানুষের কণ্ঠ নকল করে বলল, "পরিবেশ রক্ষা করতে হবে, গাছ লাগাতে হবে!"


সব পাখি তার দিকে তাকাল।

টিয়া আবার বলল, "এই কথাগুলো আমি পাশের শহরের এক সভায় শুনেছিলাম। বক্তৃতা শেষ হতেই তারা গাড়িতে উঠে এই জঙ্গল কাটার অনুমোদনের কাগজে সই করতে চলে গেল।"

পাখিদের মধ্যে কেউ হাসল না। কারণ এই রসিকতা হাসার মতো ছিল না।

এমন সময় একটি ছোট্ট চড়ুই কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "আমরা এখন কোথায় যাব?"

প্রশ্নটি এত সহজ ছিল যে তার উত্তর সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠল।

বাবুই বলল, "আমি তো গাছের ডালে বাসা বুনি। বৈদ্যুতিক খুঁটিতে সংসার বাঁধা যায় না।"

কোকিল বলল, "বসন্ত এলে আমি গান গাই। কিন্তু যদি গাছই না থাকে, তাহলে আমার গান কোথায় গিয়ে বসবে?"

কাঠঠোকরা নিজের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার কাজই তো গাছের গায়ে। মানুষ কি আমাকে কংক্রিটে ঠোকর দিতে বলবে?"

দূরে একদল বক আকাশে উড়ছিল। তাদের একজন নিচে তাকিয়ে বলল, "দেখো, জঙ্গলটা ওপর থেকে এখন আর জঙ্গল মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে পৃথিবীর বুকে কেউ বড় একটা ক্ষত করে দিয়েছে।"

বৃদ্ধ পেঁচা চোখ বন্ধ করল। সে এই জঙ্গলকে চার ঋতুতে দেখেছে। দেখেছে বর্ষার সবুজ, শরতের আলো, শীতের কুয়াশা, বসন্তের নতুন পাতা। আজ প্রথমবার সে দেখল—একটি জঙ্গলও কাঁদতে পারে।

পাখিরা হঠাৎ লক্ষ্য করল, গাছগুলো পড়ার আগে এক অদ্ভুত শব্দ করছে। যেন তারা বিদায় জানাচ্ছে। শতবর্ষী সেগুনটি মাটিতে পড়ার আগে শেষবারের মতো পাতাগুলো কাঁপিয়ে বলল, "ক্ষমা কোরো। আমি আর তোমাদের আশ্রয় দিতে পারলাম না।"

একটি কাঠবিড়ালি ছুটে এসে বলল, "আমি আমার বাচ্চাগুলোকে খুঁজে পাচ্ছি না।"

তার কথা শুনে কেউ সান্ত্বনা দিতে পারল না।

বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠল। কারণ বাতাস জানে, গাছ না থাকলে তারও কোনো ঠিকানা থাকে না।

দুপুরের দিকে জঙ্গলের অর্ধেকটাই উধাও। মানুষের ট্রাকগুলো গাছের কাণ্ড নিয়ে চলে যাচ্ছে। তারা হয়তো আসবাব বানাবে, বহুতল বানাবে, নতুন শহর গড়বে। কিন্তু কোনো কারখানাই কি একটি পাখির হারিয়ে যাওয়া সকালের গান তৈরি করতে পারবে?

একটি শিশু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। তার হাতে ছিল একটি ছোট চারা গাছ। সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, "সব গাছ কেটে ফেললে পাখিগুলো কোথায় থাকবে?"

বাবা উত্তর দিতে পারলেন না।

সেদিন সন্ধ্যায় জঙ্গলের আকাশ ছিল অস্বাভাবিক নীরব। পাখিদের কোলাহল নেই, কেবল কয়েকটি ডানা অচেনা আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে। তারা জানে না কোথায় তাদের নতুন ঠিকানা। তবু উড়ে যেতে হবে। কারণ পাখিরা থেমে গেলে বাঁচে না।

রাত নামলে বৃদ্ধ পেঁচা শেষবারের মতো চারদিকে তাকাল। তারপর নিচু স্বরে বলল, "মানুষ ভাবে তারা শুধু গাছ কাটছে। আসলে তারা নিজেদের ভবিষ্যতের ছায়াটুকুও কেটে ফেলছে।"

পরদিন সকালে মানুষ আবার কাজে এল। কিন্তু তারা খেয়াল করল না—জঙ্গলের শেষ কয়েকটি পাখি উড়ে যাওয়ার সময় কোনো গান গায়নি।

সম্ভবত সেদিন পৃথিবী থেকে একটি ভাষা হারিয়ে গিয়েছিল। যে ভাষায় অভিযোগ ছিল না, ছিল শুধু সহাবস্থানের আহ্বান। মানুষ সেই ভাষা শোনেনি। আর পাখিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—যেখানে গাছের কোনো অধিকার নেই, সেখানে গানেরও কোনো প্রয়োজন নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১১
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশে ইসলামপন্থা বনাম গণতন্ত্র: মানুষ যখন নাগরিক থেকে অনুসারী হয়ে উঠছে!

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩


কিছুদিন আগেও আমরা বলতাম, "দয়া করে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মেশাবেন না"। সরল এই কথাটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বোধ ছিল - ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনীতি এক জিনিস নয়। গত দুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো প্রয়োজন নেই! আপনি কি মনে করেন?

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪



বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতাবিহীন বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত কোনো ব্যক্তির পক্ষে এককভাবে স্থানীয় সরকারকে প্রযুক্তিনির্ভর এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'-এর লক্ষ্য অনুযায়ী আধুনিকায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

"টোকাই থেকে হিরো"

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৬



টোকাই থেকে হিরো! বাংলা ছবির  অশ্লীল যুগে মুক্তি পাওয়া এক ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র। ছবিতে প্রেক্ষাপটে অনেকটা এইরকম - বস্তিতে বেড়ে উঠা; মানুষের লাথি- উষ্টা খেয়ে বড় হওয়া এক টোকাই (ছবির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখরিত জীবনের চলার পথে, ব্লগের মুখরিত দিন

লিখেছেন মেহবুবা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


ব্লগ স্কুল, মজারু
ছোটন চলে স্কুলেতে বই শ্লেট হাতে ,
বদরুল ভাই কাঁদছে ভীষন যাবে সাথে সাথে,
চান্কু হল লক্ষ্মীছাড়া পান্কু হয়ে ঘোরে ,
চিটি যাবে সবার আগে উঠল... ...বাকিটুকু পড়ুন

Ripe Age দুই প্রান্তের দুই মানুষঃ সামু শব্দের সেতু প্রজন্মের বন্ধন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৪


একজন দাঁড়িয়ে জীবনের শুরুতে
চোখে তার অগণিত স্বপ্ন
আগামীর পথে কত প্রশ্ন
কত না-জানা, কত বিস্ময়
কত দূরের নীল আকাশ
ডাকে তাকে প্রতিদিন।

অন্যজন বসে জীবনের শেষে নয়
বরং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এক প্রান্তে
প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×