ভোর হওয়ার আগেই পাখিরা বুঝে গিয়েছিল, আজকের সকালটা অন্য রকম। কুয়াশার বদলে বাতাসে ভাসছে ডিজেলের গন্ধ। শিশিরের শব্দকে ঢেকে দিচ্ছে করাতের দাঁতের চিৎকার। সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি, কিন্তু মানুষের লোহার যন্ত্রগুলো যেন সূর্যেরও আগে জেগে উঠেছে।
একটি শালিক ডাল বদলাতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। যে ডালটিতে সে প্রতিদিন বসে গান গাইত, সেটি মাটিতে পড়ে আছে। পাশে একটি বাবুই নিজের ছেঁড়া বাসার দিকে তাকিয়ে নির্বাক। বাসাটি আর বাসা নেই; বাতাসে উড়ে যাওয়া শুকনো খড়ের মতো ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
শালিক ধীরে ধীরে বলল, "মানুষ কি নতুন কোনো ঋতুর নাম দিয়েছে? এ কেমন বসন্ত, যেখানে ফুলের বদলে গাছ ঝরে পড়ে?"
বাবুই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "এটাকে তারা উন্নয়ন বলে।"
একটি দোয়েল এসে বসল গুঁড়ির ওপর। তার চোখে ঘুম নেই, ভয় আছে। "উন্নয়ন মানে কী?"
কেউ উত্তর দিল না।
অনেকক্ষণ পর একটি বৃদ্ধ পেঁচা বলল, "মানুষের অভিধানে উন্নয়ন মানে অনেক সময় পুরোনো কিছু মুছে ফেলে নতুন কিছু বানানো। কিন্তু তারা ভুলে যায়, পুরোনো জিনিসগুলোরও প্রাণ আছে, স্মৃতি আছে, ইতিহাস আছে।"
এক কোণে বসে থাকা টিয়া হঠাৎ মানুষের কণ্ঠ নকল করে বলল, "পরিবেশ রক্ষা করতে হবে, গাছ লাগাতে হবে!"

সব পাখি তার দিকে তাকাল।
টিয়া আবার বলল, "এই কথাগুলো আমি পাশের শহরের এক সভায় শুনেছিলাম। বক্তৃতা শেষ হতেই তারা গাড়িতে উঠে এই জঙ্গল কাটার অনুমোদনের কাগজে সই করতে চলে গেল।"
পাখিদের মধ্যে কেউ হাসল না। কারণ এই রসিকতা হাসার মতো ছিল না।
এমন সময় একটি ছোট্ট চড়ুই কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "আমরা এখন কোথায় যাব?"
প্রশ্নটি এত সহজ ছিল যে তার উত্তর সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠল।
বাবুই বলল, "আমি তো গাছের ডালে বাসা বুনি। বৈদ্যুতিক খুঁটিতে সংসার বাঁধা যায় না।"
কোকিল বলল, "বসন্ত এলে আমি গান গাই। কিন্তু যদি গাছই না থাকে, তাহলে আমার গান কোথায় গিয়ে বসবে?"
কাঠঠোকরা নিজের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার কাজই তো গাছের গায়ে। মানুষ কি আমাকে কংক্রিটে ঠোকর দিতে বলবে?"
দূরে একদল বক আকাশে উড়ছিল। তাদের একজন নিচে তাকিয়ে বলল, "দেখো, জঙ্গলটা ওপর থেকে এখন আর জঙ্গল মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে পৃথিবীর বুকে কেউ বড় একটা ক্ষত করে দিয়েছে।"
বৃদ্ধ পেঁচা চোখ বন্ধ করল। সে এই জঙ্গলকে চার ঋতুতে দেখেছে। দেখেছে বর্ষার সবুজ, শরতের আলো, শীতের কুয়াশা, বসন্তের নতুন পাতা। আজ প্রথমবার সে দেখল—একটি জঙ্গলও কাঁদতে পারে।
পাখিরা হঠাৎ লক্ষ্য করল, গাছগুলো পড়ার আগে এক অদ্ভুত শব্দ করছে। যেন তারা বিদায় জানাচ্ছে। শতবর্ষী সেগুনটি মাটিতে পড়ার আগে শেষবারের মতো পাতাগুলো কাঁপিয়ে বলল, "ক্ষমা কোরো। আমি আর তোমাদের আশ্রয় দিতে পারলাম না।"
একটি কাঠবিড়ালি ছুটে এসে বলল, "আমি আমার বাচ্চাগুলোকে খুঁজে পাচ্ছি না।"
তার কথা শুনে কেউ সান্ত্বনা দিতে পারল না।
বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠল। কারণ বাতাস জানে, গাছ না থাকলে তারও কোনো ঠিকানা থাকে না।
দুপুরের দিকে জঙ্গলের অর্ধেকটাই উধাও। মানুষের ট্রাকগুলো গাছের কাণ্ড নিয়ে চলে যাচ্ছে। তারা হয়তো আসবাব বানাবে, বহুতল বানাবে, নতুন শহর গড়বে। কিন্তু কোনো কারখানাই কি একটি পাখির হারিয়ে যাওয়া সকালের গান তৈরি করতে পারবে?
একটি শিশু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। তার হাতে ছিল একটি ছোট চারা গাছ। সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, "সব গাছ কেটে ফেললে পাখিগুলো কোথায় থাকবে?"
বাবা উত্তর দিতে পারলেন না।
সেদিন সন্ধ্যায় জঙ্গলের আকাশ ছিল অস্বাভাবিক নীরব। পাখিদের কোলাহল নেই, কেবল কয়েকটি ডানা অচেনা আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে। তারা জানে না কোথায় তাদের নতুন ঠিকানা। তবু উড়ে যেতে হবে। কারণ পাখিরা থেমে গেলে বাঁচে না।
রাত নামলে বৃদ্ধ পেঁচা শেষবারের মতো চারদিকে তাকাল। তারপর নিচু স্বরে বলল, "মানুষ ভাবে তারা শুধু গাছ কাটছে। আসলে তারা নিজেদের ভবিষ্যতের ছায়াটুকুও কেটে ফেলছে।"
পরদিন সকালে মানুষ আবার কাজে এল। কিন্তু তারা খেয়াল করল না—জঙ্গলের শেষ কয়েকটি পাখি উড়ে যাওয়ার সময় কোনো গান গায়নি।
সম্ভবত সেদিন পৃথিবী থেকে একটি ভাষা হারিয়ে গিয়েছিল। যে ভাষায় অভিযোগ ছিল না, ছিল শুধু সহাবস্থানের আহ্বান। মানুষ সেই ভাষা শোনেনি। আর পাখিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—যেখানে গাছের কোনো অধিকার নেই, সেখানে গানেরও কোনো প্রয়োজন নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
