প্রথম প্রথম শ্যামবাজারের বাসা থেকে বাবা মাঝেমাঝে ঝিনেদার বাড়ীতে আসতেন। পরে আমরা সবাই ওখানে চলে যাই। ঝিনেদার বাড়ীতে রইলেন মেজকাকাবাবুরা।
আমাদের শ্যামবাজারের বাসাবাড়ীটা ছিল তিনতলা।শ্যামবাজার ট্রামডিপোর কাছেই। আমরা ভাড়া থাকতাম তিনতলায়।দোতলায় থাকতো এক দাদু ঠাকমা আর তাদের ছেলেমেয়েরা। আর একতলায় থাকতো এক ঘর হিন্দুস্তানী। আমাদের বাথরুম ছিল তিনতলায় কিন্তু সেখানে কলে জল পড়তো না। নীচে সিঁড়ির তলায় খাবার জলের কল ছিল, আর একটা চৌবাচ্চা ছিল । তাতে চান করার জন্য প্রচুর জল থাকতো। আমরা নীচে গিয়ে সেই চৌবাচ্চার জলে চান করে আসতাম। চান করে আসার সময় প্রত্যেকে এক বালতি করে জল নিয়ে এসে উপরের বাথরুমের চৌবাচ্চায় ঢালতাম । পরে গঙ্গার সাথে সংযোগ করে উপরের কলে জলের ব্যবস্থা করা হল। তাতে চান খাওয়া চলতো না। তবে অন্য সব কাজ ভালো ভাবেই চলত।
সময় যতদূর মনে পড়ে সেটা চল্লিশের দশকের প্রথম দিক । আমরা শ্যামবাজারের বাসায় পাকাপাকি ভাবে চলে এলাম । ছোটকাকা তখন পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসা শুরু করেছেন। ছোটোকাকা লেখাপড়ায় খুব ভাল ছিলেন। ম্যাট্রিকে ছ’টা লেটার পেয়েছিলেন। আই.এস.সি পাশ করে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে চেয়েছিলেন কিন্তু বাবার পক্ষে তখন অত খরচ যোগান সম্ভব ছিলনা । তাই ছোটকাকার আর পড়া হলনা। দিনাজপুরে ৫০০ টাকা মাইনের একটা চাকরী পেয়ে গেলেন। তখন ৫০০ টাকা মানে অনেক টাকা। কিছু দিন চাকরি করার পর ছোটকাকা চাকরী ছেড়ে ব্যবসা শুরু করলেন।
বাবার রং ছিল ধবধবে ফরসা আর ছোটকাকা কুচকুচে কালো। নাক চোখ বাবার মতই টানা টানা সুন্দর । ছোটকাকা সবসময় পরতেন গিলে করা সাদা আদ্দির পাঞ্জাবী আর ধুতি। ছোটকাকার ব্যবসায় সে সময় বেশ রমরমা। ছোটকাকা দুহাতে সে টাকা খরচ করতেন। সবার জন্য কত জিনিষ কিনতেন। ওনার মনটা ছিল খুব ভাল। ছোটকাকার কথা খুব মনে পড়ে।
শ্যামবাজারের বাসায় ছিল তিনটে ঘর। প্রথম ঘরটা ছিল ছোটকাকার। ছোটকাকা সে ঘর খানা সাজিয়েছিলেন খুব সুন্দর সুন্দর ফার্নিচার দিয়ে। মেঝেতে পাতা থাকতো কার্পেট। বাবার বন্ধুরা এলে ওঘরেই বসতেন। বাবার ছিল অভিনয়ের ঝোঁক । বাবা চাকরী করতেন, ছুটির পর অভিনয় করতেন। প্রথমে নাট্যভারতীতে অভিনয় করতেন। এরপর মিনার্ভা, স্টারে অভিনয় করেন। রেডিওতেও কয়েকটা নাটক করেছিলেন। থামাও রক্তপাত, চরিত্রহীন, বিচারক, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, কর্ণার্জুন, সিরাজদৌল্লা, এইসব নাটকে বাবা অফিস ছুটির পর অতিথি শিল্পী হিসাবে নিয়মিত অভিনয় করতেন। বিন্দুর ছেলে, দাসীপুত্র, সন্ধানে আরও অনেক সিনেমা এখন নাম মনে পড়ছেনা।
এখনকার আনন্দলোকের মত সেসময় রূপমঞ্চ নামে একটা সিনেমার কাগজ বেরোত। তাতে বাবার ছবি ছাপা হতে দেখেছি। ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়,শ্যাম লাহা, এই সব অভিনেতারা বাবার বন্ধু ছিলেন । এঁরা মাঝেমাঝে আমাদের বাড়িতে আসতেন। ছবি বিশ্বাসের সাথে চেহারার মিল থাকায় অনেক ছবিতে বাবা ছবি বিশ্বাসের ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ছবি বিশ্বাসকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সমীহ করতেন। ছবিদা বলে ডাকতেন । উনি কোনদিন আমাদের বাড়িতে আসেননি। বাড়িতে বাবার এইসব বিখ্যাত বন্ধুরা এলে প্রথম ঘরটাতেই বসতেন। সোফায় বসা শ্যাম লাহার মুখের ছবি উল্টোদিকের আয়না দিয়ে লুকিয়ে দেখে আমর ভাই বোনেরা কতদিন হাসাহাসি করেছি। আমার বাবার নাম ছিল মণি মজুমদার। বাবা মারা গিয়েছিলেন ১৯৮০ সালের ১৫ই
আগষ্ট ।সেওতো কতদিন হয়ে গেল।
শ্যামবাজারের বাসায় আমরা যখন এলাম, তখন আমার বয়স ছয় আর দিদির সাড়ে ছয়। ছোটোকাকা একবার কিনে আনলেন সিনেমা দেখানোর মেশিন। ওঃ আমাদের সে কি মজা! আমরা দোল খেতে খেতে পড়াশুনো করব বলে নিয়ে এলেন দোলাচেয়ার। দিদি আর আমি গান শিখব বলে কিনে আনলেন অর্গান। ছোটোকাকার ব্যবসার কাজে প্রয়োজন তাই এল টেলিফোন।এইভাবে নানান শৌখিন জিনিসে আমাদের শ্যামবাজারের বাসা বাড়িটা ভরে উঠল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



