somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভালোবাসার সাতকাহন পর্ব ৪

২২ শে নভেম্বর, ২০১৩ রাত ১২:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ট্রেনটা তার সর্বচ্চ গতিতে ছুটছে। লাইনে চাকার ঘর্ষণে আগুনের ফুল্কি বেরোচ্ছে মাঝে মাঝে। জানালার বাইরের দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে দ্রুত। কুয়াশাতে ঝাপসা সবকিছু। মাঝে মাঝে দূরে বহু দূরে একটা দুইটা ঘরে আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে সবকিছু দেখা জাচ্ছে। আনিতা জানালার পাশে বসলেও কিছুই দেখছে না। তার বুক বুকে কোন এক পাগল বুড়ো ঢাক পেটাচ্ছে। ধুক-ধুক আওয়াজ আসছে বুক থেকে। এতো জড়ে যে আনিতার মনেহচ্ছে সবাই শুনে ফেলবে। রাহাত কবির তাদের কক্সবাজারের সাতদিনের সঙ্গি হয়ে এখন তাদের সাথে। শুধু তাই না সে বসেছেও আনিতার পাশের বাঙ্কে। আনিতা আর রাহাত সামনাসামনি বসা। এরকম অভিজ্ঞতা ক্লাসে আছে, কিন্তু ক্লাসে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর সামনে বসা আর এখানে বলতে গেলে একা বসা আলাদা ব্যাপার। দিলিপ কি করে রাহাত কবির কে রাজি করাল সেটাও একটা রহস্য। কারণ রাহাত কবির তাদের এতোটাও পছন্দ করত না যে এককথায় তাদের সাথে এরকম একটা ট্রিপে তাদের সাথে যেতে রাজি হয়ে যাবে। কেউই জানত না তাদের সাথে কে যাচ্ছে। ট্রেনে উঠার আগমুহূর্তে রাহাত কবির তার একটা ঢাউস ব্যাক-প্যাক আর একটা ক্যামেরা হাতে তাদের সাথে হাসতে হাসতে ট্রেনে উঠে পড়ল। ফার্স্টক্লাসে একটা কামরা পেলো আর সেকেন্ড ক্লাসে টিকেট কেনা হোল বাকিদের জন্য। ফার্স্টক্লাসের কামরায় মোট চারটা বাঙ্ক। আনিতা নিরিবিলিতে থাকতে চায় তাই ও একটা দখল করলো। একটা নাঈম এর দখলে গেলো। ও আবার খুব ঘুম কাতুরে। কেবিনে ঢুকেই একটা আপার বাঙ্কে কম্বল মুড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। নাঈমের গার্লফ্রেন্ড আবার জেবা একটু হিংসুটে তাই সেও আর একটা আপার বাঙ্ক দখল করে বসে থাকল। এবার আর একটা বাঙ্ক ফাঁকা এটা কে দখল করবে এটা নিয়ে যখন একটা প্রায় ঝগড়া মতো শুরু হয়ে গেলো তখন রিজভি বলল
- ক্যান স্যার রে ঐ বাঙ্কটা দে না। স্যার আরাম করতে পারবো।
রাহাত কবির আপত্তি করলেও সবাই এতে সম্মতি দেয়। সারা রাত বন্ধুরা আড্ডা দিবে। আজে-বাজে গল্প করবে তার মাঝে কোন টিচার থাকলে করতে পারবে না। তাই আনিতার বিপরীত বাঙ্কে রাহাত কবিরের দখলে।
প্রথমে কথা ছিল আনিতারা সবাই বাসে করে যাবে। কিন্তু এক সাথে এতোগুলো টিকেট পাওয়া গেলো না। তাই শেষ পর্যন্ত তাদের কমলাপুর ইস্টেশন থেকে ট্রেনে উঠতে হোল। খুব বেশী কেউ আসেনি। পনেরো জনের মতো। বাকিরা বিভিন্ন অজুহাতে আসলো না। তা না হলে এখানেও হয়তো টিকেট পেতো না তারা।
আনিতা প্রাণপণ চেষ্টা করছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে। আনিতা নিজের বাঙ্কে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তাকে স্বাভাবিক থাকতে হবে। একের পর এক গ্রাম দূরে চলে যাচ্ছে। আনিতার বার বার মনে হচ্ছে সেই গ্রাম গুলোর কোন একটায় হয়তো তামিম আছে। যাকে এভাবেই আনিতা দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তার খুব মন খারাপ লাগছে। কান্না পাচ্ছে। তার পাশে বসে থাকা এই মানুষটার খুব কাছে যেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু আনিতা একবারের জন্যেও ফিরে তাকায়নি। পাছে তার মনে কি ভাবছে যদি জেনে ফেলে! খুব দেখতে ইচ্ছা করছে কি করে রাহাত কবির। কিন্তু সরাসরি তাকাতে কেমন জানি লাগছে। একবার আড়চোখে দেখল একটা বই পড়ছে। বইটার নাম পড়ার চেষ্টা করলো আনিতা। অনেক বই পড়ে সে নিজেও। এই বইটা পড়া হয়নি তার। সৈয়দ মুজতবা আলী-র শবনম। একবার দেখল রাহাত কবির তার দিকে তাকিয়ে আছে। আনিতা এমন ভাব করল যেন সে বুঝতেই পারেনি।
রাতের অন্ধকার গাঢ় থেকে আরও গাঢ় হচ্ছে। ট্রেনের যাত্রীদের কোলাহল কমে আসছে ক্রমশ। নাঈম আর জেবা ঘুমিয়ে কাঁদা। পাশের কামরা থেকে বন্ধুদের কোলাহল শুনতে পাচ্ছে না আনিতা। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে সে আর রাহাত কবির ছাড়া আর কোন ব্যেক্তি নেই। রাহাত কবির একটু একটু বই পড়ছে আর তার দিকে তাকাচ্ছে। কিছু কি বলবে? না কিছু বলছে না রাহাত। আনিতার মনে অভিমানের কুয়াশা ঘন থেকে ঘন হতে থাকে। এই মানুষটার জন্য কতো আবেগ তার মাঝে কিন্তু একবারের জন্যেও তার সাথে কথা বলতে পারছে না। এতো অহং রাহাতের মাঝে! একটা অসহ্য কষ্টের ডেলা যেন বুকের মাঝ থেকে ঠেলে উঠছে কিন্তু গলার কাছে আটকে যাচ্ছে বার বার। না সে কোন কথা বলবে না আগে। আনিতা বার বার তামিমের কথা ভাবতে চায়। এই মানুষটাকে ভুলে থাকতে হলে তামিমকে নিয়ে ভাবতে হবে। কিন্তু রাহাতের ঔদাসিন্য আনিতা কে আরও বেশি তার দিকে আকর্ষণ করছে।
- চিপস খাবেন আপনি?
হাতের ব্যাগটা থেকে এক প্যাক চিপস বের করে আনে আনিতা। সে জানে এই ব্রান্ডের চিপস রাহাতের খুব পছন্দের। রাহাত হাত বাড়িয়ে চিপসের প্যাকেটটা নিলো। কেমন ছোট বাচ্চাদের মতো দাঁত দিয়ে টেনে প্যাকেট টা খুলতে গিয়ে অর্ধেক চিপস মেঝেতে ফেলে দিল। অন্য কেউ এই কাজটা করলে আনিতা মোটামুটি রাগ করতো। কিন্তু রাহাত কে এই কাজ টা করতে দেখে খুব হাসি পেয়ে গেলো। একটু শব্দ করে হেসেই ফেলল। রাহাত কবিরও হেসে দিল।
- একচুয়ালি আমি না হাত দিয়ে চিপসের প্যাকেট খুলতে পারি না। প্রতিবার এরকমই হয়। আমাকে অন্য কেউ আনপ্যাক করে দেয় আর আমি খাই।
অনেকটা কৈফিয়তের সুরে বলে রাহাত।
- কোন সমস্যা নাই । আমিও এরকম কিছু সিম্পল কাজে গণ্ডগোল পাকিয়ে ফেলি।
আনিতা রাহাত কে সহজ করার জন্য এই কথা বলে।
- আমি একটু বেশি বেশি ভুল কাজ করি মনেহয়। বোকার মতো কাজ। পরে নিজের গালে নিজেই থাপড়াতে ইচ্ছা করে।
- হা হা হা। কেন কি করেন আপনি?
- এইযে দেখো না। তোমাদের বন্ধুদের একটা পিকনিকের মাঝে আমি আসে ঢুকে পরলাম। তোমাদের গল্প এখন খুব সাবধানে বলতে হবে যাতে আমি না শুনি। কি এক বিপদে ফেলে দিলাম তোমাদের।
রাহাত কবির কেমন যেন অপরাধীর মতো একটা ভাব করলো। আনিতার মজাই লাগলো দেখে।
- না আপনি বিপদে ফেলেননি আসলে আমরাই আপনাকে বিপদের মাঝে ফেলে দিয়েছি। এক সপ্তাহ আমাদের সাথে থাকতে হবে। আমরা তো আসলে সুস্থ না কেউ।
- মানে কি হয়েছে তোমাদের?
রাহাত কবিরের কণ্ঠে ভয়।
- না আসলে আমরা তো সকলেই পাগল। দেখবেন এক সপ্তাহ পর আপনিও আমাদের দলে চলে আসবেন।
- হা হা হা!! তুমি তো অনেক ফানি।
রাহাত কবির হাসতেই থাকে। আনিতা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে রাহাতের দিকে। এতো সুন্দর করে কি কেউ হাসতে পারে! আনিতার ইচ্ছা করছে রাহাতের গালটা একটু ছুঁয়ে দিতে।
রাহাতের এতো কাছে আসতে পারবে কোনদিনও ভাবেনি আনিতা। তার মুগ্ধতা বাড়ছে আরও। রাহাতের কথা বলা, হাসা, ভ্রু কুঁচকে তাকানো সব কিছু আনিতা কে যেন এক অতিকায় চম্বুকের মতো আকর্ষণ করছে। রাহাত কতো রকমের গল্প করছে আনিতা আজ শুধুই স্রতা। সে বরাবরই রাহাতের মুগ্ধ স্রতা। কিন্তু এতটা ব্যেক্তিগত ভাবে রাহাতের সাথে কথা হয়ে উঠেনি। রাহাত কথা বলতে বলতে একটা সময় নিজের অজান্তেই আনিতার বাঙ্কে এসে বসে। আনিতার একটু অস্বস্তি হতে থাকে। কারণ রাহত তার অনেক কাছে এসে বসেছে। সে জানালার দিকে একটু সরে বসে। রাহাত সে দিকে কোন খেয়াল নেই। একটার পর একটা গল্প বলে যাচ্ছে, তার ছোটবেলার গল্প, ভার্সিটির গল্প।


পর্ব ১
Click This Link পর্ব ২ Click This Link
পর্ব ৩ Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে নভেম্বর, ২০১৩ সকাল ৯:৫৩
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৬



স্বাধীনতা পরবর্তী, পচাত্তর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ক্যু হয়েছে দেশে। সামরিক বাহিনীতে সংঘাত। বহু সদস্য হতাহত। জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাঝা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



বর্তমানে জনসংখ্যার বিচারে 'বিহার' ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য।
বিহারের রাজধানী পাটনা। বিহার মূলত দরিদ্র অঞ্চল বলা যেতে পারে। এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ছিলো মূলত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ক্যাশলেস সোসাইটি এর জন্য কি পারফেক্ট?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



এটা বাংলা কিউ আর কোড। বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাবসায়ীদের বাংলা কিউ আর কোড বাধ্যতামূলক করেছেনভ এটার ভালো দিক ও খারাপ দিক দুইটাই আছে। বাংলাদেশের সিস্টেম, কারিগরি দক্ষতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাহরাম নয়, এমন পুরুষকে কি একজন স্ত্রীলোক নিজের স্তনের দুধ পান করাতে পারবেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২১

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: সাহলা বিনতে সুহাইল নবী করীম ﷺ-এর নিকট এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট সালেমের আসাটা আবু হুযাইফা ভালো মনে করছেন না। নবী বললেন:... ...বাকিটুকু পড়ুন

লুচ্চামি আর যৌন হতাশা এক বিষয় না।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২


সম্প্রতি জামায়াতের এক লুচ্চা এমপি-র অন্তত দুইজন তরুণী নিয়ে কট খাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তিনি তরুণী নিয়ে হোটেল, কোচিং সেন্টারে রুম ডেট করতেন। নেটিজেনরা তার এই লুচ্চামি এমনভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×