এই লেখাটা গত ২৬ জুলাই প্রথমআলোর উপসম্পাদকীয় পাতায় ছাপা হয়েছিল। আমার বাবাকে নিয়ে লেখা। বাবার ২টি ছবি। ১টি ১৯৩৯ সালে আরেকটি ২০০৭ সালে।
একজন সাধারণ মানুষের গল্প
১.
২৬ জুলাই ২০০৭। এই দিনে ছিয়ানব্বই বছর বয়সে আমার বাবা জাঈনউদ্দিন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। জরুরি অবস্থার মধ্যেও প্রায় সব বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলির সে সময়কার শীর্ষনেতৃত্ব, সেদিন তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন। নেতৃবৃন্দের সাথে সাথে প্রায় সকল ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধিরাও সমবেত হয়েছিলেন আমাদের পৈত্রিক বাড়ির আঙিনায়। বাইরে ঝম ঝম বৃষ্টি, বাড়ির গলিতে হাঁটু অব্দি পানি জমে যাচ্ছে, এরই মাঝে এত লোকসমাগম হবে তা আমরা ভাবতেও পারিনি। এর মধ্যে একুশে টিভির একজন প্রতিনিধি আমার বাবা সম্পর্কে আওয়ামী লীগ নেত্রী মতিয়া চৌধুরী ও বিএনপি নেতা এমকে আনোয়ারের মন্তব্য রেকর্ড করবার পর পরিবারের সদস্য কাউকে খুঁজছিলেন; বাবার মরদেহের পাশে দাঁড়ানো মেজভাইকে ছাড়িয়ে আমার কাছেই কেন যেন একুশে টিভির সেই প্রতিনিধি বাবার প্রোফাইল জানতে চাইলেন । শোকবিহ্বল অবস্থায় আমি কেবল বলতে পারলাম ‘সমস্ত জীবন হাই প্রোফাইলের মানুষদের খুব কাছাকাছি থাকলেও সত্যি বলতে কী উনার তেমন কোনো হাই প্রোফাইল ছিল না। পাশ থেকে হঠাৎ মতিয়া আপা বল্লেন-"এই প্রজন্মের তোমরা জানো না উনি ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের একজন যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে তুমি সম্বোধন করে কথা বলতেন।"
২.
অসংখ্য ‘অসাধারণ’ মানুষের ভীড়ে আমার বাবা সত্যিকারের অর্থেই একজন অতি সাধারণ মানুষ এবং আমাদের কাছে একজন অতি সাধারণ সনাতন বাবা ছিলেন। আজ যখন পত্রিকার পাতায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের এবং তাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের শতকোটি টাকার রূপকথা পড়ি তখন মনে হয় বাবা পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরোয়ার্দী এবং গণপরিষদের প্রাক্তন স্পীকার হামিদুজ্জামান চৌধুরীর মত বৃহৎ মাপের মানুষদের সঙ্গে একজন সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জীবনের বিভিন্ন সময় কিন্তু শতকোটি তো দূরের কথা একশত টাকাও তিনি বেতনের বাইরে থেকে আয় করেননি। নিজের পরিবার আর অকালপ্রয়াত দু’ভায়ের (আমার দু’চাচা) স্ত্রী-সন্তানদের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি ১৯৩৯ সালে ছাব্বিশ বছর বয়সে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে অবিভক্ত ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে ছোটখাটো চাকুরি গ্রহণ করেন। তখন তার প্রথম কর্মস্থল কোলকাতা। একজন বাঙালী মুসলমান হিসেবে এবং নিজের কর্তব্যনিষ্ঠার কারণে খুব সহজেই শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরোয়ার্দী প্রমুখের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেন তিনি। ১৯৪০ এর ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের বৈঠকস্থলে তিনি উপস্থিত ছিলেন। ১৯৪৬ এর ভয়াবহ সা¤প্রদায়িক দাঙার একজন প্রত্যদর্শী ছিলেন তিনি- সেসময় হোসেন শহীদ সোহরোয়ার্দী এর অধীনে চাকুরী করার সুবাদে দাঙা মোকাবেলায় ও সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি স্থাপনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। কোলকাতায় অবস্থানকালে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল মোহামেডান স্পোর্টিং কাবের সঙ্গে; সখ্যতা ছিল শিল্পী আবাসউদ্দিন, জয়নুল আবেদিন প্রমুখের সঙ্গে। অফিসের সময়ের বাইরে চিরকালই বাবা শিক্ষাসংস্কৃতির একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে চাকুরি পরিবর্তন করে তিনি ফিরে আসেন তার স্বভূমে- প্রথমে জন্মস্থান মানিকগঞ্জ ও পরে ঢাকায়। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের এডভোকেট জেনারেল হিসেবে ঢাকায় এলে তিনি বাবাকে আবার কাছে ডেকে নেন । এসময় তাঁর সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, আবু সাঈদ চৌধুরী (পরে বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতি) প্রমুখের সঙ্গে। বয়সে ছোট বলে বঙ্গবন্ধুকে তিনি ডাকতেন "তুমি" বলে।
৩.
কোলকাতায় থাকতে বাবা দেখেছিলেন বহু যুবক দিনে চাকুরি করে রাত্রে নৈশ কলেজে পড়ালেখা করতো। ঢাকায় পঞ্চাশের দশকে কোনো নৈশ কলেজ ছিল না-বিষয়টা তাকে খুব ভাবাতো। সেসময় তিনি এরকম একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করবার জন্য বিভিন্ন শিক্ষানুরাগীর সাথে যোগাযোগ করলেন। বাবার কান্তিহীন চেষ্টায় ঢাকার প্রথম নাইট কলেজ "ঢাকা সিটি নাইট কলেজ" এর কার্যক্রম শুরু হল ১৯৫২-৫৩ সালে। এ কলেজের প্রথম কাস শুরু হয় সন্ধ্যার পর ঢাকা কলেজের গ্যালারীতে; এরপর ওয়েস্টএন্ড হাইস্কুলে স্থানান্তরিত হয় কলেজের কার্যক্রম এবং তারও কিছুদিন পর ধানমন্ডির দুই নম্বর সড়কে কলেজটি স্থানান্তরিত হয়। প্রথমে কেবল নাইট শিফ্ট , এরপর ডে-নাইট দু শিফটে কলেজ চালু হয় । কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় বাবাকে বিশেষভাবে সহায়তা করেন জনাব খানে আলম খান সাহেব- যিনি পরে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন। সেই কলেজটি আজ ধানমন্ডির দু নম্বর সড়কে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে "ঢাকা সিটি কলেজ" হিসেবে। জানিনা কলেজের শিক্ষার্থীদের এই কলেজ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বা প্রতিষ্ঠাতার নাম জানানো হয় কিনা। কলেজের ফান্ড সংগ্রহের জন্য খানে আলম খান সাহেবের সহায়তায় তিনি একবার বলাকা সিনেমা হলের টিকেট বিক্রির টাকার প্রমোদ-কর কলেজের জন্য বরাদ্দ করে নিয়েছিলেন- এ ঘটনাটি অনেকে ভুলে গেলেও আমার এখনো মনে আছে।
৪.
এ লেখাটির উদ্দেশ্য এই বলা নয় যে আমার বাবা অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন- বরং তার দীর্ঘ জীবনে তিনি বহুবার তথাকথিত অসাধারণ হবার সুযোগ পেয়েও সাধারণ হয়ে ছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে পাকিস্তানি আর্মিক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার মেজভাই কামাল আহমেদ তখন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক- যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সে ঘরছাড়া। তার খোঁজে বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী; কিন্তু সাবেক স্পীকার আবদুর হামিদ চৌধুরির (সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাবা) অধীনে চাকুরির কারণে পাকিস্তানী কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলা ও কিছূ সেনাকর্মকর্তার নাম ঠিকানা পাওয়া যায় বাবার ডায়েরীতে- সেগুলোর বদৌলতে বাবা ছাড়া পান। এলিফেন্ট রোডে আমাদের বাড়ির দোতলায় সেময়কার ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের বহু নেতা কর্মীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। অবস্থানগত কারনে মুক্তিযুদ্ধের সময় এলিফেন্ট রোড ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। যাই হোক স্বাধীনতার পর আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর সাথে বিভিন্নকাজে বহুবার দেখা করেছেন, সেজভাই জামাল আহমেদকে সাথে করে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেছেন ভায়ের আঁকা একটি ছবি উপহার দিতে (শিল্পী জামাল আহমেদ, অধ্যাপক, চারুকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন অনুরোধ রেখেছেন, আবার বিনয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কোনো কোনো অনুরোধ ফিরিয়েও দিয়েছেন (যেমন সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ)- কিন্তু কোনো বৈষয়িক সুযোগ সুবিধা কোনোদিন কোনো মতাসীনের কাছ থেকে গ্রহণ করেননি। এ কারণে আমাদের নয় ভাইবোনের বিরাট সংসারে অতিরিক্ত সচ্ছলতা ও প্রাচুর্য না থাকলেও সহজ সাধারণ শান্তিটুকু ছিল সবসময়। বাবা ছিলেন সব সময়ই হাই থিংকিং অ্যান্ড সিম্পল লিভিং নীতিতে বিশ্বাসী। অবশ্য এর জন্য আমার বাবার যোগ্য সহধর্মীনি আমার মা বেগম আশরাফুন্নেসা বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। আমর মায়ের আকাংক্ষার ব্যপ্তি ছিল খুবই সীমিত, তাই আমার বাবা সব সময় আয় বুঝে ব্যয় করে গেছেন, ব্যয়ের লমাত্রা ঠিক করে অবৈধ পথে আয় করার চেষ্টা কখনোই করেননি। ব্যক্তিজীবনে ও পেশাগত জীবনে কখনো অসততার পথ বেছে নেননি। আজকে এই দিনে বাবাকে তাই স্মরণ করছি কেবল আমার বাবা বলে নয়, বরং আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় যখন দুর্নীতি, কালোবাজারি, অসৎ পন্থা ও আকাশচুম্বী বৈষয়িক লালসা বাবার পরবর্তী প্রজন্মের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনীতিকদের পাতালে নামিয়ে এনেছে এবং আমাদের মত সাধারণ জনগণকে ফেলেছে হতাশা ও টিকে থাকার এক করুণ সংগ্রামের মধ্যে তখন বাবার মত "সাধারণ" মানুষদের অভাব এই দেশে এই সময়ে বড় প্রকট হয়ে চোখে পড়ে। আমরাও কী বাবা এবং তাঁর সময়কার আরও সব মানুষদের মত অতি সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাসী হয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারি না?
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১০:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



