আলোচিত জিন বিজ্ঞানী ক্রেইগ ভেনচার পৃথিবীর সাগরতলের জীবাণুদের ডিএনএ ম্যাপ তৈরি করার কাজ শুরু করেছেন। সাগর তলে বিপুল প্রাণ বৈচিত্র রয়েছে। সাগর হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রাণীর আবাসভূমি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এদের অধিকাংশ এখনও মানুষের সম্পূর্ণ অজানা রয়ে গেছে। এ কারণেই বিজ্ঞানী ক্রেইগ ভেনচার সর্বশেষ গবেষণার স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাগরতলের রহস্যময় জগৎ।
বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত দুঃসাহসী এক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে। এই প্রজেক্টের অধীনে বিজ্ঞানীরা একটি জেনেটিক লাইব্রেরী তৈরি করছেন যেখানে বিজ্ঞানীদের শেখানো হবে জীবেরা কিভাবে পরস্পরের সহায়তায় বাস করে। এ গবেষণা বিজ্ঞানীদের নতুন ওষুধ তৈরি করতে সাহায্য করবে। সাগর তলের এ গবেষণা দূষণ মুক্ত এনার্জি আবিষ্কার করতেও সহায়ক হবে।
ব্যতিক্রমি গবেষক ক্রেইগ ভেনচারের এ ধরনের দুঃসাহসি পদক্ষেপ নতুন কোনো বিষয় নয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিজ্ঞানীদের মাঝে হিউম্যান জিনোম প্রতিযোগিতা শুরু করিয়েছেন। ২০০০ সালের হিউম্যান জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের সাফল্যের পরও তিনি তার মুকুট নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চান নি।
তার সর্বশেষ গবেষণা প্রকল্প হচ্ছে, গ্লোবাল ওশেন স্যামপ্লিং ইক্সপিডিশন। ড. ভেনচার এবং কয়েকজন বিজ্ঞানী তাদের রিসার্চ ইয়ট সরসার ২-এ করে এ গবেষণার ডেটা সংগ্রহ করেছেন। গবেষণার লক্ষে ইয়টে করে নির্দিষ্ট রুট ধরে তারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় মহাসাগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা সাগরের পানির মধ্যে বসবাসকারি অসংখ্য জীবাণু ও অনুজীবের (মাইক্রো অর্গানিজম) নমুনা সংগ্রহ করেন।
গুরুত্বপূর্ণ এ অভিযানকে অনেকে ভিক্টোরিয়ান যুগের অবিস্মরণীয় অভিযানগুলোর সঙ্গে তুলনা করছেন। পৃথিবীর অণুজীবদের শতকরা এক ভাগেরও কম ল্যাবরেটরিতে জন্মায় এবং এদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকটি সম্বন্ধেই মানুষ বিস্তারিত জানে। বাকি ৯৯% আজও মানুষের অজানা রয়ে গেছে।
ডিএনএ গবেষণা
ড. ভেনচারের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান জে. ক্রেইগ ভেনচার ইন্সটিটিউট এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করছে। বিজ্ঞানীরা নমুনা হিসেবে সংগ্রীহিত পানি ফিলটার করে অনুজীব বা জীবাণুগুলো বের করে আনেন। এরপর তাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। গবেষণার ফলে পাওয়া প্রায় ৭.৭ মিলিয়ন পৃথক ডিএনএ এবং ৬.৩ বিলিয়ন ডিএনএ লেটার তারা প্রকাশ করবেন। হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টের থেকে এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। বিশাল এ ডিএনএ ইন্সট্রাকশনে থাকবে প্রায় ৬ মিলিয়ন প্রোটিন সিকোয়েন্সের কোড। বিজ্ঞানীরা এতোদিন যে পরিমাণ প্রোটিন সম্বন্ধে জানতেন এ প্রজেক্টের ফলে এবার তার দ্বিগুণ পরিমাণ প্রোটিন সম্বন্ধে জানা যাবে। গবেষণার ফলাফল মোট তিনটি পেপারে অনলাইন ওপেন অ্যাক্সেস জার্নাল পাবলিক লাইব্রেরি অফ সায়েন্স: বায়োলজিতে প্রকাশ করা হবে। ইউএসএ-র নর্থ-ইস্ট কোস্টের ৪৪টি সাইট থেকে নমুনা নেয়ার পর তারা ক্যারিবিয়ান এবং পানামার মাঝ দিয়ে প্যাসিফিকের বিখ্যাত গালাপাগোস দ্বীপের মাঝ দিয়ে তারা নিজেদের শেডিউলড পথে প্রদক্ষিণ করেন।
ড. ভেনচার জানান, এ গবেষণা শেষ নয় বরং শুরু। এখানকার (সাগরের) জীবন সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে ।
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে
ড. ভেনচার জানাচ্ছেন, সমুদ্রের ক্ষুদ্র প্রাণীরা গ্লোবাল ওয়ার্মিং কমানো বা বন্ধ করার জন্য সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কারণ সমুদ্র হচ্ছে কার্বনের আধার। আমরা নিশ্বাসে যে বাতাস নেই তা অনেকাংশে সমুদ্র থেকে আসে। বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করবে এমন ধরনের জীবাণুর বীজ সমুদ্রে ছড়িয়ে দেয়া যায়।
ক্যালিফর্নিয়ার সল্ক ইস্টটিটউটের ড. ভেনচারের টিমের একজন বিজ্ঞানী জেরার্ড ম্যানিং জানান, দীর্ঘমেয়াদে এ প্রকল্প থেকে জিন গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। এ গবেষণায় জিনের বিশাল ভূবন সম্বন্ধে জানা যাবে এবং প্রোটিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তা কাজে লাগবে।
মানব কল্যাণে অবদান
টিমের একজন মেম্বার ডগলাস রাশ জানান, বিভিন্ন ধরণের প্রোটিন থেকে ধারণা নিয়ে বিজ্ঞানীরা ডিজাইন করতে পারবেন নতুন প্রোটিনের। নতুন জিন ক্যাটালগ মানুষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগবে। আনকোরা নতুন প্রোটিন তালিকা ভবিষ্যতে পৃথিবী থেকে ক্যান্সার নির্মূল করতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে। এছাড়াও এ গবেষণার মাধ্যমে কেমিক্যাল অ্যানার্জি এফিসিয়েন্সি বাড়ানোর উপায় পাওয়া যাবে এবং মানবজাতির এমন সব উপকারে আসবে যা এখন কল্পনাও করা যায়না।
বর্তমানে মাইক্রো অর্গানিজমের বিভিন্ন প্রোটিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রসেসে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন তাপমাত্রায় এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যাসিডিটিতে বিভিন্ন ধরনের মাইক্রোঅর্গানিজম কাজ করে। এ বিষয়ে গবেষণা করা হলে তা আরও সূক্ষ্মভাবে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কম অ্যানার্জি ব্যবহার করে এমন মাইক্রোঅর্গানিজম খুজে পাওয়া যাবে। এগুলো সবই ড. ভেনচারের গবেষণার ফলাফল থেকে পাওয়া যাবে।
বিজ্ঞানের দুষ্ট ছেলে
ড. ভেনচারের বুল-ইন-এ-চায়না-শপ-এর হিউম্যান জিনোম গবেষণার কারণে টাইম ম্যাগাজিন ২০০০ সালে তাকে বিজ্ঞানের দুষ্ট ছেলে বা ব্যাড বয় অফ সায়েন্স উপাধিতে ভূষিত করে। সে সময় বিজ্ঞানী মহলে তার অনেক সহকর্মীই মানুষের জেনেটিক কোড উদ্ধার এবং তা থেকে অর্থ কামানোর পরিকল্পনা পছন্দ করেনি। ইউনিভার্সিটিতে এক ঘটনায় তাকে প্রফেসর বলেন, বায়োলজি অনেক পূর্ণাঙ্গ বিষয়। তিনি এর জবাবে বলেছিলেন, বায়োলজিতে নতুন কিছু আবিষ্কার করা কঠিন। কারণ এ বিষয়ে (বায়োলজি) অনেক কিছুই মানুষের জানা আছে। কিন্তু জিনোমিক্স (জিন সম্পর্কিত বিদ্যা) সম্বন্ধে এ কথা প্রযোজ্য নয়।
উইকিপিডিয়ায় ড. ক্রেইগ ভেনচার...
http://en.wikipedia.org/wiki/Craig_Venter
উইকিপিডিয়ায় হিউম্যান জিনোম...
Click This Link
(ছবি- ওয়েবসাইট)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০০৮ সকাল ১১:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



