somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বার্মিংহাম - ১৬

০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ২:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
বার্মিংহামে তখন শীতকাল। বাসে করে যেতে যেতেই আস্তে আস্তে দিনের আলো ফুটে উঠলো। এ সময় আমরা বেশ সুন্দর একটা জায়গায় বাস থেকে নামলাম। পাশে সাইনবোর্ডে লেখা শেডিংটন রোড। ভোরের আলো আর কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা থেকে বাঁচার জন্য জ্যাকেট আর মাপলারটা ভালো করে জড়িয়ে নিলাম।
বার্মিংহাম শহরের ভেতরে হলেও এ জায়গাটা অনেকটা গ্রামের মতো দেখতে। ফুটবল মাঠের মতো চওড়া খালি জায়গা। মাঝখানে সঙ্কীর্ণ রাস্তা আর দুপাশে বেশ খানিকটা খালি জায়গা। রাস্তা থেকে অন্তত ৫০ ফুট দূরে তৈরি করা হয়েছে দুপাশের বাড়িগুলো। পাহাড়ি এলাকার মতোই এর সোজা সামনে অনেকদূর পর্যন্ত ঢালু হয়ে নেমে গেছে। এরপর আবার উচু এলাকা।

বাসটা চলে গেল। আর কোনো গাড়ি নাই। রাস্তায় একটা জনপ্রাণীও নাই। কয়েকটা বাসার চিমনি থেকে সাদা ধোঁয়া উঠছে। আলো কম থাকায় রাস্তার স্ট্রিটল্যাম্পের বাতিগুলো তখনো জ্বলছে।
জাকিয়া বলছিলো, আমরা ম্যারির বাসায় যাচ্ছি। সামান্য একটু হেঁটে ম্যারির বাসায় গিয়ে আমরা দরজা নক করলাম। বাসার ভেতর থেকে এক হাসিখুশি ভদ্রলোক বের হয়ে দরজা খুলে দিলেন। জাকিয়াকে দেখে তিনি খুব খুশি হলেন। হাই হ্যালো শেষ করার পর তিনি আমার সঙ্গেও পরিচিত হলেন। জাকিয়া জানালো তিনি ম্যারির হাসব্যান্ড। ব্রিটিশদের এই অভ্যাসটা আমার বেশ ভালো লাগে। যে কোনো অপরিচিত মানুষের সাথে এরা খুব ভালোভাবে কথা বলে।
ম্যারির বাসার একতলাতে আমরা ব্যাগ রাখলাম। জাকিয়া ব্যাগ থেকে ডিসপোসেবল গ্লাভস আর অ্যাপ্রন বের করলো। আমার কাছেও অফিস থেকে দেওয়া এক ব্যাগ অ্যাপ্রন আর গ্লাভস ছিল। আমি সেগুলি বের করলাম।
আমার পুরো প্যাকেট দেখে জাকিয়া হেসেই বাচেনা। বলে এতো অ্যাপ্রন সব একসাথে বয়ে নিয়ে এসেছ কেন? আমিও নিজের বোকামি দেখে হাসলাম। জাকিয়ার দেখাদেখি আমিও হাতে গ্লাভস পড়লাম। আর অ্যাপ্রন বাঁধলাম।
এরপর আমরা দুজন দোতলায় গেলাম। দোতলাতে এক বয়স্ক মহিলা বসে আছেন। জাকিয়া পরিচয় করিয়ে দিলো। ম্যারি।
এখানে মানুষের যতো বয়সই হোকনা কেন, নাম ধরেই ডাকার নিয়ম। পরিচিত হবার পরই ম্যারি হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো। আমি হ্যান্ডশেক করলাম। হ্যান্ডশেক করা মাত্রই ম্যারি জানিয়ে দিল, তোমার হাত খুবই ঠাণ্ডা। আমিও তা জানতাম। বাইরে এতো ঠাণ্ডা যে হাত ঠাণ্ডা না হয়ে উপায় নাই।
জাকিয়া জানালো যে, তুমিতো আজকে একেবারে নতুন। তাই আজকে শুধু দেখ, আমি কি করি। জাকিয়া জানালো, ম্যারির শরীরের বাম পাশ প্যারালাইজড। তো আমাদের কাজ হচ্ছে, ম্যারির সেবাযত্ন করা। এজন্য একটা গামলায় গরম পানি আনা হলো। সেখানে একটা তোয়ালে ভিজিয়ে ম্যারির হাত, মুখ মুছিয়ে দেয়া হলো। এরপর ভালোভাবে ক্রিম মাখিয়ে, চুল আঁচড়িয়ে তাকে উঠিয়ে একটা হুইল চেয়ারে বসানো হলো।
ম্যারিকে বাড়ির দোতলা থেকে একতলাতে নামানোর জন্য সিড়িতে লিফটের মতো একটা ইলেক্ট্রিক যন্ত্র ছিল। সেটাতে উঠিয়ে সাবধানে ম্যারিকে একতলাতে নামিয়ে আবার হুইল চেয়ারে বসানো হলো।
এরপর জাকিয়া ম্যারির হাসব্যান্ডকে ডাক দিয়ে বললো, ম্যারি সম্পূর্ণ রেডি।
জাকিয়ার দেখাদেখি আমিও হাতের গ্লাভস আর অ্যাপ্রন খুলে ফেলে দিলাম। এরপর জাকিয়া একটা ফাইল বের করে সংক্ষিপ্ত ভাবে ম্যারির অবস্থা আর আমরা সেখানে কি কি করলাম তার একটা বর্ণনা লিখে ফেললো। ঢুকার সময়, বের হবার সময় লিস্ট করলো। এরপর হলুদ রঙের কাগজ বের করে সেখানে ম্যারির হাসব্যান্ডের স্বাক্ষর নিয়ে নিলো।
বুঝলাম আজকে আমাদের এখানে কাজ শেষ। এরপর আমরা ম্যারি আর তার হাসব্যান্ডের থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। জাকিয়া জানালো এবার আমাদের মিস ক্যারোলের বাসায় যেতে হবে।
যাবার সময় ভাবছিলাম, বৃটিশ সরকারের কতো সিস্টেম। আমরা যে ম্যারির সেবাযত্ন করছি এর টাকা কিন্তু ম্যারির হাসব্যান্ডের দেয়া লাগবে না। ম্যারি যেহেতু ডিজঅ্যাবল তাই তার সেবাযত্নের জন্য বৃটিশ সরকার ফার্স্ট চয়েস কেয়ার এজেন্সিকে দায়িত্ব দিয়েছে। আর আমরা তাদের চাকরিজীবি হিসেবে ম্যারির সেবা করছি। মানুষের সেবা করা হিসেবে আমারও কাজটা খুব খারাপ বলে মনে হলোনা। নিজের মনেই সান্ত্বনা পেলাম, পেইড মানবসেবার কাজ। খারাপ কি।

২.
এরপর আমরা দুইজনে গেলাম মিস ক্যারোলের বাসার দিকে। জাকিয়া জানিয়ে দিয়েছিলো, মিস ক্যারোল কিন্তু ম্যারির মতো ভালো না। মাঝে মাঝে তার মেজাজ বেশ খারাপ থাকে।
আমরা দুইজনে আবার বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখানকার বাস সময় ধরে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস আসলো। আমরা বাসে করে কিছুদূরে গিয়ে নামলাম। নেমে কিছুদূর হেঁটে মিস ক্যারোলের বাসার সামনে গেলাম। মিস ক্যারোলের বাসার নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ ভাল। বাইরে একটা বাক্সের মতো আছে। সেখানে ক্যালকুলেটরের মতো একটা নাম্বারপ্যাড লাগানো। জাকিয়া খুব দ্রুত কয়েকটা নাম্বারে চাপ দিলো। বাক্সটা খুলে গেল। তার ভেতর থেকে জাকিয়া একটা চাবি বের করলো। সেই চাবি দিয়ে বাসার দরজা খোলা হলো।
দরজার ভেতরে দেখি আরেকটা দরজা। সেখানে একটা স্পিকার লাগানো। জাকিয়া স্পিকারের কাছে গিয়ে বললো, আমি জাকিয়া। ভেতর থেকে দরজাটা খুলে গেল।
মিস ক্যারোলের বাসায় ঢুকলাম। মিস ক্যারোল একটা বাসাতে একাই থাকেন। তিনিও ডিজঅ্যাবল। বয়স আনুমানিক ৪০ হবে। নড়াচড়া করতে পারেন না। মাথা ঘুরাতে পারেন। কথা বলতে পারেন আর বামহাত সামান্য নাড়াতে পারেন। সেটা দিয়েই তিনি ইলেক্ট্রিক হুইল চেয়ার চালাতে পারেন, টিভির রিমোট কন্ট্রোল চালাতে পারেন। কোনো আত্মীয় স্বজনের ধার ধারেন বলেও মনে হলোনা।
মিস ক্যারোলকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে আমরা তার সামনে টিভিটা অন করে দিলাম। তিনি ইচ্ছামতো চ্যানেল চেঞ্জ করে দেখতে লাগলেন।
ওনার খাওয়ার ব্যবস্থাও আমাদের করতে হবে। ওনার ফ্রিজের ভেতর দুধ ছিল। তা গরম করা হলো। বিটাভেক্স নামে চারকোনা টোস্ট বিস্কুটের মতো একপ্রকার খাবার ব্রিটিশরা খুব খায়। সেটার উপরে গরম দুধ ঢেলে দেয়া হলো।
জাকিয়া আমাকে ভালোভাবে দুধের পরিমাণটা শিখিয়ে দিচ্ছিলো, বেশি দুধ দেয়া যাবে না। তিনি শুকনো শুকনো খেতে পছন্দ করেন। খাবার রেডি করে নিয়ে গেলাম। জাকিয়া নিজেই চামুচ দিয়ে ওনার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছিলো। তিনি হাত সামান্য নাড়াতে পারলেও চামচ ধরতে খুবই কষ্ট হয়।
পানির সঙ্গে জুস মিশিয়ে তা একটা বোতলে ভরে তার হাতের কাছে রাখা হলো। আর ফ্রিজ থেকে বের করে কিছু চকলেট প্যাকেট খুলে তার বাম হাতের কাছে রাখা হলো। জাকিয়া জানালো তিনি মিষ্টি, চকলেট এসব খুবই পছন্দ করেন।
এরপর আমাদের কাজের দুই ঘণ্টা বিরতি। আমরা মিস ক্যারোলের বাসায় বসতেও পারি আবার বাইরে ঘুরেও আসতে পারি। আমি আর জাকিয়া বসেই থাকলাম।
এ সময় ফার্স্ট চয়েস কেয়ার এজেন্সির ক্লিনার বাসায় আসলো। এখানকার ক্লিনাররা বেশ ধনী। অনেকেরই বিএমডাব্লিউ গাড়ি আছে। এই ক্লিনার কি গাড়িতে এসেছিলো কি-না তা অবশ্য দেখা হয়নি।
মিস ক্যারোল টিভিতে বাড়ির নিলাম ভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখছিলেন। তিনি জানালেন তার এ বাড়িটা বেশ কয়েক বছর আগে কিনেছিলেন। মর্টগেজে। এখন তার কিস্তি সরকারই শোধ করে।
এরপর আমরা মিস ক্যারোলের জন্য লাঞ্চ তৈরি করা শুরু করলাম। দুপুর ঠিক বারোটার সময় তিনি লাঞ্চ খান।
ওনার লাঞ্চের আইটেম ছিল সুপার মার্কেটের রেডিমেড রান্না করা কলিজা আর তার সঙ্গে সামান্য ভাত। সবই প্যাকেটে রেডি ছিল। জাকিয়া দেখিয়ে দিল, প্যাকেটের গায়ে লেখা আছে ছয় মিনিট ওভেনে গরম করতে হবে।
আমি খাবারটা প্যাকেট থেকে বের করে ওভেনে ছয় মিনিট ধরে গরম করলাম। এরপর কাটায় কাটায় ১২টার সময় মিস ক্যারোলের কাছে খাবারটা নিয়ে আসলাম।
তিনি খাবার দেখে খুবই খুশি হলেন। খাবার কাছে আনা মাত্রই মুখ হা করে ফেললেন। এবার আমি নিজেও তাকে খাওয়াবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।
খাবারটা গরম ছিল। তাই ওনাকে বারবার বলছিলাম, হট... ইটস হট। খাবারে ফু দেওয়া অস্বাস্থ্যকর। তাই ফু দিচ্ছিলাম না। সামান্য ঠাণ্ডা করে এক একটা চামচ খাবার তার মুখে তুলে দিচ্ছিলাম। প্রতিবার, প্রতি চামচ খাবার মুখে দেয়ার পরই মিস ক্যারোলের ধন্যবাদ বানি শুনতে হচ্ছিলো... থ্যাংকু, থ্যাংকু, থ্যাংকু।
এরপর কাজ শেষ করে জাকিয়া রিপোর্ট লিখতে বসলো। মিস ক্যারোলের বাসায় কি কি করা হলো তার একটা বর্ণনা লেখা হলো। আমাদের ঢোকার সময়, বের হওয়ার সময় এসব লেখা হলো।
কাজ শেষে আমরা বিদায় জানিয়ে মিস ক্যারোলের বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম।
খাবারটা গরম ছিল। তাই ওনাকে বারবার বলছিলাম, হট... ইটস হট। খাবারে ফু দেওয়া অস্বাস্থ্যকর। তাই ফু দিচ্ছিলাম না। সামান্য ঠাণ্ডা করে এক একটা চামচ খাবার তার মুখে তুলে দিচ্ছিলাম। প্রতিবার, প্রতি চামচ খাবার মুখে দেয়ার পরই মিস ক্যারোলের ধন্যবাদ বানি শুনতে হচ্ছিলো... থ্যাংকু, থ্যাংকু, থ্যাংকু।
এরপর কাজ শেষ করে জাকিয়া রিপোর্ট লিখতে বসলো। মিস ক্যারোলের বাসায় কি কি করা হলো তার একটা বর্ণনা লেখা হলো। আমাদের ঢোকার সময়, বের হওয়ার সময় এসব লেখা হলো। জাকিয়া টাইমগুলো একটু বেশি বেশি করে লিখলো। সে জানালো আমরা কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করেছি। কিন্তু টাইম শিটে সেটা লেখার দরকার নাই। এখানে পাঁচ মিনিট বাড়িয়ে দিলেই ওরা এক ঘণ্টার পেমেন্ট অতিরিক্ত দিবে। তারপরও মোট টাইম বেশ কম। সকাল আটটা থেকে দুপুর সোয়া বারোটা পর্যন্ত দুই জায়গায় কাজ করলাম। টাইম শিট অনুযায়ী সময় লিখতে হলো আড়াই ঘণ্টা। বাকি সময় হচ্ছে যাতায়াত আর বিনা বেতনের ব্রেক।কাজ শেষে আমরা বিদায় জানিয়ে মিস ক্যারোলের বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম।
জাকিয়া জানালো আগামীকাল তোমার শিট অনুযায়ী আকরামের সাথে কাজ করতে হবে। আকরামের একটা গাড়ি আছে। কাজেই তোমার যাতায়াতে খুবই সুবিধা হবে।
প্রথমবার কাজ করে খুব ক্লান্ত ছিলাম। যদিও তেমন ভারী কাজ না। তারপরও মানসিক চাপটাও অনেক ছিল। অবশ্য কাজ করেই দুপুরে ক্লাস ধরতে ইউনিভার্সিটিতে গেলাম। ক্লাস শেষে বাসায় এসে একটা ঘুম দিলাম। এর মধ্যে আমার বন্ধুরা ডাকাডাকি শুরু করলো। কেমন কাজ হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমার অবশ্য তখন ক্লান্তিতে হুশ নাই। ঘুমের ঘোরেই তাদের কথার জবাব দিচ্ছিলাম ইংরেজিতে। এ অবস্থা দেখে তারাও অবস্থাটা বুঝতে পারলো।

৩.
কিন্তু বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর আমার কাছে আবার ফোন আসলো ফার্স্ট চয়েস কেয়ার এজেন্সি থেকে। জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কি এখন আবার কাজে যেতে পারবে? আমি ভাবলাম, অফিসের অর্ডার। কেমন করে বাদ দেই। ঘুম থেকে উঠেই আবার রওনা দিলাম। এবার যেতে বলা হলো অ্যান ম্যারির সঙ্গে। অ্যান ম্যারিকে ফোন করলাম। সে জানালো পেরি বার পোস্ট অফিসের সামনে বাসস্ট্যান্ডে ঠিক সাড়ে ছয়টার সময় দাড়াতে হবে। সেখান থেকে সে আমাকে কাজে নিয়ে যাবে।
বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দাড়ালাম। নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় ১৫ মিনিট দেরিতে এক গাট্টাগোট্টা ব্ল্যাক মেয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসে আমাকে বললো, এক্সকিউজ মি... তুমি কি দুরন্ত? পরিচিত হবার পর অ্যান মেরির পিছন পিছন গেলাম।
অ্যান মেরি আমাকে নিয়ে অন্ধকার এক গলির সামনে নামলো। সেখান থেকে রোডেসন ড্রাইভ নামে এক রাস্তা ধরে আমরা এগোতে থাকলাম। শীতকালে এখানে সন্ধ্যার সময়ই রাস্তাঘাট খালি হয়ে যায়। রাস্তায় লোকজন খুবই কম থাকে। এ অবস্থায় নির্জন রাস্তায় অ্যান মেরির সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আর যাবার পথে রাস্তার ধারের বাড়িগুলিতে অটোমেটিক লাইট জ্বলে উঠছিলো। এ বাড়িগুলিতে লাইটের সঙ্গে সেন্সর লাগানো আছে। অন্ধকারে কেউ বাড়ির কাছে আসলেই লাইট জ্বলে উঠে। আবার কিছুক্ষণ পরে নিভে যায়। এ ব্যাপারটা প্রথম প্রথম আমার বেশ মজা লাগতো। পরে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো।
বাসায় ঢুকার পথে দেখি আরেক মেয়ে বাসায় ঢুকছে। মেয়েটা জানালো সে পাশের বাড়িতে থাকে। অনেকক্ষণ ধরে কোনো সাড়াশব্দ নাই দেখে সে খবর নিতে এসেছে। ব্রিটিশরাও প্রতিবেশীদের খবর নেয় দেখে অবাক হলাম।
অ্যান মেরির কথার উচ্চারণ আমার খুব কঠিন মনে হচ্ছিলো। তার কথাবার্তা আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না। এ কারনে তাকে বিশেষ কিছু জিজ্ঞাসা করছিলাম না। আমি ভাবছিলাম এ সমস্যা মনে হয় একমাত্র আমার। কিন্তু পরে দেখলাম পাশের বাসার ব্রিটিশ মেয়েটাও অ্যান মেরির কথাবার্তা বুঝতে পারছে না। প্রতিটা কথা তিনবার করে জিজ্ঞাসা করা লাগছে।ফলে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, অ্যান মেরি ইংলিশ বলতেই পারেনা।
অ্যান মেরির সাথে আমরা বাসার ভেতরে ঢুকলাম। বয়স আনুমানিক আশি হবে। বাসায় একা থাকেন। প্রথমে তার ঘরে ঢুকে দেখি মহিলা চেয়ারে বসে মাথা নুইয়ে ঘুমাচ্ছে। অ্যান মেরি অনেক ডাকাডাকি করার পর চোখ মেললো। প্রথমে আমি তার অসুস্থতার ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম না। পরে তার হাতের কাছের প্রায় খালি হয়ে যাওয়া রেড ওয়াইনের বোতলটা দেখে বুঝতে পারলাম। মদের নেশায় একদম বুদ হয়ে আছেন। এইবারে আমাদের কাজ হলো ওনাকে হালকা কিছু খাবার দেয়া আর হুইল চেয়ারে করে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়া। হাতের কাছে একটা পানির বোতল রাখা। সামনের টিভিটা ছেড়ে দেয়া। রিমোটটা হাতের কাছে রাখা। বাড়ির সব লাইট নিভিয়ে শুধু টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে রাখা। ইত্যাদি ইত্যাদি।
সব শেষ করে তাকে শুভরাত্রি জানিয়ে আমরা বের হয়ে গেলাম।

৪.
পরদিন আমার কাজ ছিল আকরামের সাথে। আকরাম নামটা শুনতেই আমার বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার আকরাম খানের কথা মনে হয়। আমার ধারণা হচ্ছিলো এখানকার আকরামও তেমন লম্বা চওড়া কোনো ছেলে হবে।
নাম্বার দেখে আকরামকে ফোন করলাম। ফোন ধরলো এক মেয়ে। এর কথার উচ্চারণ জাকিয়ার চেয়ে স্মার্ট।
জিজ্ঞাসা করলাম, আকরামের সাথে কথা বলতে চাই। সে জানালো তার নামই আকরাম। আমি তো অবাক। আকরামও মেয়ে।
আমি বললাম আমার নাম দুরন্ত। আমি ফার্স্ট চয়েস থেকে বলছি। এটা শুনেই সে অনেক লম্বা করে বললো হাই.....। এতো লম্বা করে ‘হাই...’ কি ঠাট্টা করে বললো নাকি সবাইকে এমন বলে এটা আমার জানা ছিলোনা। তাই কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে বাকি কথাগুলো বললাম।
সে জানালো আমাকে সকাল সাড়ে সাতটার সময় ম্যারির বাসার সামনে থাকতে। সে ঠিক সময় মতো এসে পড়বে।
শীতকালে এখানে সূর্য অনেক বেলা করে উঠে। কাজ ধরার জন্য আমাকে রওনা দিতে হবে ছয়টার সময়।পরদিন সকালটা ছিল আরো ঠাণ্ডা। এতো ভোরে গ্যাস বাচানোর জন্য হিটিং সিস্টেম বন্ধ করা থাকে। সেই ঠাণ্ডার মধ্যে ভোর পাঁচটার সময় উঠে রেডি হলাম।
বঙ্গবাজারের জ্যাকেটটা পড়ে অন্ধকারেই রওনা দিলাম। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি বাসের কোনো খবর নাই



এখানে বাসস্ট্যান্ডে বাসের টাইম শিডিউল লেখা থাকে। বাসগুলোও মোটামুটি সে টাইম অনুযায়ী আসে। অন্ধকারে সিডিউল পড়তে গিয়ে দেখি লেখার উপরে বরফ জমে আছে। হাত দিয়ে বরফ সরিয়ে সিডিউল পড়তে চেষ্টা করছিলাম। এটাই বিলেতে আমার প্রথম বরফ দর্শন। তাড়াতাড়ি পকেটে হাত ঢুকালাম। ভাবলাম আজকেই গ্লাভস কিনতে হবে। যতোই দাম হোক।


ঠাণ্ডার মধ্যে প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করার পর বাস আসলো। বাসে করে আমার আরডিংটন নামে একটা জায়গায় নামার কথা। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছিলো না। তবু অনুমান করে একটা জায়গায় নেমে গেলাম। আমার অনুমান সাধারণত ভুল হয়না। এক্ষেত্রেও তাই হলো। বাস পাল্টিয়ে আরেকটা বাসে করে ঠিকই ম্যারির বাসার সামনে গিয়ে পৌঁছলাম। তখনও চারদিকে অন্ধকার। জোরে জোরে বাতাস বইছে। তাপমাত্রা মাইনাস ২ ডিগ্রি। ম্যারির বাসার সামনে পাতাবিহীন একটা গাছ আছে। শীতকালে এখানকার অধিকাংশ গাছপালার পাতা থাকেনা। উষ্ণতার আশায় গাছের নিচে দাড়িয়ে রাস্তার দিয়ে তাকিয়ে আছি। আকরাম কখন আসবে......
৪৫ মিনিট ঠাণ্ডার মধ্যে পার হয়ে গেল আকরামের কোনো খবর নাই। কাটায় কাটায় সাড়ে সাতটার সময় আসলো আকরামের ফোন। আমার একটু দেরি হচ্ছে। তুমি ইচ্ছা করলে ম্যারির বাসার ভেতরে গিয়ে বসতে পারো।

আমি বললাম না, থাক। তুমি আসলে একসাথে ঢুকবো। একাই ম্যারির বাসার ভেতরে ঢুকতে আমি একটু অস্বস্তি বোধ করছিলাম।
আরো প্রায় ১৫ মিনিট বরফের মধ্যে হাঁটাহাটি করার পর যখন দিনের আলোটা একটু ফুটে উঠলো তখন একটা লাল গাড়ি এসে থামলো। আমেরিকান কম্পানি ফোর্ডের তৈরি গাড়ি। অটো গিয়ার সমৃদ্ধ কা নামের এ মডেলটা প্রধানত মেয়েদের জন্য ডিজাইন করা।
গাড়ির জানালা দিয়ে এক মেয়ে মুখ বের করে বললো, তুমি কি দুরন্ত? তারপর তার সঙ্গে আমরা বাসার ভেতরে ঢুকলাম। আবার পুরনো কাজ শুরু হলো।
আকরাম দেখতে অনেকটা বাঙ্গালীদের মতোই। তবে চেহারায় আফ্রিকান ধাঁচ আছে। পরে জানিয়েছিল ওর পূর্ব পুরুষ আফ্রিকার সোমালিয়া থেকে এসেছে। তবে বাবা বা মায়ের দিক থেকে কেউ ইউরোপিয়ান আছে নিশ্চয়ই।
মেয়েটা বেশ বকবক করতে পারে। নিজেই জানালো, তার জন্ম নিউজিল্যান্ডে। তার বয়স বিশ বছর। পড়ছে উলভারহ্যাম্পটন ইউনিতে। জানালো কালকে সন্ধ্যায় তার ইউনি থেকে লেকচার শুনে সে খুব ক্লান্ত ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাকেও অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করছিলো।
(এবার একটু বড় করে লিখলাম)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ৩:২৩
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×