somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফকির ইলিয়াস
আলোর আয়না এই ব্লগের সকল মৌলিক লেখার স্বত্ত্ব লেখকের।এখান থেকে কোনো লেখা লেখকের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা, অনুলিপি করা গ্রহনযোগ্য নয়।লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ, ছাপা করতে চাইলে লেখকের সম্মতি নিতে হবে। লেখকের ইমেল - [email protected]

হরফের জলসৌধ

২৯ শে মার্চ, ২০১১ সকাল ৭:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হরফের জলসৌধ
ফকির ইলিয়াস
===================
সৈনিক বললেন, ' আমি আর পারছি না '
আমি বললাম, এইতো সামনেই ভোলাগন্জ সীমান্ত ক্যাম্প
আর কিছুক্ষণ পরই আমরা পৌঁছে যাবো আমাদের তাঁবুতে।

সৈনিক কেঁদে ফেললেন। কেঁদে উঠলাম আমিও
আমার কাঁধে তখন তাঁর দুহাতের ভার। মনে হচ্ছিল আমি একটি
পতাকা, একটি রাষ্ট্রের ভার উত্তোলন করে ক্রমশঃ হাঁটছি।

সারারাত আমরা যুদ্ধ করেছি হায়েনাদের সাথে। সহযোদ্ধারা যারা
প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তাদের শবদেহ প্রতিবেশী সর্ষেক্ষেতের মাটিতে
পুঁতে আমরা আহত সতীর্থদের নিয়ে ফিরে যাচ্ছি। আমার রক্তাক্ত
শার্টে দুটি বয়স্ক মাছি আমাকে অনুসরণ করছে সেই সন্ধ্যা থেকেই।
ঘন রক্তের দাগ আর গুলিবিদ্ধ পেশীতে ডানা ঘঁষতে ঘঁষতে
মাছিগুলো মোটেও ক্লান্ত হচ্ছে না। ক্লান্ত নই আমিও। মাথার গামছাটা
কোমরে বেঁধে স্ট্যানগানটায় বাঁ হাত রাখছি বার বার। আর আষাঢ়ের
নরম মাটিতে পা রেখে হাঁটছি নদীর দিকে।

নৌকোটা তৈরিই ছিল। নদী পাড়ি দেবো বলে যখন কাছে এসে
দাঁড়ালাম তখন মাঝিভাই জানালেন, কিছুক্ষণ আগেই কয়েকটি
পশ্চিমা ট্রলার টহল দিয়ে গেছে। আমরা মোটেও শংকিত হলাম না।
বরং নৌকোতে চেপে বসে নদী পাড়ি দেবার জন্য প্রস্তুতি নিলাম।

বিপরীত দিক থেকে কমান্ডার সিদ্দিকের নেতৃত্বে একদল মুক্তিসেনা
আমাদেরকে হাত নেড়ে আরেকটি নৌকা বেয়ে চলে গেল।
আমরা খুব ধীর গতিতে পাহাড় থেকে ভেসে আসা কচুরিপানার সমান্তরালে, আমাদের নৌকোটি ভাসিয়ে দিলাম।

' আমি কী আর বাঁচবো না সুলতান'- শোনে আবারও আঁতকে উঠলাম
আমি। ' এইতো এসে গেছি' - বলে তাঁকে শান্তনা দেবার চেষ্টা করলাম।
এভাবে শান্তনা আমি দিয়ে এসেছিলাম আমার মা'কেও।
বলেছিলাম, এইতো ফিরে আসবো।তোমার জন্য নিয়ে আসবো একটি
দেশ। একটি স্বাধীনতা।

নৌকোর পাটাতনে দাঁড়িয়ে যখন ভোরের অপেক্ষা করছি
ঠিক তখনই মাঝিভাই হাঁক দিলেন- ' এই যে হার্মাদ ' !
স্ট্যানগানটা তাক করার সাথে সাথেই দেখি , ওরা আমাদের
ঘিরে ফেলেছে। আর কিছুই ভাবার সময় না পেয়ে
গুলি চালাতে চালাতে নদীতে ঝাঁপ দিলাম। ডুব দিয়ে, সাঁতার
কেটে বেশ দূরে গিয়ে যখন কিনারার দেখা পেলাম,
তখন সূর্যের লাল আভা স্পর্শ করেছে প্রিয় পৃথিবীর মুখ ।

তাকিয়ে দেখলাম, গুলিতে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে
আমাদের নৌকো। মাঝিভাই সাঁতার কেটে গিয়ে পৌঁছেছেন
পশ্চিম তীরে। আর সৈনিক , আমার প্রিয় সৈনিক ............
না, আমি তাঁকে সাথে করে আনতে পারিনি। তাঁর রক্তে
ভেসে গেছে নদীর বক্ষদেশ আর চরের সবুজ ঘাস সাম্রাজ্য।

এখানে, এই পিয়াইন নদীর মোহনায় আমি যেখানে দাঁড়িয়ে
আছি, ঠিক সেখানেই আমি হারিয়েছি আমার প্রিয় সৈনিককে।
প্রিয় সহযোদ্ধাকে।

এখনও ভোর হয়। সূর্য উঠে। আমি সবজি-আনাজের ভার
কাঁধে নিয়ে বাজারে বিক্রী করতে যাই। অনেকেই এখন আর
আমাকে চেনে না। চিনেই কী হবে ! ভাবি, হয়তো এই মাটির
আমাকে আর খুব বেশী প্রয়োজন নেই।

সৈনিক, শহীদ হয়ে বেঁচে গিয়েছেন। আর আমি বেঁচে থেকেও
মরে গেছি। পিয়াইন নদীর জলে হাত রেখে আমি প্রায়ই
অনুভব করি তাঁর রক্তের উষ্ণতা। মাঝে মাঝে মনীন্দ্রদের বাগান
থেকে কয়েকটি জবাফুল তোলে ভাসিয়ে দিই সেই জলে। মাঝে মাঝে,
'আমরা কেমন আছি' - সেই সংবাদ ভরা পুরনো খবরের কাগজের
কয়েকটি অক্ষর ভাসিয়ে দিতে থাকি নদীর স্রোতে,তাঁর উদ্দেশে।
কথা হয় তাঁর ছায়ার সাথে,
এভাবেই আমি, বাংলার নদীগুলোতে প্রতিদিন সাজাই
হরফের জলসৌধ। তাঁদের স্মৃতির বেদীতে ,
নদী নক্ষত্রে চিরদিন যাঁদের অম্লান সমাধি।











সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মার্চ, ২০১১ সকাল ৭:৩৩
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×