আমার মধ্যে ঠিক তখনও 'অন্যেরা' এবং ' আমরা' সম্পর্কীত জটিলতা গুলো বাসা বাধেনি। যৌনতা এবং সৌন্দর্য্য সম্পর্কীত কোন আকাংখা নিয়ে কারও সাথে সম্পর্ক গড়েনি, বন্ধু কিংবা খেলার সাথী ছিল আমার পরিচিতির গন্ডী, আরেকটু সীমানা বড় করলে পরিবার-আত্মীয় স্বজন পর্যন্ত বলতে পারি। তবে পরিচিতির মধ্যে অনায়াসে ঢুকে যেত পাশের গ্রামের রহিম-করিম-সাবিনা-ফাতেমা। না, শুধু পাঠ্য বইয়ের চরিত্র হিসেবে নয়, একদম জলজ্যান্ত খেলার সাথী হিসাবে। কারণ আমাদের গ্রামটির পাশেই ছিল বাঙালী মুসলিমদের পাড়া, আর একদিকে পাঙনদের (মনিপুরী মুসলিম নামে অনেকেই জানে) লৈকাই (পাড়া)। কল্পনার আকাশও ছিল খুব সীমিত, পুর্ব দিকে পাহাড় - খাসীয়া পুঞ্জী, উত্তরে ছোট্ট একটি নদী কিংবা ছড়া, দক্ষীণে চা বাগান - কুলী-বাবু-সাহেব। তবে পশ্চীমের সীমানা ছিল একটু বড় - মঙ্গে মখোঙ কৈথেল (বাজার), সেখানেই আমার যত বিষ্ময় আর কৌতুহল এবং ভয়ও। কত ধরণের লোকের দেখা পেতাম সেখানে, দাঁড়িওয়ালা- টিকিওয়ালা-ঝুলিওয়ালা-কাবুলিওয়ালা। আর কথাগুলোও সব এলোমেলো, একদিকে সিলেটি বাংলা, অন্যদিকে মৈতৈলোন সাথে ভাঙা ভাঙা বাংলা, আবার খাসীয়া রমণীদের অন্যরকম বাংলা সাথে পাঙনদের কেমন করে যেন বলা মৈতৈলোন, বিষ্ণুপ্রিয়াদের নিজেদের ভাষার সাথে সাথে বাংলার সফল মিশ্রন আবার মৈতৈদের সাথে মৈতৈলোনে টুক টাক আলাপ চারিতা অন্যদিকে চা -বাগীচার লোকজনের জংলী-উরিয়া-সাঁওতালি- বিহারী মিশেল বাংলা, কেমন যেন খেই হারিয়ে ফেলতাম। তবে কেউ কাউকে পর মনে হয়নি, সবাই যার যার মতো করে নিজের চাহিদা টুকু পুরণ করে নিত, প্রয়োজনটুকু ছেড়ে ফেলতো। পুলিশের আনাগোনা তেমন ছিল না, তাই ইউনিফর্ম ভিতি তখনও মনের মধ্যে ঢুকেনি, তবে বাজারের মধ্যে হাতাহাতি- চিল্লাচেল্লি, এ -ওকে মারামারি-পিটাপিটি লেগেই থাকতো, তাই আমার ভয় হতো কখন যে আমি এই সেন্ডেল পড়া, খড়ম পড়া, বুট পড়া মানুষদের পায়ে পিষ্ট হয়ে যায়।
তবে আমার পশ্চীমের আকাশ আরও প্রসারিত হয়, যখন পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষার জন্য থানা সদর কমলগঞ্জে যেতে হলো। তখনই পাঠ্যপুস্তকের রেল গাড়ী, অট্রালিকা, অফিস, পুলিশ, পাকা রাস্তা, সিনেমা হোল, কলেজ ইত্যাদির সাথে পরিচয় হলো চাক্ষুষে। চারিদিকে নিষেধের বেড়াজালের মধ্যে রেল লাইনের দিগন্ত প্রসারিত রেখা আমার দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করেছে বেশী। চারিদিকে নিষেধের বেড়াজাল বলেছি এই কারণে, ঘড়ের দুটো কোণা সনামহী-লাইনিংথৌ এর অতি-পবিত্র এলাকা বলে বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে- যেখানে আমাদের প্রবেশ নিষেধ। আবার পাড়ার মন্ডব এবং মন্দিরের অনেকাংশ আগলিয়ে রেখেছে দেব-দেবীদের জন্য, সেখানেও ঢোকা নিষেধ এমনকি দেখাও নিষেধ। অন্যদিকে পাহাড় ও বনাঞ্চলেও ঢোকা নিষেধ রিজার্ভ ফরেষ্ট বলে। চা বাগানের টিলাবাবুদের চোখ রাঙানির ভয়ে চা বাগানেও ঢোকা হয়না সচরাচর। পাঙনদের -মুসলমানদের বাড়িতে ঢোকা হয়না জাত যাওয়ার ভয়ে, অন্যদিকে চা বাগানের বাংলোর ত্রি-সীমানায় যাওয়া হয় না আবার ছোট জাত বলে। তবে তখনও বানানো ''ঐক্যবোধ'' কিংবা ''ঐক্যচেতনা '' নামক ধারনা গুলোর সাথে পরিচিত হয়নি বলে সবগুলোকে খুব সহজ ভাবে মেনে বেশ আরামসে দিনযাপন করছিলাম।
গল্প-উপন্যাস-কবিতা'র রোমান্টিক জগতে প্রবেশ করেনি তাই ফুল-নদী-পাখী নিয়ে কোন কল্পনার রাজ্য তৈরী হয়নি মনে। কল্পনা বলতে সেই রূপকথার রাজ-রানী কিংবা দৈত্য-দানব আর হিংচাব-হিংচাবি'র ভয়, শামুগী দোলাই কিংবা পঙ্খীরাজে চড়ে বেড়ানো পর্যন্তই।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



