somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবন কি ভীষন ক্ষণস্থায়ী!

০৫ ই মার্চ, ২০১১ রাত ১১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমি যে বছর ক্লাশ ফাইভ থেকে সিক্সে উঠলাম সে বার দুটি বোন আমাদের সাথে এসে নতুন ভর্তি হলো আমাদের স্কুলে । পিঠাপিঠি এই দুই বোন মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমসের ছাত্রী ছিলো।
প্রায় দেড় বছরের ছোটো বড় হলেও কিন্ত ওরা একই ক্লাসে পড়তো। দুজনে ই ছিল আমার বান্ধবী, কিন্ত ছোটো বোন টি ছিল আমার বয়সী। ওর সাথেই ছিল সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতা কারন আমাদের দুজনের মন মানষিকতা ছিল একই রকম। আবার আমাদের দুজনের নামও ছিল একটু আন কমন ।

প্রচন্ড রাশভারী পিতার অত্যন্ত মেধাবী কন্যা আমার প্রিয় বান্ধবীটিকে তার বাবা এইচ এস সি প্রথম বর্ষে পড়ার সময় বিয়ে দিয়ে দেন।

বিয়ের পরেও তার পড়াশোনা আর আগায় নি বিভিন্ন কারনে। এটা তার মনে এক বিরাট ক্ষোভের সৃস্টি করেছিল। যার ফল ছিল তার সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে তার বিরাট আত্মত্যাগ।

মাস তিনেক আগের ঘটনা । হঠাৎ মাঝ রাতে প্রচন্ড এক পেট ব্যাথায় কাতর হয়ে পড়লো আমার বান্ধবী। কাছাকাছি এক হাসপাতালে নিয়ে গেল বাসার সবাই। ডাইগনোসিস হলো গলব্লাডারে ইনফেকশন।

চিকিৎসার পর তিনদিনেও সেখানে কোনো উন্নতি না হওয়ায় নিয়ে গেল স্কয়ার হাসপাতালে। সেখানে আবিস্কার হলো প্যানক্রিয়াস, লিভার, গলব্লাডার সবখানেই ভয়ংকর ক্যনসারের মরণ থাবা।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যা তা হলো, বিন্দুমাত্র কোনো সিম্পটমই ছিলনা। তারপর ব্যংকক, ইন্ডিয়া সব জায়গা থেকেই ফিরিয়ে দিল। কি সুন্দর স্বাস্হ্য, কি হাসি খুশী প্রান প্রাচুর্যে ভরা, কি নরম মন আমার বান্ধবীকে আজ হাসপাতালে দেখে আসলাম মৃত্যুর মুখোমুখি।
ওর সবচেয়ে বড় গুন ছিল,ওর চোখে সবাই ভালো কেউ খারাপ না ! সামনা সামনি তো নয়ই, কারো আড়ালেও কখনো কারো বিরুদ্ধে একটা কথাও বলেনি এই জীবনে।

কাল রাতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে রাত ১১টার দিকে শ্বাস টেনে টেনে একটি ফোনই করেছিল, সেটা আমাকে, "জুন আসিস, আমি মনে হয় আর বাঁচবোনা, তোকে ভীষন দেখতে ইচ্ছে করছে"।
বল্লাম "আমি কাল সকালেই আসবো, তুই একটু ও চিন্তা করিসনা, ভালো হয়ে যাবি"।
এটাই ছিল তার বলা শেষ কথা।এরপর ই সে কমায় চলে যায় আর কারো সাথেই কথা বলেনি।

আমি এর সাতদিন আগেও বাসায় অনেক সুস্থ দেখে এসেছিলাম।

অনেক ভালোবাসে ও আমাকে। যে কোনো ধরনের রান্না করতে পারতো অনায়াসে। শুধু তাই নয় রান্না করে সবাইকে খাওয়াতে ভালোবাসতো।আমার সাথে গল্প করতে করতে কি অপুর্ব কেক বানাতো। আমি ওর তৈরী বুটের ডালের হালুয়া পছন্দ করি বলে এমন একটা শবেবরাত যায়নি যে ও আমার জন্য বক্স ভরে নিয়ে আসেনি! কি খেতে ভালোবাসি, জন্মদিনে কি ধরনের গিফ্ট পছন্দ করি সব ওর নখদর্পনে ছিল।
ওর সাথে জীবনে সামান্যতম মনোমালিন্য কোনোদিন হয়েছে বলে আমি মনে করতে পারিনা।

রাতে যেতে পারিনি, সকালে গিয়েছিলেম। আমার গলা শুনলে যেই চোখ ঝলমল করে উঠতো খুশীতে, সেই চোখে কোনো দৃস্টি নেই, মরা মাছের মতন ঘোলাটে ।
আমার ডাক শুনে সেই চোখ মেলে চাইলো শুন্য দৃস্টিতে, তবে আমার দিকে নয়,কোন সুদুরের পানে কে জানে! একটা কথাও বলতে পারলোনা, যে কিনা আমার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে যেত।
আমি ওর বাসায় গেলে ওর ছেলে মেয়েরা বলতো 'আজ আম্মুর খুশীর দিন, জুন আন্টি এসেছে, কত গল্প আর হাসাহাসি যে হবে'।

বিছানায় শুয়ে বসে চা নাস্তা খেতে খেতে দুই বান্ধবীর কত স্বপ্ন, কত কল্পনা এসবই কি শেষ হয়ে যাবে একটি মৃত্যুর সাথে সাথে ?

কত স্মৃতি আমার ওর সাথে,যা মনে হলে চোখ পানি ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে।
প্রতিদিন একবার টেলিফোনে ঘন্টাখানেক গল্প না করে থাকতে পারতামনা। আর আজ আমি সারাক্ষন টেলিফোনের দিকে কান পেতে রাখছি কখন শেষ খবরটা আসে।

আর সবচেয়ে আশ্চর্য্য এবং করুন ঘটনা তা হলো ওর সেই বড় বোন যে ওর দেড় বছরের বড় ছিল, আমাদের সাথে পড়তো সেও মারা গেছে এখন থেকে ঠিক দেড় বছর আগে। কি অদ্ভুত কো-ইনসিডেন্স!

এখন তাই মনে হচ্ছে জীবন কি ক্ষনস্থায়ী ! কিসের আমাদের অহংকার! কি নিয়ে গর্ব করি আমরা। তিন মাস আগেও তো ভাবেনি সে একথা স্বপ্নেও!

অত্যন্ত মানসিক কষ্ট নিয়ে যখন বের হয়ে বাসায় আসি তখন দেখি আমার মোবাইলটা নেই ব্যাগে।

আজ ৮ই মার্চ রাতের বেলা আমার বান্ধবী চলে গেল সেখানে যেখান থেকে কেউ কোনোদিন ফেরেনা।



সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:২৯
৯৮টি মন্তব্য ৯৭টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×