সমতলের মানুষ
আমি সমতলের মানুষ। ব-দ্বীপের পলি অঞ্চলেই শৈশবে বেড়ে উঠেছি। বাবার দেশ সিরাজগঞ্জ আর স্থায়ী নিবাস রাজশাহী হবার সূত্রে পদ্মা ও যমুনাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। মুগ্ধ হয়েছি বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে সবুজ ফসলের ক্ষেত, সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত মাঠ, সাদা মেঘের মতো ইতস্ততঃ ছেয়ে থাকা কাশফুলে ঢাকা বিস্তর প্রান্তর দেখে। নরম এঁটেল মাটির সোঁদা গন্ধ, কদমফুলের থোকা, আমের মঞ্জরী, বেতের ঝাড়, বাঁশ বাগান এখনো আমাকে হাতছানি দেয়। শালের বনের পাশ দিয়ে অথবা গ্রামের মেঠো পথ ধরে এখনো হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে। ভাল লাগে বহতা নদীর বুকে ভেসে চলা পাল তোলা নৌকা, নদীর পাড় ঘেঁষে মাঝিদের ক্লান্ত পদভারে গুন টেনে চলা, চরের বুকে বুনোঘাস আর বুনোহাঁসদের নিবিড় মিতালী, অবহেলায় বেড়ে ওঠা নল খাগড়ার এলোমেলো দোল খাওয়া। ভাল লাগে ভাটিয়ালী গান, বেদের বহর, সাপের খেলা, ছই তোলা নৌকা, ছাউনী দেয়া গরুর গাড়ী, পালকীর বহর, হাটের বেচা-কেনা, শান্ত পুকুর, চাঁদনী রাত আর রাখালের বাঁশীর সুর। ভাল লাগে দীঘির কালো জলে ফুটে থাকা পদ্ম আর শাপলা দেখতে।
এখনো ইচ্ছে করে প্রজাপতি আর ঘাস ফড়িংয়ের পেছনে দৌঁড়াতে। এখনো মন কেড়ে নেয় ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি আর ব্যাঙের ডাক। ইচ্ছে করে কচুপাতায় মাথা ঢাকতে। ভাল লাগে ন্যাংটা ছেলেদের কাদাজলে গড়াগড়ি আর ইচ্ছেমতো ডিগবাজি। এখনো কান পেতে শুনতে ইচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার বেতাল সুরের অনাবিল ডাক। শুনতে ইচ্ছে করে দূরের কোন আমলকি গাছে কোকিলের ডাক। এখনো ইচ্ছে করে মার আঁচল থেকে পয়সা নিয়ে ঘুড়ি কিনতে। ভর দুপুরে লাটাই হাতে নদীর ধারে ঘুড়ি ওড়াতে। ইচ্ছে করে গুলাল-বাটল তাক করে কারো মাটির কলসী ফুটো করতে। এখনো বাবার ভয়ে লুকোতে ইচ্ছে করে মায়ের আদরের ছায়ায় কিংবা চৌকির তলে। খুব ইচ্ছে করে নগেনের দোকানের গরম গরম রসগোল্লা টপাটপ গিলে খেতে। খেতে ইচ্ছে করে বেতের কাঠায় গরম মুড়ির সাথে বাতাসা আর কদমা খেতে। খেতে ইচ্ছে করে যবের ছাতু আর কাউনের পায়েশ। আরো কতকিছুইতো ইচ্ছে করে! অথচ আমার সেই ইচ্ছে পূরণের দিন আর নেই। আর কখনো ফিরে আসবেনা সেই দিনগুলো। মহানগরীর বিশাল ও উঁচু ভবনের উপরতলায় থেকেও আমার মন মিশে আছে সমতলের এই মাটিতে। এই অস্থায়ী নিবাসে আমার মন টেকেনা। সমতলে ফিরে যেতে চাই। আমি চিরকাল সমতলের এই মাটিতেই মিশে থাকতে চাই। তাই আজো প্রকৃতির সাথে একই সমান্তরালে নিজেকে বেঁধে রেখেছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




