পাহাড়ের ভেতর দিক হারিয়েছে আঁকাবাঁকা পথগুলি। সেই পথে সারি সারি গাছ, দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। পথের ক্লান্তি ভুলে সেই তরুশাখায় দিনমান গান করে নাম না জানা পাখিরা। তারপাশেই গোলচত্বর। বিশাল এক কড়ইগাছ যেন আদরে আদরে আগলে রেখেছে জায়গাটি। তারই পাশে ছোট্ট একটি হ্রদ। দিনের একটি সময় এ চত্বর হয়ে ওঠে আনন্দের হাট—একঝাঁক মেধাবী মুখের কলকাকলিতে।
‘প্রকৌশল জীবনের ক্লান্তিকর মুহূর্তগুলো নিমিষেই নিঃশেষ হয় এ চত্বরে এসে বসলে।’ বললেন কামরুল। কথার তাল কেটে কামরুলের সঙ্গে তাল মেলালেন শাকিল, অঙ্কন, সজীব, আরজু, রাব্বি, আসাদ, পলাশ, দোলা, মুন্নি, ঈশিতারা। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ক্যাম্পাসের গোলচত্বর রং ছড়ায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে। তাঁদের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সাক্ষী যে এ গোলচত্বর। যান্ত্রিক জীবনে হঠাৎ উদাস হয় বাউল মন। তখন তাঁরা ছাদে বা পথের ধারে বসে যান গিটার, ঢোল কিংবা একতারা হাতে। গানের আসরে ভাবের সুর ভাঁজেন বাউল-ফকির সংঘের সদস্যরা।
নগরের কোলাহল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের ক্যাম্পাসে যেন লুটোপুটি খায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের পাশঘেঁষে প্রায় ১৬৩ একর জায়গায় ১৯৬৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে বর্তমান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। তখন শিক্ষার্থী ছিলেন মাত্র ১২০ জন। ১৯৮৬ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি), চট্টগ্রাম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিআইটিকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) রূপান্তর করা হয়। তড়িৎকৌশল, যন্ত্রকৌশল ও পুরকৌশল বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ১৯৯৯ সালে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ চালু হয়। এ বছর স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের আওতায় স্থাপত্য এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিভাগ চালু হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি অনুষদের অধীন ছয়টি বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে। আগামী বছর চালু হবে পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং প্রকৌশল বিভাগ। এ ছাড়া রয়েছে ইনস্টিটিউট অব এনার্জি টেকনোলজি, আর্থকোয়াক ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ সেন্টার এবং সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। সেন্টার ফর ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে শিক্ষার্থী দুই হাজারেরও বেশি।
প্রকৌশল পড়তে আগ্রহী হলেন কেন?
‘নিরিবিলি এ ক্যাম্পাস পড়াশোনার জন্য একবারে আদর্শ জায়গা।’ বললেন রাব্বি ও আসাদ। অঙ্কনের উত্তর একটু অন্য রকম—‘বিয়ের বাজারে প্রকৌশলীদের কদর বেশি, তাই।’ সঙ্গে সঙ্গে হাসির রোল পড়ল।
চট্টগ্রামের বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীরা জানান, ঘরবাড়ি বাবা-মাকে ছেড়ে এত দূরে আসতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন যেতেই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য আর একদল মনের মতো বন্ধু মন কেড়ে নেন তাঁদের।
বিদেশ থেকে অনেকে পড়তে এসেছেন এখানে। নেপালের অবধিস, ওয়াজি আর আনন্দ বললেন, এ ক্যাম্পাস যে এত ভালো লাগবে তা কখনো চিন্তা করেননি। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়েও উচ্ছ্বসিত তাঁরা। তাঁদের ব্যবহার, সহযোগিতার মনোভাব খুব পছন্দ হয়েছে তাঁদের। প্রকৌশল জীবনটা অনেকখানিই যান্ত্রিক। সারাদিন পাঠ নেওয়া, গবেষণা, কুইজ, পরীক্ষা। এত ব্যস্ততার পরও অনেকে দলবেঁধে বসে যান কার্ড আর ক্যারাম খেলায়। ফাঁকে চলে আড্ডা। ‘যখন চুয়েট ছেড়ে চলে যাব তখন সবচেয়ে বেশি মিস করব এ আড্ডা।’ বললেন কামরুল ও তাঁর বন্ধুরা।
বিকেলের সময়টায় কেউ শহরে যান গৃহশিক্ষকতা করতে। যাঁরা খেলাধুলায় ভালো তাঁরা যান খেলার মাঠে। অনেকে মাঠের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া দিকভ্রান্ত সেই পথে হাঁটেন দলবেঁধে।
একদল ছাদে বসে শুরু করেন গান-বাজনা।
গানের আসরে গিটার, হারমোনিয়াম যেমন থাকে তেমনি থাকে একতারা আর ঢোল। আছে একটা বাউল-ফকির সংঘ। সন্ধ্যায় লোডশেডিং হলেই বসে বাউল আসর। হাছন, লালন, শাহ আবদুল করিমসহ নানা সাধকের গান চলতে থাকে। বাদ যায় না ‘পানজাবিওয়ালা’ কিংবা ‘হইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যম তোঁয়ারে...।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি ছাত্রাবাস ও একটি ছাত্রীনিবাস আছে। এর মধ্যে দুটি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শাহ ও তারেক হুদার নামে নামকরণ করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশাল অবদানের জন্য বিজ্ঞানী কুদরত-এ-খুদার নামে একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয়। বাকি দুটি ছাত্রাবাসের নামকরণ হয়নি এখনো।
শিক্ষার্থীরা কারিগরি খাতে গত কয়েক বছরে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছেন। আর এর নেপথ্যে ভূমিকা রয়েছে চুয়েটে রোবট ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণাকারী ছাত্রসংগঠন ‘অ্যাসরো’ (অ্যান্ড্রমিডা স্পেস অ্যান্ড রোবটিক রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন) এবং আরএমএর (রোবো মেকাট্রনিক্স অ্যাসোসিয়েশন)।
ক্যাম্পাসে রয়েছে বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি, জয়ধ্বনি, গ্রিন ফর পিস, আছে নাটকের দল বাংলানাট। সংগঠনগুলো পড়াশোনার পাশাপাশি মুক্তবুদ্ধিচর্চা করে।
গ্রিন ফর পিসের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ আর পড়াশোনার একঘেয়েমি দূর করতে এসব সংগঠনের সৃষ্টি।’ প্রত্যেক সংগঠনের সদস্যরা সপ্তাহের একটা দিন বিকেলে বসে আড্ডা দেন। দলে দলে শিক্ষার্থীরা ভিড় করেন গ্যালারিতে। গোল হয়ে বসে তৈরি করেন আড্ডাবৃত্ত। চলতে থাকে বিষয়ভিত্তিক আড্ডা। কখনো খুনসুটি। এ ওর হাঁড়ির খবর ফাঁস করে দেন।
ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি খায়রুল বাসার জাহিদ বললেন, ‘আড্ডা থেকেই বের হয়ে নতুন গঠনমূলক নানা পরিকল্পনা। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চুয়েটের স্বপ্নবাজ তরুণেরা ঝাঁপিয়ে পড়েন নিজেকে উজাড় করে দিয়ে। #
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ১২:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



