এক হিন্দি ডাক্তার হাত পা নেড়ে অনেকক্ষণ ধরে আমাকে বুঝিয়ে জিজ্ঞেস করল- কী বুঝলেন?
বললাম- বুঝলাম যে আমার শরীরের ডান-বাম দুইটা দুই কোম্পানির তৈরি আর ধোলাইখালে লোকাল নাটবল্টু দিয়ে ফিটিংয়ের কারণে এখন লুজ হাডিড ঘর্ঘর করে...
মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে ডাক্তার জিজ্ঞেস করে- ধোলাইখাল কী?
বললাম- ধোলাইখাল আমাদের বিশ্বকর্মার দপ্তর। ওখানে সবকিছু জোড়াতালি হয়...
ডাক্তারটা একটু টাল কিসিমের। কিছু বোঝে কি বোঝে না তাও বোঝা যায় না। কিন্তু বের হবার সময় হারামজাদা একটা প্যাজগি লাগিয়ে দিলো। বলল- আচ্ছা বিড়ি খাওয়ার সময় একটা জিনিস একটু খেয়াল করবেন তো; জিনিসটা খেতে টেস্টি মনে হয়- না তিতা লাগে...
আচ্ছা দেখব' বলে বের হয়ে এসে বিড়িতে টান দিয়ে দেখি- নাহ; বস্তুটাতো একটু তিতা তিতাই লাগে...
০২
লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছি না ভুলে গেছি না আদৌ কোনোদিন কিছু লিখতাম সেইটা এখন আমার এক ধান্দার বিষয়
বহু বছর ধরে প্রতিদিন রাত সাড়ে এগারোটার পরে ঘণ্টা দুয়েক শব্দটব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম; মাঝে মাঝে দুয়েকটা বাক্যও তৈরি করে ফেলতাম আর কয়েকদিন পরে এর মাথা ওর ঘাড়ে কিংবা এর লেজ ওর পেছনে গিটঠু দিয়ে হাবিজাবি দুচার পাতা বানিয়ে ফেলে নিজের কাছে বলেও ফেলতে পারতাম ইহা একখান রচনা; রচিয়াছি মুই...
কিন্তু আমার সেই টাইমটাকেই সরকার বেছে নিলো দেশের বাত্তিসংকট মোকাবেলার উপযুক্ত সময় হিসেবে গত বেশ কয়েকমাস ধরে
বাসায় ঢুকে বিড়ি টান দিতে না দিতেই সরকারের খেয়াল হয় কারেন্টের স্টক সীমিত; সুতরাং লাগাও আন্ধার থেরাপি...
অন্ধকারে খাওয়া হয়; বিড়ি হয়; মোবাইলে খুটখাট হয়; গরমে ঘাম হয়; মেজাজ খিটখিটে হয়; পরদিনের গোলামির কথা খেয়াল হয় এবং হাড়ে হাড্ডিতে ব্যথাটেথা নিয়ে মনে হয়- অন্যকিছু না হলেও ঘুমে কোনোদিন অরুচি হয় না আমার...
তারপর একখান ঘুম হয়; শব্দগুলোর সাথে দূরত্ব হয়; সকালে উঠতে দেরি হয়; গোলামকেন্দ্রে দৌড়াতে হয়; দৌড়াতে দৌড়াতে খেয়াল হয় বাত্তি এসছিল লাইট অফ করার সময় আর অফ করার সময় ঘরে বাত্তি থাকার কথা মনে করতে না পারায় তালাবন্ধ ঘরে বাত্তিরা সারাদিন জ্বলতে জ্বলতে মাসের শেষে অন্ধকারবাসের ফি হিসাবে কিছু টাকা সরকারের ঘরে তুলে দিয়ে প্রমাণ করে ছাড়বেন আমিও আছিলাম জনৈক দেশদরদী মানুষ...
০৩
এক চ্যাংড়া পোলা যে নিজেকে সাংবাদিক আর সচেতন আর সৎ হিসেবে প্রমাণ দিয়ে কথা শুরু করে; দাঁত মুখ চুল খিঁচিয়ে ঝোলা থেকে একখান ফটোকপি তাক করে আমাকে আক্রমণ করে বসল সৎ হবার প্রতিজ্ঞা করার জন্য। এইবার নাকি বন্যার সিজনে যত না পানির বন্যা হয়েছে তার থেকে বেশি বন্যা বয়ে যাচ্ছে প্রতিজ্ঞা করার...
আমি তারে যত বোঝাই যে আমি মূলত সুযোগের অভাবে চরিত্রবান- সাহসের অভাবে সৎ আর ক্ষমতার অভাবে শান্তিপ্রিয়; তত সে হাউমাউ করে আর বলে কিছু একটা প্রতিজ্ঞা করতেই হবে
সমাজের সচেতন মানুষ হিসেবে সে নিজেই নিজের উদ্যোগে এইসব প্রতিজ্ঞার কলেমা পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে এবং নিজের উদ্যোগেই সে প্রতিজ্ঞাকারীদের ইমান মনিটর করবে এবং একহাজার মানুষকে প্রতিজ্ঞামুমিন বানাতে পারলে সেইসব দলিল নিয়ে জমা দেবে প্রতিজ্ঞাপ্রতিষ্ঠানে এবং প্রতিজ্ঞার প্রতি তার এই ইমান দেখে সেই প্রতিষ্ঠান হয়ত তাকে একখান চাকরি দিলেও দিতে পারে প্রতিজ্ঞামুনশির পদে...
আমি এক ঠ্যাঙের উপর বকাসনে দাঁড়িয়ে অন্য হাঁটুতে কাগজটা রেখে প্রতিজ্ঞা লিখলাম- বিড়ি খাওয়া ছেড়ে দেবো...
লেখাটা দেখে প্রতিজ্ঞাঠাকুর চোখ দিয়ে লালা ফেলতে ফেলতে বলল- সময় লিখেন; কবে ছাড়বেন তারিখ লিখেন
আমি এবার আগের লেখাটার পাশে ব্রাকেট দিয়ে লিখলাম- মরে যাবার পর...
অক করে একটা শব্দ করে ফ্রিজে রাখা কুরবানির মাংসের মতো শক্ত আর কালো হয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে- এইটা কী লিখলেন?
বললাম- লিখলাম যে আমি প্রতিজ্ঞা করছি মরে যাবার পরে আর বিড়ি খাবো না... তুমি তোমার পুরো প্রতিজ্ঞাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে মনিটর করে দেখতে পারো; যদি মরার পরেও আমাকে বিড়ি খেতে দেখো তাহলে আমি তোমাদের প্রতিজ্ঞাপ্রতিষ্ঠানে বিনা পয়সায় নাইটগার্ডের ডিউটি দেবো সারাজীবন...
কাগজ কলমটা ওর হাতে গুঁজে দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম ইস্কুলের রচনায় লেখা কোনো প্রতিজ্ঞার বারান্দা পর্যন্ত যেতে না পারলেও এই প্রতিজ্ঞার একচুলও নড়ন চড়ন হবে না আমার... যদিও কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমি নিশ্চিত ছিলাম আরো দুয়েকটা পাতা লিখে ফেলার প্রতিজ্ঞা বিষয়ে। কিন্তু এখন মনে হয় সেই প্রতিজ্ঞাটাও অনেক প্রতিজ্ঞার মতো রাখতে পারবো না নিজের কাছেই নিজে
০৪
আগে এর মাথা ওর ঘাড়ে জোড়া দিয়েই লিখতাম; গত বছর সরাসরি চব্বিশজন লেখকের টুকরা টাকরা লেখা জোড়া দিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দিলাম পুরো একটা বই; বইটা নেড়েচেড়ে আমার এক শব্দখাদক বললেন- এইটাতো একটা নকশি কাঁথা হলো; ছিঁড়ে যাওয়া শাড়ির পাড় থেকে সুতা তুলে ছেঁড়া ছেঁড়া শাড়ির টুকরা জোড়া দিয়ে শীত নিবারণ; নকশি কাঁথা শিল্প নয়; নকশি কাঁথা দারিদ্র্যের প্রকাশ... অবশ্য নতুন কাপড়ে নতুন সুতায় নকশি কাঁথা এখন কারখানায় তৈরি করে স্টাইল বলে চালিয়ে দেয়া হয়। তুমি এক কাজ করো; যেহেতু আর লিখতে পারবে না কিছুই; সেহেতু পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে এজেন্সি ভাড়া করে নিজের নামে বই লিখিয়ে ফেলো; পরে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলবে- যুগ পাল্টেছে; এখন আর সময় নষ্ট করে নিজের লেখা নিজে লেখার কোনো মানেই হয় না। তাই আমি এখন থেকে আমার সব লেখা এজেন্সিকে দিয়ে লেখাব; এইটাই আমার স্টাইল আর মৌলিকত্ব...
০৫
এই দেশে একবার ভিনগ্রহ থেকে সাইন্স ফিকশনের প্রাণী এসে এক বেকার ছেলের গলায় শেকল বেঁধে নেতা তৈরির ফর্মুলা আর ডাইস হাতে দিয়ে বলল- এই ফর্মুলায় তুই তোর দেশের জন্য বারোটা মডেল নেতা বানাবি; তবেই তোর মুক্তি... তারপর সেই ছেলেটা গেলো ভিনগ্রহের মডেলে দেশের জন্য বারোজন নেতা বানাতে....
এই দেশে এক বাজারলক্ষ্মী নারী; সারাদিন পারফিউম মেখে চকচকে অফিস আর বাড়িগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে রাতে নিজের ঘরে এসে শরীরে কেরোসিন মাখে শরীর থেকে মানুষের দুর্গন্ধ ছাড়াতে...
এই দেশে এক মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধের দিনে একইসাথে যুদ্ধ করেন পাকিস্তান আর ভারতের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে; একই সঙ্গে যুদ্ধ করেন রাজাকার আর প্রবাসী সরকারের নেতাদের বিরুদ্ধে; তাকে লড়তে হয় স্বাধীনতার জন্য; তাকে লড়তে হয় সম্মানের জন্য; তাকে লড়তে হয় অবরুদ্ধ দেশের নারীদের রক্ষার জন্য; তাকে লড়তে হয় শরণার্থী শিবিরের নারীদের পতিতালয়ে বিক্রি বন্ধের জন্য...
আমার প্রতিজ্ঞা ছিল এইসব গল্প একদিন আমি লিখে ফেলব; কিন্তু আদৌ আর কিছু লেখার হয়ে উঠবে বলে মনে হয় না আমার...
কেউ আছেন গল্পগুলো লিখে দেবার জন্য?
২০০৯.০৬.০১ সোমবার

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


