আখাউড়াতে অবহেলায় পড়ে থাকা বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের স্মৃতিসৌধ
বড় ভুল দেশের বীরশ্রেষ্ঠ তুমি শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল। বেঁচে থাকলে হয়তো নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করতে কেন করেছি আমি যুদ্ধ? কার জন্য করেছি আমি যুদ্ধ? এইকি সেই দেশ যার জন্য আমি যুদ্ধ করেছিলাম?? না সে সুযোগ তুমি পাওনি। না পেয়ে ভালোই করেছ। নিজের চোখের সামনে নিজের অপমান তুমি হয়তো সহ্য করতে পারতেনা। ইতিহাসে ৪০ বছরকে মাত্রই বলা চলে। তোমার শাহাদাতের আজকে মাত্র ৪০তম বার্ষিকী। অথচ ৪০ বছরেই জাতি তোমার কথা ভুলে গেল!! শুধু সাধারন মানুষ নয় তোমার সহযোদ্ধা আর দেশের কর্তাব্যক্তিরাও বলতে পারেনা আজকে তোমার শাহাদাত দিবস!!
এই মহাজোট সরকার আসার পরে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং সুযোগ সুবিধা বাড়াতে আলাদা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় চালু করে মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘদিনের দাবীর প্রেক্ষিতে। সেই মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের কাছেও জাতির এই বীরসন্তানের শাহাদৎ বার্ষিকী তেমন আবেদন রাখতে পারেনি। আর তাইতো মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে নিঃশেষে প্রাণ দান করে যাওয়া মহান ৭ বীরশ্রেষ্ঠর একজনের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটি সবার অলক্ষ্যে এভাবে পার হয়ে।
স্মৃতিসৌধ এর ফলক
শুধু কি মন্ত্রণালয়। না। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মিডিয়া, স্থানীয়-জাতীয় বিভিন্ন সামাজিক সাংিস্কৃতিক সংগঠন কেউ মনে রাখেনি মহান এই জাতীয় বীরকে। আখাউড়ায় আমার এক মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ বন্ধুকে কল করে বললাম যাতে সে মোস্তফা কামালের স্মৃতিসৌধে গিয়ে বিকালে ঘুরে আসে। কথামত সে সেখানে গিয়ে কল দিয়ে বললো, দোস্ত আমি এখন স্মৃতিসৌধ এর সামনে দাড়িয়ে আছি। বল কি করতে হবে। বললাম দেখতো কেউ তার স্মৃতিসৌধে ফুল বা কোন শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েছে কিনা। সে অবাক হয়ে বললো না আমিতো স্মৃতিসৌধ ছাড়া এখানে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিনা। সন্ধ্যা ছয়টায় সে যখন সেখান থেকে ফিরছিল তখন তাকে বললাম দোস্ত তোর হাতেতো ফুল নেই, স্মৃতিসৌধের পাশ থেকে কিছু দুর্বাঘাস নিয়ে তা এই বীর সন্তানের কবরে রেখে আমার পক্ষ থেকে একটা স্যালুট দে। তবে তাই হোক বলে বন্ধুটি স্যালুট দিয়ে এসে আমার কাছে একটু আগে কল দিয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে বললো, যদি স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির দাবিদার সরকারের আমলেই মাত্র ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠকেই স্মরণ করতে না পারে তাহলে যারা সাধারন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা তাদের কি অবস্থা একবার ভেবে দেখ। আমি তার কথায় উত্তর দিতে না পেরে ফোনটা কেটে দিলাম।
ভাবতে ভাবতে লেখাটি শুরু করলাম। ভাবলাম সীমাহীন এই জাতীয় লজ্জাজনক ব্যাপারটি সবার সাথে শেয়ার করি। কত ঘটা করে গতকালই না পালিত হল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। দিবসটি স্মরণে স্টেডিয়ামে ভারতীয় শিল্পীদের নাচগান, প্রধানমন্ত্রীর মুজিবনগরের ঐতিহাসিক ভাষণ সহ কত আয়োজন। আর তার ঠিক পরের দিনেই শহীদ হওয়া একজন বীরশ্রেষ্ঠের সাথে এই কোন নিষ্ঠুর আচরন।
![]()
বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের ছবি দেখিয়ে স্মৃতিচারণা করছেন তাঁর গর্বিত মা মালেকা বেগম। ছবি : কালের কণ্ঠ
মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোলা জেলার দৌলতখান থানার পশ্চিম হাজীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই দুঃসাহসী হিসেবে খ্যাত মোস্তফা কামাল ১৯৬৭-র ১৬ ডিসেম্বর বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীতে চাকরি গ্রহণ করেন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়া অবস্থায়। তিনি ছিলেন চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক। বাড়ি ভোলায় হলেও চাকুরী সুত্রে তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে ছিলেন। আর যুদ্ধের সময় তাকে পাঠানো হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউরায়। ১৬ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কুমিল্লা-আখাউড়া রেললাইন ধরে উত্তর দিকে এগুতে থাকে। বেলা ১১ টার দিকে শুরু হয় শত্রুর গোলাবর্ষণ। পাক বাহিনীর আক্রমনের তীব্রতায় পিছু হটতে থাকে কামালের সহযোদ্ধারা। কিন্তু অকুতোভয় শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল পিছু না হটে শত্রুদের মোকাবেলা করতে করতে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে যান প্রিয় মাতৃভুমির স্বাধীনতার জন্য।
"কি দেখার কথা কি দেখছি? কি শোনার কথা কি শুনছি?
কি ভাবার কথা কি ভাবছি? কি বলার কথা কি বলছি?
তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি।।
স্বাধীনতা কি বৈশাখী মেলা, পান্তা ইলিশ খাওয়া?
স্বাধীনতা কি বটমূলে বসে বৈশাখী গান গাওয়া?
স্বাধীনতা কি বুদ্ধিজীবির বক্তৃতা সেমিনার?
স্বাধীনতা কি শহীদ বেড়িতে পুষ্পের সমাহার?
স্বাধীনতা কি গল্প নাটক উপন্যাস আর কবিতা?
স্বাধীনতা কি আজ বন্দী আনুষ্ঠানিকতা?
স্বাধীনতা কি ঢাকা শহরের আকাশচুম্বী বাড়ি?
স্বাধীনতা কি ফুটপাতে শোয়া গৃহহীন নর-নারী?
স্বাধীনতা কি হোটেলে হোটেলে গ্র্যান্ড ফ্যাশন শো?
স্বাধীনতা কি দুখিনী নারীর জড়-জীর্ণ বস্ত্র?
স্বাধীনতা কি গজিয়ে ওঠা অভিজাত পান্থশালা?
স্বাধীনতা কি অন্যের খোঁজে কিশোরী প্রমোদবালা?
স্বাধীনতা কি নিরীহ লোকের অকারণে প্রাণদন্ড?
স্বাধীনতা কি পানির ট্যাঙ্কে গলিত লাশের গন্ধ?
স্বাধীনতা কি হরতাল ডেকে জীবন করা স্তব্ধ?
স্বাধীনতা কি ক্ষমতা হরণে চলে বন্দুক যুদ্ধ?
স্বাধীনতা কি সন্ত্রাসী হাতে মারণাস্ত্রের গর্জন?
স্বাধীনতা কি অর্থের লোভে বিবেক বিসর্জন?
আজ নেই বর্গী, নেই ইংরেজ, নেই পাকিস্তানী হানাদার,
আজো তবু কেন আমার মনে শূণ্যতা আর হাহাকার?
আজো তবু কি লাখো শহীদের রক্ত যাবে বৃথা?
আজো তবু কি ভুলতে বসেছি স্বাধীনতার ইতিকথা?"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



