এই রকম একটা ব্যস্ত সময়ে ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে জানালো কমনওয়েলথ স্কলারশীপের চূড়ান্ত নির্বাচনের জন্য IELTS পরীক্ষা দিতে হবে। রেজিষ্ট্রেশনের পর জানা গেল পরীক্ষা হবে ১৫ই জানুয়ারী ২০০৫ এবং সারা দিন ব্যাপী। বন্ধু বান্ধবদের অনেকেই ততদিনে IELTS, TOEFL, GRE দিয়ে ফেলেছে কিন্ত আমার এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা একেবারে শুণ্যের কোঠায়। আমাকে IELTS দিতে হবে জেনে অনেকেই মূল্যবান উপদেশ দিল এবং বিভিন্ন কোচিং সেন্টার এর অব্যর্থ সব প্রোগ্রামের হদিস দিল।
ছাত্র হিসাবে সারা জীবন অনিয়মিত, কোচিং করাটা কখনই খুব একটা আকর্ষনীয় লাগেনি তারপর এই বুড়া বয়সে (বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হয়ে গেছি, বুড়া তো বলাই যায়, কি বলেন!) কোচিং। না ভাই ওটি আমাকে দিয়ে হবে না। সিদ্ধান্ত নিলাম কোচিং টোচিং করবনা একবারে পরীক্ষা। আমার স্ত্রী এবং আমার পরিবারের বেশ কিছু সদস্য আমার সিদ্ধান্তে যারপরনাই মনক্ষুন্ন হলেন। আমার এহেন হঠকারী (!) সিদ্ধান্তের কারণে নাকি স্কলারশীপটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। IELTS এর জন্য প্রস্ততি দরকার আছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমাকে বেশ কিছু বই আর সিডি গছিয়ে দেয়া হল পড়ার জন্য। কিন্ত সময় কোথায়? ঘরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮০ টি খাতা। পরীক্ষা কমিটির সভাপতি তাড়া দিচ্ছেন জমা দেবার জন্য। এক একটি খাতাও মাশাআল্লাহ ৮০-৯০ পৃষ্ঠার কম নয়। ছাত্ররা লিখতেও পারে বটে। প্রতীজ্ঞা করলাম আবার কখনো ছাত্র হলে যথাসাধ্য কম লেখার চেষ্টা করব। এর সাথে আছে ল্যাব এর কাজ, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্যাপ, ক্লাস প্রিপারেশন, বউকে নিয়ে নিয়মিত ডাক্তারের সাথে চেক আপ ইত্যাদি। সব মিলিয়ে IELTS হয়ে গেল প্রায়োরিটি লিষ্টের নীচের দিকের ব্যাপার।
টের পাচ্ছিলাম যে সময় খুব দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। এরমাঝে বউ এর পীড়াপিড়িতে একদিন সিডি থেকে দুইটা MOCK পরীক্ষা দিলাম। ফলাফল খারাপ না। ব্যস না পড়ার জন্য আরো যুক্তি পেয়ে গেলাম।
৮ জানুয়ারী ২০০৫, IELTS পরীক্ষার আর এক সপ্তাহ বাকী। তখন মনে হল, একবার একটু ভাল করে দেখি পরীক্ষার সিস্টেম কি, কি ধরনের প্রশ্ন আসছে ইত্যাদি। বাসায় বসে আরো দু একটি MOCK Test দিতে গিয়ে দেখি অবস্থা কেরোসিন। রিডিং এ সমস্যা না হলেও লিসেনিং এর সমস্যা হচ্ছে। আর রাইটিং এবং স্পীকিং এর তো প্রাকটিস হচ্ছে না। ঠিক করলাম কোন এক জায়গায় একটা MOCK Test দেবো। তখন BETS সেন্টারে MOCK Test চালু করেছে।
কাউকে না জানিয়ে দিয়ে দিলাম একটা টেষ্ট। আমাকে অক্সফোর্ড আর London School of Pharmacy এর জন্য পেতে হবে কমপক্ষে ৭। BETS সেন্টার থেকে জানালো আমার বেশ কিছু সমস্যা আছে। যদি পারি টেস্ট এর তারিখ পেছাতে আর না হলে নাকি প্রত্যেকটি বিভাগে ৭ স্কোর করা কঠিন হতে পারে। রিস্ক না নেয়াই নাকি ভালো। তারিখ পেছাবার যেহেতু কোন উপায় নেই (ব্রিটিশ কাউন্সিলকে কমনওয়েলথ এর কাছে স্কোর পাঠাতে হবে), তাই কথায় কান দিলাম না। তবে এই প্রথমবারের মত ঘাবড়ালাম।
আমার প্রথম সন্তান নাসিফ (বর্তমান বয়স ৫ বছর ৪ মাস) জন্ম সিজারিয়ান ডেলিভারীর মাধ্যমে। তাই নামিরার জন্মের সময়ও সিজারিয়ান করাটা অনেকটাই ঠিক করা ছিল। সব কিছু মিলিয়ে Expected Date of Delivery (EDD) ছিল জানুয়ারীর ৪র্থ সপ্তাহে। এর মাঝে জানুয়ারীর ১৩ তারিখের দিকে হঠাত করে আমার স্ত্রীর কিছু কমপ্লিকেশন শুরু হল। দ্রুত দৌড়ালাম ডাক্তার এর কাছে। পরিচিত ফ্যামিলি ডাক্তার। আমার প্রথম সন্তানও তার হাতেই হয়েছে। জানালেন দ্রুত সিজারিয়ান করা দরকার, নাহলে রিস্ক হতে পারে এবং সম্ভব হলে আগামীকাল রাতেই। বললাম ১৫ তারিখ আমার IELTS পরীক্ষা। তাই ১৪ তারিখ রাতে অপারেশন করাটা ঝুকিপূর্ণ হয়ে যায় কেননা ওইরকম একটা সময়ে স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে পরীক্ষা দেয়া অসম্ভব আর কমপ্লিকেশনের কথাতো কিছুই বলা যায় না।বউ এর সাথে কথা বলে ওর অনুমতি নিয়ে নামিরার পৃথিবীতে আগমন একদিন পিছিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম।
এতসব ঘটনার ফলে একটা কাজের কাজ হলো, IELTS বিষয়ে যত টেনশন ছিল তা উধাও হয়ে কোন রকমে পরীক্ষাটা দেওয়াটাই মুখ্য ব্যাপার হয়ে গেল। নিজের Speaking দক্ষতা নিয়ে কনফিডেন্ট ছিলাম, যেহেতু Reading, Writing এ কোন সমস্যা হচ্ছিলনা, তাই ভাবলাম কোন রকমে Listening এ ৭ জোগাড় করতে পারলেই প্রয়োজনীয় স্কোর হয়ে যাবে। Listening এ বড় সমস্যা হলো এত দীর্ঘসময় মন:সংযোগ ধরে রাখা।
১৫ জানুয়ারী ২০০৫, সকাল বেলা চলে গেলাম ব্রিটিশ কাউন্সিল এ। মনে হচ্ছে সব কিছু খুব ধীরে হচ্ছে, আমি চাচ্ছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরীক্ষা শেষ করতে। Listening দিয়ে পরীক্ষা শুরু হলো আর Speaking দিয়ে শেষ। একটা ঘোরের মধ্যে Listening, reading, writing শেষ করে Speaking টেস্ট এর জন্য অপেক্ষা করছি। কি লিখেছি কিছুই মাথায় নাই। অপেক্ষা করতে করতে বার বার বাসায় ফোন করছি সব কিছু ঠিক আছে কিনা জানার জন্য আর বউকে অভয় দিচ্ছি যে আমি কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌছাবো বলে।
Speaking এর শুরুতে কুশল আলাপের পর পরীক্ষক শুরু করলেন মেমরী নিয়ে প্রশ্ন। আমার জীবনে মেমরীর ভূমিকা কি? সমাজের অন্যান্য মানুষের ক্ষেত্রে সেটি কিভাবে ডিফরেন্ট হতে পারে... ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার মেমরী তখন ফাকা, মাথায় ঘুরছে বউ, নামিরা, হাসপাতাল এসব চিন্তা। ধারণার চাইতে অনেক খারাপ একটা Speaking টেস্ট দিলাম। যেটা নিয়ে কনফিডেন্স বেশী ছিল মনে হলো সেটাতেই ধরা খাব।
যা হোক পরীক্ষা শেষ হতেই পড়িমড়ি করে ছুটলাম বাসায়। তারপর বউকে নিয়ে সোজা হাসপাতালে। ডাক্তার আমাদের জন্য অপেক্ষা করেই ছিলেন। কোনো রকম সমস্যা ছাড়াই পৃথিবীতে আসল ছোট্ট নামিরা। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে ওকে প্রথমবারের মত কোলে নিয়েই কানে কানে ক্ষমা চেয়ে নিলাম পৃথিবীতে আনতে এক দিনের বিলম্বের জন্য।
(সময়মত IELTS পরীক্ষার ফলাফল পেলাম। প্রয়োজনের চেয়ে অনেক ভালো হল ফল। সবচাইতে অবাক হলাম Listening এর স্কোর দেখে। নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হয়েছিল, না হলে আমি কিভাবে ৯ পাই
)
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০০৭ রাত ৩:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




