জন্ম ও পরিবার
হুমায়ুন আজাদ মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের ভাগ্যকুল ইউনিয়নের কামারগাঁও গ্রামে নানা বাড়িতে ২৮ এপ্রিল ১৯৪৭ জন্মগ্রহণ করেন। তখন নানা বাড়িতে জন্ম নেয়াটাই রীতি ছিল। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি পাশ্ববর্তী রাড়িখাল গ্রামে। রাড়িখাল পূর্ব ও পশ্চিম দিকে লম্বা একটি সূর্যদীঘল গ্রাম। কিন্তু শ্রীনগর থেকে ভাগ্যকুল পর্যন্ত রাস্তাটি গ্রামটিকে উত্তর দক্ষিণে দুইভাগ করে দেয়। বর্তমানে এটি ঢাকা দোহার রোড নামে পরিচিত। রাস্তার উত্তরের গ্রামটি উত্তর রাড়িখাল এবং দক্ষিণের গ্রামটি দক্ষিণ রাড়িখাল নামে পরিচিত। এই দক্ষিণ রাড়িখালই তাঁর পিতার বাড়ি। বাড়িটি আখন্দ বাড়ি হিসাবে পরিচিত। তাঁর পিতার নাম আব্দুর রাশেদ, মায়ের নাম জোবেদা খাতুন। হুমায়ুন আজাদ পিতা-মাতার দ্বিতীয় পুত্র ও তৃতীয় সন্তান। প্রথম পুত্র আজাদ কবীর জন্মের পরে মারা গিয়েছিল। ফলে প্রথম পুত্রের আদরেই বড় হতে থাকেন। তাঁর বড় ভাইর আজাদ নামটি ধারণ করেই হুমায়ুন কবীর থেকে হুমায়ুন আজাদ হয়েছিলেন। এর কারণ ছিল- তখন হুমায়ুন কবীর নামে একজন লেখক ছিলেন। আÍবিশ্বাসী হুমায়ুন আজাদ নাম বদলে নিয়েছিলেন। শুরু থেকেই লেখালেখি করেছেন হুমায়ুন আজাদ নামে। ১৯৮৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর নারায়গঞ্জ জেলার প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্টেটের নিকট পিতৃপ্রদত্ত ও সার্টিফিকেটে লিখিত নাম পবিবর্তন করে তিনি হুমায়ুন আজাদ নাম গ্রহণ করেন। একই বছর ৮অক্টোবর দৈনিক খবর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশবাসীকে জানান: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ তারিখে আমার নাম হুমায়ুন কবীর থেকে হুমায়ুন আজাদ করা হয়েছে। তিনি ছদ্মনামের লেখক হিসাবে থাকা পছন্দ করেন নি।
তাঁর পিতা ছিলেন রাড়িখাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং স্থানীয় পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। তিনি এখান থেকে খুব বেশি আয় করতেন না। এজন্য তিনি অনেক জমি বিক্রি করে, গোয়ালের গরু বিক্রি করে, চাকুরি ছেড়ে ১৯৬০ সালে ব্যবসা করার জন্য দিনাজপুর চলে যান। তিনি চাকুরি ছেড়ে ব্যবসার জন্য দিনাজপুর চলে যান এটা পরিবারের কেউই চান নি। তখন হুমায়ুন আজাদ নবম শ্রেণীতে পড়েন। কিন্তু তাঁর পিতার ব্যবসায় সফল না হওয়াতে, লোকসান দিয়ে কয়েক বছর পরে আবারো রাড়িখালে প–র্বের পেশায় ফিরে আসেন। তাঁর বড় বোনের নাম পানু কবীর। তিনি ১৯৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন মাত্র ৪০ বছর বয়সে। হুমায়ুন আজাদের ইচ্ছাতেই তাঁর বোনের কবর দেয়া হয় স্বামীর বসত ভিটায়। এই বোনের এক পুত্র পিজির সার্জন হয়েছেন, হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত হলে তিনি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের ওটিতে ছিলেন। তাঁর আরেক বোনের নাম নাজমা কবীর। তিনি সরকারের শিক্ষা বিভাগে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর দুই ভাই হলেন সাজ্জাদ কবীর বাদল এবং মঞ্জুরুল কবীর মাতিন। সাজ্জাদ কবীর বাদল বর্তমান উপ-সচিব পদমর্যদায় কর্মরত রয়েছেন। ছোট ভাই মঞ্জুরুল কবীর মাতিন বর্তমানে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। তাঁর পিতা আব্দুর রাশেদ ১৯৯২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মাতা জোবেদা খাতুনও মৃত্যুবরণ করেন ২০০৩ সালে। তাঁর এক ভাই ছিল কালাম নামে; সে সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকতো। তিনি ওকে গোশল করাতেন, ঘুম পাড়াতেন। হুমায়ুন আজাদ যখন সেভেনে পড়েন তখন গ্রামে কলেরা দেখা দেয়, কলেরায় কালাম মারা যায়। তাকে নিয়ে ফুলে গন্ধে ঘুম আসে না-তে লিখেছেন, 'সবচেয়ে যে ছোটো পিঁড়িখানি' এবং কবিতা লিখেছেন অনুজের কবরপার্শ্বে নামে।
তাঁর নানা জান খাঁ। তিনি আড়িয়াল বিলে জমি সংক্রান্ত বিরোধে খুন হন। জান খাঁ ছিলেন সেকালে আর্থিক সঙ্গতিসম্পন্ন মানুষ। তাঁর আপন এক মামা ছিল; তিনি হুমায়ুন আজাদের জন্মের আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাঁর আপন কোন খালাও ছিল না। তবে এখনো কামারগাঁয়ে তাঁর নানার গোষ্ঠীর মামা ও মামাতো ভাইয়েরা প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালী। তাঁর এক চাচাতো মামা ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর এই মামার দুই পুত্রও চেয়ারম্যান হয়েছেন। কয়েক মামাতো ভাই সরকারী উচ্চ পর্যায়ে চাকরী করেছেন। হুমায়ুন আজাদের মা অনেক পৈত্রিক সম্পত্তি পেয়েছিলেন। তাঁর আপন কোন কাকাও ছিল না। তাঁর ছিল তিন ফুফু।
হুমায়ুন আজাদ তাঁর সহপাঠিনী লতিফা কোহিনুরকে ভালবেসে বিয়ে করেন। তাঁদের বিয়ে হয় টেলিফোনে। সে সময় এটা খুব একটা প্রচলিত ছিল না। তখন হুমায়ুন আজাদ উচ্চ শিক্ষার জন্য এডিনবরায় ছিলেন। তাদের রয়েছে দুই মেয়ে এবং এক পুত্র। বড় মেয়ে মৌলী আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইনে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। ছোট মেয়ে স্মিতা আজাদ একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। একমাত্র পুত্র অনন্য আজাদ সন্তানদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। তিনি পড়াশোনা করছেন।
পরিবারের প্রতি তাঁর ছিল অসামান্য প্রভাব। তাঁর কথার বাইরে কখনোই পরিবারের কেউ যেত না। অন্যদের মতো পরিবারের লোকেরাও তাঁর প্রতিভা ও বিবেচনাবোধ মেনে নিয়েছিল। তাঁর ছোট দুই ভাই তাকে দাদাভাই বলে সম্বোধন করেন। এখনো তাঁর ছোট দুই ভাই হুমায়ুন আজাদের কথা উঠলে অশ্রু সজল হয়ে পড়েন। তিনি যখন ব্যাংককে বুমরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন তাঁর সাথে ছিল তাঁর ছোট ভাই মাতিন। জনাব মাতিন ১৫ দিন বড়দার সাথে তাঁর কক্ষেই ছিলেন, বের হননি। খাওয়ানো পরানোসহ এমনকি সৌচকার্য করিয়ে দিতেন। বড়দার প্রতি এতোটাই দরদ ছিল। এখনো ভাই-বোনেরা তাঁর সমাধীটি আগলে রাখছেন গভীর মমতায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ বিকাল ৫:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



