
বার্সেলোনায় কোন চাঁদর কিংবা জ্যাকেট লাগে না এখনও। সেখানের মানুষ এখনও বসন্ত কাটায়। দিনে কিংবা রাতে সমুদ্রের গর্জন শোনা যায় এখানে। ২০ তারিখ রাতে হাটছিলাম এই শহরের প্রশস্ত রাস্তায়। এখানের রাস্তাগুলো আসলেই বেশ প্রশস্ত। তার পাশে আবার সাইকেল এর রাস্তা। ইউরোপের তেমন কোথাও এখন আপনি বসন্ত ভোগ করতে পারবেন না শুধু স্পেন ছাড়া। স্পেনেরও অনেক স্থানেই ঠান্ডা আছে। তবে বার্সেলোনা একটু আলাদা।
রাস্তায় হাটছিলাম। রাতের খাবারের জন্য কিছু কিনব বলে একটা সুপার মার্কেট খুজছিলাম। এখানে মানুষ দেখেই তার আগমনের স্থান অনেকটা ধারনা করা যায়। পাকিস্তানী একটি দোকানে ডুকলাম। কিন্তু দামের কষাঘাতে ছিটকে বের হয়ে আসলাম। ঠিক রাস্তার উল্টো দিকে আর একটি মার্কেট পেলাম। সেখানে গেলাম। আমরা জিনিষপত্র দেখছিলাম। দূর থেকে, ঠিক বাংলা নয় আবার বাংলার মত একটা ভাষার দুইজন মানুষের কথোপকথন ভেসে আসছিল। ক্যাশ টেবিলে তারা বসা। আমি এগিয়ে গেলাম। ভাষাটা আরো ক্লিয়ার হতে শুরু করল। আগেও শুনেছি। কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে বের হয়ে এলো দোকানের মালিক ভদ্রলোক সিলেটের সুনামগঞ্জ এর মানুষ। নামটা ঠিক এখন মনে আসছে না।
আমি যেখানেই যাই না কেন আমার চোখ সাধারনত বাংলাদেশী খুজে বেড়াই। কোন দেশী মানুষকে পেলে বুকে নিলে কেমন যেন আলাদা একটা তৃপ্তি পাই আমি। বিশেষ করে যারা আমার মতই বেশ অনেক বছর প্রিয় দেশ ছেড়ে দূরে আছেন। এর আগে অষ্টিয়ার সেই বাংলাদেশী দুই ভাইয়ের কথায় এটা লিখছিলাম।
ভদ্রলোক প্রায় ৭/৮ বছর স্পেনে আছেন। বয়স ৩৫/৪০ হবে। গত ২০১৩ সালে একবার দেশে গিয়ে বিবাহ করে এসেছেন। একটি ছেলে সন্তান আছে তার। তিনি এখনও দেখেন নাই। দোকানটি সে অনেক কষ্টে দিয়েছেন। তবে দোকান যে খুব একটা ভাল যাচ্ছে না সেটা দোকানের শুকিয়ে যাওয়া আপেল আর কমলা দেখেই কিছুটা আন্দাজ করা যায়।
বলছিলেন, "ভাই এখানে অনেক কষ্ট করে এই দোকানটা দিয়েছি। বেশ অনেক মাস যাবত লস দিয়ে যাচ্ছি। প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ টাকা লস যায়। মালামাল তোলা দরকার। তাও পারছি না। প্রায় ১৫/১৬ লাখ টাকা হলে এটাকে আমি দাড় করাতে পারি। খুব কষ্টে যাচ্ছে সময়টা"।
বাচ্চাকে দেখেন নাই। "দেশে যাবেন না?" আমার প্রশ্ন।
"জি ভাই যাব। ছেলেটাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু দেশে গেলে আমার এখানের কিভাবে চলবে বলেন!" বললেন তিনি।
অনেক্ষন গল্প হল। দোকানে কাস্টমার ছিল না। তাই আমাদের গল্পে কোন ব্যঘাত ঘটে নাই। আমার সাথে আজারবাইজান এর একটা ছেলে ছিল। দুজনকে সেই শুকনো আপেল থেকেই প্রান নির্যাসিত ভালবাসা জড়িয়ে আপ্যায়ন করলেন। সাথে ফান্টাও দিয়েছিলেন। ফান্টাটা আমার না নেয়ার খুব তোড়জোড় ছিল। কিন্তু তার সাথে পারলাম না।
রাত অনেক হয়েছে। প্রায় ১১/১২ টা। উনার দোকান সারারাত খোলা থাকে। আমাদের উঠতে হবে।
"ভাই, এখানে থাকলে আবার আসবেন। আপনার মত এই ৮ বছরে কেউ এসে খোজ নেয় নাই। আসেন আর একবার বুক মিলাই। দেশে গেলে আমাদের বাড়িতে আসবেন" বলে একবার বুক মিলিয়ে প্রশান্তির আদান প্রদান করলাম আমরা।
"জি, আসব ইনশাল্লাহ। আপনি ভাল থাকবেন। পরিবারের সবাইকে সালাম দিবেন। মন খারাপ করবেন না। কারো কোরবানী কারো প্রাপ্তির বন্ধনী" বলে আমি আর চলে এলাম।
আমি সেদিন বুঝেছিলাম, বার্সেলোনায় শুধু ফুটবল খেলার আনন্দই হয় না। এখানের অলিতে গলিতে অনেক কষ্টের আর অপ্রাপ্তির গল্পও অলিখিত থাকে।
একবার পেছনে তাকিয়েছিলাম।
উনি এখনও তাকিয়ে আছেন আমাদের পথে।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




