বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ ধার্মিক বলে একটা সরল সাধারণীকরণ বাজারে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে। এ সাধারণীকরণটা আমার কাছে অতি সরল বলে মনে হয়। অন্তত নিজের পর্যবেক্ষণে। কিন্তু একই সাথে এটি সত্য যে, এখানকার মানুষদের মনোজগতে ঐতিহাসিকভাবে ধর্মের ব্যাপারে একটি সফট কর্ণার বর্তমান। অতীত থেকে আজ অবধি। মূলত: সাধারণ মানুষের ধর্মের ব্যাপারে বিরাজমান এ সফট কর্ণারটাই বারাবার সা¤প্রদাযিক রাজনীতির পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ বিমানবন্দর থেকে নির্মিয়মান লালন সহ বাউলদের ভাস্কর্য সরাবার ঘটনা এবং একে ঘিরে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক মোর্চাগুলোর কর্মকান্ড।
লালনের ভাস্কর্য সরাবার ঘটনাটিকে আপাত দৃষ্টিতে অনেকেই রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। পরিবর্তে তাঁরা এটিকে ধর্মান্ধতা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। এ রকম দেখা-দেখির মধ্যেও একই সরল সমীকরণটি নিহিত। আমার মতে এটি সা¤প্রদায়িক রাজনৈতিক কর্মকান্ডেরই ধারাবাহিকতা। এখানে বলা দরকার যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যান্য লোকজ ঐহিত্য ও সংস্কৃতির উপাদানগুলো নিয়ে মৌলবাদ ও সা¤প্রদায়িক শক্তির অবস্থান একেবারে সুস্পষ্ট। কিন্তু প্রকাশে তারা বেশ কৌশলী। বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে যতবেশি মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীক ও অসা¤প্রদায়িক লোকজ ধারার উপাদানগুলো থাকবে, চর্চা হবে তত বেশি মৌলবাদ ও সা¤প্রদায়িক রাজনীতি পিছিয়ে পড়বে এ বিষয়টি তারা খুব ভাল করে জ্ঞাত। ফলে যেকোন মূল্যে এ ধরনের শিল্প-সংস্কৃতির চর্চার প্রতিরোধে তারা বদ্ধপরিকর। কিন্ত এ সব বিষয়নিয়ে বিপরীত কর্মকান্ড পরিচালনার ধরন সব সময় এক নয়। এটি নির্ভর করে নির্দিষ্ট সমযের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।
মৌলবাদী ও সা¤প্রদায়িক শক্তি খুব ভাল করেই জানে লালনের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এবং তার অসা¤প্রদায়িক অবস্থান। সুতরাং লালনের ভাস্কর্য মানেই হলো অসা¤প্রদায়িক চেতনারই লালন-পালন। অন্তত শিল্প-সংস্কৃতির দিক থেকে, যার একটি রাজনৈতিক ফলাবর্তনও রয়েছে এবং এ ফলাবর্তন থাকতে বাধ্য। মৌলবাদ ও সা¤প্রদায়িক শক্তির ভয়টা মূলত এখানেই। সুতরাং এ রাজনৈতিক ভয় থেকেই মূলত লালন ভাস্কর্যের সরিয়ে ফেলার আকাঙ্খা ও উদ্যোগ। এ উদ্যোগটা মৌলবাদ ও সা¤প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি সচেতনভাবেই নিয়েছে। আর আগের মতোই সাধারণ জনগণের ধর্মের প্রতি বিদ্যমান সফট কর্ণারটাকে পুঁজি করে ধর্মটাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার নিমিত্তে এটিকে হাজিদের মূর্তি দর্শনের কল্পিত সম্ভাবনার সাথে যোগসূত্র স্থাপন করে পরিবেশন করা হয়েছে। ভাস্কর্যকে মূর্তি হিসেবে পরিবেশনের এ রাজনৈতিক ব্যককরণ ব্যবহার করে এর পেছনে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, তৎপরতা এবং দলীয় পরিচিতিগুলো আড়ালে রাখার চেষ্টা চালানো অপেক্ষাকৃত সহজ। দ্বিতীয়ত জরুরি অবস্থার মধ্যদিয়েও এ ধরনের তৎপরতা ধর্মের মোড়কে পরিবেশিত ও চর্চিত হয় বলে পার পাওয়া যায় সহজে। ভাস্কর্যকে মূর্তি হিসেবে পরিবেশনের অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে এ সব ভাস্কর্য হিন্দু ধর্মের আচার-আচরণের অংশ। ইসলাম যেহেতু মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে সেহেতু সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ নিজেরা ধর্ম চর্চা না করলেও নিজ ধর্মের প্রতি সফট কর্ণার থাকার সুবাধে বিষয়টিকে কোন মৌলবাদী রাজনৈতিক তৎপরতা হিসেবে দেখে না। দেখে মূর্তির বিরুদ্ধে জিহাদ হিসেবে। ফলে নিজেরা অংশ না নিলেও নিরবতার সংস্কৃতি অবলম্বন করে। এতে মৌলবাদী ও সা¤প্রদাযিক শক্তি জনগণের একটি বিরাট অংশকে নিজেদের পক্ষে নিতে না পারুক, অন্তত প্রতিবাদের পথ থেকে সরাতে সমর্থ হয়।
সুতরাং আমরা যারা এর বিপক্ষে অবস্থান করছি বা করতে চাই আমাদের সংবাদ পরিবেশনের এ মৌলবাদী রাজনীতিটাও তুলে ধরতে হবে। সাধারণের কাছে। তাদের অনুসৃত প্রক্রিয়াটা এত সহজ এবং ভয়াবহ যে তারা মসজিদ-মাদ্রাসা-মক্তব থেকে শুরু করে মৌলবাদী পত্র-পত্রিকা, প্রকাশনা এমনকি টিভি মিডিয়া পর্যন্ত ব্যবহার করে। সুতরাং এ প্রক্রিয়াটার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারলে সা¤প্রদায়িকাতা ও মৌলবাদ কৌশলে বিকাশিত হতে থাকবে। তাতে বাউল-লালনদের সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা আরও বাড়বে। একটুও কমবে না। আগ্রহীদের জন্য আরেকটি লিংক

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

