জিয়া বিমানবন্দরের সম্মুখ পথ হতে লালনের ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগটি শুধু মৌলবাদ নয়, সুপ্ত এবং প্রকাশিত সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ধারবাহিকতার কাছেও একটি সম্মিলিত পরাজয়। আবারও জোর দিয়ে বলছি, এটি একটি সম্মিলিত পরাজয়েরই ধারবাহিকতা। এ ধারাবাহিকতার হাত ধরে ক্রমান্বয়ে দাবি উঠবে এবং উঠছেও অন্যান্য ভাস্কর্যগুলো সরিয়ে ফেলার। বিনস্ট করে দেয়ার। এভাবে পরাজিত হতে থাকলে আর বেশি দিন নেই, যখন দাবি উঠবে অপরাজেয় বাংলা সরিয়ে নাও। সোপর্জিত স্বাধীনতা সরিয়ে নাও। শহীদ মিনার সরিয়ে নাও। এমনকি জাতীয় স্মৃতিসৌধ। তাও সরিয়ে নাও। আমাদের স্বাধীনতা, লড়াই-সংগ্রাম এমনকি শিল্প চর্চার ইতিহাসকে ধরে রাখবার জন্য এগুলোর যত প্রয়োজন থাকুক না কেন তথাকথিত মুসলমানিত্বের ছদ্মাবরণে এগুলোই ঘটতে থাকবে ।
বৃটিশ প্রবর্তিত সা¤প্রদায়িক এবং শ্রেণীবিভাজিত শিক্ষাকাঠামোর গর্ভে জন্ম ও বিকশিত কওমী ও সরকারি মাদ্রাসাগুলোর কোনটিতেই শহীদ মিনার নেই। একই সাথে জামাত পরিচালিত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাগুলোতেও কোন শহীদ মিনার নেই। শহীদ দিবসে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদদের বরণ করার জাতীয় রীতিটি সেখানে প্রকাশ্যে লঙ্ঘিত হয়। ধর্মের দোহাই দিয়ে। ওসব প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীতও গাওয়া হয় না। একই অজুহাতে। এবং এ লঙ্ঘনের ঘটনাটি ঘটে কারও অজ্ঞাতে নয়, প্রকাশ্যে। একটি রাষ্ট্রের আইনী কাঠামোর ভেতরে প্রতিনিয়ত এ লঙ্ঘন চলতে পেরেছে, পারছে শুরু থেকে। সে ধারাবাহিকতার সাথেই সহ সম্পর্ক রয়েছে লালনের ভাস্কর্য সরাবার ঘটনাটির।
একটি পশ্চাদপদ শিক্ষা-কারিক্যুলাম এবং সামাজিকায়নের হাত ধরে শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং অপরাপর ভাস্কর্য সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণগুলো দাড়িয়ে গেছে, প্রচারিত হযেছে এবং সে প্রচারণার হাত ধরে এগুলো ধব্বংসের আয়োজন চলছে তার পুরোটাই সা¤প্রদায়িকতার মননে হৃষ্টপুষ্ট। হিন্দু ধর্মের পূজা-পার্বনের রীতি-নীতির সাথে এগুলোকে সমার্থক করে দেখে এগুলোর প্রতিও সা¤প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আরোপের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজটি শুরু থেকে ছিল। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিকাশ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রীক অপরারজনীতি তার সাথে একটি বাড়তি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। সব মিলে মৌলবাদ ও সা¤প্রদায়িক রাজনীতির জন্য এখন পোয়াবারো অবস্থা। সুতরাং সে অবস্থার সেলিব্রেট করাতো চাই-ই-চাই। সে সেলিব্রেশনটা শুরু হয়েছে। আর আমরা দেখছি। সম্মিলিতভাবে। আমি ধারণা করে বলতে পারি, ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতিতে নিমজ্জিত ধর্মনিরপেক্ষ দলটিও হয়তো এ নিয়ে তেমন কিছু বলবে না। কারণ ভোটের রাজনীতি। আদর্শ নয়, আমাদের চাই ভোট। ভোটের রাজনীতিতে এ ভাবে হারতে থাকবে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি, লালন-হাসনরাজা, জারি-সারি, ভাটিয়ালী, পহেলা বৈশাখ। চুপ থেকে থেকে আমাদের ঐতিহ্যের ক্রমাগত শেষকৃত্য দেখাই যেন আজ একমাত্র জাতীয় কর্তব্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৮:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


