শামস সুমন বিষয়ক সংবাদটি যখন স্ক্রীণে পৌছালো ততক্ষণে আমরা ঋদ্ধি ক্যাফেতে, মিরপুর। বসে আছি মাঝখানের টেবিলে। আমি দরজামুখি, ওপাশে রমিন এবং তার পাশে আরো দশ মিনিট পরে এসে বসবে ফরহাদ। এরও পরে এসে যুক্ত হবে মঈন। মঈনের সাথে অনেকদিন দেখা হয়না।
ফরহাদ বলার চেষ্টা করল যে এরকম শহুরে অভিনেতা অর্থাৎ যাকে দেখে শহুরে মনে হত সে সময় ১৯৯০-২০০০ এর সময়টাতে বিরলই ছিল। আমরা প্রায় সকলেই শহুরে অভিনেতা হিসেবে তৌকিরকে মনে করলাম। আমার মাথায় আরো একটা নাম ঘুরঘুর করছিল তিনি ফারুকীর “চড়ুইভাতির” সেই নায়ক যিনি শিক্ষিকার প্রেমে পড়ে তার জন্য কবিতা লিখে ছাপিয়ে ফেলেছিলেন। নাম মনে পড়েছে মামুনুল হক। ব্যাচেলর টেলিফিল্মেও যার সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন বহন করবেন অপি করিম। দুটোই দেখবার আমন্ত্রণ রইল।
তো যা বলছিলাম, শামস সুমন এমন একজন মধ্যবিত্ত তরুণকে পর্দায় হাজির করতেন যাকে ঘিরে আমার ভালা লাগা ছিল। সহজাত ভালো লাগা। কাছের মানুষ মনে হত। আজ উনার মৃত্যুর পরে যখন উনার অট্টহাসি এবং এর আড়ালে লুকানো প্রবল অভিমান, এমনকি অর্থ কষ্টের কথাও অনলাইন অবিচুয়ারিতে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে তখন ২০১০ থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের নাটকের যে পরিবর্তনের ধারা তা মনে না করে পারা গেল না।
ছোট করে বললে ২০০০ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বাংলা টিভি নাটকের রূপান্তর আসলে শুধু মাধ্যম বদলের গল্প নয়, বরং রুচি, ন্যারেটিভ এবং দর্শক–সংস্কৃতির একটি গভীর পরিবর্তন। ২০০০-এর দশকের শুরুতে Humayun Ahmed-এর প্রভাবিত গল্পনির্ভর, সংলাপভিত্তিক মধ্যবিত্ত বাস্তবতার নাটক ছিল কেন্দ্রীয়, যেখানে মানবিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্মতা গুরুত্ব পেত। পরে Mostofa Sarwar Farooki-সহ নতুন নির্মাতারা শহুরে যুবসমাজ, স্টাইল এবং ভিজ্যুয়াল ভাষাকে সামনে আনেন। ২০১৫-এর পর ইউটিউবের আগমনে নাটক ক্রমে “ভিউ অর্থনীতি”-র অংশ হয়ে পড়ে, যেখানে গল্পের চেয়ে অ্যালগরিদম ও ভাইরালিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর ২০২০-এর পর Chorki বা Hoichoi-এর মতো প্ল্যাটফর্ম নতুন করে জটিল, অন্ধকার, এবং পরীক্ষামূলক গল্পের জায়গা তৈরি করে। ফলে আজকের বাংলা নাটক এক দ্বৈত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে—একদিকে ইউটিউবের mass emotional content, অন্যদিকে OTT-র curated narrative—যেখানে “গল্প” ধীরে ধীরে “অ্যালগরিদম” এবং “প্ল্যাটফর্ম লজিক”-এর সাথে সহাবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে।
২০০০–২০২৬ সময়কালের এই রূপান্তর বাংলা নাটকের তারকাদের অভিনয়ধারা ও আয়ের কাঠামো—দুটোকেই মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। আগে টেলিভিশন যুগে তারকাদের সাফল্য নির্ভর করত অভিনয়ের গভীরতা, সংলাপ বলার ক্ষমতা এবং চরিত্র নির্মাণের উপর—যেখানে একেকজন অভিনেতা দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট “অভিনয়ভাষা” তৈরি করতেন। কিন্তু ইউটিউব যুগে এসে অভিনয় অনেক ক্ষেত্রে হয়ে গেছে দ্রুত, আবেগ-নির্ভর এবং ফর্মুলামূলক, যেখানে subtle performance-এর চেয়ে তাৎক্ষণিক আবেগ (কান্না, রোমান্স, নাটকীয়তা) বেশি কার্যকর, কারণ এগুলোই বেশি ভিউ আনে। ফলে অভিনয়ের মানে এক ধরনের “performative intensity” বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে “character depth” কমেছে।
আয়ের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন হয়েছে। আগে আয়ের প্রধান উৎস ছিল টিভি চ্যানেলের পারিশ্রমিক, যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং সীমিত ছিল। এখন আয়ের উৎস বহুমুখী: ইউটিউব ভিউ (ad revenue), ব্র্যান্ড স্পন্সরশিপ, ফেসবুক মনিটাইজেশন, এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং। ফলে কিছু তারকা—বিশেষ করে যারা ভাইরাল হতে পারেন—তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারছেন। তবে এটি একটি অসম অর্থনীতি তৈরি করেছে: top-tier তারকারা খুব বেশি আয় করছেন, কিন্তু mid-level এবং নতুন অভিনেতারা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন। অন্যদিকে OTT প্ল্যাটফর্ম (যেমন Chorki) আবার নতুন করে “গুণগত অভিনয়” এবং উচ্চ পারিশ্রমিকের সুযোগ তৈরি করেছে, তবে তা মূলত সীমিত ও নির্বাচিত অভিনেতাদের জন্য। ফলে আজকের তারকা-অর্থনীতি একটি hybrid structure—যেখানে একই অভিনেতাকে একদিকে algorithm-driven ইউটিউব কনটেন্টে কাজ করতে হয়, অন্যদিকে OTT-তে নিজের “serious actor” পরিচয় ধরে রাখতে হয়।
ফেইসবুকে ভেসে বেড়ানো শামস সুমনের নিকটজনদের ছোট্ট ছোট্ট ক্লিপ থেকে জানা গেল যে শেষ পর্যন্ত তিনি অভিনয়টা করতে চেয়েছিলেন। যদিও তেমন আর ডাক পেতেন না। আমি মনে করি বাজার তাঁকে দূরেই ঠেলে দিয়েছিল। অথবা এই নতুন অভিনয় বাজারের সাথে তিনি খাপ খাওয়াতেই পারছিলেন না। একজন শিল্পী যিনি দীর্ঘসময় কাজ করে যেতে চান তার জন্য এই সময়টাই, রুচি-বাজার-প্রযুক্তি ও রাজনীতি আর উপযুক্ত ছিল না।
এ প্রসঙ্গে স্বৈরাচারী রিজিমের সময় বারবার উঠে আসা প্রসঙ্গ, মধ্যবিত্ত কি এবং কেন এই আলাপটা আবারো মনে পড়ছে। একদিকে প্রবল আত্ম পরিচয় সংকট এবং আরেকদিকে প্রবল দলীয়করণ। একইসাথে বাঙালি মুসলমান আত্মপরিচয় নিয়ে প্রবল আত্মম্ভরীতা যেন ফয়সালা হওয়া আত্মপরিচয় বারবার জন্ম নেবার দরকার পড়ল। এই সংকট আমাদের এখনো কাটেনি। বরং বেড়েছে।
আমি মনে করি এমন অনেক শামস সুমন এখনো বেঁচে রয়েছেন এবং শিল্পীর কর্মময় জীবনটা ওঁনারা চান। আমার একটি তীব্র আশাবাদ ছিল যে অভ্যুত্থান পরবর্তি সময়ে সেই মধ্যবিত্ত এবং শিল্পীদের আবার পর্দায় দেখতে পাবো। যদিও তা ঘটেনি বরং শিল্পের আরেক রকমের দুর্বিত্তায়ন হয়েছে। আর সেইক্ষেত্রে সবচেয়ে গভীর ও সফল ক্ষতিটা করেছেন সম্ভবত ফারুকী। আওয়ামী দুর্বিত্তায়নের পর ইন্টেরিম দুর্বিত্তায়ন চোখে পড়েনি অনেকের। কিন্তু আমার মনে হয়েছে আত্মপরিচয়ের সংকটকে আরো গভীর এনারা করেছেন। বাই পোলারও।
প্রবল ধর্মীয় আত্ম পরিচয় “খাৎরে মে হ্যায়” অথবা “আমরা এইবার সব দখল কইরা ফালামু” প্রবণতা উৎকটভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রতিদিনের ভাষা থেকে রাজনীতির আলাপ। খিস্তি আর গালি ট্রেন্ড হয়েছে। আমার এক ফেইসবুক বন্ধু বারবার পোষ্ট ফ্যাসিস্ট দাবী করে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়কে প্রতিষ্ঠিত করে যাচ্ছেন। এসব উনার রাজনীতি বটে। যদিও এসব ফালতু বয়ানের বাইরে বরং ফ্যাসীজমের নতুন নানান ভঙ্গি আর রূপ আমরা দেখেছি। ফ্যাসিজম এত সহজে যায় না। মধ্যবিত্তের পুর্নবিন্যাস এত সহজে হয় না।
যাই হোক আপনারা খেয়াল না করলেও ফারুকীর তীব্রতর সাংস্কৃতিক রাজনীতিটা আমি লক্ষ্য করি এবং পরিষ্কার অবিশ্বাসও করি। স্মার্ট, চালাক ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক । যিনি এবং যেই গোষ্ঠী একদম গিরগিটির মত। কিন্তু শিল্পী হিসেবে অনেক ছোট হয়ে গেছেন; অন্তত আমার কাছে। এঁনারা শিল্প ব্যবসায় ভালো যতটা শিল্পের জন্য ততটাই খারাপ। একটা পোয়েটিক অনুভূতিমূলক অনুমান এবং বেদনা হল শামস সুমনের মৃত্যুতে এসবেরও প্রভাব আছে।
বিগত দশকে আরেকটি বড় প্রবণতা হল ফেইসবুকে দার্শনিকতার খোলস পড়া এবং রুচি-র সংজ্ঞায়ন। যদিও এর পেছনে ব্যক্তি সমূহের মনযোগ অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে ইনফ্লুয়েন্সিয়াল ব্যক্তি হবার বাসনা যতটুকু সমাজের প্রতি দায় ততটুকু নয়।
সমাজের রুচি দরকার আছে। আমি বিশ্বাস করতে চাই যে এখনো বাংলাদেশের মানুষের জন্য অরুচিকর বলে একটা সাধারন ধারণা আছে। এই প্রসঙ্গে হিরো আলমের কথা বলা দরকার। রুচি-র গণতন্ত্রায়নের দাবীকারীরা তখন মধ্যবিত্তকে গালি দিয়ে ছোট করার জন্য হিরো আলমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এবং আরো বহু সংখ্যক ইউজার ও গ্রহিতার কাছে হিরো আলমকে বিপ্লবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিতও করেছিলেন। আসলে তারা নিজেদেরই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং স্বৈরাচারিতায় বড় হওয়া প্রজন্মকে এক অনৈতিহাসিকতার দিকে বা সিলেকটিভ ঐতিহাসিকতার দিকে ঠেলেও দিয়েছেন। একদিকে স্বৈরাচারি ঐতিহাসিকতা আর অন্যদিকে অনৈতিহাসিকতা বা সিলেকটিভ ঐতিহাসিকতা মধ্যে যে প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, দর্শক হিসেবে এদের আমি এত শার্প মনে করিনা। এখানেই সাংস্কৃতিক ফাঁক। আর মাঝখানের দালালেরা। এখানে আরেকজনের প্রতি তীব্র প্রতারণা বোধের কথা মনে করতেই হয় তিনি হলেন, বাকের ভাই অর্থাৎ আসাদুজ্জামান নূর। এরকম নানাবিধ বৈঈমানীর নজির আমরা দেখেছি। দলীয়করণের নৃশংসতম রূপ এবং হতাশার আরেক নাম উনি। যদিও হুমায়ুন আহমেদের কোমল এবং বুদ্ধিদ্বীপ্ত পুরুষের ইমেজ হয়ে উঠেছিলেন তিনি, এবং পরিণত হলেন দলীয় দালালে।
এদিকে অভ্যুত্থান পরবর্তি সময়ে, শিল্প চর্চাকে একটা বিশেষ দিকে নেবার জন্য যে সাংস্কৃতিক রাজনীতি হল, যে কৃত্রিম আত্মপরিচয় সংকট তৈরি করা হল, সেটি ছিল বিশুদ্ধ একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ। যা এখনো চলমান।
মঈনের সাথে দীর্ঘদিন দেখা হয় না। তার যে খোঁজ রাখতে হয় সেটাও সে নিরুৎসাহিত করে। শামস সুমন কে পর্দায় দেখেই আমি অনুভব করেছিলাম যে এই ব্যক্তিটি ভীষণ আড়াল রাখতে পারেন। ঠোঁটভর্তি অভিমান। যেই অভিমান আমারো। সেই রুচিহীনতার বেদনা আমাকে কষ্ট দেয়। এতটা নীচে নামতে না পারার অদক্ষতা পীড়া দেয়।
রমিনের মন্তব্যে ফরহাদ সুন্দর করেই বলছিল, শামস সুমন তো রাজশাহী থেকে এসেছিলেন কিন্তু তাকে শহুরে লাগতো। কিন্তু জাহিদ হাসানকে ততটা না। আর ফরহাদের পেছনে দেখলাম মামুনুর রশিদ নেমে যাচ্ছেন। এক বৈচিত্রময় নেমে যাওয়া।
আমাদের রুচির দরকার আছে, সুন্দর শোভন ভাষার দরকার আছে। ৯০-২০০০ মধ্যবিত্তের দরকার আছে। আর দরকার আছে সাংস্কৃতিক দখলদারদের উৎখাত করার। এদের সবাইকে একাউন্টেবল করার। প্রশ্ন করার, কোন সমাজ তৈরি করছো তুমি? আবার কবে নতুন করে তোমার বৈঈমান মুখটা দেখবো? আমরা দর্শকরা আছি সংকটে। যদিও সমাজ ও সংস্কৃতিতে বিরাট ফাঁক। অর্থনীতি, নৈতিকতার রাজনীতি, প্রযুক্তি এবং শিল্পের বিস্তর ও জটিল সমীকরণ।
শামস সুমন সম্ভবত এই ফাঁকে মারা গেলেন।
শরৎ চৌধুরী, ১৮ই মার্চ ২০২৬।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


