লেখক: কুমার সাঙ্গাকারা
অনুবাদ: নাফিস ইফতেখার
টেন্ডুলকার যুগের একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হওয়ার সুবাদে এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ আমার ঘটেছে- আর তা হলো ক্রিকেট মাঠে শচীনের রোমাঞ্চকর সেই প্রবেশ। প্যাভিলিয়ন থেকে তার বের হয়ে আশার সেই অপেক্ষা, বাইন্ডারি থেকে পিচ পর্যন্ত তার সেই হেঁটে আসা, যেনো অনেকটাই কল্পলৌকিক। শচীনের মাঠে প্রবেশের অপেক্ষারত আবেগী ভারতীয় দর্শকদের সেই "শচীন"....."শচীন" ধ্বনি, আর পরক্ষণেই শচীনের মাঠে প্রবেশ মাত্রই পুরো স্টেডিয়ামের তারস্বরে চিৎকারে ফেটে পড়া, সে এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা!
সেই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা শচীন সম্পর্কে অনেকটাই বলে দেয়, আরো যা বলে দেয় তা হলো- ক্রিকেটের ইতিহাসের পাতায় "শচীন টেন্ডুলকার" নামটির একটি বিশেষ স্থান দখলের করে থাকার কথা। শচীন যে বিগত দুই দশকের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত ব্যাটসম্যান শুধু তাই নয়। ক্রিকেট-পাগল একটি দেশ, যেখানে ক্রিকেটাররা দেবতাতুল্য ও এক অর্থে তাদের উপাসনা করা হয়, তেমন একটি দেশের ক্রিকেটার হয়েও শচীন যেনো অনেকটাই অনন্য, যেনো অনেকটাই ভিন্ন। এমন এক উপমহাদেশ যা জন্ম দিয়েছে সুনীল গাভাস্কার আর কপিল দেবের আরো মতো অনেক কিংবদন্তি ক্রিকেটারের, তেমন এক উপমহাদেশের ক্রিকেটার হয়েও শচীন অর্জন করেছে এক অতিমানবীয় রূপ।
আমার মনে আছে ২০০৩ সালে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেয়াড় স্টেডিয়ামে আমি একটি চ্যারিটি ম্যাচে খেলেছিলাম। ম্যাচটি দেখতে হাজার হাজার দর্শকের সমাগম ঘটেছিলো। বীরেন্দর শেবাগের সাথে যখন শচীন ব্যাটিং ওপেন করার জন্য মাছে প্রবেশ করে তখন আবার সেই পরিচিত শব্দে, পরিচিত চিৎকারে আর পরিচিত গুন্ঞ্জনে মাঠ সরব হয়ে ওঠে। কিন্তু দুই ওভার পরেই যখন শচীন আউট হয়ে ফিরে যায় তখন মাঠে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। মাঠে তখন শোনা যাচ্ছিলো শুধু হতাশ দর্শকদের গুন্ঞ্জনধ্বনি। আমার কাছে মনে হয়, এই ভালো খেলার চাপ এবং তাও এই ব্যাপক আকারে, প্রতিটা দিন, প্রতিটা ম্যাচ, প্রতিটা ইনিংসে এবং প্রকৃত অর্থে কোন ব্যাক্তিগত জীবন না থাকার যন্ত্রনা, তা যেকোন সাধারণ মানুষের সহ্য সীমার অনেক উর্ধ্বে।
কিন্তু শচীন তার প্রায় ২০ বছর ব্যাপি এই ক্যারিয়ারে কোন এক অজানা শক্তিবলে এই ব্যাপক প্রত্যাশার চাপকে তার সঙ্গী বানিয়ে নিতে পেরেছে। আমার কাছে এই অর্জনের স্থান শচীনের পাতার পর পাতা পরিসংখ্যান আর রেকর্ডের অনেক ওপরে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে খেলাটা কোন সহজ কাজ নয়। প্রতি ইনিংসে নিজের শ্রেষ্ঠ খেলা উপহার দেওয়া আর প্রতিটি ম্যাচে জেতার প্রচন্ড চাপ থাকে ভারতীয় ক্রিকেটারদের ওপর। এখন এই প্রচন্ড চাপকে হাজারগুণ করে চিন্তা করুন - তাহলে হয়তো শচীনের ক্রিকেটীয় জীবন সম্বন্ধে সামান্য ধারণা পাবেন।
শচীনের কোটি কোটি ভক্ত হয়তো হয়তো আছে, কিন্তু তার নিন্দুকেরও অভাব নেই। বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় দল বিভিন্ন টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেও অধিকাংশ ফাইনালে জিততে সক্ষম হয়নি। আর ঠিক যখনই এমনটা ঘটে তখনই সবাই দোষারোপ করার জন্য প্রথমেই যাকে বেছে নেয় সে হলো শচীন। তারা বলে - "শচীন টেন্ডুলকার ভারতকে ফাইনালে জেতাতে পারে না।" যে মানুষটি রেকর্ড বই নতুন করে লেখানোর জন্য ক্রিকেট বিশ্বে বিখ্যাত, সেই মানুষটিকেই কিছু মানুষ মনে রেখেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার ব্যর্থতা দিয়ে।
এই অভিযোগটির কোন সত্যতা আমি কখনোই খুঁজে পাইনি। বরং আমার কাছে অভিযোগটি অত্যন্ত অনৈতিক ও যুক্তিহীন মনে হয়েছে। শচীন মানসিকভাবে প্রচন্ড শক্তিশালী, হওয়াটা প্রায় বাধ্যতামূলকই বটে যদি টানা ২০ বছর আপনি শীর্ষে অবস্থান করতে চান। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে পৌঁছানো আজকের শচীনকে এখনো লড়াই করতে হয় ইনজুরি আর প্রচন্ড মানসিক চাপের সাথে। তার ওপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচিতো আছেই। কিন্তু এতো কিছুর সাথে লড়াই করেও আজো শচীন একাই ভারতকে ম্যাচ জেতানোর মতো ইনিংস খেলছেন, এটাই বলে দেয় তার মানসিক শক্তি কতোটা দৃঢ়। আসলে ভারত এতোগুলো ফাইনাল একা শচীনের দোষে হারেনি, বরং হেরেছে খারাপ দলীয় পারফরম্যান্সের কারনে। আসলে এটিই হচ্ছে দলে একক নৈপুণ্যধারী খেলোয়াড় থাকার অসুবিধা। এমন অনেকবার হয়েছে আমি ড্রেসিংরুমে বসে সনাৎ জয়সুরিয়াকে একাই ম্যাচ জেতাতে দেখেছি। অনেক ক্ষেত্রেই, নিজের অজান্তেই ম্যাচের কোন এক পর্যায়ে এসে, গোটা দলই সনাৎ এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তো। সনাৎ এর তাড়াতাড়ি আউট হয়ে গেলে আমরা যেমন করে প্রবল চাপের মুখে পড়তাম, তেমনি করে উইকেটে সনাৎ এর দীর্ঘসময়ের উপস্থিতি আমাদের আত্মবিশ্বাস কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতো। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এই নির্ভরশীলতাকে কাটিয়ে উঠতে শিখেছি। অনেকটা এমন একটি মানসিক লড়াই পুরো ভারতীয় দলকে শচীনের সাথে লড়তে হয়েছে।
আমি শচীনকে প্রথম দেখেছিলাম টিভিতে, তখন আমার বয়স ছিলো ১২। আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক মনে হয়েছিলো ওর প্রান্ঞ্জল ও সরল ব্যাটিং স্টাইল। দৃষ্টিনন্দন স্ট্যান্স, মাপা সোজা ব্যাকলিফট, আত্মবিশ্বাসী ফরওয়ার্ড ডিফেন্সিভ এবং ওর সেই বিখ্যাত চেক ড্রাইভ যা এখন ক্যারিয়ারের শেষদিকে এসে একটু বদলে গিয়েছে, এসবই আমাকে আকর্ষণ করেছিলো। সন্দেহ নেই টেন্ডুলকারের এই অসাধারণ নৈপুণ্যের অনেকটাই ঈশ্বর প্রদত্ত, কিন্তু এই নৈপুণ্য পরিপূর্ণতা পেয়েছে ওর অসাধারণ টেকনিকের জোরে।
শচীন ওর সহজ-সরল টেকনিকের কারনে ক্রিকেটের প্রতিটি ফরম্যাটের সঙ্গেই মানিয়ে নিতে ও এক কথায় রাজত্ব করতে পেরেছে, তা সে টেস্ট ক্রিকেট, ওয়ানডে ক্রিকেট হোক আর টুয়েন্টি-টুয়েন্টিই হোক। আপনি যদি শচীনের সামগ্রিক পরিসংখ্যান দেখেন তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন ব্যাটসম্যান হিসেবে শচীন কতোটা পরিপূর্ণ। শচীন রান করেছে প্রতিটি ভেন্যুতে, প্রতিটি দলের বিরুদ্ধে, সবরকমের পিচে এবং সবরকমের বোলিংয়ের বিরুদ্ধে। শচীনের রাজ্য ক্রমশই বিস্তৃত হয়েছে টেস্ট থেকে ওয়ানডে এমনকি ক্রিকেটের সর্বাধুনিকতম ফরম্যাট টুয়েন্টি-টুয়েন্টিতেও।
বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দল শচীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওর টেকনিক পর্যবেক্ষণ করেছে কোন দুর্বলতা খুঁজে পাবার আশায়। যদিও বা কখনো তারা কোন দুর্বলতা খুঁজে পেয়েও থাকে, শচীন সবসময়ই পেরেছে নিজেকে তার সাথে মানিয়ে নিয়ে খেতে, আর এখানেই একজন মহৎ খেলোয়াড়ের পরিচয় পাওয়া যায়। ব্যাক্তিগতভাবে আমি মনে করি শচীনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অফস্টাম্পের সামান্য বাইরে পিচ করে বাঁক নিয়ে অফস্টাম্পে আসা বলগুলো, যা একইসাথে আরো অনেক ভারতীয় ব্যাটসম্যানেরই দুর্বলতা।
২০০৩ এর পর থেকেই শচীনের ক্রিকেটীয় জীবন আরো কঠিন হয়ে ওঠে যার প্রধান কারন- ইনজুরি ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সময়সূচী। আমার মনে হয়েছে ইনজুরিগুলোর কারনে শচীন ব্যাটসম্যান হিসেবে আগের চেয়ে আরো সতর্ক হয়েছে। আর তাই হয়তো শচীনের ক্রিজে আসাটা এখন আর বিপক্ষ দলের কাছে কোন অভিশাপ নেমে আসার মতো মনে হয় না, যেমনটা আগে মনে হতো। নতুন এই শচীন আগের শচীনের তুলনায় অনেকটাই ম্লান, তবে এখনো ওর একাই ম্যাচ জেতাবার মতো ইনিংস খেলার ক্ষমতা আছে।
এতো অর্জন, এতো সফলতা কিন্তু মানুষ হিসেবে যে শচীনকে আমরা চিনি তাকে পাল্টে দেয়নি। শচীন ওর পরিবারকে খুব ভালোবাসে, একই সাথে ওর আছে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা। এখনো ওকে দেখলে খুব সাধারণ কোন মানুষ মনে হয়, যেন আমাদেরই কোন আপনজন ও। ওর সহখেলোয়াড় আর বিপক্ষ দলের খেলোযারদের সাথে কথোপকথন দেখলে বোঝা যায় আসলে মানুষটার মন কতোটা সরল। যেকোন কথোপকথনেই থাকে শচীনের কুন্ঠাহীন অংশগ্রহণ। দু'টো জিনিস খুব প্রিয় শচীনের - গাড়ি আর ঘড়ি। এগুলো নিয়ে আলোচনা হলেই ও খুব উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।
এসব কিছু থেকে আসলে যে জিনিসটা বোঝা তা হলো - শচীন কোথা থেকে তার মানসিক শক্তি সঞ্চয় করে। ওর স্বচ্ছ মূল্যবোধ আর নৈতিক বিশ্বাস, দুঃসময়ে পরিবার আর কাছের বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া আত্মবিশ্বাস ওকে দিয়েছে কোটি মানুষের আস্থাকে ধরে রাখার ক্ষমতা। আমার কাছে শচীন হচ্ছে "Cricket is a gentleman's game" কথাটার জলজ্যান্ত বাহক। নিন্দুকের সমালোচনার জবাব দেয়ার জন্য শচীনের মুখ ফুটে কিছু বলবার প্রয়োজন হয় না, কারন সেই কাজ শচীন ব্যাট দিয়ে করতেই অভ্যস্ত।
(ক্রিকইনফো অবলম্বনে নাফিস ইফতেখার)
* লেখাটা পড়ে খুব ভালো লেগেছিলো, তাই পোস্ট না দিয়ে পারলাম না। আমি ভালো অনুবাদক নই। যাদের অনুবাদটা ভালো লাগেনি তারা মূল প্রবন্ধটি পড়ে নিতে পারেন।
মূল প্রবন্ধের লিংক: View this link
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১২:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



