মূল প্রবন্ধ: Change is not cricket's enemy
লেখক: হার্শা ভোগলে - ধারাভাষ্যকার, টিভি উপস্থাপক ও লেখক
অনুবাদ: নাফিস ইফতেখার
প্রকাশস্থল: www.cricinfo.com
লিংক: View this link
ক্রিকেটের অন্তীম দিনের গল্পগুলো আমাদের আতঙ্কিত করছে, চোখ রাঙাচ্ছে - ঠিক যেন কোন হলিউডের ম্যুভি থেকে নেয়া। কিন্তু যেমনটা আমরা জানি, গল্প ভয়ংঙ্কর হতেই পারে, কিন্তু সত্য হবেই এমন কোন কথা নেই। তাই প্রথমেই বলে রাখা ভালো - ক্রিকেট কোন সংকটের মাঝে নেই, পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে মাত্র। কিছু মানুষ দু'টোকে গুলিয়ে ফেলছেন। সেটা নতুন কিছু নয়, যখনই প্রথাগত ধারা থেকে ভিন্ন কোন কিছু পৃথিবীতে হয়েছে মানুষ এই দু'টোকে গুলিয়ে ফেলেছে।
ক্রিকেটকে আজ আমরা যে রূপে দেখছি তার পরিবর্তন হতে পারে, ঠিক যেমন আমাদের জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতেও এসেছে পরিবর্তন - আমাদের সম্পর্ক, আমাদের পরিবার, আমাদের চিকিৎসা, আমাদের বিজ্ঞান। পরিবর্তন মানেই উন্নতি নয় বা অগ্রসরতা নয় - এটাও যেমন ঠিক. তেমনিভাবে স্থিরবস্থাই যে সাফল্য বয়ে আনবে এমনটাও কোথাও বলা নেই।
এই দশকের সূচনাটা হয়েছিলো সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ টেস্ট সিরিজ দিয়ে, যখন ২০০১ এ অস্ট্রেলিয়া ভারতে আসে। দশকের মাঝামাঝিতে এসে আমরা পেয়েছি সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইপূর্ণ এ্যাশেজ সিরিজ। দশকের শেষটা অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ড এর মধ্যে চমৎকার ক্রিকেট নৈপুণ্য, আরেকটি দারুণ এ্যাশেজ সিরিজ আর ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর দিয়ে যেখানে ক্রীড়ানৈপুণ্য ঢাকা পড়ে গিয়েছিলো বিতর্কের মেঘে। খেয়াল করার বিষয় - প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি বিষয় কমন - অস্ট্রেলিয়া। যদিও অসি ক্রিকেটাররা মনে করে আচার-ব্যবহার সংক্রান্ত নিয়মগুলোর তাদের জন্য একটু ব্যতিক্রম হওয়া উচিৎ, কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই - সেরা ক্রিকেটশৈলীর দেখা মেলে এই অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকেই।
দশকের মাঝটায়, ক্রিকেট রাজনীতিকে শেকল পড়িয়ে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্বটা কমিয়ে এনেছিলো অতীতের আর যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু শেষ হাসিটা হেসেছে রাজনীতিই - কারগিল যুদ্ধ আর ২৬/১১'র মুম্বই বোমা হামলার মাঝের সুখস্মৃতিটা হয়তো আর কখনোই ফিরে আসবে না। এ উপমহাদেশে অন্ততঃ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শত্রু পরিবর্তন নয়; বরং ঘৃণা যা ক্রমশ ছড়াচ্ছে আর বাড়ছে। অবশ্য ভুলে গেলে চলবে না ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকাকে এনে দিয়েছে তাদের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত বস্তুটি এবং মাখায়া এনটিনিকে সুযোগ করে দিয়েছে ক্রিকেটের সবচেয়ে সুখানুভূতির গল্পটি রচনার।
আর তাই ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়ে থাকা টেস্ট ক্রিকেটও আমাদের অনেক সুখস্মৃতি উপহার দিয়েছে এই দশকে। আমাদের প্রাণে আশা যুগিয়েছে টেস্ট ক্রিকেট, যেন বলছে - "না! আরো কয়েক দশক অন্ততঃ আমি টিকে থাকবো আমি।" তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেটা তা হলো - "আজকের ক্রিকেটাররা কি এখনও টেস্ট ক্রিকেটকে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ ধারা বলে মনে করে?" যাদের কারনে আমাদের কাছে এই দশকটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে; এই ওয়ার্ন, ম্যাকগ্রা, পন্টিং, টেন্ডুলকার, দ্রাবিড় আর মুরালিরা মনে একটি মাত্র স্বপ্নকে পুঁজি করে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছিলেন - আর তা হলো টেস্ট ক্রিকেট খেলা। আজকের টি-টুয়েন্টি জেনারেশনের মনের চিন্তাটা হয়তো সেই একইরকম নয়। ২০১৫ নাগাদ এই কিশোররাই যাদের আমরা টি-টুয়েন্টি জেনারেশন বলছি, পা রাখবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অঙ্গনে। নিঃসন্দেহে অবস্থাটা কি দাঁড়াবে সেটা দেখার জন্য মুখিয়ে আছি আমরা।
পরিবর্তনটা চোখের সামনেই ঘটতে দেখতে পাচ্ছি - জোড়ে বল করার ইচ্ছেটা বোলাররা আস্তে আস্তে মন থেকে মুছে ফেলছেন। কারন এটাই হয়তো এখন টেস্ট দলে স্থান করে নেয়ার শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। শেন বন্ড টেস্ট ছেড়ে দিয়েছে, শোয়েব আখতার আজ শুধুই স্মৃতি, ডেল স্টেইন ধারাবাহিক নয়, ব্রেট লিকে দেখে মনে হয় সে ফুড়িয়ে গেছে, ফিডেল এডওয়ার্ডসের দেখা মেলা ভার, কেমার রোচ এতোই নতুন যে তার সম্পর্কে কিছু বলার সময় এখনও আসেনি আর ইশান্ত শর্মা ঠিক ততোটাই দ্বিধাগ্রস্ত যতোটা তার বয়সের অন্য কেউ হয়ে থাকে। এটা কিছুটা হলেও ব্যাখ্যা করে কেন আজ টেস্ট ক্রিকেটে এতো ব্যাটসম্যানের পঞ্চাশোর্ধ ব্যাটিং গড় আর কেনই বা এই দশকটা ব্যাটসম্যানদের দশক।
আগের সেই ওয়ানডে ক্রিকেটও এখন আর সেই আগের মতো নেই -পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে এখানেও। কিন্তু ওয়ানডে ক্রিকেটের দর্শকের সংখ্যা একটু ভিন্ন কথা বলছে, ভিন্ন সেইসব কলাম লেখকদের থেকে যারা ওয়ানডে ক্রিকেটকেও দেখছেন বিপদগ্রস্তের কাতারে। আমি আবারো বলবো, যেমনটা আমি আগেও বলেছি - ওয়ানডে ক্রিকেট কোন সংকটে মধ্যে নেই, বরং সংকটে আছে সেইসব আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা যেগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে; অন্ততঃ দর্শক পরিসংখ্যান তাই বলে। এতো এতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আজকাল খেলা হচ্ছে যে দর্শককে আগে থেকেই ঠিকঠাক করতে হয় কোনটিকে সে গুরুত্ব দেবে। তাই নিজের দেশের মাটিতে খেলাগুলো ভালো সারা পেলেও অন্য খেলাগুলো তেমন একটা পাচ্ছে না। এই যদি হয় বাজারের হালচাল তাহলে আমাদেরও উচিৎ আমাদের পণ্য সেইমতো বানানো। ২০১১ এর বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে আর তাই আইসিসির উচিৎ এটির দিকে বিশেষ নজর দেয়া।
এ দশকের শেষটা জ্বলে উঠেছিলো আইপিএল আর টুয়েন্টি-টুয়েন্টি'র ঝলকে। এ যেন ঠিক ক্রিকেট নয় বরং পরিণাম নিয়ে মাথা না ঘামানো পথভ্রষ্ট কোন তরুণ - কি করতে হবে জানে না, কেন করবে তাও জানে না। তবে যে কোন নতুন উদ্যোগই অপরিণামদর্শীতার বদনামটা আপনা-আপনিই পেয়ে যায়, আর তাই এটা নিয়ে আমি মোটেও চিন্তিত নই। কারন এই অপরিণামদর্শীর দলই বিশ্বকে চ্যালেন্ঞ্জ ছুঁড়ে দেয়, স্থিতিশীলতা নয়। টুয়েন্টি-টুয়েন্টি দর্শককে তা দিতে পেরেছে যা সে চেয়েছে আর খেলোয়ারদেরকে দিয়েছে ক্রিকেট থেকে উপার্জনের নতুন পথ। আমরা আরো অপেক্ষা করবো, দেখবো, টুয়েন্টি টুয়েন্টি কিসে রূপ নেয় - রক্ষক নাকি ভক্ষক।
আর তাই এই ১০টি বছর ভাগ্য নির্ধারণী কোন দশক হিসেবে নয়, বরং পরিচিতি পাবে 'পরিবর্তনের দশক' হিসেবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



