somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টিপাইমুখী বাঁধ বাংলাদেশের মরণ ফাঁদঃ দেশের মানুষ হুশিয়ার সাবধান

১৫ ই মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এলেখাটি ইমেইলে আমার একবন্ধু অষ্ট্রেলিয়া হতে পাঠিয়েছে, তথ্য ও বাস্তবতা এবং বিষয়ের গুরুত্ব মনে করে আমি হুবহু এটা তুলে দিলাম ব্লগের পাঠকদের উদ্দেশ্যে। আশা করছি আপনাদের অনেক প্রশ্নের জবাব মিলবে।

সম্প্রতি আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত বরাক নদীর উপর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১০০ কিমি উজানে টিপাইমুখে একটি ড্যাম এবং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ২০০ কিমি উজানে ফুলেরতালে ব্যারেজ নির্মাণের সকল প্রস্তুতি নিয়েছে। উজান দেশের এরকম কার্যক্রমে আমাদের নদীগুলোর নাব্যতা-সংকট নদী অববাহিকার মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রতি একদিকে যেমন হুমকি, তেমনি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্বকেও বিপন্ন করে তুলবে। গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা ব্যারেজ, তিস্তা নদীতে গজলডোবা ব্যারেজ ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের অপরিসীম তিসাধন করেছে।

বাংলাদেশে উজান থেকে আসা পানির মোট ৭-৮ শতাংশ আসে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের বরাক নদী থেকে। মৎস্য সম্পদ আহরণ ও চাষাবাদের জন্য বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এ নদীর পানি প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন, এ বাঁধ নির্মাণের ফলে সুরমা-কুশিয়ারা ও মেঘনা অববাহিকার ২৭৫ দশমিক ৫ বর্গ কিমি এলাকায় তাৎণিক ও দীর্ঘমেয়াদি কুফল দেখা দেবে। টিপাইমুখ ড্যাম পরিচালনার পূর্বে যখন রিজার্ভারটি পূর্ণ করা হবে তখন তা ভাটি অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও ইকো-সিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং মৎস্য প্রজননে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। শুষ্ক মৌসুমে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় প্লাবন ভূমির পরিমাণ শতকরা ৬০ ভাগ এবং ভরা মৌসুমে অন্তত ১২ ভাগ হ্রাস পাবে।

ঋঅচ-৬ এর গবেষণা মতে, বাংলাদেশের অমলসিধের কাছে বরাকের পানি প্রবাহ ভরা মৌসুমে অন্তত ২৫ শতাংশ হ্রাস পাবে, সেই অনুসারে ওয়াটার লেভেল ১ দশমিক ৬ মিটার নেমে যাবে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে (ফেব্র“য়ারি মাসে) বরাকের প্রবাহ অন্তত ৪ দশমিক ২ গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং পানি সমতল বাড়বে প্রায় ১ দশমিক ৭ মিটার। এই অবস্থা সুরমা ও কুশিয়ারার প্রবাহকেও একইভাবে প্রভাবিত করবে।

টিপাইমুখে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু হলে নিয়ন্ত্রিত প্রবাহের ফলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পানি ছাড়া হবে। এর ফলে মাটির অভ্যন্তর দিয়ে পানির প্রবাহ প্রক্রিয়াও (নধংব ভষড়ি ঢ়ধঃবৎহ) পরিবর্তিত হবে। সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকা নিচু জলাভূমি পূর্ণ, শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। সেই সঙ্গে পাহাড়ি ঢলের পানি সহজে নামতে না পারার কারণে নিচু বাঁধ উপচে বিস্তীর্ণ বোরো ফসল বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

টিপাইমুখ বাঁধের প্রভাবে কালনী-কুশিয়ারা নদীর পলিভরাট (ঝবফরসবহঃধঃরড়হ) প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। ফলে নাব্যতা রায় অতিরিক্ত ড্রেজিংয়ের মতো ব্যয়বহুল পদ্ধতির প্রয়োজন হবে। সুরমা-কুশিয়ারায় বন্যার পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে পলল সমভূমিগুলো পলিমাটি বঞ্চিত হবে এবং নদী অববাহিকার মধ্যবর্তী সমভূমিগুলো নদীর সঙ্গে সংযোগহীন হয়ে পড়বে। অন্তত চারটি প্রকল্প টিপাইমুখ বাঁধের প্রভাবে নিশ্চিতভাবে তিগ্রস্ত হবে। প্রকল্পগুলো হচ্ছেÑ আপার সুরমা-কুশিয়ারা রিভার প্রজেক্ট, সুরমা রাইট ব্যাঙ্ক প্রজেক্ট, সুরমা-কুশিয়ারা-বাউলিয়া বেসিন প্রজেক্ট এবং কুশিয়ারা-বিজনা ইন্টারবেসিন প্রজেক্ট।

শুধু ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশই নয়, বরং এই প্রকল্পের ফলে খোদ ভারতেরই ২৭ হাজার ২৪২ হেক্টর বনভূমি বিনষ্ট হবে। আসাম, মনিপুর, মিজোরামের ৩১১ বর্গ কিমি ভূমি প্লাবিত হবে যার অধিকাংশই আদিবাসী অধ্যুষিত। ১ হাজার ৪৬১ হামর পরিবার এবং জিলিয়ানোগ্রং নাগা উপজাতিদের এক-তৃতীয়াংশ তাদের আবাসস্থল ছাড়তে বাধ্য হবে। হামর আর নাগা উপজাতিদের ৬৭টি গ্রাম আংশিক বা সম্পূর্ণ তিগ্রস্ত হবে। বরাক প্রপাতের অনেক ধর্মীয় তীর্থস্থান তলিয়ে যাবে। আর এই সবকিছুই জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী অধিকার ও স্বার্থ সংরণ নীতিমালার পরিপন্থী।

ভারত সরকার টিপাইমুখে ড্যাম নির্মাণের চিন্তা-ভাবনা শুরু করে ১৯৫৫ সালে। নির্মাণকাজ শুরুর প্রস্তাবটি আসে ১৯৯৩ সালের দিকে। যদিও ২০০৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর টিপাইমুখ বাঁধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে তথাপি ভারতীয় বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার মতে টিপাইমুখ প্রকল্পটি প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোনো দেশ অভিন্ন নদীর উজানে কোনো কাঠামো নির্মাণ করতে হলে অবশ্যই এর ভাটিতে বসবাসকারী জনপদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবতে বাধ্য। উন্নত দেশগুলো যখন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কুফলের কথা বিবেচনা করে বাঁধের মতো অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের দুর্বুদ্ধি থেকে পিছিয়ে আসছে, সেখানে ভারতের এমন একটি বাঁধ নির্মাণের প্রস্তুতি আরো গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। আর টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি ভারত আদৌ পুনর্বিবেচনা করবে কি না তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বাঁধটির সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা কতটা বলিষ্ঠ ও তথ্যসমৃদ্ধভাবে আলোচনার টেবিলে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে পারছে এর ওপর।
২০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×