নোবেল শান্তি পুরস্কার : গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস (পর্ব-১)
Click This Link
নোবেল শান্তি পুরস্কার : গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস (পর্ব-২)
Click This Link
নোবেল শান্তি পুরস্কার : গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস (পর্ব-৩)
গত ২ ডিসেম্বর ’০৬ ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি), সাউথ এশিয়ান সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজ (সাসেপস) ও নিজেরা করি আয়োজিত এক সেমিনারে বলা হয়েছে, “সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর দারিদ্র্য বিমোচনের হার শুন্য দশমিক ৫২ শতাংশ। যদি এ হারেই দারিদ্র্য কমতে থাকে তাহলে দেশকে পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত করতে ৮১ বছর লাগবে। আর অর্ধেকে নামিয়ে আনতে লাগবে ৪০ বছর।” (দৈনিক প্রথম আলো, ৩ ডিসেম্বর ’০৬)
যারা খোঁজ-খবর রাখেন তারা জানেন যে সেই ষাটের দশক থেকেই এদেশে দারিদ্র্য-বিমোচনের নামে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নানা কর্মসূচি চালু হয়েছে। কাবিখা, কাবিটা, ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ইত্যাদি নানা নামে নানা কর্মসূচি সারাবছর ধরেই চলছে। ’৭২-’৭৩ সালের দিকে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল্য উদ্দেশ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল : “দারিদ্র্য ও বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং স্বনির্ভর উন্নয়ন।” ৮ বছর এই লক্ষ্যে কাজ করার ফলাফল যা হয় তা বোঝা যায় দ্বিতীয় পরিকল্পনার দলিলের বক্তব্য থেকে। এখানে বলা হয় : “দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করছেন।” এখানেও অন্যতম লক্ষ্য হিসাবে দারিদ্র্য বিমোচনকে ধরা হয়। তৃতীয় পরিকল্পনার দলিলে বলা হয় : “দেশে এযাবৎকালে পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যই ছিল দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ অংশের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নেই বরাবর চেষ্টা নেয়া হয়েছে।” কিন্তু এই একই দলিলে আবার এটাও বলা হয় যে : “ক্রমবর্ধমানহারে গ্রামীণ জনগণ ন্যূনতম পুষ্টিসীমার নীচে পতিত হচ্ছেন। অব্যাহত দারিদ্র্যের সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্ব, অপুষ্টি, নিরক্ষরতা জটিল আকার ধারণ করছে।” এই কারণে দারিদ্র্য বিমোচনকে এখানেও মূল লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চতুর্থ পরিকল্পনা দলিলেও সামান্য বাক্যবিন্যাসের রদবদল ছাড়া পুরনো কর্মসূচিকেই বহাল রাখা হয়। [তথ্যসূত্র - আনু মুহাম্মদ, বাংলাদেশের অর্থনীতি : বর্তমান নীতিকাঠামো ও বদ্ধমূল বিভ্রান্তিসমূহ; সংস্কৃতি, জুলাই ১৯৯৭]
এনজিওগুলো, বিশেষত ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের অধিকর্তাদের দারিদ্র্য-বিমোচন কাজে সফলতার দাবির সাথে সরকারের তরফ থেকে বছর বছর লক্ষ কোটি টাকা খরচ -- এই উভয় প্রচেষ্টার সার হল শুন্য দশমিক ৫২ হারে দারিদ্র্য-বিমোচন।
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘গ্রামীণ ব্যাংক : মহাজনী শোষণের অভিনব হাতিয়ার’ পুস্তিকায় মীর ইলিয়াস হোসেন গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লেখেন, “রামচন্দ্রপুর, ঝিনাইদহ থানার হলিধানী ইউনিয়নের অধীন একটি গ্রাম। গ্রামীণ ব্যাংকের হলিধানী শাখার আওতায় এই রামচন্দ্রপুরে ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম ফুলে ফেঁপে উঠেছে। গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সমিতিভুক্ত ৩৫ জন মহিলার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। আমরা জিজ্ঞাসা করেছিলাম সমিতিভুক্ত হবার পর আপনাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা কি ভাল হয়েছে? ৩৪ জন জবাব দিয়েছেন -- না বরং অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। একজন মহিলা বলেছিলেন, ভালো। কিন্তু তাঁর গ্রুপ চেয়ারম্যান জানালেন অভাবের কথা বলতে লজ্জা লাগায় সে মিথ্যা বলছে। কেননা, গত কিস্তির টাকা নিরূপায় হয়ে হাঁড়ি বিক্রি করে পরিশোধ করেছে। ঋণগ্রহীতা মহিলাদের পরিবারের প্রায় অধিকাংশের জনমজুরি-ই আয়ের একমাত্র উৎস। স্বল্প সংখ্যক ক্ষুদে ব্যবসায়ে জড়িত। এদের অনেকের কোনো জমি নেই, বা কয়েক শতক জমি আছে।"
“পরিবারের গড় জনসংখ্যা ৪.৫০ জন। পাঁচ জন সদস্য নিয়ে একটি গ্রুপ। ৮টি গ্রুপ নিয়ে একটি কেন্দ্র গঠন করা হয়। প্রত্যেক সদস্যকে গ্রুপভুক্ত করার সময় ৭.০০ টাকা এবং প্রতি সপ্তাহে প্রথম বৎসর এক টাকা করে সঞ্চয় গ্রুপফান্ডে জমা দিতে হয়। ২য় বৎসর হতে সাপ্তাহিক সঞ্চয় জমা নেওয়া হয় ৩.০০ টাকা করে। ঋণ প্রদানের সময় জামানত নেওয়া হয় না ঠিকই কিন্তু প্রত্যেক সদস্যদের জন্য প্রত্যেকে এবং সমষ্টিগতভাবে ঋণের জন্য দায়ী থাকেন। যদি কোনো সদস্য কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় তবে ঋণগ্রহীতার সম্পদাদি বিক্রি করে অথবা নিজেরা দিয়ে দায়মুক্ত হতে হয়। এখানে জানা গেল অধিকাংশ ঋণগ্রহীতাই ১০ থেকে ১৫ সপ্তাহ যেতে না যেতেই ঋণের সমুদয় টাকা খরচ করে ফেলে। তখন জনমজুরি করে বা হাঁড়ি-পাতিল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করে কিস্তি চালায়। কিস্তির দিন ঋণগ্রহীতাদের নিকট মহাদুর্যোগের দিন হিসাবে হাজির হয়। এই দিনে তারা আর পরিবারের কেউ থাকে না, হয়ে পড়ে ব্যাংকের সম্পত্তি।"
“খোদেজা ঋণ নিয়ে একটি গাভী কিনেছিল। কিস্তি দিতে না পারায় বাধ্য হয়ে গাভী বিক্রি করে কিস্তি পরিশোধ করেছিল। গত ৬ ডিসেম্বর ’৯৪ মুরগী বিক্রি করে কিস্তি পরিশোধ করেছে। কিস্তি দিতে না পারায় রমেছা বেগমের নতুন কাঁথা (যা তখনও সেলাই সম্পন্ন হয়নি) গ্রুপ চেয়ারম্যান বিক্রি করে কিস্তি আদায় করেছে। রপসী ঋণের টাকা দিয়ে টিন কিনে ঘর বানিয়েছিল। সেই চালের টিন বিক্রি করে কিস্তি চালিয়ে এসেছে। ১৩ ডিসেম্বর ’৯৪ সে কিস্তির টাকা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। ব্যাংকের লোক ও গ্রুপ সদস্য তার ঘরে তল্লাশি করে বিক্রি করার মত এক ভাড় ধান পায়। সেই ধান বিক্রি করে কিস্তির অর্থ আদায় করেছে। সুফিয়া খাতুন নলকূপ বসিয়েছে ঋণ নিয়ে। কিস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় নলকূপের হেড বন্ধক রেখে কিস্তির অর্থ আদায় করা হয়। ঘটনাটা ১৯৯৪-এর নভেম্বর মাসের। উল্লেখ্য, বিশুদ্ধ পানির জন্য সে নলকূপ বসিয়েছিল। সমিতির সদস্য লালভানু, কিস্তির দিন তার জামাই এসেছিল। জামাইকে অভুক্ত রেখে চাউল বিক্রি করে মিটিয়েছিল।"
“মৌসুমী ঋণ, ঘর ঋণ, গরু মোটা-তাজাকরণ ঋণ, নলকূপ ঋণ ইত্যাদি প্রকল্পের নামে গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ ইস্যু করে। বাস্তবে ৩৫ জনের অনেকেরই সিংহভাগ ঋণ সাংসারিক ব্যয়ভার মেটাতে খরচ হয়ে গেছে। পূর্বে উল্লেখ করেছি ১৪/১৫ সপ্তাহ না যেতেই মূলধন ফুরিয়ে যায়। তখন কোনো মহাজনের কাছ থেকে অথবা গ্রামীণ ব্যাংকের অন্য কোনো প্রকল্পের নামে ঋণ নিয়ে কিস্তি চলতে থাকে। অর্থাৎ ঋণ-কিস্তি, নূতন ঋণ, পুরাতন+নূতন কিস্তি পরিশোধ, আবার ঋণ -- এইভাবে চক্রাকারে ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। যেমন ফেরদৌস আরা, ১৯৯০-এ সমিতির সদস্য হয়। তখন অভাবের হাত থেকে বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় ঋণ নিয়েছিল ২০০০/= টাকা। বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে তার দায় ৯০০০/= টাকা। রহিমা বেগম ১৯৯০-এ ৩০০০/= টাকা ঋণ গ্রহণ করে, এখন তার কয়েকটি খাতে সর্বমোট ঋণ ৩৩,০০০/= টাকা। ৮০০০/= টাকা দিয়ে কিনেছিল গাভী, সেটি বাচ্চা দিতে গিয়ে মারা গেছে। আর কোনো টাকা হাতে নেই। কিন্তু ঠিকই সাপ্তাহিক সঞ্চয়সহ ৬৬৩/= টাকার কিস্তি তাকে চালিয়ে যেতে হচ্ছে। মনোয়ারা বেগম ব্রাক থেকে ঋণ নেয়, ব্রাকের ঋণের কিস্তি চালানোর জন্য সে গ্রামীণ ব্যাংকের শরণাপন্ন হয়। গ্রহণ করে ৫০০০/= টাকা ঋণ। ১৮টি কিস্তি পার হয়েছিল ডিসেম্বরে। প্রবল ইচ্ছা নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল, কিন্তু এ ঋণ আয় বাড়াতে পারেনি এক কণাও। বিপরীতে, ঋণের দুষ্টচক্রে আষ্টে পিষ্টে বেঁধে ফেলেছে তাদের। দিনমজুরি, হাঁস-মুরগী ও ডিম বিক্রি করে যারা কায়ক্লেশে দিনযাপন করত, তারা নূতন জীবনের হাতছানিতে বিপাকে পড়েছে। দিনমজুরির আয়ে এখন আর চাল, ডাল বা তেল কেনা নয়, ঋণের কিস্তি মেটাও। এ ঋণের বিপরীতে স্থায়ী কোনো সম্পদ বাড়েনি তিল বিন্দু কিন্তু ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে।”
এক জায়গার ঋণের দায় মেটাতে অন্য জায়গা থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি ড. ইউনূস। সাপ্তাহিক ২০০০ (২৯ জুলাই ’০৫)-এর সাথে সাক্ষাৎকারে ইউনূসের প্রতি প্রশ্ন ছিল, “এরকম কি দেখা যায় -- গরিব মহিলারা এক এনজিও থেকে টাকা নিয়ে আরেক এনজিও কে কিস্তির টাকা শোধ দেয়? দেখা গেল ব্রাকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে গ্রামীণের ঋণের কিস্তি দিচ্ছে। আবার আশা থেকে নিয়ে ব্রাকের কিস্তি দিচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এরকম দৃশ্য কি চোখে পড়েনি?”
এর উত্তরে তিনি বলেন, “এনজিওর সংখ্যা বেড়েছে। দেখা যায়, তারা আশা থেকে নিচ্ছে। ব্রাক থেকে নিচ্ছে, গ্রামীণ থেকে নিচ্ছে এবং শোধও করছে। যদি রোজগার করে এটা করে থাকে অসুবিধা কী? আর যদি রোজগার না করে এটা করে থাকে তবে একসময় আটকে যাবে। এরকমটা তো হচ্ছে না। আমাদেরটা শোধ করছে, অন্যদেরটাও করছে। একটা লোকের ২০ হাজার টাকা লাগবে। গ্রামীণের কাছ থেকে দেখা গেলো ৫ হাজারের বেশী পাবে না। সে আরো ৩/৪টি এনজিও থেকে নিয়ে তার ২০ হাজার পূর্ণ করে ব্যবসা করছে। আমাদের সব এনজিওদের আদায়ের ব্যবস্থা যদি ভালো হয়, তবে অসুবিধা কোথায়?” অর্থাৎ এক্ষেত্রে ঋণ এবং কিস্তির টাকা আদায় হওয়াটাই মূল কথা; ঋণগ্রহীতার অবস্থা যাই হোক!
সংবাদপত্রগুলোর পাতায় পাতায় তখন চলছিল ইউনূস ও ক্ষুদ্রঋণ-প্রশস্তি এবং দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর উচ্ছ্বাস, ঠিক ওই সময় এনজিওদের ঋণের কিস্তি আদায়ের বর্বর প্রক্রিয়া কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তারই একটি নজির প্রকাশিত হয় গত ২১ নভেম্বর ’০৬-এর দৈনিক ইত্তেফাকে। এই পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছোট একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে যাতে বলা হয়েছে, “এনজিওর ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য ফটিকছড়ি উপজেলার এক দম্পতি মাত্র ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে তাদের কোলের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে। এই মধ্যযুগীয় অমানবিক ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ... ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব ফরহাদাবাদ গ্রামের অধিবাসী শিশুটির পিতা-মাতার নাম যথাক্রমে চিকন মিয়া ও হুমায়রা। দরিদ্র এই দম্পতি দুই সন্তানকে নিয়ে অভাবের সংসারে সচ্ছলতা আনতে একটি এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ করে বলে জানা যায়। ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ এই দম্পতি তাদের নবজাতক শিশুটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের আগ্রহে শিশুটির দাম ওঠে ২০ হাজার টাকা।” এমনি করে কত মানুষের কত দুর্ভোগ-লাঞ্ছনা, বাড়ি-ঘর উচ্ছেদ এমনকি আত্মহত্যার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে তা উল্লেখ করতে গেলে সাতকাহন লিখতে হবে।
গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার ও লভ্যাংশ
গ্রামীণ ব্যাংকের সমালোচকদের মধ্যে প্রায় সকলেই এর সুদের উচ্চ হার নিয়ে সমালোচনা করে থাকেন। সুদের এই উচ্চ হার সম্পর্কে ড. ইউনূস কি মনে করেন?
“২০০০ : অর্থনীতিবিদদের একটা অংশ যারা সমালোচনা করেন, তারা কিন্তু খুব জোর দিয়েই বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার বেশি। তাদের এই সমালোচনার জবাব কী?
“ড. ইউনূস : আমি এ প্রশ্নের জবাব দিই এভাবে, মুখে অনেক কথা বলা যায়। আমাকে করে দেখাতে হবে। এটা তো একটা বাজার। আমি তো একচ্ছত্র অধিপতি না। এইসব ওয়াজ না করে, আপনি করে ফেলেন। আপনি যদি প্রফেসর হন তাতে কোনো সমস্যা নাই। আমিও প্রফেসর ছিলাম। কাজেই এ ব্যবসা করতে লজ্জা হওয়ার কথা নয়। ২০ শতাংশের জায়গায় ১০ শতাংশ সুদ নিয়ে যদি পারেন করে দেখান। আমি বাহবা দেবো। সালাম দেব। সমালোচনা নয়, কাজ করে দেখিয়ে তারপর বলতে হবে, সুদের হার কমিয়ে ভালো কিছু করছি। ...” [সাপ্তাহিক ২০০০, ২৯ জুলাই ’০৫]
অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ ইউনূস সাহেবকে সুদের কারবারি বা আধুনিক মহাজন বলে থাকেন। তিনিও সেটা জানেন। আর তাই সুদের হারের ওই প্রশ্নে ক্ষিপ্ত হয়ে আসল কথা বলে ফেলেছেন। তিনি আসলে ব্যবসায়ী; সুদের ব্যবসাই তিনি করছেন। তবে সেটা ‘দারিদ্র্য-বিমোচন’ বোরখার আড়ালে; তাই তিনি বলছেন যে এতে তিনি লজ্জা বোধ করেন না।
তাঁর ওই ব্যবসার কথা তিনি গ্রামীণফোনের কলচার্জের বিষয়েও একভাবে স্বীকার করেছেন (পরে আলোচিত হয়েছে)। তাঁর ব্যবসার আরও দু একটি সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করা যেতে পারে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোফিনান্স ইনফরমেশন এক্সচেঞ্জ (MIX)-এর রিপোর্টে বাংলাদেশের অপর একটি এনজিও, যারা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশাল অ্যাডভান্সমেন্ট বা আশা (ASA)-কে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে মনোনীত করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ ডিসেম্বর দৈনিক যায়যায়দিনের ‘বিজনেস এন্ড ক্যারিয়ার’এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে আশার প্রেসিডেন্ট সফিকুল হক চৌধুরী এনজিওগুলোর সুদের হার নিয়ে কথা বলেছেন। আমরা এখানে তার সাক্ষাৎকারের ওই অংশটুকু তুলে ধরলাম।
“যাযাদি : ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদের হার নিয়ে বিতর্ক আছে। আশার সুদের হার কেমন?
সফিকুল হক চৌধুরী : মাইক্রোক্রেডিটে অন্য জায়গার থেকে সুদের হারটা অনেক বেশি এটা সত্য। ... আমাদের খরচ কিছুটা কমে আসার কারণে জানুয়ারি থেকে সুদের হার কমাচ্ছি। ১৫% থেকে ১২% এ নিয়ে আসছি। দুটি কারণে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এক. এখন আমাদের কিছু সারপ্লাস থাকছে, দুই. সমালোচনা যেভাবে হচ্ছে ...। চারদিক দিয়েই আক্রমণ। মাইক্রোফিনান্স বললেই সমালোচনা। ... দুই বছর পর্যন্ত দেখবো। দুই বছর পর যদি দেখি আরো আক্রমণ আরো সমালোচনা তাহলে সুদের হার ১০% করে দেবো। তার মানে আমরা ১০-এও ম্যানেজ করতে পারি।” অর্থাৎ আশা-র পরিচালকের এই স্বীকারোক্তি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে ১০% সুদেও তাদের পক্ষে লাভ করা সম্ভব হয়।
সুদের হার সংক্রান্ত পরবর্তী প্রশ্নের জবাবে ইউনূস সাহেব কি বলেছিলেন? তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “২০০০ : আমি বলতে চাইছি, আপনারা এখন ঋণ দিচ্ছেন ২০% সুদে। সুদের হার যদি কমিয়ে ১০% বা ১২% করা যেতো, তাহলে কি দরিদ্র মানুষ আরো বেশি উপকৃত হতেন না?
ড. ইউনূস : হ্যাঁ, এটা করলে লাভ হতো। তাৎক্ষণিক লাভ হতো। তবে তা ভালো হতো না।” [সাপ্তাহিক ২০০০, ২৯ জুলাই ’০৫]
অধ্যাপক সাহেব একবার ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কমানোর বিপক্ষে বলতে গিয়ে যুক্তি হাজির করছেন যে এতে মানুষের তাৎক্ষণিক লাভ হলেও তা ভালো হত না। অথচ ইনি-ই অন্যত্র শিল্পায়নের বিরোধীতা করে ক্ষুদ্রঋণের পক্ষে যুক্তি হাজির করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, “আমি সেটাই করব যা মানুষের জীবনকে তাৎক্ষণিক এবং সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।”
তিনি কেন সুদের হার কমাচ্ছেন না? জবাবে অধ্যাপক সাহেব যা বলেছিলেন তার মর্মার্থ হল, এতে করে গ্রামীণ ব্যাংকের লাভ কমে যেত। আর গ্রামীণ ব্যাংকের লাভ কমে যাওয়া মানে গরিব মানুষেরই লাভ কমে যাওয়া, কারণ এই গরিব মানুষরাই তো গ্রামীণ ব্যাংকের আসল মালিক (তাঁর ভাষ্যমতে)! তো এই মালিকরা লাভের ভাগ কতটা পাচ্ছে? এই প্রশ্ন করা হয়েছিল সাপ্তাহিক ২০০০-এর পক্ষ থেকে অপর এক সাক্ষাৎকারে (১৪ এপ্রিল, ২০০৬)।
“২০০০ : গ্রামীণ ব্যাংক তো একটা লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এই যে ৫৮ লাখ মালিক, তারা কীভাবে লাভের ভাগ পায়?
“ড. ইউনূস : লাভ পাওয়ার কথা। কিন্তু সরকারের সঙ্গে আমাদের একটা সমঝোতা হয়েছে, সে কারণে আমরা মুনাফাটা বণ্টন করতে পারছি না। ... এই আইনের কারণে আমরা লভ্যাংশ বণ্টন করতে পারছি না। সরকার এই নিয়মটা করেছে ১৯৯৮ সালের দিকে।
“২০০০ : এর আগে কি লভ্যাংশ বণ্টন করা হতো?
“ড. ইউনূস : না, হতো না। তখন আমাদের লাভ হতো খুব কম, আর মালিক অনেক বেশি। যেমন তখন হয়তো আমাদের সদস্য ছিল ৫ লাখ আর মুনাফা হলো ৫ লাখ টাকা। তাহলে ভাগ করে দিলে ভাগে পড়তো ১ টাকা। এতে তো আনা-নেয়ার খরচ উঠতো না।
“২০০০ : এখন লাভের পরিমাণ কত?
“ড. ইউনূস : এখন বেশি। গত বছর আমাদের মোট লাভ হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। এই টাকা যদি ৬০ লাখ মানুষের মাঝে বণ্টন করা যায় তাহলে অ্যামাউন্টটা বেশ ভালো হবে।
“২০০০ : সেটা তো ঠিক। কিন্তু তারা তো টাকা পাচ্ছেই না।
“ড. ইউনূস : আইনের কারণে আমরা দিতে পারছি না।”
অপর এক প্রশ্নের জবাবেও তিনি আইনের দোহাই দিয়েছেন, কিন্তু সেটা ভিন্ন ভাবে।
“২০০০ : অভিযোগ করা হয় ফোন কোম্পানিগুলো বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিদেশে নিয়ে যায় ..."
“ড. ইউনূস : কত টাকা নেয় সেটা একটা বিষয়। আর মূল বিষয় হলো টাকা যে নিচ্ছে সে বৈধভাবে নিচ্ছে কি না। আইনের আওতায় নিচ্ছে কি না। সব কিছু যদি আইনের মধ্যে থেকে হয়ে থাকে তাহলে সমস্যা কোথায়? ...”
আইন সম্পর্কে অধ্যাপক সাহেবের অগাধ আস্থা। তিনি সমাজবিজ্ঞানের এই সরল সত্যটা জানেন না যে যা আইনসম্মত তা ন্যায়সঙ্গত নাও হতে পারে। কতদিনে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকৃত মালিকরা লভ্যাংশ পাওয়ার আইন তৈরি হবে? ততদিনে মালিকদের সবাই গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে থাকবেন কি? যারা চলে যাবেন তারা কি তাদের পাওনা বুঝে পাবেন? নতুন যারা সদস্য হয়েছেন তারা কিভাবে পুরনো মালিকদের লাভ ভোগ করবেন? আইনের এই সমস্ত জটিল মারপ্যাঁচে লাভের টাকাটা কোনো কালেই কি ইউনূস সাহেব কথিত প্রকৃত মালিকরা পাবে?
... ... ... ... ... ... ... ... চলবে ... ... ... ... ... ... ... ... ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



