somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নোবেল শান্তি পুরস্কার : গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস (পর্ব-২)

১৪ ই মার্চ, ২০১১ বিকাল ৪:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নোবেল শান্তি পুরস্কার : গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস (পর্ব-২)

১৫ নভেম্বর ’০৬ দৈনিক সমকাল পত্রিকায় ওমর তারেক চৌধুরী লেখেন, “সব পুরস্কারেরই রয়েছে নিজস্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও মতাদর্শ। কারা কোন পুরস্কার দিচ্ছে, কাকে দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে কেনই বা কেউ তা পাচ্ছে না (শান্তির জন্য মনোনীতি হয়েও স্ট্যালিন নোবেল পুরস্কার পাননি) বা পেলেও প্রত্যাখ্যান করছে (জাঁ পল সার্ত্রে ও অরুন্ধতী রায়) তা ভেবে দেখার মতো। তিনি ১৯৯৪ সালে ‘বিকল্প নোবেল’ হিসাবে খ্যাত ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ পেয়েছিলেন। এই পুরস্কারের ৭৪টি পৃষ্ঠপোষকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : বিতর্কিত মোনসান্তো, কার্গিলসহ আমেরিকার আরো কয়েকটি বৃহৎ সয়াবিন ও কৃষিজাত পণ্যের কোম্পানি; মার্কিন সরকারের এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সার্ভিস, কয়েকটি পুঁজি লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান ও কোকাকোলা কোম্পানি। ইউনূস এই পুরস্কার পাওয়ার পর ক্ষতিকর জেনেটিক কৃষি প্রযুক্তির বাজারজাতকারী হিসাবে সারা দুনিয়ায় ধিক্কৃত এবং উন্নত বিশ্বে কোনঠাসা প্রতিষ্ঠান মোনসান্তোর টার্মিনেটর এবং জিএম প্রযুক্তির কৃষি বীজ বাংলাদেশে বাজারজাতকরণের যৌথ উদ্যোগে কোম্পানি খোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গ্রামীণ মোনসান্তো সেন্টার খোলার জন্য দেড় লাখ ডলার থলেতে ভরেছিলেন (২৫.৬.৯৮)। ব্রোকারির এই কাজটি শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় ক্ষুদ্র ঋণ শীর্ষ সম্মেলনে। এই সম্মেলনেই বহুজাতিক কোম্পানি মোনসান্তো দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর জন্য বড়ই উতলা হয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের শরণাপন্ন হলে, তারই আগ্রহে দেশীয় কৃষি ধ্বংসের এই যৌথ উদ্যোগ শুরু হয়। দেড় লাখ ডলার দান গ্রহণের এক মাসের মাথায় বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের মুখে কোনোরকম দুঃখ প্রকাশ বা ভুল স্বীকার না করে তিনি এই ক্ষতিকর উদ্যোগ থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। ... বাংলাদেশের কৃষকদের কাছে মোনসান্তোর কৃষি-প্রযুক্তি বাজারজাতকরণের সঙ্গে যেমন ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ’-এর সম্পর্ক ছিল, তেমনি গরিবদের জন্য মোবাইল ফোন চালুর কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ব্রিটেনের ওয়ান ওয়ার্ল্ড ব্রডকাস্টিং ট্রাস্ট্র মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড (১৯৯৮) ও ওয়ার্ল্ড টেকনোলজি নেটওয়ার্ক অ্যাওয়ার্ড (২০০৩), স্পেনের টেলিসিনকো অ্যাওয়ার্ড (২০০৪) এবং কর্পোরেট ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রসারের জন্য আমেরিকার দ্য ইকোনমিস্ট ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড (২০০৪) ও লিডারশিপ ইন সোশ্যাল এন্ট্রোপ্রেনিয়রশিপ অ্যাওয়ার্ডসহ (২০০৪) আরো অনেক পুরস্কারের। গ্রামীণ ব্যাংক ২০০৪ সালে যে পিটার্সবার্গ প্রাইজ পেয়েছিল তার পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে জার্মান টেলিফোন কোম্পানি ডয়েশ টেলিকম এবং মার্কিন সফটওয়্যার কোম্পানি মাইক্রোসফট।"

“... গত ২৫ বছরের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ২৫ জন ব্যবসায়ী’র একজন হিসেবে ২০০৪ সালে মুহাম্মদ ইউনূসকে নির্বাচিত করে হোয়ারটিন স্কুল অব বিজনেস। তার অন্যতম সতীর্থ হচ্ছেন : বিল গেটস, জর্জ সোরেস, অপরাহ্ উইনফ্রে, জেফ বেজোস, রিচার্ড ব্রানসন, ওয়ারেন বাফার্ট, মাইকেল ডেল, অ্যালেন গ্রিনস্প্যান, লি লাকোকা, চার্লস সোয়াব, ফ্রেডরিখ স্মিথ এবং ওয়াল্টনের মতো ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাশালী ধনকুবেররা। গরিবের সেবক হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের যে ভাবমূর্তি তাতে এই ধনকুবেরদের সঙ্গে একই গোষ্ঠীতে তার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার রহস্যটি কী? অধ্যাপক ইউনূস বড় কর্পোরেশনগুলোর পুঁজি লগ্নির ও প্রযুক্তি বিক্রির নতুন পথ আবিষ্কারক, ব্রোকার এবং সেলসম্যান হিসেবে যে পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন এবং এক্ষেত্রে প্রচলিত চিন্তাভাবনার বাইরে বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র বাঁধা-খরিদ্দারদের কাছে পুঁজি ও প্রযুক্তি বাজারজাতকরণে তার গ্রামীণ ব্যাংক-পন্থার সম্ভাবনা কর্পোরেট মহল দেখতে পাচ্ছে। সে কারণেই তারা অত্যন্ত সঠিকভাবে তাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কাতারে ফেলতে কুণ্ঠিত হয়নি। কয়েকটি উদাহরণ কর্পোরেট জগতের সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের ঘনিষ্ঠ লেনদেনের বিষয়টি বুঝতে সহায়ক হবে। স্টকহোম চ্যালেঞ্জ নামে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উদ্যোক্তাদের যে গ্লোবাল নেটওয়ার্ক রয়েছে, তিনি তার পরামর্শকমণ্ডলীর সদস্য। এখানে ইউনূসের সহযোগীরা হচ্ছেন : সান মাইক্রোসিস্টেমস নামের নেতৃস্থানীয় কম্পিউটার কোম্পানির মুখ্য গবেষক ও সায়েন্স অফিসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট; রাশিয়া, পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার এক নেতৃস্থানীয় উদ্যোক্তা; ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক সদস্য এবং এরিকসন কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ও সি.ই.ও.। মুহাম্মদ ইউনূস ফ্রান্সের প্ল্যানেট ফাইনান্স নামের ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির জন্য পুঁজি সরবরাহকারী একটি লগ্নি প্রতিষ্ঠানের কো-প্রেসিডেন্ট ও অ্যাডভাইজারি বোর্ডের সদস্য। বহুজাতিক কোম্পানি সানোফি অ্যাভেনটিস এই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম অর্থ যোগানদাতা পৃষ্ঠপোষক। সানোফি অ্যাভেনটিসের সংশ্লিষ্টতা থেকে কী আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও পৃথিবীর গরিবদের জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছে! পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ সিমেন্ট ও নির্মাণ সামগ্রী প্রস্তুতকারক সুইস কোম্পানি হোলসিমের (৭০টি দেশে পরিচালিত ব্যবসা থেকে ২০০০ সালে তাদের আয় ছিল ৮.২ বিলিয়ন ডলার) অর্থে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ‘স্বাধীন’ হোলসিম ফাউন্ডেশনের অ্যাডভাইজারি বোর্ডের সদস্য হচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূস। এমন ‘স্বাধীন’ ফাউন্ডেশনগুলো কেন প্রতিষ্ঠিত হয়, কি করে, ইত্যাদি ধারণা পাওয়ার জন্য রকফেলার বা ফোর্ড ফাউন্ডেশনের নিন্দিত কার্যকলাপ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা সহায়ক হতে পারে।"

“বিভিন্ন ব্যবসায়িক কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও ক্ষুদ্রঋণকে সারা বিশ্বে পুঁজি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিক্রির বাহন হিসেবে ব্যবহার করার জন্য মুহাম্মদ ইউনূসের আছে নিজস্ব সাংগঠনিক ব্যবস্থা। গ্রামীণ ব্যাংক একটি ব্রান্ড নেম বা ফ্রানচাইজের মতো কাজ করে। পৃথিবীর শতাধিক দেশে গ্রামীণ ব্যাংক আদলে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্ব পর্যায়ে গ্রামীণ ব্যাংকের কৌশলগত সহযোগী গ্রামীণ ফাউন্ডেশন ইউএস-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বোর্ড মেম্বার। ৫২টি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ২২টি দেশে এই প্রতিষ্ঠানটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে কাজ করে। এই সংস্থাটি ইনফরমেশন টেকনোলজি ও গ্রামের মানুষের জন্য ফোন বিক্রি, পুঁজি বাজার এবং বাণিজ্যিক অর্থ ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষদের কাছে লগ্নির কাজ করে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ লগ্নি প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংকের সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডে রয়েছে কেইন প্রপার্টি কোম্পানি, গাইডস্টার, সিটি ব্যাংক, মাইক্রোসফট, সিটিগ্রুপ, ক্যালভার্ট ফান্ডস প্রভৃতি বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বা সাবেক কর্মকর্তারা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাওয়ার ব্রোকিংয়ের কাজ কীভাবে চলে কিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ঘনিষ্ঠতা থেকে তা আঁচ করা যেতে পারে। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে (কারণ নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন করার তার কোনো ক্ষমতা নেই, যা অমর্ত্য সেনের আছে) দ্বিতীয়বারের মতো যখন অধ্যাপক ইউনূসকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করেন, তখন গ্রামীণ ফাউন্ডেশন সিটিগ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে ৫০ মিলিয়ন ডলার (এবং সম্ভব হলে ৩০০ মিলিয়ন) ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য ক্লিনটন ইনিশিয়েটিভের অংশীদার হয়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংক মডেলে কার্যক্রম বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া, পুঁজি সংগ্রহ করা, ভাবমূর্তি গড়ে তোলা এবং জনসংযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে আমেরিকায় স্থাপিত এই প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সমবেত করতে অস্ট্রেলিয়াতেও একই নামের একটি পাওয়ার ব্রোকিং হাউস রয়েছে।"

“বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ (আমাদের ঋণখেলাপি শিল্পপতিদের স্মর্তব্য) তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীদের অর্থের নিরাপদ (গরিবরা ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়) বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেওয়ার কৃতিত্বের কারণেই মুহাম্মদ ইউনূসের স্থান হয়েছে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কাতারে। এই অসাধারণ সাফল্যের জন্যই আন্তর্জাতিক পুঁজির মালিকরা অত্যন্ত সুনিপুনভাবে তার দুনিয়াজোড়া ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে নানা পুরস্কার, ডিগ্রি, খেতাব আর রাজা-রানী-প্রেসিডেন্ট-ফার্স্টলেডিদের সঙ্গে সখ্যের কাহিনী ছড়িয়ে দিয়ে। সেই কাহিনীরই স্বীকৃতি ও প্রসার ঘটল মুহাম্মদ ইউনূসকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করার মাধ্যমে।”

ড. ইউনূসের দাবি ও বাস্তবতা

২০২৫ সালের মধ্যে শুধু বাংলাদেশে নয়, দুনিয়া জুড়েই দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর সংকল্পকামী ড. ইউনূস। এবং এটা তিনি করবেন ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে প্রসারিত করে। দুনিয়ার কথা বাদ থাক, আপাতত দেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের কাজ-কর্মের একটি খতিয়ান নেওয়া যাক।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৫ সালে ‘সাপ্তাহিক ২০০০’এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, “বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ এত সম্প্রসারিত যে, বলা যায় ৮০/৯০ ভাগ দরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্রঋণের আওতায় এসেছে। ... আগে একবেলা খেলে এখন দুবেলা খায়। আগে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতোনা। এখন পাঠায়। এটাই আমাদের সান্ত্বনা।” এই সান্ত্বনা যত মধুরই হোক, বাস্তব চিত্র এর থেকে যোজন যোজন দূরে। জাতীয় আয় এবং উন্নতি বৃদ্ধির নামে বাস্তবে ধনী-দরিদ্র্যের আয়বৈষম্য কি দ্রুততার সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে তার চিত্র তুলে ধরে ১৭ মে ’০৬ তারিখের দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় এই মর্মে একটা সমীক্ষা রিপোর্ট বেরিয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, “দেশে ৪৪% অর্থাৎ ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দরিদ্র। ... সমাজে উপরের ৫ ভাগ মানুষের আয় নীচের ৫ ভাগ মানুষের আয়ের চেয়ে ১৮ গুণ বেশি ছিল ১৯৯১-৯২ সালে, পরবর্তী ৫ বছরে ২৮ গুণ, তার পরবর্তী ৫ বছরে ৪৬ গুণ এবং ২০০৫ সালে হয়েছে ৮৪ গুণ।” পরিসংখ্যান ব্যুরো, অর্থনীতি সমিতি, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট এন্ড বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন এবং সেন্টার ফল পলিসি ডায়লগের তরফ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই একই প্রতিবেদন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে।
৯ অক্টোবর ’০৬ দৈনিক প্রথম আলো’তে প্রকাশিত বিআইডিএস ও ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের ক্রনিক পোভার্টি রিচার্স সেন্টার (CPRC) এর যৌথ প্রতিবেদনে জানা যায়, “... গ্রামের ১৯ শতাংশ পরিবারই তিন বেলা খেতে পায় না। বছরের কয়েকটি মাস ১০ শতাংশ পরিবারই দুই বেলার খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। ... দেশে ২৮ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্য অবস্থার মধ্যে বাস করে। অর্থাৎ দেশের আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ চরম দরিদ্র।” গ্রামীণ ব্যাংক, ব্রাক, আশা-সহ অসংখ্য এনজিও সংস্থার হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের পরও দারিদ্র্য-চিত্রের তেমন পরিবর্তন ঘটেনি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নিয়ে একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। ‘সোসিও-ইকোনমিক এন্ড ইনডেবটেড্নেস-রিলেটেড ইমপ্যাক্ট অব মাইক্রো-ক্রেডিট ইন বাংলাদেশ’ নামক ওই গ্রন্থে তিনি মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছিন বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কিভাবে ‘দারিদ্র্য চাষ’ করছে। তিনি প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাকে ব্রিটিশ আমলের ‘কাবুলিওয়ালা’ ব্যবসার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, এই ঋণ অধিকাংশ গরিব-দরিদ্র মানুষকে ক্রমাগত দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চড়া মুনাফা, ঘূর্ণায়মান তহবিলের নামে এক বছরের ব্যবধানে শতকরা আড়াই শ’ ভাগ মূলধন বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ এখন গরিবের রক্ত চুষে খাচ্ছে। নিজের গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে দৈনিক জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, “ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে মাত্র শতকরা সাতভাগ লোক বলেছেন, ঋণ গ্রহণের পর তাদের অবস্থা ভাল হয়েছে। আর ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের জীবনের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। এই ঋণ গ্রহণের পর কমপক্ষে ৬৪ ভাগ লোকের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। এদের মধ্যে ৪০ ভাগ লোকের অবস্থা খুব খারাপ হয়েছে। এখানে ঋণ গ্রহণের পরের সপ্তাহ থেকে কিস্তি দিতে হয়। ঋণ গ্রহীতাদের শতকরা ৯৬ ভাগ লোক প্রথম কিস্তি দেয়ার পর দ্বিতীয় কিস্তির জন্য দুশ্চিন্তায় পড়ে যান।” (দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩০ জানুয়ারি ২০০৯)
তিনি আরো বলেন, “অনেক প্রতিষ্ঠান বলছে তারা ঋণের বিপরীতে মাত্র ১০ ভাগ থেকে ১৫ ভাগ সুদ নেয়। আসলে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে এই সুদাসল নেয়ার কারণে সুদের হার গিয়ে দাঁড়ায় শতকরা ২৮ ভাগ থেকে ৪০ ভাগ পর্যন্ত। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ১২ টাকা সুদের হারে ঋণ নিয়ে শতকরা ২৮ থেকে ৪০ টাকা সুদের হারে বিনিয়োগ করে বেশ মুনাফা করছে। ... ঘূর্ণায়মান তহবিলের নামে তারা এক টাকা বিনিয়োগ করে বছরে সেই মূলধন সাড়ে তিন টাকায় দাঁড় করায়। পৃথিবীতে এমন কি ব্যবসা আছে যাতে মাত্র এক বছরে শতকরা আড়াই শ’ ভাগ মূলধন বৃদ্ধি করা যায়? অথচ বাংলাদেশে গরিব-নিঃস্ব মানুষ নিজেদের শ্রমে-ঘামে ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে পড়ে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসায়ীদের বছরে আড়াই শ’ ভাগ মূলধন বৃদ্ধি করে দিচ্ছে। ... আবার সমাজে নারী উন্নয়নের কথা বলে এই ক্ষুদ্রঋণ দেয়ার কথা বলা হলেও শতকরা মাত্র ১০ ভাগ মহিলা এই ঋণের অর্থ নিয়ন্ত্রণ করেন। বাকি ৯০ ভাগ অর্থ পুরুষরাই নিয়ন্ত্রণ করেন।” (পূর্বোক্ত)

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘অনীক’ পত্রিকার নভেম্বর ২০০৬ সংখ্যায় “নোবেল পুরস্কার, ‘মঙ্গা’ এবং ক্ষুদ্রঋণের দারিদ্র্য বিমোচন” প্রবন্ধে লিখেছেন, “... এনজিও মডেল নিয়ে সামগ্রিক গবেষণা ছাড়াও আমি গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১৫টি গ্রামে গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নিয়ে সমীক্ষা করেছি। সেখান থেকে যে সাধারণ চিত্র পেয়েছি, তাতে প্রতি ১০০ জনে ৫ জনকে পাওয়া গেছে যারা এই ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহার করে নিজেদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। যারা সক্ষম হয়েছেন তাদের সকলেরই অন্য কোনো না কোনো আয়ের উৎস আছে। শতকরা ৫০ জন একাধিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। আর শতকরা ৪৫ জন একদমই সামাল দিতে পারেননি, তাদের অবস্থা সংকটগ্রস্ত হয়েছে। তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রাম ছেড়েছেন, অনেকে ঋণখেলাপি হিসেবেই। ঢাকা শহরের ফুটপাত বা বস্তিতে তাদের অনেককে হয়তো পাওয়া যাবে।"
“মেয়েরা সাধারণত ঋণগ্রহীতা হিসাবে কথিত। কিন্তু আমার সমীক্ষাতে দেখেছি, এর ব্যবহারকারী শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষ। তারা নারীর নামে গৃহীত ঋণ দিয়ে ব্যবসা করছে, কিন্তু এই ঋণশোধের কোনো দায়দায়িত্ব তাদের নেই। এর ফলে সেইসব গ্রহীতা নারীর ওপর মানসিক-সামাজিক-পারিবারিক চাপ বেড়েছে। বড়ো আকারের নির্যাতনের ঘটনাও আছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো মেয়ের ক্ষুদ্রঋণপ্রাপ্তি একরকম যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে তাই গ্রামীণ ব্যাংক ‘আনঅফিসিয়ালি’ পুরুষদের সাথেই লেনদেন করছে, যদিও কাগজপত্রে কোনো না কোনো নারীর নাম আছে। কিস্তি পরিশোধের অনিশ্চয়তার কারণে গ্রামীণ ব্যাংক-সহ ক্ষুদ্রঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে ঝুঁকছে অধিকতর স্বচ্ছল পরিবারগুলোর দিকে, যারা দারিদ্র্যসীমার অনেক উপরে বাস করে। ঋণশোধের হার এরপরও উচ্চমাত্রায় রাখার জন্য রিশিডিউল (পুনর্বিন্যস্ত) করতে হচ্ছে বারবার, অর্থাৎ বারবার ঋণ দিয়ে আগের বকেয়া শোধ করতে হচ্ছে। রিশিডিউল বাদ দিলে ঋণ পরিশোধের হার ৪০ এর নীচে নেমে আসবে।"
“দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করলেও সব চাইতে দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে বা সব চাইতে দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এনজিও কার্যক্রম সব চাইতে কম দেখা যায়। উত্তরবঙ্গে মঙ্গাপীড়িত অঞ্চলে পরিচালিত এক গবেষণায় তাই দেখা যাচ্ছে, এখনও সেখানে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে শতকরা ৪০ জন মানুষ, যেখানে সুদের হার শতকরা ২০০ থেকে ৩০০। অগ্রিম ধান ও শ্রম বিক্রি সেখানকার অধিকাংশ মানুষকে দীর্ঘকালের জন্য বন্দী করে ফেলছে। এনজিও-রা কেন এখানে ক্ষুদ্রঋণ দিতে আগ্রহী নয়? অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে তার কারণ _ এখানকার মানুষ সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধে সক্ষম নয়।"
“তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এনজিও মডেল, বিশেষত ক্ষুদ্রঋণ-কেন্দ্রিক তৎপরতার বিস্তার অস্বাভাবিক দ্রুত হারে ঘটছে। এই ক্ষেত্রে মুনাফার হার উঁচু, মূলধন সংবর্ধনের হার অনেক বেশি। এর মধ্য দিয়ে ক্ষুদ্রঋণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কয়টি এখন বৃহদায়তন বাণিজ্যিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক-এরও অনেক বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রকল্প এখন। তারা বেশি বেশি করে বহুজাতিক পুঁজির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু ব্যবসা বা মূলধন সংবর্ধনের এই অভাবনীয় সাফল্য এই সত্যকে আড়াল করতে পারে না যে, এনজিও প্রতিষ্ঠানকালীন সময়ে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা যা ছিল, বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নীচে মানুষের সংখ্যা তার চাইতে বেশি।”

চলবে ....
প্রথম পর্ব : Click This Link
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×