somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃঅতুলের কান্না………

১৮ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১১:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজো বারান্দার গ্রিল ধরে দাড়িয়ে আছে অতুল।চাতক পাখির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রাস্তার ছুটে চলা রিক্সা গুলোর দিকে।এই বুঝি দেখা দেবে আড়াল ছেড়ে প্রিয় মুখটি।ডাক আসবে,ছুটে যাবে, নিচ তলার হোস্টেল সুপারের রুমে।দু’হাত প্রসারিত করে ঝাপিয়ে পড়বে মায়ের মমতাময়ী কোলে।


চার ভাই বোনের মধ্যে অতুল সবার ছোট।সবার আদরের হলেও বাস্তবতা একটা সময় অতুলকে তার পরিবার থেকে আলাদা করে দেয়।হাঁটি হাঁটি পা পা করে অতুল যখন ক্লাস থ্রীতে উঠল মা-বাবার ব্যস্ততার কারনে অতুলকে তারা ভর্তি করে দেন অনেক দুরের একটি প্রি-ক্যাডেট স্কুলে।
নামে প্রি-ক্যাডেট হলেও নিয়মগুলো ছিল ক্যাডেট কলেজের মতই।নিয়মের বাইরে গেলেই নেমে আসতো শাস্তির অভিশাপ।সঙ্গে ছিল সিনিয়রদরে অমানবিক অত্যাচার।যা ছোট্ট অতুলের মনে দাগ কেটে যেতো।

আজ অতুলের সাথে দেখা করার কথা জাহানারা রহমানের।জাহানারা রহমান পেশায় শিক্ষিকা।৯টা-৪টা স্কুল করতে করতে তিনি অতিষ্ট তার উপর রয়েছে স্কুল কমিটির মিটিং ও সংসারের খড়গ।স্কুল মিটিংয়ের কারনে ভুলেই গিয়েছিলেন যে আজ ৭ তারিখ।যখন মনে পড়ল তখন অনেক দেরি।যেহেতু স্কুল ছুটি নেই তাই ভাবলেন কাল অতুলের বাবা অফিসে যাবার সময স্কুলের টাকা আর চিঠিটা কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দিতে বলবেন স্কুলের ঠিকানায়।

দুপুর গড়িয়ে যায়।একে একে সবার ডাক আসে কিন্তু অতুলের ডাক আর আসে না।মা-বাবার হাত ধরে বেড়িয়ে যায় প্রিয় কোন বন্ধু।কেউবা রেডি হচ্ছে বাইরে যাবার জন্য।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয় কিন্তু মা-বাবা আর আসে না।
সন্ধ্যের আগে সবাই বাইরে থেকে ঘুড়ে আসে।গল্প বলে সারাদিনের।বন্ধুদের মুখে এসব শুনে কান্না আসে অতুলের চোখে।উঠে যায় অতুল বারান্দার পাশে।গ্রিল ধরে ভাবে মা-বাবা তোমরা কেন এলেনা?তবে কি আমাকে তোমরা আর আদর করো না?



ক্লাসে মনযোগ নেই অতুলের।ভাবছে কাল মা-বাবা আসেনি আজ আসবে।সময় গুলোকে বিদ্রুপ করছে আর নিজেকে জেলে বন্দী কয়েদীর মত ভাবছে।টিফিনের সময় হয়ে এলো।এমনি সময় দারোয়ান এলো অতুলকে ডাকতে।অতুলের আর খুশি ধরে না।মা-বাবা এসেছে,বাইরে যাবে,মায়ের হাতে খাইয়ে নিবে।কতদিন মায়ের হাতে খাওয়া হয়না।কোথায় কোথায় ঘোড়াঘুড়ি করবে আর কি কি কিনে নিবে এসব ভাবতে ভাবতে চলে এল প্রিন্সিপালের রুমের সামনে।হার্টবিট প্রচন্ড ভাবে উঠানামা করছে।নিজেকে কেন জানি মুক্ত বিহঙ্গের মত মনে হচ্ছে।
প্রিন্সিপালের সম্মতি নিয়ে রুমে ঢুকেই হাহাকার করে উঠল অতুলের বুকটা।তার পরিচিত মুখটি যে কোথাও নেই।



অতুল তোমার মা-বাবা ব্যস্ততার কারনে আসতে পারেননি।তাই টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন আমাদের।আর এই চিঠিটা তোমার জন্য।


চোখের কোনে জমে উঠা অভিমানের অশ্রুগুলোকে কোনভাবে ঠেকিয়ে চিঠিটা নিয়ে বেড়িয়ে এলো অতুল।অভিমানের দানা বাড়তেই লাগলো অতুলের।একসময় ক্লাস শেষ করে হোষ্টেলে ফিরে এলো অতুল।ছিঁড়ে ফেললো চিঠি।অভিমান থেকে হালকা হতে মায়াবী দুটো চোখ এলিয়ে দিল বালিশের আড়ালে।
কাদঁতে কাদঁতেই অতুল বলে মা বাবা আর কোনদিন তোমরা এসো না,আমি আর তোমাদের জন্য পথ চেয়ে পা ব্যাথা করবো না।আমার আর কোন কিছুর দরকার নেই।তুমি এসো না মা,তুমি এসো না।

এভাবেই ব্যস্ততার কারন বাব-মাকে অতুলের কাছ থেকে অনেক দুরে ঠেলে দেয়।কোন কোন মাসে মা-বাবা আসলেও আর অতুলের ভাবান্তর হয়না।অতুল নিজেকে আলাদা একটা জগতের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে।যেখানে তার কেই নেই,নেই কোন আদর-ভালবাসা।অতুল এখন আর মা-বাবার প্রতীক্ষায় থাকে না। ।আর কোন অভিমান নেই অতুলের।

এরপর থেকে যখন সে দেখতো অন্য বন্ধুদের মা-বাবা আসছে তখন অতুলের হিংসা হতে লাগলো।আর এই হিংসা থেকে অতুল ধীরে ধীরে বন্ধুদের থেকেও নিজের দুরত্ব তৈরি করলো।গুটিয়ে গেল অভয়ন্তরে।
আর এভাবেই দিন গুলো চলে যেতে থাকে অতুলের।

অতুলের সুপ্ত অভিমান গুলো অতুলকে নিজের মাঝে গুটিয়ে যেতে সহযোগিতা করে।অতুল ধীরে ধীরে হয়ে যায় রক্ত মাংসে গড়া একটা পাথর।আর অতুল নামের এই পাথরটিতে আবেগ গুলো দিন দিন নিজের অবস্থান হারিয়ে ফেলে।জায়গা করে নেয় ঘৃনা আর প্রতিহিংসার পাহাড়।

এভাবেই দিন,মাস বছর গুলো তাদের আপন গতিতে কেটে গেল।ক্রমেই শেষ হলো অতুলের স্কুল জীবন।কলেজ জীবনের প্রারম্ভে সে ফিরে এলো পরিবারের মাঝে।কিন্তু অতুল অনেক পরিবর্তিত।অতুল এখন অর্ন্তমুখী,স্বাথর্পর।অতুলের কাছে আজ নিজের স্বার্থটাই বড় হয়ে দাড়িয়েছে।সে বেছে নিয়েছে তার একমুখী একাকিত্ব ও স্বার্থময়ীতার জীবন।আজ তার হৃদয়ে কড়াঘাত করে না বাবার স্নেহ ও মায়ের স্নেহময়ী চুমুর পরশ।অতুলের কাছে এই পৃথিবীতে তার জগৎটা সম্পুর্নই তার ব্যক্তিগত।এখানে সে কারো অনুপ্রবেশ ভাল চোখে দেখে না।


অতুর এখন নিজের দুঃখ,কষ্ট,আনন্দ গুলো নিজের মনের খুব গভীরে চাপা দিয়ে রাখে কোন ভাবেই চোখের কোনে আসতে দেয় না।তার কাছে দুঃখ কষ্ট গুলো অন্যের সাথে শেয়ার করা মানে নিজের দুর্বলতার প্রকাশ করা।আজ অতুলের কাছে নিজের বেঁচে থাকার তাগিদটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।আর তাই সে স্বার্থপর তার সহপাঠী ও পরিবারের কাছে।

প্রিয় পাঠকঃএই সব অতুলরাই বড় হয়ে সম্মুখীন হয় বিভিন্ন সমস্যার।সামাজিক জীবনে এসে তারা কারো সাথে ভালভাবে মিশতে পারেনা।খাপ খাইয়ে চলতে পারে না বন্ধুদের সাথে।পরিবার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে,গুটিয়ে যায় নিজের মাঝে।এদের সঙ্গী কেবল একাকিত্ব।আর এসব কারনেই তারা হয়ে যায় হতাশাগ্রস্থ যা তাদের এই সামাজিক সমাজে অসামাজিক আর ন্যারো মাইন্ডেড করে তুলে।

শ্রদ্ধেয় বাবা-মায়ের প্রতিঃ আমার বিনীত আবেদন,অতুলের মত এতো ছোট্ট বাচ্চাদের আপনারা হোস্টেলে দিবেন না।না হলে হারাতে হবে আপনার সন্তানের সামাজিক সুস্থ জীবন।হাজার কমর্ব্যস্ততার মাঝে সময় দিন আপনার সন্তানকে।এই সময় দেয়াতেই আপনার সন্তান গড়ে উঠবে পরিপুর্ন মানুষ হিসেবে।





উৎসর্গঃএই লিখায় অনুপ্রেরনা দানকারী অনন্যা দিদি কে।



সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১:৫৮
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×