পর্ব ২ :
আজ আমার ডাক্তারি জীবনের প্রথমদিন। তাই আজ একটু বেশি সকালেই উঠে পড়েছি ঘুম থেকে। বাথরুমের লম্বা লাইন এড়াতে আজ একটু সকাল সকাল ই গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। রুমে আসার পথে দেখি সমস্ত ইন্টার্নীদের মাঝেই চাপা উত্তেজনা। সবাই আজ ভোর থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। ৫ বছরের প্রচন্ড পরিশ্রমের ফলাফল আজকের এই দিনটা । আজ বাস্তবেই আমি একজন ডাক্তার হিসেবে হাসপাতালে প্রবেশ করব। কত মানুষ কত দূর থেকে আসবেন চিকিতসা নিতে, নিশ্চয় ই তাদের চিকিতসা করার কিছু সুযোগ আমি ও পাব। কিন্তু পারব কি ? পারব ইনশাআল্লাহ। নিজেকে সাহস দিলাম। বাকিদের দিকে তাকালাম। মনে হল, সবাই ভিতরের উত্তেজনা কে আটকে রেখেছে। কেউ কেউ অবশ্য আটকাতে পারছে না।যাই হোক রুমে গিয়ে আমার সবচেয়ে নতুন শার্ট টা বের করলাম। আগের দিন ই ইস্ত্রি করে এনেছিলাম লন্ড্রি থেকে। প্রস্তুত হয়ে আরেকবার দেখে নিলাম আমাকে আমার বাবার দেয়া নতুন ব্যাগ খানা আর থার্মোমিটার, মেজারিং টেপ, টর্চ, আরো কিছু দরকারী জিনিস, আমার সাধের লিটম্যান স্টেথোস্কোপ আর ব্লাড প্রেসার মেশিন টাতে আরেকবার স্নেহের পরশ বুলিয়ে নিলাম। সব কিছু ঠিকঠাক করে নিচের ক্যান্টিনে আসলাম। পরোটার সাথে ডিম ভাজা খেতে খেতে ই দেখলাম বাকিরা ও এসে পড়েছে ক্যান্টিনে। চা খেয়ে কয়েকজন বন্ধুর সাথে রওয়ানা দিলাম হাসপাতালে। আমার প্রথম এ কাজ করতে হবে জেনারেল সার্জারী ওয়ার্ডে। অবশেষে যথাসময়ে পৌঁছলাম আমার নতুন কর্মস্থলে। জানতে পারলাম আমরা ৭ জন এই ওয়ার্ডে।
আমি, মিলা, আদিব, রিমি, নোবেল, শায়লা, রবিন ( সব ছদ্মনাম )। প্রথমেই আমাদের উপদেশ দেয়া হলো ওয়ার্ডের নিয়মকানুন, সময়ানুবর্তিতা, রাউন্ড, ফলোয়াপ, এডমিশন ইত্যাদি সম্বন্ধে। প্রথম দিনে ই আমাকে একজন সিনিয়র ভাইয়ার সাথে দায়িত্ব দেয়া হল ওয়ার্ডের ৪ টা বেড আর উপরে কেবিনের ৩ জন পেশেন্ট আর মহিলা ওয়ার্ডের ৪ জন পেশেন্ট। প্রথম দিনে আমাকে শেখানো হলো ডিসচার্জ পেপার লেখার নিয়মকানুন , রোগী ভর্তি বা ডিসচার্জের তথ্য রেকর্ড খাতায় তুলার নিয়ম, অপারেশনের পর রোগীর শরীরে যে ক্ষত থাকে সেখানে কি করে পরিষ্কার করে ড্রেসিং করতে হবে এসব। আরো শিখলাম কি করে স্টিচ কাটতে হয়, ড্রেইন টিউব সরাতে হয় ইত্যাদি। এরমাঝে প্রফেসরের পিছনে পিছনে দল ধরে হাঁটতে হাঁটতে শিখতে পারলাম কিভাবে স্যার রা ফলোয়াপ শুনতে চান , কখন কোন ঔষধ দিতে মানা করেন, কত দিনের পরেও ঔষধ চালিয়ে গেলে খেপে যান। রোগীদের সাথে স্যারদের আচরন দেখে মনে হল অমায়িক, কিন্তু যেসব ডাক্তারের আন্ডারে তারা ভর্তি তাদের ভুল হলে উনারা যে ধমক দেন বা তিরস্কার করেন তা এখনো মনে আছে।
যাই হোক সকাল ১১ টা ১৫ মিনিটের দিকে কিছুটা ১৫ মিনিটের ছুটি পেলাম খাওয়ার। অতঃপর আমরা নতুন ডাক্তাররা সবাই তাড়াতাড়ি করে পৌঁছে গেলাম ডক্টর’স ক্যান্টিনে। ওখানে গিয়েও মনে হল সবাই অল্প সময়ের জন্য আসছে। অবশ্য অনেকেই হয়ত একটা অপারেশন শেষ করে বা বড় একটা রাউন্ড শেষে আসছে। আমাদের নতুন ইন্টার্ণী বন্ধুদের ও দেখলাম বিভিন্ন টেবিলে। কেউ হয়ত মেডিসিন এ , কেউ সার্জারী তে, কেউ গাইনীতে। খুব দ্রুত গরম পুরী, সিঙ্গারা আর চা খেয়ে আবার চলে আসলাম ওয়ার্ডে। দায়িত্ব দেয়া হল কিছু ডিসচার্জ লেখার জন্য । ডিসচার্জ লিখতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, কিসের জন্য কি ঔষধ দিতে হবে জানলে ও দোকানে কি নামে বিক্রি হয় কিছুই জানি না ।যা জানি তা দিয়ে তো হবে না। অতঃপর ভাইয়া আপুদের সাহায্য নিলাম। এরপর উপদেশ কি লিখতে হবে সেটাও শুনে নিলাম এবং লিখলাম, নিচে সাইন করলাম এবং সিএ ভাইয়ার কাছে নিয়ে গেলে উনি চেক করে কিছু সংশোধন করে সাইন করে দিলেন এবং রেকর্ড রাখতে বললেন।
প্রথম দিনের একজন রোগীর কথা মনে আছে, ৪৫-৫০ বছর বয়সী একজন লোক ভর্তি ছিল আমার একটা বেড এ । উনার বুকের থেকে একটা টিউব বের করা ছিল যেটা রাখা ছিল পানি তে, আর পেট এর আশে পাশে কিছু কাটা সেলাই করা ছিল। প্রথম দিনে আমি উনাকে দেখে রীতিমত ভয় পেয়েছিলাম। এখানে যে আমার কিছু করার থাকতে পারে এটাই বিশ্বাস করি নাই, আর উনার ছিল শ্বাস কষ্ট। কিছুদিন পরেই অবশ্য উনার ড্রেসিং, ড্রেন্টিউব চেক করতে হত নিয়মিতভাবে আমাকে আর ফলোয়াপ তো ছিলই। কোন এক অজানা কারণে উনি আমার উপর বেশ ভরসা করতেন।
যাই হোক এভাবে আস্তে আস্তে দুপুর সোয়া দুইটা বাজতেই আমরা এবার বিদায় নেয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। কিন্তু একদম আড়াইটার আগে আমাদের যেতে দেয়া হল না এবং বলা হল আগামীদিন ই এডমিশন , সুতরাং আমরা যেন তাড়াতাড়ি চলে আসি, আর আমরা যেন দ্রুত শিখি, কেননা আমাদের একা ডিউটি দিতে হবে ২ সপ্তাহ বা ৩ সপ্তাহ পর থেকেই।
অতঃপর হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আমি আর মিলা গেলাম চানখারপুলের নীরব হোটেল এ আমাদের প্রথম দিন শেষে।
( চলবে )
আমার মেডিকেল ইন্টার্ণশীপের ১ টা বছর ( আনন্দ, সাফল্য, ব্যর্থতা, হতাশা, অভিজ্ঞতা এবং সাংবাদিকদের উপর চূড়ান্ত অবিশ্বাস)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২৮টি মন্তব্য ২৮টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।