২০০৮ সাল। আমার পড়াশুনা তখনও শেষ হয়নি। এম.এস.এস পরীক্ষার্থী। অথচ দু’বছর পূর্বেই পড়াশুনা সমাপ্ত হওয়ার কথা, সেশনজটের কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। সেশনজটের ভুক্তভোগী শুধু আমি, ব্যাপারটা মোটেও তা নয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে এ সমস্যা মেনে নিতে হয়, বহন করতে হয়। আর এই সেশনজটের অন্যতম কারণ অসুস্থ্যধারার ছাত্র রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি। আমিও ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম, তবে সত্যিকার অর্থে সুস্থ্যধারার ছাত্র আন্দোলনের সাথে। আমরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষারমাণ নিশ্চিতকরণের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্ঠা করতাম।
যা-ই হোক, ছাত্রত্ব শেষ হয়নি, ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত, ন্যূনতম চলার মতো টাকা-কড়ির সংস্থান তাও বন্ধ হয়ে গেল। সবকিছু মিলিয়ে হিসেব করে দেখলাম একটা চাকুরী দরকার। পত্রিকার বিজ্ঞাপন আর রাস্তার পুরানো দেওয়ালে শাটানো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ঠিকানায় একের পর এক জীবন বৃত্তান্ত জমা দিচ্ছি এবং দিচ্ছি। কিন্তু কোথাও চাকুরী হলো না। কারণ বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই বংছং টাইপের বা কারও কাজের সাথে মতের মিলন হলো না। আর দু’একটা প্রতিষ্ঠানের কাজের সাথে মতের মিল থাকলেও আমার ওই কাজের যোগ্যতা ছিল না। খুব কষ্টে দিন কাটছে। অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়।
যখন বাড়ি থেকে টাকা আসতো তখনও তিন বেলা খেতে পারতাম না। একবেলা খাবারের টাকা বাঁচিয়ে পল্টনের ফুটপাত থেকে পুরানো বই কিনে পড়তাম। পাঠ্যপুস্তক পঠনে কোনো দিনও তেমন মনোযোগী হতে পারিনি। পল্টনের ফুটপাতে যার যা প্রয়োজন, সে ধরনের বই সংগ্রহ করা যায়। এখানে রাশিয়ার বই থেকে শুরু করে এবাংলা ওবাংলার নানাবিষয়ের বই পাওয়া যায়। এজন্য দিনের পর দিন ওই বইয়ের দোকানগুলোর দিকে নজর রাখতে হয়। একটা সময় পুরানো বই কেনাও বন্ধ হয়ে যায়।
বই কেনা তো দুরের কথা, দুবেলা খাবারের স্থলে একবেলা খেয়ে কোনমতে দিন কাটাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একদিন এক বড় ভাইয়ের পরামর্শ অনুযায়ী দৈনিক সংবাদ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক মুনিরুজ্জামান ভাইয়ের কাছে গেলাম, চাকুরির জন্য। চাকুরি হলো না। মুনির ভাই বললেন, রফিক আগে পড়াশুনা ও ছাত্র রাজনীতি শেষ কর। তারপর দেখা যাবে। আর তুমি তো ফ্রিল্যান্স হিসেবে লেখালেখি করছ, সেটা বন্ধ কর না।
আমি কলেজ জীবন থেকে লেখালেখির সাথে যুক্ত ছিলাম। বেশ মনে আছে, ১৯৯৮ সাল, তখন আমি সরকারী স্বরূপকাঠী কলেজে আই.এ পড়ি। কলেজে যখন পড়াশুনা করতাম তখন ডিসেম্বর’ ১৪ সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলাম। এটি ছিল কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের প্রকাশনা। ১৯৯৩ সাল থেকে আমাদের ওখানে ছাত্র ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছিল না। তার আগে স্বরূপকাঠীতে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল কলেজের বড় সংগঠন। আমি ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হয়েছিলাম ১৯৯৫ সালে, শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনাকালে। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে সংগঠন না থাকলে আমরা কিভাবে যুক্ত হলাম? আমি স্কুলে পড়াশুনাকালে আমার দূরসম্পর্কে মামা সামসুল আলম মাষ্টার (ছাত্র জীবনে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন করতেন) আমাকে ছাত্র ইউনিয়ন নামটার সাথে পরিচয় করান এবং তিনিই এই সংগঠন সম্পর্কে আমাকে ধারণা দেন। ১৯৯৫ সালে, শিক্ষামন্ত্রী জমির উদ্দিন সরকারের সময় নৈব্যর্ত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি বাতিলের আন্দোলনে একদিন থানায় আটক ছিলাম। মূলত তখন থেকেই শুরু হয় এক নতুন জীবনের। তারপর কলেজ জীবনে বিপ্লবী কবির ভাই (সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা) আমাকে রাজনীতির অ.আ.ক.খ পড়ান। শুধু আমি নই আমাদের অসংখ্য কর্মীকে তিনি নার্সিং করতেন।
প্রতিদিন কলেজ শেষে আমরা কয়েকজন জাহিদ ভাই, মহসিন, আমি, সুমন পাইকসহ আরো দু-একজন লঞ্চ টার্মিনালের উত্তর দিকে বিসিক-এ গিয়ে বসতাম। আড্ডা দিতাম, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হতো, মাঝে মাঝে পাঠচক্রও হতো। বিকেল বেলা কবির ভাই আসতেন। তারপর সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের দেশে চলে যেতাম। আর ওখানে থাকতেন স্বপন ভাই ও তার এক বড় বোন। আমরা তার বাসায় প্রাই দিনই খেতাম। তারা ছিলেন নাছোর বান্ধা, না খাওয়ায়ে একদিনও ছাড়তেন না। স্বপন ভাই ছিলেন আরেক বিপ্লবী। বিসিক-এ মামুন ভাইদের একটি লম্বা ঘর ছিল। যেখানে স্বপন ভাইরা থাকতেন। মামুন ভাই হলো সরকারী স্বরূকাঠী কলেজের এক সময়ের তুখোড় ছাত্র ইউনিয়ন নেতা রেজাউল বারী ও তারার ছোটভাই এবং মাসুমের বড় ভাই। আর জাহিদ হলো তাদের চাচাতো ভাই। এই সকল ভাইয়ের রাজনীতির শিক্ষক হলেন কবির ভাই (বিপ্লবী কবির ভাই)। এছাড়াও আমরা স্বরূপ থিয়েটারের সাথে যুক্ত ছিলেম। ওই থিয়েটারের মূল ব্যক্তিটি হলেন আমাদের সকলের প্রিয় নাট্যকার শহিদ ভাই। স্বরূপ থিয়েটারের অফিস ছিল ইন্দুর হাট, সদর রোডে। প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যাবেলা থিয়েটার অফিসে গণসঙ্গীতের আসর বসতো। এখানে অতুল প্রসাদ, মুকুন্দদাস, ভূপেন হাজারী, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের গান হতো। আমরা সবাই মিলে সে গান গাইতাম। তবে আমার কাছে মুকুন্দ দাসের ‘ভয় কি মরণে/ থাকে যদি ডোবাখানা, জন্মিবে কচুরীপনা/ সকলকাজের মিলবে সময়, আগে দুটি ভাতে জোগাড় কর’ এই গানগুলো সবচেয়ে বেশী ভাল লাগতো। গান শেষে বাড়ি চলে যেতাম। পথে এই গানগুলোর অর্থ আরো ভাল করে বোঝার চেষ্ঠা করতাম।
আমার বাড়ি ছিল বিষ্ণুকাঠী। বিষ্ণুকাঠী হলো: চন্দ্রদ্বীপ। বরিশালের পূর্বনাম। এটি ছিল তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। অগ্নিযুগের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন-সংগ্রামে বরিশালের অবদান নানাদিক দিয়ে শ্রেষ্টতম। বরিশালের বানরীপাড়া ছিল সশস্ত্র বিপ্লববাদীদের তীর্থস্থান। বানরীপাড়ার পরে স্বরূপকাঠীর নাম উল্লেখযোগ্য। মূলত বরিশাল সদর ও বানরীপাড়ার পর স্বরূপকাঠীতেই বিপ্লবীদের তৃতীয় ঘাটি গড়ে ওঠে। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে স্বরূপকাঠীই সর্বোচ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে। যার নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী কমিউনিষ্টরা।
স্বরূপকাঠীর বুক চিড়ে বয়ে গেছে বিখ্যাত সন্ধ্যা নদী। নদীর দুই কূল ঘেঁষে রয়েছে অসংখ্য গ্রাম। বিষ্ণুকাঠী তার মধ্যে একটি। স্বরূপকাঠী থানা সদর থেকে ৩ কি.মি. দক্ষিণে সন্ধা নদীর পশ্চিমে এর অবস্থান। গ্রামের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে ছোট-বড় অনেকগুলে খাল। খালের দুই পপড় জুড়ে রয়েছে মাঠ, মাঝে মধ্যে দু-একখানা বাড়ি। আর বাড়ী ঘিরে রয়েছে নারিকেল, সুপারী ও আম গাছসহ নানাধরনের গাছের সারি। এই গ্রমের একেবারে পশ্চিম দিকে আমার বাড়ী, যেখানে আমি জন্মেছি।
ইন্দুরহাটের রতন দার স্বর্ণের দোকানেও আমাদের বসা হত। মাছ বাজারের সাথে একটি রুটির দোকান ছিল। ওখানেও আমরা আড্ডা দিতাম। সিনেমা হলের সামনে একটি চায়ের দোকানে মাঝে মাঝে সময় কাটাতাম।--নান্টুদার হোটেল ছিল আমাদের শেষ ঠিকানা। যখন টাকা থাকতো না তখন আমরা তার কছে যেতাম। অনেক সময় জাহিদ ভাই এই টাকা পরিশোধ করতেন। আর বাকিটাতো থাকতো কবির ভাই’র জন্য। কবির ভাই স্কুলে মাস্টারী করেন। করির ভাই স্ত্রীও শিক্ষকতা করেন। দুই ছেলে নিয়ে তাদের ৪ জনের সংসার। কবির ভাই’র বেতনের টাকা দিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন ও পার্টি চলে আর ভাবী চালান সংসার।
জাহিদ ভাই ছিলেন শান্ত ও নিরীহ স্বভাব প্রকৃতির। তিনি সবসময় কম কথা বলতেন। কথা ও কাজে মিল রেখে চলতেন। অহমিকা বা কোনো ধরনে চতুরতা তার মধ্যে ছিল না। সংগঠনে সাধ্যমত সময় দিতেন। এক কথায় সহযোদ্ধার পূর্ণ অর্থ বলতে যা বুঝায় তা তার বৈশিষ্টের মধ্যে ছিল। ১৯৯৭-২০০০ সাল পর্যন্ত তার সাথে আমরা একত্র সংগঠন করেছি। জাহিদ ভাই-ই ৯৩’র পরে ১৯৯৮ সালে প্রথম স্বরূপকাঠী থানা সংসদের সভাপতি হন। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মহসিন আর আমি ছিলাম সাংস্কৃতিক সম্পাদক।
২০০০ সালের শেষে আমি ঢাকা চলে আসি। এখানে এসেও ছাত্র ইউনিয়নের যুক্ত থাকি। ২০০১ সালে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হই। পড়াশুনা আর ছাত্র রাজনীতি চলতে থাকলো। এসময় আমি সাপ্তাহিক একতায় লেখালেখি শুরু করি। ২০০৩ সালের খুব সম্ভবত জুন মাসে সেলিনা নামের একটি মেয়ে সাথে আমার বিয়ে হয়। আমার পড়াশুনা শেষ না হওয়ার কারণে আমরা ঘর-সংসার শুরু করতে পারিনি। তাছাড়া এই বিয়েতে আমার পরিবারের কেউ রাজি ছিল না। আমি তখন আমার বোনের বাসায় থেকে পড়াশুনা করছি। পড়াশুনা, ছাত্র রাজনীতি আর মাঝে মাঝে সেলিনাকে গিয়ে দেখা আসা এভাবে চললো ২০০৬ পর্যন্ত। ততদিনে আমি মোটামুটি লেখক হিসেবে নিজেকে দাড় করেছি। তখন আমি দৈনিক সংবাদে প্রতি মাসে সাহিত্য, রাজনীতি ও শিক্ষা বিষয়ে ৩/৪ পোস্ট লিখছি।
২০০৬ সাল ছিল রাজনৈতিক অরাজকতায় পরিপূর্ণ। ওই বছর প্রায়ই হরতাল-ধর্মঘট-অবরোধ লেগে থাকতো। একবার আওমীলীগ অনির্দিস্টকালের জন্য হরতাল-ধর্মঘট ডেকে ছিল। রাজনৈতিক পাড়া হিসেবে খ্যাত পল্টন-মুক্তাঙ্গনের রাস্তায় তখন জনসমূদ্র। কোথাও বত্তৃতাবাজী হচ্ছে, কোথাও সরকার পদত্যাগের মিছিল আবার কোথাও গণসঙ্গীত চলছে। ওই সময় মুকুন্দদাসের কয়েকটি গান প্রায় দিনই শুনতাম। ঢাকা এসে বহুবার উদীচীর অনুষ্ঠানে তাঁর শুনেছি। সবকিছু মিলিয়ে মুকুন্দদাসকে জানা আগ্রহ বেড়ে যায়। শুরু করি তাঁকে অধ্যায়ন। অধ্যায়ন শেষে হিসেব করে দেখলাম তাঁকে জানা খুব প্রয়োজন, বিশেষ করে আমরা যারা নতুন সমাজ নির্মানের জন্য কাজ করছি, তাদের তো অবশ্য। দুই বছর পর মুকুন্দদাসের রচনাসমগ্র বইটি বের করে নতুন সমাজ নির্মানের তরুণ, যুব, প্রবীণদের হাতে দিলাম। পরের বছর বিপ্লবী নলিনীদাস রচনাসমগ্র ও সরদার ফজলুল করিমের অগ্রন্থিত প্রবন্ধ সংকলন করলাম। এই বইগুলো সংবাদের মুনির ভাইকেও দিয়েছিলাম।
২০০৮ চলে গেল, ২০০৯ আসল। কোথাও আমার চাকুরী হল না। মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষার শুরু হতে ৩/৪ মাস বাকী। হঠাৎ একদিন পল্টনে হামিম ভাইয়ের সাথে আলাপকালে আমার কাজের কথা বললাম। তিনি বললেন পরীক্ষা শেষ করার পর তার ঢাকানিউজ২৪ডটকমে কাজ করার কথা। আমি রাজি হলাম। পরীক্ষা দিয়ে ঢাকানিউজ২৪ডটকমে কাজ শুরু করলাম। যুক্ত হলাম ডিজিটাল দুনিয়ায়। ঈশ্বর গুগোলের আর্শিবাদে প্রতিনিয়ত নানাকিছু জানতে থাকলাম, শিখতে থাকলাম। এবার সেলিনাকে নিয়ে ঘর-সংসার করার পালা। একটি বাসা বাড়া নিলাম। আমাদের ঘর-সংসার শুরু পূর্বেই একটি সন্তান হয়। ওর নাম সব্যসাচী। ওর নামের আগে ও পরে কিছু না থাকাতে পারিবারিকভাবে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। অন্যদিকে ওই বছর ২৮ অক্টোবর ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নিলাম। রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বে একটি মাসিক পত্রিকা বের করা উদ্যোগ নেই। পত্রিকাটির নাম দেয় ‘বিপ্লবীদের কথা’। মুকুন্দদাস, নলিনীদাস রচনাসমগ্র করা ও কিংবদন্তী বিপ্লবীদের জীবনী পড়া এবং বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা ইত্যাদি কারণে এই উদ্যোগ নেয়া হয়। আরেকটা বিশেষ কারণ এর সাথে জড়িত। আর তা হলো: কলেজ জীবন থেকেই বিপ্লবী হওয়ার এবং বিপ্লব করার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু সেই স্বপ্নটা ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বেই ভেঙ্গে যায়। তখন আমার সামনে যে সমস্থ বিপ্লবী মড়েল ছিল, তারা অতীতের বিপ্লবী মানুষগুলো থেকে এতটাই বিপরীত যে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। তখন প্রচণ্ড হতাশ হলাম। নিজের এই হতাশা কাটাতে এবং আমার মত হতাশাগ্রস্থ তরুণদের হতাশা দুর করতে এবং নতুনদের হতাশায় না ফেলতে এই ‘বিপ্লবীদের কথা’ পত্রিকার মাধ্যমে বিপ্লবের নায়কদের তরুণ প্রজন্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ২০০৯ সাল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে মাসিক ট্যাবলওয়েড "বিপ্লবীদের কথা"।
প্রথম থেকেই এই পত্রিকার মূল লক্ষ্য ছিল বাঙলা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে সমকালীন বিপ্লবীদের জীবনী এবং তাদের আদর্শের সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং সেই সাথে এই অঞ্চলের বিপ্লবী রাজনীতির একটা টাইমলাইন তৈরি করা। একটি "সমাজ বিপ্লব ও বিপ্লবী গবেষণা কেন্দ্র" হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে গিয়ে প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিপ্লবীদের একটি এনসাইক্লোপিডিয়া তৈরি করার। আমি (শেখ রফিক) ও পারভেজ আলম সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তৈরী করি http://www.biplobiderkotha.com ওয়েবসাইটটি (২০১০ সালের শুরুতে)। সমাজ বিপ্লবীদের জীবনী, কর্মযজ্ঞ, আদর্শ আর সাড়াজাগানো সব লড়াই-সংগ্রামের অনলাইন অর্কাইভ গড়ে তুলতে নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে বিপ্লবীদেরকথাডটকম।
পেশাগত সাংবাদিকতা কিছু দিন ভাল লাগলেও পরে আর তা ভাল লাগেনি, প্রায় এক বছর পর্যন্ত। তার মূল কারণ ছিল প্রায় সময়ই সংবাদকে ছাড়-কাট করে অসল সংবাদ আড়াল করা হত। তাতে যা সত্য তা অনেক সময় হারিয়ে যায়। এটাও এক ধরণের নীতিহীনতা মনে করে নিজের পত্রিকায় পুরোদমে কাজ শুরু করি। ছেড়ে দেই অনলাইন নিউজ এবং সাংবাদিকতা।
২০১০ সালের মার্চ মাসের শুরুতে বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা বের হওয়ার পর বরাবরের মত সাবেক বর্তমান ছাত্র নেতৃবৃন্দসহ কর্মীদের হাতে তুলে দেয়। একদিন শাহাবাগের মোড়ে দেখা হয়ে যায় রাজশাহীর সাবেক ছাত্রনেতা প্রমথেশ দা’র সাথে। অনেকক্ষণ কথা হয়। তাকে বলি বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা ও ওয়েব সাইটের জন্য ডোনার জোগাড় করে দিতে। এর আগেও আমি কমপক্ষ শতজনকে বলেছি এই পত্রিকাটিকে চালিয়ে রাখার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করতে। তারমধ্যে দু-একজন সহযোগিতা করছে। তাদের একজন খোদাদাদ ভাই। তবে পত্রিকাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সামান্য সহযোগিতা _পুরানা পল্টনের লাল ভবনের অনেক প্রিয় সহযোদ্ধার কাছ থেকে পাইনি। যে কারণে আমাকে প্রতিটি সংখ্যায় সাবসিডি দিতে হয়েছে।
পত্রিকাটি ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুদের মাধ্যমে প্রায় সারাদেশে যায়। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা থেকে প্রায় অস্টম সংখ্যা পর্যন্ত দাম ছিল ২ টাকা। যে কারণে সাবসিডি ছাড়া বের করা সম্ভব হত না। ২০১১ সালের শুরুতে সাবসিডি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এই পত্রিকার দাম করা হয় ৫ টাকা কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না।
প্রমথেশ দা সবকিছু শুনে সে আমাকে একজন ডোনারের কাছে পাঠানোর কথা দৃঢ়ভাবে বলল এবং তার সাথে অবশ্যই দেখা করতে বলল। আর বললেন যে তিনি আমার এই পত্রিকাকে সহযোগীতা করবেনই। আমি বললাম কে? প্রমথেশ দা বললেন আপনি তাকে চিনেন। নাম কি? দাদা বলল: অনন্য রায়হান, ড. অনন্য রায়হান, অর্থনীতিবিদ। জসিমউদ্দিন মন্ডলের নাতী। হ্যা, আমি চিনি। পার্টি অফিসে দু-একদিন কোনো সেমিনারে কথা বলতে দেখেছি।
তারপর ২০১০ সালের ৫ মার্চ রায়হান ভাইয়ের সাথে দেখা করি। তিনি আমার কাজগুলোতে খুশি হলেন এবং আমাকে এই কাজগুলো করে যাওয়ার জন্য আরো অনুপ্র্রেরণা দিলেন। নানা বিষয় নিয়ে ঘন্টা দুয়েক আলোচনা হলো। তার মধ্য তিনি যে প্রতিষ্ঠানটিকে তীলে তীলে গড়ে তুলেছেন, সেটি সম্পর্কে আমাকে জানালেন। প্রতিষ্ঠানটির নাম ডি.নেট। ডি.নেট তথ্যপ্রযুক্তি ও জ্ঞানের মাধ্যমে অধিক সম্পদ উপাদন এবং ওই সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যে দারিদ্রতা কমিয়ে আনতে কাজ করে। ডি.নেটের আইকন কর্মসূচী “গুণীজন” সম্পর্কে তিনি আমাকে বিস্তারিত বললেন। তিনি আমার এই সমস্ত কাজে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহযোগিতা করার কথাও বললেন। কথা অনুযায়ী তিনি তার সাধ্যমত বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা ও ওয়েবের জন্য প্রতিমাসে সহযোগিতা করেন।
“গুণীজন” যাঁরা তাঁদের সৃজনশীল চিন্তা, মনন ও মেধা দিয়ে শান্তি, মানবতা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন এবং এখনও যাচ্ছেন, যাঁরা তাঁদের লেখনী, শব্দমালা, বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ও শিল্পকর্ম এবং অন্যান্য সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন, আমাদের প্রিয় জন্মভূমির এসব গুণী ব্যক্তিবৃন্দকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলার একটি প্রয়াস এই গুণীজন উদ্যোগ। ‘গুণীজন ওয়েব জার্নাল http://www.gunijan.org.bd’ এই ওয়েব জার্নালে রয়েছে আমাদের দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের (ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজ বিজ্ঞান, গণমাধ্যম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মানবাধিকার, নারী অধিকার আন্দোলন, সঙ্গীত, চিত্রকলা, দর্শন, ক্রীড়া, আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ইত্যাদি) গুণীজনদের বেড়ে ওঠার গল্প, তাঁদের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র, তাঁদের অডিও সাক্ষাৎকার, নির্বাচিত লেখা/সৃজনশীল কর্ম, পুরস্কার বা স্বীকৃতি, গুণীজনবৃন্দের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র ইত্যাদি। ১০২৩ জন গুণীজনকে নিয়ে গুণীজন কাজ করে যাচ্ছে। রায়হান ভাই এই উদ্যোগের সাথে আমাকে কাজ করার জন্য বললেন।
আমি হিসেব নিকেস করে ‘গুণীজন’-এ কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলাম। ৮ মার্চ ‘গুনীজন’ টিম এর সাথে কথা হল। এই কমৃসূচীর সমন্বয়ক হলেন উর্মি লোহানী, রায়হান ভাই’র স্ত্রী, ভাবী। তার সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা হল। এসময় তার সাথে ছিলেন, মৌরী তানিয়া, তিনি গুণীজনে ৩ বছরেরেও বেশী সময় ধরে কাজ করছেন। আমি ১৬ মার্চ গুনীজনে অফিসিয়্যালি যুক্ত হলাম। সেই থেকে ৩০আগস্ট ২০১১ পর্যন্ত আমি গুণীজনে কাজ করছি। যে কারণে একই সাথে আমার স্বপ্নগুলো প্রতিনিয়ত একটু একটু বাস্তবায়ন করতে পারছি। অন্য কোথাও চাকুরী করলে বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা ও ওয়েবের জন্য কাজ করার সময় পেতাম না। আরো অসংখ্য হতাশাগ্রস্থ রফিকদের কাছে এই পত্রিকা নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। এমনকি হয়তো সম্ভব হতো না, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বসবাস করে তার সাথে থাকা। এখন আমি তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আমার আশা, স্বপ্ন ও স্বপ্নের সমাজ, শোষণমুক্ত সাম্যের সমাজ নির্মাণের কাজ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে পারছি। এই কাজগুলো করার ক্ষেত্র অর্ধেকেরও বেশীর কৃতৃত্ব রায়হান ভাই ও তার ডি.নেটের এবং বাকীটুকু আমার চেষ্ঠা।
২০১১ সালের আগস্ট মাস। এক সহযোদ্ধার সহযোগীতার আশ্বাসে বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা নতুনভাবে পথ চলতে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তারপর ওই সহযোদ্ধা বন্ধুটি আমার পত্রিকা বের করার ইতিহাস জেনে বিপ্লবীদের কথা পত্রিকা ও বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনার দায়িত্ব নিলেন। তার শরীফ-উল-আনোয়ার সজ্জন।
এবার ডি.নেট থেকে বিদায় নেওয়ার পালা। এই চাকুরিটা এখন আমার অনেকগুলো কাজের বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে। অবস্থা এমন যে, কাজগুলো বাদ দিতে হবে অথবা চাকুরীটা বাদ দিতে হবে। অবশেষে কি আর করা চাকুরীটাই বাদ দিলাম।------------আবার বেকার!
নতুন আগামীর প্রত্যাশায় স্বপ্ন বুনে যাই: শেখ রফিক
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।