somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প - ফ্যামিলি

২৬ শে অক্টোবর, ২০১৩ রাত ১০:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কামরুল সাহেব জুতোর ফিতে বাঁধা ভুলে গেছেন । প্রথমে এক গিঁট দিয়ে ডান পাশের ফিতা ফুল করে বাম পাশের ফিতা পেঁচিয়ে ঐ ফুলের ভিতরে ডুকিয়ে আলতো করে এক টান । ব্যাস ! হয়ে যায় ফিতে বাঁধা । কামরুল সাহেব ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সেই কাজটাই করে যাচ্ছেন । কিন্তু হচ্ছে না । হচ্ছে না তো হচ্ছেই না । এই অবস্থায় লুতফাকে কি ডাক দেয়া যায় ?

--ঐ লুতফা , আমি না মানে জুতোর ফিতে বাঁধা ভুলে গেছি , তুমি একটু বেঁধে দিবে ?

কথাটা বলতে কেমন অস্বস্তি হচ্ছে । যে লোক প্রতিদিন টাই স্যুট জুতো মুজো পড়ে গত ২২ বছর যাবৎ সরকারী চাকুরীতে অভ্যস্ত সে কিনা আজ সামান্য জুতোর ফিতে বাঁধতে পারছেন না ! হাস্যকর ব্যাপার । তবে এই হাস্যকর ব্যাপারটাই আপাতত সত্য । কামরুল সাহেব জুতোর ফিতে বাঁধা বেমালুম ভুলে বসে আছেন ।


শুধু জুতোর ফিতে না ইদানীং তিনি অনেক কিছুই ভুলে যাচ্ছেন । এই তো সেদিন তার বড় মেয়ের নাম ভুলে গেলেন । সুমি নাকি অন্তি , কোনটা ? কামরুল সাহেবের দুই মেয়ে । একজনের নাম সুমি অন্য জনের নাম অন্তি । সমস্যা হয়েছিল সুমি বড় নাকি অন্তি বড় সেটা নিয়ে । বেশ কিছুক্ষন চেষ্টার পর হতাশ হয়ে তিনি লুতফা বেগমকে বললেন --
তোমার বড় মেয়েকে ঢেকে নিয়ে আসো তো । জরুরী কথা আছে ।
লুতফা বেগম লাউ শাক বাছছিলেন । তিনি লাউ শাক হাতে বিরক্ত মুখে স্বামীকে দেখলেন । মেয়ে পাশের রুমে তারপরও তাকে দিয়ে মেয়েকে ডাকানোর অর্থ লুতফা বেগম বুঝতে পারেন নি । বিরক্তি নিয়েই বড় মেয়েকে ডাক দিয়েছিলেন --

– ‘ এই সুমি , এইদিকে আয় তো , তোর বাবা তোকে কি জানি বলবে ।
‘ কামরুল সাহেব মহাসাগরে ভেলা খুঁজে পেলেন । বড় মেয়ের নাম সুমি । এই নাম কামরুল সাহেবের মা তৈয়বা আক্তার রেখেছিলেন । একজন বাবা তার বড় মেয়ের ভুলে গেছেন ! কতো বড় লজ্জার বিষয় ! কামরুল সাহেবের খুব লজ্জা করছিল । মেয়ে বাবার কাছে আসলো ।

-- বাবা , ডাকেছিলেন ?

বড় মেয়েকে কামরুল সাহেব ডাকছিলেন , সত্য । কিন্তু কেন ডাকছিলেন সেটা আর মনে নেই ।

তিনি জড়তা নিয়ে বললেন - হ্যাঁ মা ডেকেছিলাম । তা তুই আছিস কেমন ?
সুমি কপাল কুঁচকে বাবার দিকে তাকালো । চোখগুলো সুরু হয়ে গেছে । ঠিক কামরুল সাহেবের মতো । মেয়েটার গায়ের রং কালো । তার মতোই । লুতফার রং পেয়েছে ছোট মেয়ে । দুধে আলতা । আচ্ছা ছোট মেয়েতা জানি কোন ক্লাসে পড়ছে ? সিক্স নাকি সেভেনে ? মনে পড়ছে না । তিনি ছোট মেয়ে কোন ক্লাসে পড়ে সেটা ভুলে আবার লজ্জা পেতে শুরু করলেন ।



কামরুল সাহেব জুতো হাতে বসে আছেন । অফিসের সময় হয়ে আসচ্ছে । তিনি বসেই আছেন । জুতো ছাড়া তিনি আজ পর্যন্ত অফিস করেননি । এমনকি বৃষ্টির দিনেও তিনি পলিথিনে জুতো মুড়িয়ে ব্যাগে করে নিয়ে যেতেন । অফিসে ডুকার আগে তাদের অফিসের দারোয়ান রোকনের টুলে বসে জুতো পড়ে তারপর অফিসে ডুকতেন । কিন্তু আজ ? আচ্ছা আজ অফিস ফাঁকি দিলে কেমন হয় ! স্কুল কলেজ কতো ব্যাং দিয়েছেন , আরবি শিক্ষক হারুন স্যারের বেতের বারি এখনো প্যান্ট খুললে খুঁজে পাওয়ার কথা কথা । আজ অফিসটাই ব্যাং হয়ে যাক । আরবি শিক্ষক হারুন স্যার তো আর অফিসে নেই । সুতরাং এই বুড়ো বয়সে পশ্চাৎদেশে ট্যাঁস ট্যাঁস বেতের ভয়ও নেই ।

-- কি ব্যাপার !! তুমি লাঞ্চের বাটি ফেলেই চলে যাচ্ছে যে ? লুতফা বেগম গোসল সেরে কামরুল সাহেবের পিছনে দাঁড়িয়ে ।

--আজ অফিসে লাঞ্চ করবো । গতকাল এক কলিগের প্রমোশন হয়েছে । তিনি আজ সবাইকে খাওয়াবেন ।

--তো এই কথাটা আগে বললে চলতো না ! এই ভোরে উঠে তোমার জন্য তো তাহলে আর মশলা বাটতে হতো না । এমনিতেই কাজের লোক নেই । সমস্ত সংসার সামলাতে হয় এক হাতে । দু মেয়ে তো হয়েছে নবাবজাদী । কোন কাজের ভিতরে নেই আছে শুধু অর্ডার দিতে । সেইসাথে তুমিও শুরু করছো তামাশা । মানে আমিও তো মানুষ , মনে থাকে সে কথা ?

লুতফা কোমরে হাত দিয়ে কথা বলছে । কথার দমে দমে তার নাকের ফটো বড় হচ্ছে , ছোট হচ্ছে । কামরুল সাহেব অবাক নয়নের তার স্ত্রীকে দেখছেন । নাহ , ২৪ বছর আগে এই মেয়েটিকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করে তিনি ভুল করেননি ।

কামরুল সাহেবকে চুপ করে থাকতে দেখে লুতফা বেগম ভাবলেন আজ স্বামীকে বাগে পাওয়া গেছে । তিনি স্বামী কাছে অভিযোগের পর অভিযোগ দিয়ে যাচ্ছে । অনেক দিন অভিযোগ দেয়া হয়নি । অনেক অনেক কিছু জমে আছে ।
কামরুল সাহেব গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছেন , মূলত ভাবছেন । আজ তার তাড়া নেই । তিনি লুতফার প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করছেন । সত্যিই তো , মেয়েটা তার এই ছাপোষা সংসারে এসে একদম শেষ হয়ে যাচ্ছে । সারাদিন হাড়ি পাতিল নিয়ে পড়ে থাকতে হয় । আগে গান গাওয়ার যে চর্চাটা ছিল সেটা তো কবেই মরে ভূত । মেয়ে দুটোকে নিয়েও বহুদিন ঘুরে বেড়ানো হয় না । ঘুরে বেড়ানো দূরে থাক , বাসায় একসাথে চারজন বসে ঠিক মতো কথাটাও ইদানীং বলা হচ্ছে না । অফিস বাসা , বাসা অফিস । কারেন্ট বিল , গ্যাস বিল , বাসা ভাড়া , মাসের বাজার , সেভিংস , একটা বাড়ির চিন্তা , রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা , অফিস পলেটিক্স ! কোন মানে হয় ? এতো কিছুর কি মানে আছে ?

লুতফা বেগম অনর্গল তার কষ্টের কথা বলে যাচ্ছিলেন এমন সময় কামরুল সাহেব শান্ত স্বরে বললেন
-- আচ্ছা আজ লুতফা আর মেয়েদের নিয়ে বেড়াতে বের হলে কেমন হয় ।

স্বামীর কাছে তীব্র অভিযোগের মুহূর্তে এমন তরল কথা শুনতে লুতফা বেগম প্রস্তুত ছিলেন না । গত ২৪ বছরে বছরে তার কামু যে কথা বলেনি আজ সে কথা কেন ? কামরুল সাহেব লুতফার অবাক চোখকে পাশ কাটিয়ে তেমনি তরল স্বরে বলল --

-- চল আজ মেয়েদের নিয়ে আমরা কোথা হতে বেড়িয়ে আসি । যাবে ?

লুতফা বেগমের কিছু বলা উচিৎ কিন্তু কি বলা উচিৎ ভেবে পাচ্ছেন না । তিনি আগের মতোই বিস্ফোরিত চোখে কামরুল সাহেবকে দেখছে ।

বেশ কিছুক্ষন পর তিনি তার প্রাক্তন কামু বর্তমান কামরুল সাহেবকে বললেন --
-- এই তোমার কি আজ কিছু হয়েছে ? কখনো তো এতক্ষন আমার কথা শুনো না । আজ আমি এতগুলো কথা বললাম আর তুমি ঠায় দাড়িয়ে শুনলে আবার এখন বলছো আমায় নিয়ে বাইরে যাবে ! এই প্লিজ সত্যি করে বোল তো তোমার কি হয়েছে ?
বিস্ময়ের পরিবর্তে এইবার লুতফা বেগমের কণ্ঠে উদ্বেগ ।

-- কিছু হয়নি তো । ভাবলাম তোমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবো । আচ্ছা লুতফা তুমি কি জুতোর ফিতে বেঁধে দিতে পারবে ? আমি না ভুলে গেছি

কামরুল সাহেবের স্ত্রী লুতফা বেগম এবার সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গেছেন । তার কমকথা বলা নিরীহ স্বামীটির আজ কিছু একটা হয়েছে । তিনি অস্থির ভাবে বললেন
-- এই , সুমির বাবা , তুমি ঠিক আছো তো !

তিনি দ্রুত স্বামীর কপালে হাত রাখলেন । কপাল ঠাণ্ডা । জ্বর নেই । প্রেশার কি বাড়ল ? কাল রাতে ডিম তরকারী দেয়াটা ঠিক হয়নি । হজমে সমস্যা না তো !

লুতফা বেগম স্বামীকে জোর করে বিছানায় শুয়িয়ে দিলেন । ইতিমধ্যে সুমি আর অন্তি বাবার মাথার কাছে চলে এসেছে । তিনজন উদ্বিগ্ন নারী কামরুল সাহেবকে ঘিরে রেখেছে । কামরুল সাহেব মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তার আপন মানুষগুলোকে দেখছে । আহা কি শান্তি লাগে এই মুখগুলো দেখতে ।

কামরুল সাহেব পরিতৃপ্ত মনে ভাবছেন -- নাহ , মাঝে মাঝে ভুলে গেলে মন্দ হয় না ।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই আগস্ট, ২০১৪ রাত ৯:২২
২১টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যেখানে খোদা নেই; সেই ঠিকানার সন্ধানে( একটি দীর্ঘ সুফি দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসা)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


প্রথমেই জানাই আমার এই লেখাটি ব্লগার মরুভুমির জলদস্যুর লেখা “শরাব পিনে দে”
হতে উৎসারিত, তাই তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ।

সেই লেখাটিতে তিনি মির্জা গালিব এর বিখ্যাত শেরটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

ফ্যাসিস্ট আমলে পুলিশকে দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছিল- এ অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক নয়, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অংশ।
জুলাইয়ের পর- সেই পুলিশ কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৮ বছর পর ঋণের খোঁজে সন্তান বনাম হাজার কোটি টাকার খেলাপি: আমাদের ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের ট্র্যাজেডি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই ধরণের মানুষগুলোই বি,এন,পি-কে আবারও ডোবাবে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০১



পড়ালেখার পিছনে টাকা খরচ করা 'টাকা পাচার'?
যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাঁরা কি দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যান, নাকি নিজের বাপের টাকায় পড়ালেখা করেন?

পড়ালেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩০



প্রায় বিশ কোটি মানুষের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম মাত্র: - রেমিট্যান্স আর পণ্য রপ্তানি।

রেমিট্যান্স: সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×