'তোমরা কি জাগো ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এসেছ?'
'জাগো কি নতুন টি-শার্ট ছাপিয়েছে নাকি?'
'আপনারা জাগোর সাথে কাজ করছো না কেন?'
'জাগো নিয়ে এতোদিন যা শুনেছি, তা কি সত্যি'?
'আপনারা যে সত্যি মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে কাজ করছেন, তা বুঝবো কিভাবে? আপনাদের কি কোন সার্টিফিকেট আছে?'
প্রশ্ন, অভিযোগের অভাব নেই। দশাসই সাইজের প্রাডো গাড়িতে বসা এক ভদ্রলোক তো ইংরেজিতে গাল নেড়ে বলেই বসলেন, 'ডোন্ট ডিস্টার্ব জেন্টেলমেন লাইক দিস।'
স্যারের কাছে বিনীত অনুরোধ, একবারের জন্যে হলেও আপনার বহুমূল্য গাড়িটি নিয়ে ঢাকার বাইরে ঘুরে আসুন। সকালে, কিংবা সন্ধ্যার পর শুধু পাঞ্জাবীর উপর দামী কাশ্মীরি শাল চাপিয়ে গাড়ির হিটার থেকে বাইরে পা দিন। শীত নামক ঋতুটা আপনাদের 'জেন্টেলমেন'দের কতোটা ডিস্টার্ব করে, তা জানতে চাই। আপনার কারুকার্যখচিত শালও মনে হয় ৭-১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার বরফঠান্ডা হাওয়া থেকে আপনাকে রক্ষা করতে পারবেনা।
যা-ই হোক, কথা বাড়াব না। সংক্ষেপে আমাদের পরিচয়টা দিয়ে নিই। আমরা Smile Factory নামক একটি ক্ষুদ্র সংগঠন, যাদের মূল কর্মকাণ্ড সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে নূন্যতম হাসি ফোটানোর ব্যর্থ কিংবা সফল চেষ্টা। সদ্য জন্মলাভ করা সংগঠনটি নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই, এধরনের অনেক সংগঠন দেশের আনাচে-কানাচে কাজ করে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আমরা তাদের খবর পড়ি, তাদের অনেক কর্মকান্ডও দেখি রাস্তাঘাটে। কিন্তু এটা কখনো ভাবিনা, এমন হাজারটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মিলেই রাষ্ট্রের সহায়তাবিহীন এ দেশটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এমন হাজার প্রচেষ্টার ফলেই এখনো মানবাধিকার শব্দটা এদেশে টিকে আছে, অসহায়-নিপীড়িত মানুষেরা পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে না কাউকে পাচ্ছে। অবশ্য দেশের শাসনযন্ত্র যখন এসব ব্যাপারে বধিরের মতো উদাসীন, তখন আমাদের নিজেদেরই এভাবে এগিয়ে আসা ছাড়া বিকল্প আছে বলে মনে হয়না।
আপাতত আমাদের সাফল্য বলতে এটাই, অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে আমরা সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে তা দিয়ে শীতবস্ত্র কিনে সফলভাবে বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছি। এই অর্থ সংগ্রহের জন্যে গত দু মাসে বসুন্ধরা-পান্থপথে একটি এবং গুলশান ১ নং চক্করে একটি, মোট দুইটি ক্যাম্পেইন করা হয়। ক্যাম্পেইন হতে প্রাপ্ত অর্থের সাথে সংগঠনটির প্রত্যেক সদস্যের দান করা অর্থ যুক্ত করে কেনা হয় শীতবস্ত্র, যা দিয়ে আমরা আমাদের মূল লক্ষ্য, অন্তত একটি গ্রামের মানুষকে শীতের দুঃসহ কষ্ট থেকে রেহাই দেয়া, তা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি। অন্যান্য বড় সংগঠনের তুলনায় তুলনামূলক স্বল্প আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের পরিচিত গার্মেন্টসের সুবাদে এতোবড়ো কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
শীতবস্ত্র বিতরণের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের চরকাটারী গ্রাম, যাকে একেবারেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত গ্রাম বলা যায়। তারওপর প্রতি বছর রয়েছে নদীভাঙনের যন্ত্রণা। শুকিয়ে খটখটে হয়ে যাওয়া যমুনার চর দিয়ে যাওয়ার সময়ই ঠান্ডার ছুরির ধার টের পাচ্ছিলাম।
স্থানীয় চরকাটারী সবুজসেনা হাই স্কুলের মাঠে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। সেই ভয়াবহ ঠান্ডার মধ্যে একটা-দুটো কাপড় কোনমতে গায়ে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, আমরা বড় অবিচার করি তাদের ওপর। ঢাকার আধুনিক ফ্ল্যাটের আধুনিক কম্পিউটারের সামনে বসেও এখন মনে হচ্ছে, সে যেন এক অন্য জগত! পদ্মা নদীর মাঝির বিখ্যাত উক্তিটা আবার মনে পড়ছে, “গরীবের মধ্যে তারা আরও গরীব, ছোটলোকের মধ্যে আরও ছোটলোক”।
তবে গ্রামটি নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা এখানেই শেষ নয়। আসছে গ্রীষ্মে গ্রামটিকে যতোটুকু সম্ভব সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার পরিকল্পনা আমরা হাতে নিয়েছি, যার মধ্যে আছে বই-খাতা বিতরণ থেকে শুরু করে ওই গ্রামে কিছুদিন অবস্থান করে সেখানকার শিশুদের আধুনিক শিক্ষা প্রদান।
তো, গুলশান আর পান্থপথে অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টার সময় বেশ কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যার মধ্যে আছে শুরুর প্রশ্নগুলো। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা বেশ অবাক হচ্ছিলাম জাগোর প্রতি মানুষের মনোভাব দেখে। অনেকেই যেমন জাগোর প্রশংসা করতে করতে মুখ ফেনা তুলছেন, তেমন অনেকে আবার জিজ্ঞাসা করছেন আমরাও জাগোর মতোই বাটপাড় কিনা। জাগো নিয়ে কিছু বলতে চাইনা, কিন্তু নিজেদের নিয়ে একটা কথাই বলতে চাই, আমরা জাগো নই স্যার, জাগোর মতো অতোবড় সামর্থ্যও আমাদের নেই। আমরা নিতান্তই একটি অলাভজনক ক্ষুদ্র সংগঠন, যাদের লক্ষ্য অসহায়, অবহেলিত মানুষের মুখে খুশির মৃদু হাসি ফোটানো। আমাদের বিশ্বাস না করলে সাহায্য করবেন না, কিন্তু দয়া করে গাড়ির ভেতর বসে অমন দন্ত্যব্যাদন করে ব্যঙ্গ করবেন না প্লিজ। আপনারা থাকেন গাড়ির এসিতে, আমরা পায়ে হেঁটে, রোদে ঘুরে ঘুরে মানুষের জন্যে টাকা সংগ্রহ করি, তাই কেউ যখন এই কষ্টটুকুরও অবমূল্যায়ন করে, তখন সত্যি আমাদের কষ্ট হয়। কে জানে, ভিক্ষুক ভেবে তাড়িয়ে দিলেও হয়তো এই কষ্ট লাগতো না!
আমাদের সংগঠনটির শুরু হয়েছিল এআইইউবির সিএসই ডিপার্টমেন্টের কিছু ছাত্র-ছাত্রীর হাত ধরে, কিন্তু ইতোমধ্যে এর সাফল্যের খবর বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছে গিয়েছে, যার ফলে সংগঠনের সদস্য হওয়ার জন্যে অনেকের কাছ থেকেই আবেদন আসছে। আমরা বিনীতভাবে বলতে চাই, আমাদের সাম্প্রতিক কর্মকান্ডের উপর ভিত্তি করে ইউনিসেফের কাছে একটি আবেদন আমরা পাঠিয়েছি, যার ফলাফল হিসেবে আমরা ইউনিসেফের অনুমোদন আশা করছি। ইতোমধ্যে আমাদের আবেদনটি ইউনিসেফের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো হয়েছে এবং আমাদের জানানো হয়েছে যে আবেদনটি গ্রহণযোগ্য। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের শুরুর দিকেই আমাদের ইউনিসেফের অনুমোদন পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; এরপরই মূলত আমরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সদস্য গ্রহণ করা শুরু করব।
প্রতি বছর আমাদের দেশে কয়েক কোটি টাকার শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। অনেককেই বলতে শুনেছি, দেশ না বদলে প্রতি বছর শুধু শীতবস্ত্র বিতরণ করে কিছুই হবে না। আমি একমত। কিন্তু ভাই, সকল ধরনের নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত মানুষেরা যখন শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, তখন কি পত্রিকায় তাদের খবর পড়ে আমাদের দেশোদ্ধার হয়ে যায়?
এটাও সবার জেনে রাখা উচিত, ইএসএইডের তথ্যমতে, প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ শীতবস্ত্র প্রদান সত্ত্বেও মোট শীতার্তদের ৭২% শীতের কাপড় থেকে বঞ্চিত হয়। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আমাদের অত্যধিক জনসংখ্যার এ দেশে আরও কি পরিমাণ শীতবস্ত্রের প্রয়োজন। প্লিজ, আসুন, আমরা এই অসহায়, অনাদরে ক্লিষ্ট মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াই। যদি আপনার মনে তবু কোন দ্বিধা থাকে, বিনীত অনুরোধ, যেকোন একটি দলের সাথে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে গিয়ে নিজ চোখে মানুষের দুর্দশা দেখে আসুন। আশা করি এরপর আর আপনার মনে কোনরকম দ্বিধা থাকবে না।










এধরনের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে আমি অনেক আগে থেকেই যুক্ত, তাই কি ধরনের প্রশ্ন আসবে আন্দাজ করতে পারছি। তাই আগেই বলে নিই, ক্যাম্পেইনে ব্যবহৃত গেঞ্জিগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিচিত গার্মেন্টসটি আমাদের দান করেছে, এবং এটা যেহেতু কোন ফেসবুক পেজ কিংবা এলাকার পক্ষ থেকে ক্যাম্পেইন নয়, তাই গেঞ্জি পরাটা আমাদের জন্যে অনেক বাধ্যতামূলক বলা যায়। এরই সাথে আছে ইউনিসেফের ব্যাপারটা, যার জন্যে লোগো সম্বলিতি গেঞ্জিও গুরুত্বপূর্ণ।
যাতায়াত খরচ থেকে আনুষঙ্গিক সব খরচ সব সদস্য নিজেদের পকেট থেকে ব্যয় করেছেন, সংগ্রহকৃত অর্থের একটা ফোঁটাও কোন ব্যক্তিগত খাতে ব্যয় হয়নি। এছাড়া টাকা-পয়সার হিসাব এবং সকল তথ্য আমাদের ফেসবুক পেইজে নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে।

এর পরও কারও কোন অভিযোগ কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় করতে পারেন। আপনাদের মতামত, উৎসাহই আমাদের চলার পথের প্রেরণা। ব্লগের অতো বৃহৎ একটা গণমাধ্যমের সাপোর্ট পেলে আমরা নিঃসন্দেহে নিজেদের লক্ষ্যে আরও সহজে পৌঁছাতে পারব। সবার সহযোগিতা কামনা করছি।
সবাইকে ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১২:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



