আশির দশকের শেষের কথা। তখন আমি ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের গর্বিত ছাত্র। গর্বিত এই কারণে যে ঢাকা কলেজ নামক এক স্বনামধন্য ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের ছাত্র হতে পেরে ‘আমি কী হনু রে’ টাইপ বালখিল্য ভাবালুতায় তখন আমি আচ্ছন্ন। আমারে তখন আর পায় কে! স্কুলের বোরিং কঠোর নিয়মতান্ত্রিকতার বেড়াজাল ডিঙিয়ে হঠাৎ মহাবিদ্যালয়ের মহা দক্ষযজ্ঞে নাম লিখিয়ে আমি তখন এক উড়ালপঙ্খী... যা ইচ্ছা তাই করার খুশিতে তখন ভাসতে আছি তো ভাসতেই আছি। একদিকে ঢাকা কলেজের ইতিহ্য রক্ষা করে চরম পোংটামীতে গা ভাসানো, আরেক দিকে রাজনীতি আর সমাজ সচেতনতার বিপ্লবী দাবানলে আমার কৈশরিক মনজগতে এক তুরীয় তোলপাড়- এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে তখন আমি দিশেহারা! এরই মাঝে এক “বিপ্লবী” বন্ধুর (এখন সে একজন সফল ব্যবসায়ী) হাত ধরে ফরহাদ মজহারের দর্শনশাস্ত্রের এক পাঠচক্রে আমার নিয়মিত যাতায়াত তখন। সব মিলিয়ে আমার চিন্তার জগতে এক ছেড়াবেড়া অবস্থা! মানুষের ‘ব্যক্তি’ হয়ে উঠবার (personification of man) তাত্বিক প্রথমপাঠের এক বিমূর্ত প্রক্রিয়া অস্থির করে তুলেছে আমার ভেতরটা। এরকমই এক আউলাঝাউলা মনোজগতের হাত ধরে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল।
চিন্তার উল্লম্ফনের এমনই কোন এক গা চিট্চিটে ঘামে ভেজা দুপুরে- হ্যাঁ, সেই দিনের কথা আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে, আমি কলেজ পালিয়ে ঢাবি’র মধুর ক্যান্টিনে ধুন্ধুমার কৈশরিক আঁতলামী সেরে রাজা উজির মেরে রিকশা করে বাসায় ফিরছিলাম। পকেটে ছিল ত্রিশটি টাকা। তার থেকে দশ টাকার চা-বিড়ি উড়িয়ে তখন সাকুল্যে আছে বিশ টাকা (বলাই বাহুল্য, এই বিশ টাকার নোটটি আমার শ্রদ্ধেয় আব্বাজানের পকেট থেকে আত্মসাৎ করা, কেননা আমার প্রতিদিনের বাস যাতায়াত সহ কলেজ খোরাকি ছিল দশ টাকা। মাত্র দশ টাকায় কি আর বিপ্লবী হওয়া যায়? আপনারাই বলেন!) তো চকচকে বিশটি টাকার নোট যখন আছেই, তখন ওই ঘামে ভেজা দুপুরে রিকশা করে বাসায় ফেরার মতো বিলাসিতা আমি করতেই পারি!
ভার্সিটি থেকে বাসায় ফেরার তখনকার ভাড়া ছিল দশ টাকা। রিকশা বাসায় পৌঁছাতেই আমি ‘দশটা টাকা পানিতেই গেল’ সুলভ মেজাজ খারাপ করা মুখভঙ্গী করে রিকশাওয়ালাকে বিশ টাকার নোটটি বাড়িয়ে দিলাম। যথারীতি দশ টাকা ফেরত নিয়ে বাসায় ঢুকে গোসল সেরে বাপের হোটেলের খাবার গলধ:করণের পায়তারা কষছি। কেন যেন রিকশাওয়ালার ফেরত দেওয়া সেই দশ টাকার নোটটির দিকে চোখ গেল। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, নোটটির গায়ে কাঁচা হাতের অক্ষরে কি সব জানি লেখা আছে। কৌতুহলবশতঃ ভালো করে লেখাটির পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করলাম।
এতোদিনে হুবহু মনে নেই; তবে পাঠ শেষে যা দাঁড়ালো, ভুল বানানে তা ছিল এরকমঃ
“আমি পুষ্পরাণী। আমারে জোর কইরা এই শাখারিপট্টিতে ধইরা আইনা বিক্রি করসে। এই টাকাটা যে পাইবেন, সে আমার ধর্মের ভাই লাগে। আমারে বাঁচান। আমারে এইখান থিকা উদ্ধার করেন। আপনার পায়ে পড়ি!”
চিরকুটটার নীচে শাখারিপট্টির একটি ঠিকানা দেয়া ছিল, যা আজ এতোদিন পর আমার আর মনে নেই। আমি স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ হয়ে সেই কাঁচা হাতের লেখার দিকে তাকিয়ে রইলাম। গলা দিয়ে আর ভাত নামলো না। কেন যেন সীমাহীণ এক আত্মশ্লাঘা আর আত্মগ্লাণিতে আমার কৈশরিক মন কোনো এক অক্ষম বাসনার বিষাদময়তায় ছেয়ে গেল। রাতে বিছানায় শুতে গেলাম, কিন্তু কিছুতেই আর ঘুম এলো না। একটা অস্ফুট কান্না আর হৃদয়চেড়া কষ্টে ছটফট করতে লাগলাম। আমি কি করে পারবো সেই অদেখা পুষ্পরাণীকে উদ্ধার করতে? কেউ কি নেই যে এই অসহায় আকুতিমাখা নিষ্পাপ মেয়েটাকে উদ্ধার করতে পারে? সত্যিই তাহলে কেউ নেই? আমার অক্ষমতায় আমি নিজেই দগ্ধ হতে লাগলাম সারারাত। তারপর একসময় ভূতগ্রস্ত নিশিপাওয়ার মতো করে উঠে বসলাম বিছানায়। কাগজ টেনে নিয়ে কে যেন আমাকে দিয়ে এই কাঁচা কবিতাটা লিখিয়ে নিল। দু’চোখের অশ্রুধারায় সিক্ত হতে হতে এক কিশোর তার থর থর কম্পিত হাতে সিক্ত করে তুললো কমা দাড়ি ফুটকী সমেত কিছু শব্দমালা। আমি বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম, আমাকে ক্ষমা করে দিও বোন:
পুষ্পরাণী
আমার উচ্চারণহীণ কবিতাপূঞ্জ হ’তে শব্দের কিছু
জ্ঞানমার্গতা উৎসর্গ করলাম তোমায়, পুষ্পরাণী
যা কিনা নিতান্ত ব্যক্তিগত সৌকর্যে
লালিত ছিল এ্যাতোটাকাল ধরে।
জানি এ আমার অক্ষম বাসনার যে বোধ, তোমার
মোহান্ত চক্ষুর অশ্রুবিন্দু লুকোবে না তাতে
তাড়া খেয়ে যাবে শাখারী পট্টির এঁদো গলিতে
সারা বাংলাদেশ জুড়ে;
তবু এ অক্ষম পুরুষকে তুমি ক’রো না ক্ষমা, পুষ্পরাণী
দিও অভিশাপ!
সৃষ্টির আনন্দের যে নান্দনিক উপলব্ধি নারীদের
করায়ত্ব তা আমি জানিনি এ্যাতোদিন
আজ জানা হলো পুষ্পরাণী, মানুষ হিসেবে শুধু
কেননা মানুষ তো সৃষ্টিশীল সদা, যেমন পুরুষটি নয়।
তুমি তো মানুষ ছিলে পুষ্পরাণী,
নারী হলে কোন যাদুবলে?
দ্রষ্টব্যঃ কবিতা নামক এই গর্ভস্রাবটিকে দয়া করে কাব্যবিচারের নিরিখে না দেখে এক কিশোরের হৃদয় নিংড়ানো অক্ষম কষ্টের শব্দময় বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করলে বাধিত হবো।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ২:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




