প্রথম পর্ব
শুধু যে রাজাকার কর্তৃক সর্বস্ব অগ্নিতে ভস্মিভূত হয়েই আমাদের পরিবার ঝালকাঠি হতে বরগুনার উদ্দেশ্য পাড়ি জমায় তা নয়। নদীর পাড়ে বাড়ি হওয়ায় বেশ কয়েকবার ডাকাতি হওয়াটাও এর পেছনে কাজ করে। ১৯৭২ সালে বরগুনাতে আমাদের পরিবারটি যেখানে গিয়ে বসতি গড়ে সেখানে একসময় সুন্দরবন ছিল। আমার দাদার বাবা সুন্দরবন কেটে কিছু জমির সীমানা রেখে দিয়েছিলেন যার অধিকাংশই ছিল গোলপাতায় আবৃত ও জলাশয়। ১৯৭৭ সালে আমার যখন জন্ম হয় তার ছয় মাস পূর্ব পর্যন্ত আমাদের পরিবারটি অন্যদের বাড়িতেই ঘর তুলে বাস করত। কারণ, তখনো সে জমি পুরোপুরি বাসের যোগ্য ছিল না।
ব্লগের জন্য ভূমিকাটা একটু দীর্ঘই হয়ে গেল। এবার লেখায় ফিরি।
যে গ্রামে আমার জন্ম সে গ্রামটি ছিল পুরোপুরি হিন্দু অধ্যুষিত। বিশাল একটা গ্রামের মধ্যে কেবল এক ঘর মুসলমান ছিল, তাও অবৈধভাবে দখল করে, যদিও সে পরিবারটিকে পরবর্তীতে আইনীভাবে তুলে দেয়া হয়েছিল। শিশুবেলায় দিনে, সপ্তাহে এমনকি মাসেও আমরা একজন মুসলমান দেখতাম না (কেবলমাত্র ভিক্ষুক ছাড়া)। মুসলমান ভিক্ষুকদের দু'একদিন মুড়ি-খই বা ভাতও খেতে দেয়া হতো। সবসময়ই দেখতাম ওদের বসতে দেয়া হচ্ছে বস্তা বা এরকম কিছুর ওপর, কখনো বা কেবলই মাটির ওপর এবং খাওয়ার পরে থালাগুলো ওরা পুকুর থেকে ধুয়ে আনতো অথবা ওদেরকে ধুয়ে আনতে বলা হতো। ওদেরকে কখনো ছুঁতে দেয়া হতো না, ভিক্ষে দেয়ার সময়ও ভিক্ষা দেয়ার পাত্রটিকে মাটিতে রাখা হতো, হাতে হাতে দেয়া হতো না। কখনো কখনো ঠাকুরমার কাছে বকাও খেয়েছি এ জন্য। মনে কখনো প্রশ্ন জাগলেও ভেবেছি এটাই নিয়ম। হিন্দু আর মুসলমান যে এক নয়, এটুকু বুঝতে পারতাম বা আমাদের পরিবার তা বুঝিয়ে দিয়েছিল।
আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে ছিল বেশ বড় একটি খাল। খালের ওপারে যদিও মুসলমানদের জমি আছে তবুও তাদের বসতি ছিল আরো পশ্চিম দিকে আরেকটি খাল ছিল, তার পাড়ে। ওপারে কখনো কখনো মুসলমান ছেলেরা মাছ ধরতে আসত। কখনো ওদের সাথে হিন্দু ছেলেদের সাথে বচসা হতে দেখতাম। সেসব ঝগড়ায় দু'দলই কিছু ছড়া-টাইপ গালি ব্যবহার করত যেগুলি আমি এখন মনে করতে পারছি না। একটা মনে আছে- মুসলমান ছেলেরা বলত, 'নোমো (হিন্দু) নোমো তুলসি পাতা, নোমো খায় গরুর মাথা।' গরুর মাথা খাওয়ার মত গালি(!) একজন হিন্দু ছেলে কিছুতেই মেনে নিতে পারত না। এদিকে হিন্দু ছেলেরাও মুসলমান ছেলেদের নিয়ে কচ্ছপ খাওয়া নিয়ে কীসব ছড়া বলত। তারপর দু'দলই একে অপরের উদ্দেশ্যে ঢিল ছুড়ত, যদিও কেউই খালের ওপারে ঢিল নিতে পারত না। অনেকটা শয়তানের উদ্দেশ্যে ঢিল ছুড়ে মারার মতো! ঢিলের সাথে চলত লাগামহীন ভাষার অবিরত গালাগালি। আমি এসব দেখতাম, যদিও নিজে কখনো গালগালিতে অংশগ্রহণ করেছি বলে মনে পড়ে না তবে মুসলমান ছেলেদের গালিতে কাবু করে ফেলাটাকে খুব উপভোগ করতাম।
বস্তুতই আমরা একপক্ষ অপরপক্ষকে শত্রু বলেই বিবেচনা করতাম। কেন করতাম জানিনা, পরিবার তথা সমাজ থেকে এরকম শিক্ষাই পেয়েছিলাম। মনে হত ওরা খুব নীচু। ওদের ভাষা সম্পর্কে অন্যদের কাছ থেকে শুনতাম, যা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সাথে মিলত না। বিশেষ করে ওরা নাকি জলকে পানি বলে আমাদের কাছে এটা ছিল সবচেয়ে আশ্চর্যজনক। আমাদের পাড়ার দু'জন ছেলেকে খালের ওপারে একা পেয়ে ক'জন মুসলমান ছেলে ওদের কলেমা পড়িয়েছে এবং জলকে পানি বলতে বাধ্য করিয়েছে (একটু বড় হয়ে আমি নিজেও এরকম পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম)। এরকম একটি খবরে আমরা শিশুরা একবার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে আমরাও একদিন............।
মুসলমানপাড়া থেকে প্রায়ই এপাড়ে মাছ বিক্রি করতে আসত। কোনদিন যদি কারো সাথে সকালে উঠেই কোন মুসলমান লোকের সাথে দেখা হত, সেদিনটাকে অশুভ বলেই বিবেচনা করত হিন্দু লোকজন। কোন হিন্দু ব্যক্তি মুসলমান কোন বাড়িতে ভাত খাওয়া তো দূরের কথা, মুড়িও খেয়েছে এরকম শুনলেও আমাদের কাছে খুব ঘৃণ্য বলে মনে হতো। হিন্দুদের কাছে কেমন একটা অচ্ছুত, অশুভ, অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত সকল মুসলমান মানুষগুলো।
শিশুবেলার এরকম হাজারো সত্যি রয়েছে যা আমি কেবল আমাদের পরিবার তথা সমাজ থেকেই শিক্ষা পেয়েছিলাম, যা লিখতে গেলে পুরো একটা বই হয়ে যাবে। পরবর্তী পর্বে আরো তুলে ধরব। ব্লগে আমার আস্তিক বন্ধুরা যখন আমার নাস্তিকতার বিরোধিতা করে এবং তাদের আপত্তিতে যখন আমার পোস্ট ডিলিট হয়ে যায়, তখন আমার বলতে ইচ্ছে করে-- আপনাদের ধর্ম, আপনাদের ঈশ্বর আমাদের সমাজের শিশুদেরকে এই শিক্ষাই দেয় এবং আপনারা এ শিক্ষাকেই সাপোর্ট করেন। আমার কাছে এ লজ্জাজনক! আপনাদেরও লজ্জাবোধ জাগ্রত হোক, এ প্রতিক্ষায়...........।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ১০:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



