somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্ধকার থেকে আলোয়-২য় পর্ব

২৪ শে মার্চ, ২০১০ রাত ১১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম পর্ব

শুধু যে রাজাকার কর্তৃক সর্বস্ব অগ্নিতে ভস্মিভূত হয়েই আমাদের পরিবার ঝালকাঠি হতে বরগুনার উদ্দেশ্য পাড়ি জমায় তা নয়। নদীর পাড়ে বাড়ি হওয়ায় বেশ কয়েকবার ডাকাতি হওয়াটাও এর পেছনে কাজ করে। ১৯৭২ সালে বরগুনাতে আমাদের পরিবারটি যেখানে গিয়ে বসতি গড়ে সেখানে একসময় সুন্দরবন ছিল। আমার দাদার বাবা সুন্দরবন কেটে কিছু জমির সীমানা রেখে দিয়েছিলেন যার অধিকাংশই ছিল গোলপাতায় আবৃত ও জলাশয়। ১৯৭৭ সালে আমার যখন জন্ম হয় তার ছয় মাস পূর্ব পর্যন্ত আমাদের পরিবারটি অন্যদের বাড়িতেই ঘর তুলে বাস করত। কারণ, তখনো সে জমি পুরোপুরি বাসের যোগ্য ছিল না।

ব্লগের জন্য ভূমিকাটা একটু দীর্ঘই হয়ে গেল। এবার লেখায় ফিরি।

যে গ্রামে আমার জন্ম সে গ্রামটি ছিল পুরোপুরি হিন্দু অধ্যুষিত। বিশাল একটা গ্রামের মধ্যে কেবল এক ঘর মুসলমান ছিল, তাও অবৈধভাবে দখল করে, যদিও সে পরিবারটিকে পরবর্তীতে আইনীভাবে তুলে দেয়া হয়েছিল। শিশুবেলায় দিনে, সপ্তাহে এমনকি মাসেও আমরা একজন মুসলমান দেখতাম না (কেবলমাত্র ভিক্ষুক ছাড়া)। মুসলমান ভিক্ষুকদের দু'একদিন মুড়ি-খই বা ভাতও খেতে দেয়া হতো। সবসময়ই দেখতাম ওদের বসতে দেয়া হচ্ছে বস্তা বা এরকম কিছুর ওপর, কখনো বা কেবলই মাটির ওপর এবং খাওয়ার পরে থালাগুলো ওরা পুকুর থেকে ধুয়ে আনতো অথবা ওদেরকে ধুয়ে আনতে বলা হতো। ওদেরকে কখনো ছুঁতে দেয়া হতো না, ভিক্ষে দেয়ার সময়ও ভিক্ষা দেয়ার পাত্রটিকে মাটিতে রাখা হতো, হাতে হাতে দেয়া হতো না। কখনো কখনো ঠাকুরমার কাছে বকাও খেয়েছি এ জন্য। মনে কখনো প্রশ্ন জাগলেও ভেবেছি এটাই নিয়ম। হিন্দু আর মুসলমান যে এক নয়, এটুকু বুঝতে পারতাম বা আমাদের পরিবার তা বুঝিয়ে দিয়েছিল।

আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে ছিল বেশ বড় একটি খাল। খালের ওপারে যদিও মুসলমানদের জমি আছে তবুও তাদের বসতি ছিল আরো পশ্চিম দিকে আরেকটি খাল ছিল, তার পাড়ে। ওপারে কখনো কখনো মুসলমান ছেলেরা মাছ ধরতে আসত। কখনো ওদের সাথে হিন্দু ছেলেদের সাথে বচসা হতে দেখতাম। সেসব ঝগড়ায় দু'দলই কিছু ছড়া-টাইপ গালি ব্যবহার করত যেগুলি আমি এখন মনে করতে পারছি না। একটা মনে আছে- মুসলমান ছেলেরা বলত, 'নোমো (হিন্দু) নোমো তুলসি পাতা, নোমো খায় গরুর মাথা।' গরুর মাথা খাওয়ার মত গালি(!) একজন হিন্দু ছেলে কিছুতেই মেনে নিতে পারত না। এদিকে হিন্দু ছেলেরাও মুসলমান ছেলেদের নিয়ে কচ্ছপ খাওয়া নিয়ে কীসব ছড়া বলত। তারপর দু'দলই একে অপরের উদ্দেশ্যে ঢিল ছুড়ত, যদিও কেউই খালের ওপারে ঢিল নিতে পারত না। অনেকটা শয়তানের উদ্দেশ্যে ঢিল ছুড়ে মারার মতো! ঢিলের সাথে চলত লাগামহীন ভাষার অবিরত গালাগালি। আমি এসব দেখতাম, যদিও নিজে কখনো গালগালিতে অংশগ্রহণ করেছি বলে মনে পড়ে না তবে মুসলমান ছেলেদের গালিতে কাবু করে ফেলাটাকে খুব উপভোগ করতাম।

বস্তুতই আমরা একপক্ষ অপরপক্ষকে শত্রু বলেই বিবেচনা করতাম। কেন করতাম জানিনা, পরিবার তথা সমাজ থেকে এরকম শিক্ষাই পেয়েছিলাম। মনে হত ওরা খুব নীচু। ওদের ভাষা সম্পর্কে অন্যদের কাছ থেকে শুনতাম, যা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সাথে মিলত না। বিশেষ করে ওরা নাকি জলকে পানি বলে আমাদের কাছে এটা ছিল সবচেয়ে আশ্চর্যজনক। আমাদের পাড়ার দু'জন ছেলেকে খালের ওপারে একা পেয়ে ক'জন মুসলমান ছেলে ওদের কলেমা পড়িয়েছে এবং জলকে পানি বলতে বাধ্য করিয়েছে (একটু বড় হয়ে আমি নিজেও এরকম পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম)। এরকম একটি খবরে আমরা শিশুরা একবার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে আমরাও একদিন............।

মুসলমানপাড়া থেকে প্রায়ই এপাড়ে মাছ বিক্রি করতে আসত। কোনদিন যদি কারো সাথে সকালে উঠেই কোন মুসলমান লোকের সাথে দেখা হত, সেদিনটাকে অশুভ বলেই বিবেচনা করত হিন্দু লোকজন। কোন হিন্দু ব্যক্তি মুসলমান কোন বাড়িতে ভাত খাওয়া তো দূরের কথা, মুড়িও খেয়েছে এরকম শুনলেও আমাদের কাছে খুব ঘৃণ্য বলে মনে হতো। হিন্দুদের কাছে কেমন একটা অচ্ছুত, অশুভ, অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত সকল মুসলমান মানুষগুলো।

শিশুবেলার এরকম হাজারো সত্যি রয়েছে যা আমি কেবল আমাদের পরিবার তথা সমাজ থেকেই শিক্ষা পেয়েছিলাম, যা লিখতে গেলে পুরো একটা বই হয়ে যাবে। পরবর্তী পর্বে আরো তুলে ধরব। ব্লগে আমার আস্তিক বন্ধুরা যখন আমার নাস্তিকতার বিরোধিতা করে এবং তাদের আপত্তিতে যখন আমার পোস্ট ডিলিট হয়ে যায়, তখন আমার বলতে ইচ্ছে করে-- আপনাদের ধর্ম, আপনাদের ঈশ্বর আমাদের সমাজের শিশুদেরকে এই শিক্ষাই দেয় এবং আপনারা এ শিক্ষাকেই সাপোর্ট করেন। আমার কাছে এ লজ্জাজনক! আপনাদেরও লজ্জাবোধ জাগ্রত হোক, এ প্রতিক্ষায়...........।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ১০:৫০
১৪টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×