১৯৭১ সালের মে মাসের দুপুরে যখন ঘরটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হল, তখন রাজাকারের দল যে মহৎ(!) কাজটি করেছিল তা হল- আগুন ধরানোর পূর্বে তারা ঘরের সকলকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে আগুন দেয়নি, ঘর থেকে সবাইকে বের করে দিয়েছিল। তাদের এই মহত্বটুকুই আজ আমাকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে সাহায্য করেছে।
আমার মা-বাবা, কাকা-কাকি এবং ঠাকুরমা তাদের একমাত্র পরিহিত বস্ত্রখানিকে সম্বল করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সামনের বারান্দায় বাঁধা ছাগলটা, যেটা তখন গর্ভবতী এবং বাবার সামান্য ব্যবসা বাদ দিলে যেটাই ঐ পরিবারের একমাত্র সম্পত্তি ছিল, সেটাকেও ছেড়ে দিতে দেয়া হল না। জীবন্ত দগ্ধ হয়ে ছাগলটার পেটটা যখন ফটাস করে ফেটে গিয়েছিল, তখন নাকি রাজাকারের দল উল্লাসে ফেটে পড়েছিল।
পুরো ঘরখানা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আমাদের পরিবারের সবাই দূরে থেকেই তাকিয়ে দেখল আগুনের লোলিহান শিখার সাথে রাজাকারদের উল্লাস। শুধু ঘরখানাই নয়। পরিবারের একমাত্র জীবিকার উৎস, একটি ভাসমান দোকান (হাটবারগুলোতে হাটে হাটে গিয়ে রাস্তায় মালামাল সাজিয়ে যে দোকান পরিচালিত হয়), যার মালামাল তখন ঘরের মধ্যেই ছিল, পুড়ে কয়েকমুঠো ছাই হয়ে গেল।
প্রত্যেকের সাথে একমাত্র পরিধেয় বস্ত্র সম্বল করে যেভাবে আমাদের পরিবারটি মুক্তিযুদ্ধকালীন মাসগুলো পার করেছে তা আমি এখন ভাবতেও পারি না। এই কটা লাইন লিখতে গিয়েও হাত আটকে যাচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে। কী করুণ সে জীবন! আমি ভাবতে পারি না।
লিখতে বসেছিলাম আমার নাস্তিক হয়ে ওঠার গল্প। লিখে ফেললাম পারিবারিক দুর্যোগের গল্প। এ গল্পটাই আমার ভূমিকাস্বরূপ। কারণ, এরকম কপর্দকশূণ্য একটি পরিবার যখন ১৯৭২ সালে নিজ জেলা ঝালকাঠি ছেড়ে বরগুনার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় তখন তাদের সাথে পরিধেয় বস্ত্র, দু'খানা মাদুর ভিন্ন যা সাথে ছিল সে বস্তুটা হল একখানা কৃষ্ণের ছবি। যাকে তাঁরা ঈশ্বর মনে করতেন। 'ঈশ্বর যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন!'
এরকম একটি ঈশ্বর নির্ভরশীল পরিবারের সন্তান হয়েও যেভাবে আমি যু্ক্তিবাদী হলাম তার গল্প বলবো পরের পর্বে। আজ এ পর্যন্তই। ভাল থাকুন সবাই।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ১০:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



