somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নীলাচল: বর্ষণহীন মেঘের মেলা

১৯ শে নভেম্বর, ২০১০ রাত ১২:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
অনেক বছর আগে আমি যখন দার্জলিং গিয়েছিলাম তখনও এরকম একটা অনুভুতি হয়েছিল। মনে হয়েছিল পৃথিবীতে এত অপরুপ জায়গাও হয়!
সে প্রায় বছর দশেক আগের কথা। কিন্তু খোদ বাংলাদেশেই এর কাছাকাছি একটা স্বাদ পাব এটা ভাবিনি। এত মনোমুগ্ধকর জায়গা বাংলাদেশে আর আছে কিনা জানিনা। প্রথম দেখার মুগ্ধতা যদি বাদও দেই তারপরও তরুন বয়সে ভাললাগা রমনীর পোট্রেটের মতো বান্দরবান এর রুপ সর্ম্পকে আমার অনুভবের তেমন তারতম্য হবেনা। এত বছর আসিনি কেনো ভাবতেই অবাক লাগে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এসেছি অন্তত ১০-১২ বার। আর তার থেকে ২ ঘন্টার দুরত্বেই এত অমলিন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা একটা জায়গা কিন্তু একবারও আসা হয়নি। গতমাসের ১৫-১৬ তারিখ ছিল সাপ্তাহিক ছুটি আর ১৭ অক্টোবর ছিল পুজার সরকারী ছুটি। সপরিবারে বেড়াতে যাওয়ার জন্য এসময়টাকেই নির্বাচন করেছিলাম। সপরিবারে মানে আমি, আমার ঘরওয়ালী, আর দুইকন্যা শ্রবনা ও জয়িতা। প্রথমটির বয়স ছয় আর দ্বিতীয়টির আড়াই। রওয়ানা হলাম আরো দুদিন আগে অর্থাৎ ১৩ অক্টোবর।


প্রথম গন্তব্য কক্সবাজার। শ্রবনা এর মধ্যেই তিনবার সমুদ্রদর্শন করেছে কিন্তু ছোটোটি এবারই প্রথম সমুদ্র দেখবে। তাই প্রথম কক্সবাজার গিয়ে সেখান থেকে বান্দরবান যাওয়ার পরিকল্পনা চুড়ান্ত হল।


জয়িতা কিছুতেই পানিতে নামবে না। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে ওকে সমুদ্রের সাহচর্য্যে আনা সম্ভব হল। আর শ্রবনা পারলে সবসময়ই সমুদ্রের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকে আর কি।


কক্সবাজার থেকে ইনানি পৌঁছতে লাগল আধঘন্টা। হিমছড়ি বা ইনানি গেলে অন্তত কক্সবাজারের অসম্ভব ভীড় থেকে একটু নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া যায়। যা অনেকটাই স্বস্তিকর।







এই জায়গাটার সুবিধা হচ্ছে একদিকে সমুদ্র অন্যদিকে পাহাড় কিংবা গ্রাম। শহরের কোলাহলটা নেই যেটা কক্সবাজারে আছে। ইনানির কাছে সোনারপুর নামে একটা গ্রাম মতো আছে। আর বড়সড় একটা বাজারও আছে। ফেরার পথে ইনানির থেকে সোনারপুর ঘুরে আমরা হিমছড়িতে এলাম। ঝরনা বলতে এখানে যেটা রয়েছে তা হল প্রায় কলের পানির সদৃশ্য চিকন একটি ধারা। আর এখানে চিকন একটা একটা সিঁড়ি দিয়ে শতশত মানুষ প্রানপাত করে ওপরে উঠছে। ঠিকমতো কেউই জানেনা কেনো উঠছে! যারা নামছে তারা ক্লান্ত পায়ে গজগজ করছে ওপরে কিছুই নাই খামোখাই উঠেছে কয়েকশো সিঁড়ি ভেঙে । কক্সবাজার আর হিমছড়ির মাঝামাঝি একটা জায়গা আছে নামটা হল পেচার দ্বীপ। বেশ মজার নাম তবে এটা কোনো দ্বীপ নয়!

কক্সবাজার থেকে বান্দরবান পৌঁছতে প্রায় আড়াই ঘন্টার মত লাগল। আমার সাথে দুটো বাচ্চা থাকায় আমি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং ঝুঁকিপুর্ন নয় কেবল এমন স্থানগুলোতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম।

মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে একটা ঝুলন্ত সেতু আছে। আর তার শুরুতেই সাইনবোর্ডে লেখা ঝুঁকিপুর্ন সেতু। সেতুর কাঠ নড়বড় করছে তবে ভেঙেযাবে এমন মনে হয়নি আমার কাছে। আমার বউ আর শ্রবনা জয়িতা সেতুর মাঝামাঝি যাওয়ার পর তিনটে ছেলে একসাথে বেশ জোরে সেতু দিয়ে মার্চ করে চলে গেল। এতে সেতু হেলতে দুলতে লাগল এবং যথারীতি আমার বউ এবং সম্ভবত আরও দুএকটি মেয়ে তারস্বরে চিৎকার শুরু করল। ঠিক এ সময়টাতে আবার ছিপছিপ করে কোথ্থেকে বৃষ্টি আরম্ভ হল। আমিতো ছবি তোলার জন্য ওদের চেয়ে একটু বেশিই পেছনে। দ্রুত ওদের কাছে পৌঁছতে গিয়ে আমি একটু ব্যলেন্স হারালাম। ফলে দ্রুত রোপ ধরতে গিয়ে ছোটো ক্যামেরাটা(বড় ক্যামেরাটা আমার গলায় ঝোলানো ছিল) গ্রিপ থেকে বের হয়ে গেল। ভাগ্যিস রিস্টে ফিতাটা পেঁচানো ছিল নাহলে ওটা ওই লেকেই সমাধিস্থ হত। এই কমপ্লেক্সটাতে ঠিক কি আছে জানা থাকলে হয়ত আসতাম না। কারন ভেতরে কি আছে দেখার জন্য শতশত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে নামতে হল। কিন্তু এই ঝুলন্ত সেতুটা ছাড়া দেখার মতো আর কিছুই দেখলাম না। যদিও তালিকায় লেখা আছে অনেক কিছুই।

স্বর্ন মন্দিরে পৌঁছতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যা হয়েগেল তাই এই স্থানটির ভাল ছবি নেওয়া গেল না। আমাকে তাক লাগিয়ে দিয়ে ১৩৭ সিঁড়ি আমার হাত ধরে উঠে এল আমার আড়াই বছরের(২ বছর ৮ মাস একজেক্টলি) কন্যা জয়িতা।




সিঁড়িগুলো দিয়ে উপরে উঠতে প্রায় আধঘন্টা লাগল। অবশ্য বৃষ্টিতে ভেজা থাকায় এবং অন্ধকার হয়ে আসায় সময় বেশি লেগেছে। পুরো মন্দিরটি সোনালী রং করা। এর ভেতর বেশ কয়েকটি প্রকোষ্ঠ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে একটি ড্রাগন এবং বিরাট একটি ঘন্টা। এই বিশাল ঘন্টাটি ছোটোখাটো একটি মানুষের সমান। সবুজ পাহাড়ের মধ্যে একদম সোনালী এই বৌদ্ধমন্দিরটি পুরো স্থানটিতে অপরুপ এক দৃশ্যপট তৈরী করেছে। আকাশে মেঘ থাকায় এবং সন্ধ্যা হয়ে আসায় আমরা যুৎসইভাবে ছবি তুলতে পারলাম না। এছাড়া মন্দির চত্বরে চারিদিকে এমনভাবে শক্তিশালী হ্যালোজেন লাইটগুলো জ্বালানো আছে যাতে কোনো না কোনো লাইট ক্যামেরার এগেনেইস্টে পড়ছেই। তেমন ছবি না তুলতে পারলেও এর সবকিছু আমরা দেখতে পেলাম ভালভাবেই। স্বনর্মন্দির থেকে ফেরার পথে আমাদের গাড়ীর চাকা পাংচার। যাক স্পেয়ার লাগিয়ে বান্দরবান শহরে এসে চাকা সারাতে পারলাম। এই ফাঁকে আমরা বান্দরবান শহরটা একটু ঘুরে দেখলাম।
শিশির-ভেজা সকালবেলা আজ কি তোমার ছুটির খেলা,
বর্ষণহীন মেঘের মেলা তার সনে মোর মনকে ভাসাই ... ...




পরদিন ভোরবেলায় রওয়ানা হলাম, গন্তব্য: নীলাচল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ফুট উঁচুতে নীলাচল এর চুড়া। রাস্তাটা একেবারে ছবির মতো। কেমন স্বপ্নের মতো আবহ। উপরের দিকে মনে হচ্ছে মেঘগুলো ধরা ছোঁয়ার মধ্যে এসে যাচ্ছে। সকালের কুয়াশা এটাকে করে তুলেছে আরো রহস্যময়ী।



ওপর থেকে দেখা যাচ্ছে ট্রাইবাল গ্রামগুলো। অনেক দুরে দেখা যাচ্ছে কিছু “খেলনা ঘরবাড়ী”? আসলে ওটাই বান্দরবান শহর। অসাধারন ল্যান্ডস্কেপ!!!




এখান থেকে জানতে পারলাম জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে নীলাচল-এর ছোট্ট এই কটেজটির ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। রাতে থাকারও ব্যবস্থা আছে। থাকার জন্য জেলা প্রশাসনের অফিস থেকে বুকিং করতে হয় প্রতি রাত ১৫শ টাকা খরচে। তবে বারান্দায় বিনা খরচেই থাকা যায়। কিন্তু এখানে কোনো সাপোর্ট নেই। বিদ্যুৎ নেই। রাতে থাকলে খাবার, পানি ব্যাটারীর লাইট/ফ্যান ইত্যাদী ব্যবস্থাগুলো নিজ উদ্দোগেই করতে হবে। দু-একটা মুদি দোকান আছে। এখান থেকেই পযর্টকরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারে। এই যেমন বনরুটি, কলা, মিনারেল ওয়াটার, বিস্কিট, চা ইত্যাদি। অ্যাডভেঞ্চার এর জন্য এটা দারুন একটা জায়গা। তবে থাকার জন্য যতটুকু ফ্যাসিলিটি এভেইলেবল তাতে কেবল সিঙ্গেল-দেরই রাতে থাকা সম্ভব বলে মনে হল।



ঢাকার উদ্দেশ্যে বান্দরবান ছাড়লাম ১৭ তারিখ সকালে। রাত ৮টার দিকে ঢাকা পৌঁছে গেলাম। পরদিন থেকেই আবার সেই ব্যস্ততা, রোডজ্যাম, গাড়ীর হর্ন, চিৎকার ... ... । মেমরিতে থাকা এ ক’দিনের অনেক ইভেন্টই বারবার রিপ্লে হবে মনের মিডিয়া প্লেয়ারে।

এবার চিম্বুক যেতে পারিনি শীতের শেষের দিকে একটা চেষ্টা চালাব।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে নভেম্বর, ২০১০ দুপুর ১২:১০
১৭টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×