আমার প্রিয় পোস্ট

~~~কেমন যেন একটা উৎকন্ঠায় আছি.......

~~~বাংলার মুক্তি সংগ্রাম ও সংবিধানের কাটা-ছেঁড়া.......

২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ৯:২৭

শেয়ারঃ
0 0 0

প্রতিটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মত আমরাও একটি সংবিধানের গর্বিত অংশীদার। ১৯৭২ সালে একটি যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে এই সংবিধান ছিল যাদুর কাঠির মত, যার দ্বারা পরিচালিত হবে এই দেশ। বাংলাদেশের অবিকৃত সংবিধানের মূল স্তম্ভগুলো হলঃ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র। এই সংবিধান থেকে সুকৌশলে কিছু কথা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা বর্ণনা করার আগে আমাদের এই বাংলার দীর্ঘ সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা যৌক্তিক বলে মনে করি। আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ, কোন আকস্মিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এর উৎপত্তি হয়নি। এদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, প্রায় দুইশ বছরেরও বেশি সময় কাল আমরা ছিলাম পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ, যখন ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর প্রান্তরে লর্ড ক্লাইভের ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে মরণপন লড়ায়ে সেনাপতি মীর জাফর আলি খাঁ ও তার অনুচরদের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। কিন্তু বাঙালীরা কখনোই ইংরেজদের এই ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষন সহজে মাথা পেতে নেয়নি। তাদের মুক্তির সৌভাগ্য সূর্য্যকে ছিনিয়ে আনার নিরলস প্রচেষ্টা, নিরবছিন্ন ও প্রগাঢ় আত্মত্যাগ ইতিহাসের বুকে স্বাক্ষী হয়ে বিদ্যমান। ১৮৫৭-৫৯ সালে জনতার এই অসন্তোষ সিপাহি বিদ্রোহের আকারে আত্মপ্রকাশ করে। বিদেশী ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী জনতার এটাই এদেশের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত সংগ্রাম। সংক্ষেপে বললে এরপর বাংলার সুযোগ্য সন্তান তিতুমীর ও শরীয়তুল্লাহ প্রমূখের প্রতিরোধ সংগ্রাম, চট্টগ্রামের অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেন, কল্পনাদত্ত ও বাঘা যতিন প্রমুখের সশস্ত্র প্রতিবাদ। জনগণের কারণে, জনগণই পাকিস্তান এনেছিল, ভোট দিয়ে ১৯৪৬-এ। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ব্রিটিশ সরকার দ্বি-জাতি ভিত্তিক পরিকল্পনায় ভারতবর্ষকে দ্বিখন্ডিত করে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান নামে দুটো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ভারতবর্ষের পূর্ব ও পশ্চিম এর দুটো অংশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব হয় প্রায় দেড় হাজার মাইলের মতো। স্বাধীন হয়েও পূর্ব পাকিস্তান ধীরে ধীরে পশ্চিমাংশের কলোনী হয়ে উঠল, এখানকার বাঙালীরা আগের মতোই রয়ে গেল, অবহেলিত। তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই আঘাত এল বাঙালীর ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় পাকিস্তানের জনক ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করলেন উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ঐ মাসের ২৪ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ সাহেব একই উক্তি করেন। বাঙালীরা বুঝে নিল পাকিস্তান সৃষ্টির সঙ্গে মুক্তি সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেনি। বরং নতুন ভাবে শুরু হলো। ঐদিন এদেশের ছাত্র সমাজ প্রতিবাদের ঝড় তোলে। শুরু হলো ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সাল, এল অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি। ছাত্রজনতার মিছিল আর শ্লোগানে মুখর হয়ে উঠল রাজপথ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের হুকুমে পুলিশ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাল। ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হলো শহীদ সালাম-জব্বার-রফিক-বরকত প্রমুখ ছাত্র জনতার বুকের রক্তে। তাদের এই আত্মাহুতি বাঙালীর মুক্তি আন্দোলনকে আরো এগিয়ে নিয়ে গেল। দেশব্যাপী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু হলো। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বেগবান ও সফল হয়েছে জনগনের অংশ গ্রহণের ফলে। অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা স্বীকৃতি পেয়েছিল। ১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচন হলো। এল ৯২-ক ধারা, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচিত হলো। সেইসঙ্গে শুরু হলো স্বায়ত্ব শাসনের দাবি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান শুরু করলেন তার ঐতিহাসিক ছ’দফা আন্দোলন। সে বছর ১৩ই মে ও ৭ই জুন ছ’দফার স্বপক্ষে প্রদেশব্যাপী পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হয়। জাতির প্রতি দেওয়া ভাষণে ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন ও জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন। ৭০’-এর ডিসেম্বরে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬৯টি আসনের ১৬৭টিতে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু বিধিমতো আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হলো না। আলোচনার পর আলোচনা চলতে থাকল, বাঙ্গালির হাতে ক্ষমতা এলো না। এ পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব এক সংবাদ সম্মেলন আহবান করলেন। সেখানে তিনি ২রা মার্চ ঢাকায় এবং ৩রা মার্চ প্রদেশব্যাপী হরতালের ডাক দিলেন। সেই সঙ্গে জানালেন ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন তিনি- সেখানে চুড়ান্ত কার্যক্রম ঘোষণা করা হবে। ২রা ও ৩রা মার্চ হরতাল পালন করলেন বিক্ষুব্ধ জনতা। শত শত সভা আর শোভাযাত্রায় মুখরিত হয়ে উঠল ঢাকা শহর। হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হল-’ষড়যন্ত আর নয়, পরাধীনতার গ্লানি আর সইব না, চাই মুক্তি, চাই মুক্তি’। এল ৭ই মার্চ, মুজিব এক ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করলেন, , “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ২৫শে মার্চের কালো রাত, বর্বর হানাদার বাহিনী নৃশস পাশবিকতায় বাঙ্গালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল সে রাতে। শুরু হল বাংলার বুকে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ও জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। ঐ রাতেই বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হবার আগে দিলেন স্বাধীনতার ঘোষনা। নয় মাস মরণপন যুদ্ধের পর আসল স্বাধীনতা, বাংলার মাটি হল স্বাধীন। স্বাধীন দেশে লেখা হল বাংলাদেশের সংবিধান। এবার ফিরে যাওয়া যাক মূল বিষয়ে। ৭ই মার্চের সেই বিখ্যাত জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” কিন্তু এই “মুক্তি” ও “স্বাধীনতা” শব্দ দু’টির মধ্যে কি কোন পার্থক্য ছিল? পার্থক্য নিশ্চয়ই ছিল, নইলে পরে, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে সংবিধানে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতে “মুক্তি” সরিয়ে দিয়ে সে-জায়গায় “স্বাধীনতা” বসানো হলো কেন, কেন প্রয়োজন পড়লো এই সংশোধনের। আমাদের আদি সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে, এক নম্বর অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছিল, “আমরা বাংলাদেশের জনগন ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষনা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি।” ১৯৭৮ এ জারি করা এক ফরমানের বলে সংবিধানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রস্তাবনার ওপরে লেখা হয়েছে, “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম”, যা আগে বিদ্যমান ছিল না এবং প্রথম অনুচ্ছেদে যেখানে ছিল “জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম”, সেখানে তা বদল করে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে “জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ”। সেই সঙ্গে যোগ করা হয়েছে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা”র কথা, এবং বাদ দেয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। আদি সংবিধানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল; এবং তার স্থান ছিল জাতীয়তাবাদের পরেই। অর্থাৎ, জাতীয়তাবাদের পরবর্তী অঙ্গীকারই ছিল সমাজতন্ত্রের। ১৯৭৮ সালের ঐ ফরমানে সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়া হয় নি সত্য, কিন্তু তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সর্বশেষে, আর সমাজতন্ত্র হল “অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি, সকলের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা”। সংবিধানে আরো পরিবর্তন হয়েছে নাগরিকদের জাতীয়তাবাদ যা পূর্বে ছিল “বাঙালি”, পরিবর্তনের ফলে তা দাঁড়িয়েছে “বাংলাদেশী”তে। এই পরিবর্তনগুলো মোটেও পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, তারা একটি অভিন্ন চিন্তাধারার প্রতিফলন বটে। ওই চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে আছে একেবারে সূচনাতেই, সংবিধানের পরিবর্তনে যেখানে “জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম”কে রুপান্তরিত করা হয়েছে “জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ”-এ। কিন্তু এই দুইয়ের পার্থক্য বিস্তর। “যুদ্ধ” একাত্তরের ব্যাপার বটে, কিন্তু “সংগ্রাম”-এর ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, সংগ্রাম একাত্তরের ঘটনা নয়। ১৯৭৮-এ যাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত তাঁরা যুদ্ধটাকেই দেখতে চেয়েছেন সংগ্রামকে উপেক্ষা করে। যুদ্ধে তারা ছিলেন, সংগ্রামে ছিলেন না। আর মুক্তি ও স্বাধীনতা যে এক নয় তাও উনারা খেয়াল করেছেন। মুক্তি অনেক ব্যাপক ও গভীর ব্যাপার। স্বাধীনতা বলতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বোঝানো সম্ভব, কিন্তু মুক্তি বলতে বোঝাবে সার্বিক জাতীয় মুক্তি। স্বাধীনতার জন্য লড়াই হয়েছে একাত্তরে। আমরা পাকিস্তানী রাষ্ট্রের অধীনতা থেকে বের হয়ে এসে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু সেটা একমাত্র লক্ষ্য ছিল না, বস্তুতঃ মূল লক্ষ্য ছিল অনেক বিস্তৃত, সেটা ছিল জনগনের মুক্তি। যে জন্য রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের উল্লেখ করতে হয়েছে, বলতে হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের কথা। অঙ্গীকার করতে হয়েছে এই চারটি মূলনীতি প্রতিষ্ঠার। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা প্রয়োজন ছিল ওই সর্বাত্মক লক্ষ্যে পৌঁছবার জন্যই। স্বাধীনতা প্রথম পদক্ষেপ, মুক্তি চূড়ান্ত লক্ষ্য। সংগ্রাম ছিল মুক্তির। মুক্তির জন্য সংগ্রাম দীর্ঘকালের। এই লড়াইয়ে নানা মানুষ এসেছেন, সংগঠন এসে যোগ দিয়েছে। সকলের ভূমিকা সমান নয়। নানা মাত্রার ও মাপের। কিন্তু সকল স্রোত মিলেই বৃহৎ ধারাটি তৈরি। হঠাৎ করে অভ্যুত্থান ঘটে নি। ভুঁইফোঁড় নয়। একাত্তরে শুরু নয়, শেষও নয়। মুক্তির সংগ্রাম এখনো চলছে। এবং চলবে। শেষ যে হয় নি তার প্রত্যক্ষ প্রমান তো সংবিধানের ওই পরিবর্তনগুলো। ওগুলোর উদ্দেশ্য স্পষ্ট। সেটা হচ্ছে সংগ্রামের লক্ষ্যকে অস্পষ্ট করে দেয়া। মানুষকে ঠেলে দেওয়া পেছনে। মুক্তির সংগ্রামকে চিহ্নিত করা একটি সামরিক যুদ্ধ হিসাবে। মুক্তির সার্বিক যুদ্ধে একাত্তরের মুখোমুখি লড়াই একটা অত্যন্ত বড় মাপের ঘটনা, অতবড় ঘটনা এর আগে কখনো ঘটে নি; কিন্তু সেটা একমাত্র ঘটনা নয়। এদেশের মানুষ মুক্তির জন্য সংগ্রাম অনেক কাল ধরে করে এসেছে। যা উপরে বাংলার সংক্ষেপিত ইতিহাস থেকে সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান।শাসনক্ষমতা যখন জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে গেল, এলো দূরবর্তীদের শাসন তখনই সম্ভব হয়েছে মূলনীতির পরিবর্তন। মুক্তির জায়গায় এসেছে স্বাধীনতা। মুক্তি যুদ্ধ ছিল একটা স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম। যুদ্ধটা সংগঠিত, পরিকল্পিত ভাবে শুরু হয় নি। চলেও নি। বিপরীতে পাকিস্তানীরা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও সুসজ্জিত। তাদের ছিল বিদেশী শক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন মিত্র বলতে বাঙালীর প্রায় কেউই ছিল না। ভারত যে যুক্ত হয়েছে তা আগের কোন যোগাযোগের কারণে নয়, ঘটনা পরস্পরায়। এমনকি যারা ছিল নেতৃত্বে সেই আওয়ামী লীগও একথা বলে নি যে যুদ্ধ তারা শুরু করেছে। বলেছে যুদ্ধ তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যে ঐক্যবদ্ধ ছিল তাও নয়। সেখানে যেমন তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন, তেমনি ছিল খন্দকার মোস্তাক আহমদ। তাজউদ্দিন আপোসে বিশ্বাসী ছিলেন না, খন্দকার মোস্তাক সব সময়েই আপোসের পথ খুঁজছিল। কিন্তু তাজউদ্দিনের আশেপাশে যারা ছিল তারাও সবাই যে তাঁর সঙ্গে ছিল তাও নয়। বিরোধ ছিল, সে জন্য মুক্তি বাহিনীর সমান্তরালে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিল। খন্দকার মোস্তাকরা যে শক্তিহীন ছিল না তা বোঝা গেছে ১৯৭৫-এর নির্মম হত্যাকান্ডে। এও তাৎপর্যহীন নয় যে, তার আগেই মন্ত্রীসভা থেকে তাজউদ্দিন বাদ পড়ে গেছেন, মোস্তাক বাদ পড়েন নি। যুদ্ধের সময় জাতীয় সরকার গঠনের দাবী উঠেছিল। সেটা গৃহীত হয় নি। হবার কথাও নয়। তবে ছাড় হিসাবে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছিল, কিন্তু সেই পরিষদের একটির বেশি বৈঠক হয়নি। জাতীয় সরকার গঠনের দাবী স্বাধীনতার পরেও তোলা হয়েছিল। গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের শত্রু কে ছিল? শত্রু ছিল তারাই যারা জাতিয় মুক্তির বিপক্ষে ছিল। অর্থাৎ আলবদর রাজাকার সহ সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সমর্থকরা, দক্ষিনপন্থীরা। শত্রু ছিল তারা যারা মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে মনে করেছে, এবং নতুন রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগুতে না দিয়ে পেছন দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছে, বড় পাকিস্তান ভেঙ্গে ছোট পাকিস্তান গড়বে ভেবেছে। ১৯৭৮-এর সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো তাদেরই কাজ। এরশাদের সময়ে পুঁজিবাদের পথকে আরো প্রশস্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ধর্ম প্রবর্তন পশ্চাদগমনেচ্ছুদের আরকেটি বিজয় চিহ্ন। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিব নীতি নির্ধারনের ক্ষেত্রে ব্যর্থ না হলে এই দেশের চেহারা আজ অন্য রূপও ধারন করতে পারত। সংবিধানকে চতুর্থ বারের মত পরিবর্তন করে ১৯৭৫-এর ২৫শে জানুয়ারী শেখ মুজিব যে বক্তৃতা দেন সেটি মুক্তিকামী জনগণের কন্ঠস্বর নয়, সেটি একজন পথ হারানো জন-নায়কের স্বগতোক্তি। অত্যন্ত উঁচু একটি জায়গায় ছিলেন তিনি, অতটা জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতা কখনো কোনো বাঙালী রাষ্ট্রনায়ক লাভ করেন নি। কিন্তু তিনি এগুবার পথ দেখতে পাচ্ছিলেন না। তার প্রধান কারণ জনগন থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। ঘাতকেরা ওই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়েছে। নইলে অতিনিষ্ঠুর পাকিস্তানী শাসকেরা যে-কাজ করতে সাহস পায় নি, সে-কাজ করবার মত দুঃসাহস স্থানীয় দুর্বৃত্তরা সংগ্রহ করতে পারতো না। বাংলার জনগণ যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই তার শক্তির পরীক্ষা দিয়েছে। ভোট দিয়েছে ১৯৭০-এ, যেমন দিয়েছে ১৯৪৬-এ। জনগণ সংগ্রাম করেছে, কিন্তু মুক্তি পায়নি। রাষ্ট্র এখন কতটা স্বাধীন তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যায়, কিন্তু জাতি যে মুক্ত নয় সেটা সন্দেহাতীত। জাতি বলতে জনগণকেই বোঝায়। সেই জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতার ধারে কাছে নেই। দেশে উন্নতি হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু উন্নতি মানে বড় জোর ২০ জনের উন্নতি; এবং ৮০ জনের অবনতি। ধনী-দরিদ্রের তারতম্য বোঝাতে আকাশ-পাতালের উপমা অগ্রাহ্য নয়। ওই দুই প্রান্তের মধ্যেই বিভিন্ন স্তরের বিন্যাস। কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম চলছে, চলবে। সরবে, নয়তো বা নীরবে। তাকে চলতেই হবে, জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।।

সুত্রঃ"মঙ্গলধ্বনি"তে প্রকাশিত আমার লেখা

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): সংগ্রামমুক্তিরাজনীতিসমাজতন্ত্র ;
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:২৯ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ৯:৩৩
হাসান শহীদ ফেরদৌস বলেছেন: সুন্দর বিশ্লেষন। প্রিয়তে।
২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ৯:৫২

লেখক বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ।।

২. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ৯:৪৬
সবুজ-ভাই বলেছেন: দেশটাকে আর আপন মনে হয় না জানেন। ভেবেছিলাম, বাংলা মা আমার , আমার মা হয়েই থাকবে কিন্তু পরবর্তিতে মনে হল মায়ের বিয়ে হবে বুঝি ভারতের সাথে কিন্তু তাও হল না। ভারত বিয়ে না করেই বাংলা মা কে ব্যবহার করার অনুমতি পেয়ে গেছে। যাকে এমনিতেই ব্যবহার করা যায় তাকে যে কেও বিয়ে করেনা এটা ভালোই বুঝি । আমার মা'র কান্না আমি শুনতে পাই এতদূর থেকেই কিন্তু কোন অজানা কারনে মার কাছে থেকেও আপনারা কেন শুনতে পান না আজও বুঝতে পারিনি।

যাই হোক একটা প্রশ্ন , ২১ শে ফেব্রুয়ারী আর ২৫ শে ফেব্রুয়ারী কোন দিনটা বেশি শোকের ?

একটা ঘটনা স্বাধীণতা পাবার আগে আরেকটি পরে ।
২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:০৯

লেখক বলেছেন: আপনার কথায় সহমর্মিতা প্রকাশ করছি।।

আপনি বলেছেন,
"একটা প্রশ্ন , ২১ শে ফেব্রুয়ারী আর ২৫ শে ফেব্রুয়ারী কোন দিনটা বেশি শোকের ?

একটা ঘটনা স্বাধীণতা পাবার আগে আরেকটি পরে ।"


দু'টোই শোকের, তবে ঘৃন্যতার দিক থেকে ২৫শে ফেব্রুয়ারীর ঘাতকেরা আমার কাছে অগ্রাধিকার পাবে। কারণ, তারা স্বজাতির উপরে ঐদিন হামলে পরেছিল।।

আসলে ঐদিন যা ঘটেছিল তার কথা মনে হলে এখনো আমি কেমন যেন হয়ে যায়।
যাই হোক, আমি ভাবছি ২৫শে ফেব্রুয়ারীতে একটি নোট লিখব। আশা করি, আপনার প্রশ্নের সবিস্তার উত্তর পাবেন।।

ধন্যবাদ, লেখাটা পড়ার জন্য।।

৩. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:২৫
সবুজ-ভাই বলেছেন: ২৫শের সকল তথ্য সহ একটা লেখা ইতালীর পত্রিকায় এবং বুকলেট আকারে প্রকাশের জন্যে সহায়তা চাচ্ছি। সব বিচারের দাবী ৩০ বছর পর করতে চাই না। জনগনকে সঠিক তথ্যের সাথে বারবার সম্পর্কিত না রাখলে তারা খুব সহযেই দিকভ্রান্ত হয়। একটু হাত বাড়ালে খুশী হব।

২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৪৬

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে।।
পাশে আছি।।

৪. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:৫৯
কঠিনলজিক বলেছেন: ২০১১ এর মুক্তিযোদ্ধের ডাক ।

Click This Link
৫. ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১:১৭
পাহাড়ের কান্না বলেছেন: প্রিয়তে নিয়ে গেলাম।
২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১:০৯

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে।।

৬. ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ২:৩২
ত্রিশোনকু বলেছেন: সুন্দর পোস্ট।

যুক্তিগুলো ধারালো। প্রিয়তে। :)
২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১:১০

লেখক বলেছেন: অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ।।

৮. ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:৫৬
তায়েফ আহমাদ বলেছেন: পরশুদিনের পোষ্ট। চোখে পড়লেও কেন যেন পড়া হয় নি। সংবিধান নিয়ে কথা বলাটা কঠিন বলেই বোধ হয়!:|
এখন পড়ে মন্তব্য করতেই হচ্ছে।
‘মুক্তি সংগ্রাম’-এর বদলে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ শব্দের ব্যাপারে আপনার মতামতের সাথে ঐক্যমত্য পোষন করছি।

এরপরেই আপনার একটা ভুলকথন ধরিয়ে দিই। গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫৩(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, “বাংলায় এই সংবিধানের একটি নির্ভরযোগ্য পাঠ ও ইংরাজীতে অনূদিত একটি নির্ভরযোগ্য অনুমোদিত পাঠ থাকিবে এবং উভয় পাঠ নির্ভরযোগ্য বলিয়া গলপরিষদের স্পীকার সার্টিফিকেট প্রদান করিবেন।” এরপরেই ১৫৩(৩) অনুচ্ছেদের শেষে বলা আছে, “তবে, শর্ত থাকে যে, বাংলা ও ইংরাজী পাঠের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাবে।”
অতএব, আপনার ভাষ্যের (পরিবর্তিত অবস্থায় তাতে বলা হয়েছে, “বিরোধের ক্ষেত্রে ইংরেজি পাঠই প্রাধান্য পাবে।”) সত্যতা পেলাম না। সেই সাথে, প্রয়াত রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের একটা কথা না বলেই পারছি না, (যার সাথে আমিও ঐক্যমত পোষন করি),“ এই একটি মাত্র কথা দ্বারা ভবিষ্যতের জন্য কত যে বিরোধের বীজ বপন করা হইয়েছে, তার হিসাব করা কঠিন। সংবিধানের যে কোন অনুচ্ছেদের বাংলা ও ইংরাজী পাঠ মিলাইয়া পড়লেই বোঝা যাইবে যে সুস্পষ্ট সুন্দর ও প্রাঞ্জল ইংরাজি পাঠের অস্পষ্ট, দূর্বল ও দ্ব্যার্থবোধক অক্ষম অনুবাদ করা হইয়াছে। সাধারন আইন-আদালতে বা সাংবিধানিক আদালতে কোনও বিধানের ব্যাখ্যার উপর বিতর্ক বাঁধিলে সংবিধানের প্রকৃত মর্মার্থ ও আইন-রচয়িতার উদ্দেশ্য হৃদয়ংগম করিতে হইলে ইংরাজি-পাঠটির প্রাধান্য না দিয়া উপায় নাই।” (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর- নয়া অধ্যায়)

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, বাস্তবতা বিবর্জিত আবেগ হতে উৎসারিত “বাঙালী জাতীয়তাবাদ”, আমাদের জন্য কত বড় বিষফোঁড়ার জন্ম দিয়েছে, তার প্রমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্ত পরিবেশ। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, উপজাতিদের প্রতি, “তোরা বাঙালী হয়ে যা”- এ কথা ঐক্যবদ্ধ জাতীয় চেতনার মূলে কুঠারাঘাত স্বরূপ। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদই যুক্তিযুক্ত ছিল। সমস্যা হচ্ছে, পরিবর্তনটা এসেছিল সামরিক সরকারের হাতে, যা নীতিগতভাবে ঠিক হয় নি, অথচ, সময়ের দাবী ছিল। অবশ্য চতুর্থ সংশোধনীর মত অগনতান্ত্রিক অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধানের মূল চেতনার বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন ঐ সময়ের নির্বাচিত গনতান্ত্রিক সরকারও- এটা অস্বীকারের উপায় নেই।

তারপরেই আমার যেটা মাথায় ধরে না তা হলো, সমাজতন্ত্র আর গনতন্ত্রের মত তাত্ত্বিকভাবেই দুইটি ভিন্ন মেরুর মতাদর্শ একই রাষ্ট্রের মূলনীতিতে কিভাবে সহাবস্থান নেয়! সর্বোপরি, ১৯৭০ সালে যে মেনিফেস্টোর উপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার জনগনের ম্যান্ডেট লাভ করেছিল, তার সাথে উক্ত মূলনীতি কতটা সামঞ্জস্যশীল ছিল, তা নিয়ে ও বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়।

তথ্যবহুল লেখায় জ্ঞান ঝাড়ার সুযোগ দেবার জন্য ধন্যবাদ।
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:২৭

লেখক বলেছেন: প্রথমেই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, পুরো লেখাটা পড়ার জন্য।।

আপনি খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের সর্বোচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার বর্জিত। এর কারণ হলো, সংবিধানের ইংরেজী অনুলিপি বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করায়।।

জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে আবেগের ব্যবহার বেশি ছিল, সহমত পোষন করছি। আমি এব্যাপারে নিজের অবস্থান দেইনি, শুধু সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলোর কথা বলার জন্য তার উল্লেখ করেছি।।

আর সমাজতন্ত্রের কথা বললে বলতে হয়, সমাজতন্ত্রই গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ। জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ব্যতিত সমাজতন্ত্র প্রাতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব নয়।।
সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে আপনার যে কোন জিজ্ঞাসা থাকলে আমাকে করতে পারেন, উত্তর দেবার চেষ্টা করব।।

 

মোট সময় লেগেছে ১.০১৫২ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই