somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

~~~বাংলার মুক্তি সংগ্রাম ও সংবিধানের কাটা-ছেঁড়া.......

২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ৯:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতিটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মত আমরাও একটি সংবিধানের গর্বিত অংশীদার। ১৯৭২ সালে একটি যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে এই সংবিধান ছিল যাদুর কাঠির মত, যার দ্বারা পরিচালিত হবে এই দেশ। বাংলাদেশের অবিকৃত সংবিধানের মূল স্তম্ভগুলো হলঃ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র। এই সংবিধান থেকে সুকৌশলে কিছু কথা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা বর্ণনা করার আগে আমাদের এই বাংলার দীর্ঘ সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা যৌক্তিক বলে মনে করি।

আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ, কোন আকস্মিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এর উৎপত্তি হয়নি। এদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, প্রায় দুইশ বছরেরও বেশি সময় কাল আমরা ছিলাম পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ, যখন ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর প্রান্তরে লর্ড ক্লাইভের ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে মরণপন লড়ায়ে সেনাপতি মীর জাফর আলি খাঁ ও তার অনুচরদের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। কিন্তু বাঙালীরা কখনোই ইংরেজদের এই ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষন সহজে মাথা পেতে নেয়নি। তাদের মুক্তির সৌভাগ্য সূর্য্যকে ছিনিয়ে আনার নিরলস প্রচেষ্টা, নিরবছিন্ন ও প্রগাঢ় আত্মত্যাগ ইতিহাসের বুকে স্বাক্ষী হয়ে বিদ্যমান। ১৮৫৭-৫৯ সালে জনতার এই অসন্তোষ সিপাহি বিদ্রোহের আকারে আত্মপ্রকাশ করে। বিদেশী ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী জনতার এটাই এদেশের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত সংগ্রাম। সংক্ষেপে বললে এরপর বাংলার সুযোগ্য সন্তান তিতুমীর ও শরীয়তুল্লাহ প্রমূখের প্রতিরোধ সংগ্রাম, চট্টগ্রামের অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেন, কল্পনাদত্ত ও বাঘা যতিন প্রমুখের সশস্ত্র প্রতিবাদ।

জনগণের কারণে, জনগণই পাকিস্তান এনেছিল, ভোট দিয়ে ১৯৪৬-এ। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ব্রিটিশ সরকার দ্বি-জাতি ভিত্তিক পরিকল্পনায় ভারতবর্ষকে দ্বিখন্ডিত করে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান নামে দুটো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ভারতবর্ষের পূর্ব ও পশ্চিম এর দুটো অংশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব হয় প্রায় দেড় হাজার মাইলের মতো। স্বাধীন হয়েও পূর্ব পাকিস্তান ধীরে ধীরে পশ্চিমাংশের কলোনী হয়ে উঠল, এখানকার বাঙালীরা আগের মতোই রয়ে গেল, অবহেলিত। তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না।

স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই আঘাত এল বাঙালীর ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় পাকিস্তানের জনক ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করলেন উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ঐ মাসের ২৪ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ সাহেব একই উক্তি করেন। বাঙালীরা বুঝে নিল পাকিস্তান সৃষ্টির সঙ্গে মুক্তি সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেনি। বরং নতুন ভাবে শুরু হলো। ঐদিন এদেশের ছাত্র সমাজ প্রতিবাদের ঝড় তোলে। শুরু হলো ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সাল, এল অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি। ছাত্রজনতার মিছিল আর শ্লোগানে মুখর হয়ে উঠল রাজপথ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের হুকুমে পুলিশ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাল। ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হলো শহীদ সালাম-জব্বার-রফিক-বরকত প্রমুখ ছাত্র জনতার বুকের রক্তে। তাদের এই আত্মাহুতি বাঙালীর মুক্তি আন্দোলনকে আরো এগিয়ে নিয়ে গেল। দেশব্যাপী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু হলো। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বেগবান ও সফল হয়েছে জনগনের অংশ গ্রহণের ফলে। অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা স্বীকৃতি পেয়েছিল। ১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচন হলো। এল ৯২-ক ধারা, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচিত হলো। সেইসঙ্গে শুরু হলো স্বায়ত্ব শাসনের দাবি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান শুরু করলেন তার ঐতিহাসিক ছ’দফা আন্দোলন। সে বছর ১৩ই মে ও ৭ই জুন ছ’দফার স্বপক্ষে প্রদেশব্যাপী পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হয়। জাতির প্রতি দেওয়া ভাষণে ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন ও জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন। ৭০’-এর ডিসেম্বরে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬৯টি আসনের ১৬৭টিতে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু বিধিমতো আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হলো না। আলোচনার পর আলোচনা চলতে থাকল, বাঙ্গালির হাতে ক্ষমতা এলো না। এ পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব এক সংবাদ সম্মেলন আহবান করলেন। সেখানে তিনি ২রা মার্চ ঢাকায় এবং ৩রা মার্চ প্রদেশব্যাপী হরতালের ডাক দিলেন। সেই সঙ্গে জানালেন ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন তিনি- সেখানে চুড়ান্ত কার্যক্রম ঘোষণা করা হবে। ২রা ও ৩রা মার্চ হরতাল পালন করলেন বিক্ষুব্ধ জনতা। শত শত সভা আর শোভাযাত্রায় মুখরিত হয়ে উঠল ঢাকা শহর। হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হল-’ষড়যন্ত আর নয়, পরাধীনতার গ্লানি আর সইব না, চাই মুক্তি, চাই মুক্তি’। এল ৭ই মার্চ, মুজিব এক ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করলেন, , “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

২৫শে মার্চের কালো রাত, বর্বর হানাদার বাহিনী নৃশস পাশবিকতায় বাঙ্গালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল সে রাতে। শুরু হল বাংলার বুকে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ও জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। ঐ রাতেই বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হবার আগে দিলেন স্বাধীনতার ঘোষনা। নয় মাস মরণপন যুদ্ধের পর আসল স্বাধীনতা, বাংলার মাটি হল স্বাধীন। স্বাধীন দেশে লেখা হল বাংলাদেশের সংবিধান।

এবার ফিরে যাওয়া যাক মূল বিষয়ে। ৭ই মার্চের সেই বিখ্যাত জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” কিন্তু এই “মুক্তি” ও “স্বাধীনতা” শব্দ দু’টির মধ্যে কি কোন পার্থক্য ছিল? পার্থক্য নিশ্চয়ই ছিল, নইলে পরে, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে সংবিধানে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতে “মুক্তি” সরিয়ে দিয়ে সে-জায়গায় “স্বাধীনতা” বসানো হলো কেন, কেন প্রয়োজন পড়লো এই সংশোধনের।

আমাদের আদি সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে, এক নম্বর অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছিল, “আমরা বাংলাদেশের জনগন ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষনা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি।” ১৯৭৮ এ জারি করা এক ফরমানের বলে সংবিধানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রস্তাবনার ওপরে লেখা হয়েছে, “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম”, যা আগে বিদ্যমান ছিল না এবং প্রথম অনুচ্ছেদে যেখানে ছিল “জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম”, সেখানে তা বদল করে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে “জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ”। সেই সঙ্গে যোগ করা হয়েছে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা”র কথা, এবং বাদ দেয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। আদি সংবিধানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল; এবং তার স্থান ছিল জাতীয়তাবাদের পরেই। অর্থাৎ, জাতীয়তাবাদের পরবর্তী অঙ্গীকারই ছিল সমাজতন্ত্রের। ১৯৭৮ সালের ঐ ফরমানে সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়া হয় নি সত্য, কিন্তু তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সর্বশেষে, আর সমাজতন্ত্র হল “অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি, সকলের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা”। সংবিধানে আরো পরিবর্তন হয়েছে নাগরিকদের জাতীয়তাবাদ যা পূর্বে ছিল “বাঙালি”, পরিবর্তনের ফলে তা দাঁড়িয়েছে “বাংলাদেশী”তে।

এই পরিবর্তনগুলো মোটেও পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, তারা একটি অভিন্ন চিন্তাধারার প্রতিফলন বটে। ওই চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে আছে একেবারে সূচনাতেই, সংবিধানের পরিবর্তনে যেখানে “জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম”কে রুপান্তরিত করা হয়েছে “জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ”-এ। কিন্তু এই দুইয়ের পার্থক্য বিস্তর। “যুদ্ধ” একাত্তরের ব্যাপার বটে, কিন্তু “সংগ্রাম”-এর ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, সংগ্রাম একাত্তরের ঘটনা নয়। ১৯৭৮-এ যাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত তাঁরা যুদ্ধটাকেই দেখতে চেয়েছেন সংগ্রামকে উপেক্ষা করে। যুদ্ধে তারা ছিলেন, সংগ্রামে ছিলেন না। আর মুক্তি ও স্বাধীনতা যে এক নয় তাও উনারা খেয়াল করেছেন। মুক্তি অনেক ব্যাপক ও গভীর ব্যাপার। স্বাধীনতা বলতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বোঝানো সম্ভব, কিন্তু মুক্তি বলতে বোঝাবে সার্বিক জাতীয় মুক্তি। স্বাধীনতার জন্য লড়াই হয়েছে একাত্তরে। আমরা পাকিস্তানী রাষ্ট্রের অধীনতা থেকে বের হয়ে এসে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু সেটা একমাত্র লক্ষ্য ছিল না, বস্তুতঃ মূল লক্ষ্য ছিল অনেক বিস্তৃত, সেটা ছিল জনগনের মুক্তি। যে জন্য রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের উল্লেখ করতে হয়েছে, বলতে হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের কথা। অঙ্গীকার করতে হয়েছে এই চারটি মূলনীতি প্রতিষ্ঠার। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা প্রয়োজন ছিল ওই সর্বাত্মক লক্ষ্যে পৌঁছবার জন্যই। স্বাধীনতা প্রথম পদক্ষেপ, মুক্তি চূড়ান্ত লক্ষ্য। সংগ্রাম ছিল মুক্তির।

মুক্তির জন্য সংগ্রাম দীর্ঘকালের। এই লড়াইয়ে নানা মানুষ এসেছেন, সংগঠন এসে যোগ দিয়েছে। সকলের ভূমিকা সমান নয়। নানা মাত্রার ও মাপের। কিন্তু সকল স্রোত মিলেই বৃহৎ ধারাটি তৈরি। হঠাৎ করে অভ্যুত্থান ঘটে নি। ভুঁইফোঁড় নয়। একাত্তরে শুরু নয়, শেষও নয়। মুক্তির সংগ্রাম এখনো চলছে। এবং চলবে।

শেষ যে হয় নি তার প্রত্যক্ষ প্রমান তো সংবিধানের ওই পরিবর্তনগুলো। ওগুলোর উদ্দেশ্য স্পষ্ট। সেটা হচ্ছে সংগ্রামের লক্ষ্যকে অস্পষ্ট করে দেয়া। মানুষকে ঠেলে দেওয়া পেছনে। মুক্তির সংগ্রামকে চিহ্নিত করা একটি সামরিক যুদ্ধ হিসাবে। মুক্তির সার্বিক যুদ্ধে একাত্তরের মুখোমুখি লড়াই একটা অত্যন্ত বড় মাপের ঘটনা, অতবড় ঘটনা এর আগে কখনো ঘটে নি; কিন্তু সেটা একমাত্র ঘটনা নয়। এদেশের মানুষ মুক্তির জন্য সংগ্রাম অনেক কাল ধরে করে এসেছে। যা উপরে বাংলার সংক্ষেপিত ইতিহাস থেকে সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান।শাসনক্ষমতা যখন জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে গেল, এলো দূরবর্তীদের শাসন তখনই সম্ভব হয়েছে মূলনীতির পরিবর্তন। মুক্তির জায়গায় এসেছে স্বাধীনতা।

মুক্তি যুদ্ধ ছিল একটা স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম। যুদ্ধটা সংগঠিত, পরিকল্পিত ভাবে শুরু হয় নি। চলেও নি। বিপরীতে পাকিস্তানীরা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও সুসজ্জিত। তাদের ছিল বিদেশী শক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন মিত্র বলতে বাঙালীর প্রায় কেউই ছিল না। ভারত যে যুক্ত হয়েছে তা আগের কোন যোগাযোগের কারণে নয়, ঘটনা পরস্পরায়। এমনকি যারা ছিল নেতৃত্বে সেই আওয়ামী লীগও একথা বলে নি যে যুদ্ধ তারা শুরু করেছে। বলেছে যুদ্ধ তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যে ঐক্যবদ্ধ ছিল তাও নয়। সেখানে যেমন তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন, তেমনি ছিল খন্দকার মোস্তাক আহমদ। তাজউদ্দিন আপোসে বিশ্বাসী ছিলেন না, খন্দকার মোস্তাক সব সময়েই আপোসের পথ খুঁজছিল। কিন্তু তাজউদ্দিনের আশেপাশে যারা ছিল তারাও সবাই যে তাঁর সঙ্গে ছিল তাও নয়। বিরোধ ছিল, সে জন্য মুক্তি বাহিনীর সমান্তরালে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিল। খন্দকার মোস্তাকরা যে শক্তিহীন ছিল না তা বোঝা গেছে ১৯৭৫-এর নির্মম হত্যাকান্ডে। এও তাৎপর্যহীন নয় যে, তার আগেই মন্ত্রীসভা থেকে তাজউদ্দিন বাদ পড়ে গেছেন, মোস্তাক বাদ পড়েন নি। যুদ্ধের সময় জাতীয় সরকার গঠনের দাবী উঠেছিল। সেটা গৃহীত হয় নি। হবার কথাও নয়। তবে ছাড় হিসাবে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছিল, কিন্তু সেই পরিষদের একটির বেশি বৈঠক হয়নি। জাতীয় সরকার গঠনের দাবী স্বাধীনতার পরেও তোলা হয়েছিল। গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের শত্রু কে ছিল? শত্রু ছিল তারাই যারা জাতিয় মুক্তির বিপক্ষে ছিল। অর্থাৎ আলবদর রাজাকার সহ সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সমর্থকরা, দক্ষিনপন্থীরা। শত্রু ছিল তারা যারা মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে মনে করেছে, এবং নতুন রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগুতে না দিয়ে পেছন দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছে, বড় পাকিস্তান ভেঙ্গে ছোট পাকিস্তান গড়বে ভেবেছে। ১৯৭৮-এর সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো তাদেরই কাজ। এরশাদের সময়ে পুঁজিবাদের পথকে আরো প্রশস্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ধর্ম প্রবর্তন পশ্চাদগমনেচ্ছুদের আরকেটি বিজয় চিহ্ন।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিব নীতি নির্ধারনের ক্ষেত্রে ব্যর্থ না হলে এই দেশের চেহারা আজ অন্য রূপও ধারন করতে পারত। সংবিধানকে চতুর্থ বারের মত পরিবর্তন করে ১৯৭৫-এর ২৫শে জানুয়ারী শেখ মুজিব যে বক্তৃতা দেন সেটি মুক্তিকামী জনগণের কন্ঠস্বর নয়, সেটি একজন পথ হারানো জন-নায়কের স্বগতোক্তি। অত্যন্ত উঁচু একটি জায়গায় ছিলেন তিনি, অতটা জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতা কখনো কোনো বাঙালী রাষ্ট্রনায়ক লাভ করেন নি। কিন্তু তিনি এগুবার পথ দেখতে পাচ্ছিলেন না। তার প্রধান কারণ জনগন থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। ঘাতকেরা ওই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়েছে। নইলে অতিনিষ্ঠুর পাকিস্তানী শাসকেরা যে-কাজ করতে সাহস পায় নি, সে-কাজ করবার মত দুঃসাহস স্থানীয় দুর্বৃত্তরা সংগ্রহ করতে পারতো না।

বাংলার জনগণ যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই তার শক্তির পরীক্ষা দিয়েছে। ভোট দিয়েছে ১৯৭০-এ, যেমন দিয়েছে ১৯৪৬-এ। জনগণ সংগ্রাম করেছে, কিন্তু মুক্তি পায়নি। রাষ্ট্র এখন কতটা স্বাধীন তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যায়, কিন্তু জাতি যে মুক্ত নয় সেটা সন্দেহাতীত। জাতি বলতে জনগণকেই বোঝায়। সেই জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতার ধারে কাছে নেই। দেশে উন্নতি হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু উন্নতি মানে বড় জোর ২০ জনের উন্নতি; এবং ৮০ জনের অবনতি। ধনী-দরিদ্রের তারতম্য বোঝাতে আকাশ-পাতালের উপমা অগ্রাহ্য নয়। ওই দুই প্রান্তের মধ্যেই বিভিন্ন স্তরের বিন্যাস। কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম চলছে, চলবে। সরবে, নয়তো বা নীরবে। তাকে চলতেই হবে, জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।।


সুত্রঃ"মঙ্গলধ্বনি"তে প্রকাশিত আমার লেখা
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:২৯
৮টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×