এক্সিট টা নিতে ভুল হয়ে গেল। আজকাল এরকমই হচ্ছে সব কিছু। যেখানে আছি আমি যেন সেখানে থাকছি না। যা করছি, মনে মনে তার থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছি।
যাক ভুল হয়ে যাক, পরের এক্সিট দিয়ে। বেরুলেই হবে। আমার তো কোন গন্তব্য নেই আমি শুধু যাচ্ছি। আমি শুধু যেতেই চাই আমি ফিরতে চাই না। শুধু যাওয়া যাওয়া যাওয়া কোন ফিরা নেই। তা হলে কেমন হতো জীবনটা।
এক দিক থেকে আমরা শুধুই যাচ্ছি, শৈশব থেকে কৈশোরে, যৌবনে,প্রৌঢ়ত্বে, বার্ধক্যে কেমন চলে যাচ্ছি একটার পর একটা ধাপ পেরিয়ে। ফিরতে হয়না কোথাও ফেরা যায়না এখানে। কিন্তু সারা দিনমান আমরা ফিরছি সমাজ থেকে সংসারে , ঘর থেকে অফিস, কাজ থেকে বাড়ি, রাত থেকে দিন, দিন থেকে রাত, একই ঘূর্ণিচক্রে।
এই যে গাড়ি করে ছুটে চলছি, গাড়ি চালানোর কোন টেনশন নাই। ক্রজ বাটন টিপে চুপচাপ বসে থাকা শুধু স্টিয়ারিংটা হালকা করে ধরে রাখা। মিটারের কাঁটা উঠা নামার কোন ভয় নেই। মাইলের পর মাইল পেরিয়ে চলে যাও যমদূতের মত ট্রাক এসে সামনে পরবে না বা পেছন থেকে সরে যাওয়ার জন্য পোঁ পোঁ হর্ণ বাজিয়ে মন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবে না কেউ। তোমার মত তুমি যেতে থাকো।
এই ঝকমকে রোদের উজ্জ্বল আলোয় দিগন্ত বিস্তৃত সাদা বরফের মাঠ পেরুতে পেরুতে আমি মনে করছিলাম আমি এরোপ্লেনের পেটের ভিতর বাতাসে ভেসে যাচ্ছি। কোন উঠা নামা নেই কোন ঝাঁকুনি নেই। গতি টের না পেয়ে গতির ভিতর বসে থাকা।
আসলে এই মধ্য দুপুরের ঝকমকে উজ্জ্বল আলোর ভিতর, কনকনে ঠান্ডার মধ্যে থেকে আমি উপলব্ধি করছিলাম হঠাৎ যেন কোথায় এসে থমকে গেল আমার গাড়ি। এ আমি কোথায়? ঘোর ভেঙ্গে চেয়ে দেখি আমি এখন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসি। এই তো আমার প্রিয় পথ, প্রিয় শহর যাকে ফেলে চলে এসেছি নতুন এক এক্সিট নিয়ে। তারই বুকে ফাগুনের নম্র দিনে পৌঁছে গেলাম অবশেষে। না বলা কষ্টগুলো মুছে মুছে পায়ে পায়ে হাঁটছি। অনেক মানুষের ভিড়। আমি আছি ফুলার রোডে লম্বা মানুষের সারির মধ্যে দাঁড়িয়ে। ফুরফুরে ফাল্গুনি হাওয়া। রাত বারোটার একটু আগে বিশে ফেব্রুয়ারীর রাত। হাজার হাজার মানুষ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। কি ভালোলাগা আর ভালোবাসা নিয়ে। শহীদ মিনারের পাদদেশে পৌঁছানোর অপেক্ষায়। হাতে ব্যানার, ফেস্টুন, ফুল। মানুষের লম্বা লাইন আজ অনেক বড়। আজ রাত পেরিয়ে কাল দুপুর পর্যন্ত চলবে। ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে কোন ব্যক্তি নয় নাম নয় শুধু মানুষ। মানুষের পর মানুষ। মৃদু সেই সুর ভেসে আসছে। হৃদয় নাড়ানো চোখের কোল ভিজে যাওয়া। শরীর শিহরীত করা সেই সুর . ... আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি আ আ আ আ.. .. .. .... ....।
দু পাঁচজন চেনা মানুষের সাথে হালকা কুশল বিনিময় করেছি ইতিমধ্যে। ওদের সাথে কথা বলে মনেই হলোনা যে বেশ কিছুকাল ধরে অনেক দূরে আছি আমি। আমি তো চাই না ফিরতে অথচ গাড়ীর গতিতে সামনে যেতে যেতে মন চলে গেছে পিছনে কত বছর আগের সেই আল্পনা আঁকা রাস্তায়। দেয়ালে দেয়ালে কবিতা। নীলক্ষেত, চাঁনখার পুল, ফুলার রোড,শাহবাগ, ভার্সিটির চত্বর, রমনা, রেসকোর্স?, দোয়েল চত্বর মানুষে মানুষে সয়লাব। বাংলা একাডেমিতে সাজানো বইয়ের স্টল। আবৃতি,গান, বই,মাইকের শব্দ, হাসি আনন্দ, গল্প আড্ডা, পরিচিত অপরিচিত কত মুখের সারি। কত রকমের পসরা সাজানো দেশী পণ্যের সমারোহ। আদি অকৃত্রিম স্বদেশী কুটির শিল্প দিয়ে সাজানো রাস্তায় দুপাশ। প্রাণ ভরা আনন্দ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে নারী, পুরুষ।
অদ্ভুত এক মাতোয়ারা সুঘ্রানে ছেয়ে থাকত নীল ক্ষেতের রাতের বাতাস। সেই সুগন্ধ যেন আমার শরীর মনে সৌরভ ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমি হেঁটে যাচ্ছি সন্ধ্যার ফুরফুরে বাতাসে চাঁদের আলোয় উদয়ন স্কুলের সামনে দিয়ে। হঠাৎ আমার গাড়িটা থমকে দাঁড়াল সামনে রক্তচোখ সিগন্যাল। তাহলে এতক্ষণ আমি কোথায় ছিলাম। আমি শক্ত হতে চাই, নড়ে চড়ে বসি। এ এক অন্য ইনটারসেক্শন।
এখান থেকে আমি পেরিয়ে যাচ্ছি ভ্যালির পর ভ্যালি। খামারবাড়ি লেইক, বরফ জমা মাঠ, মানুষজন হীন ঘর বাড়ি। লেইকের জলে বরফ ভাসছে।
আমি বাস করছি এই নিথর বরফ সাদা বর্তমানে আর মন থাকছে হৈ চৈ জমজমাট বাংলাদেশের প্রান্তে। অদ্ভুত অদ্ভুত এই টানা পোড়েন। এতক্ষণ আমার সাথে আমার গাড়িটা চুপচাপ চলছিল, এবার হঠাৎ সে কথা বলে উঠল-
এই যাবে!
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞোস করি - কোথায়?
-এই এতক্ষণ যে সব ভাবছিলে সেখানে
- কি করে?
আমার গাড়ি কোন উত্তর দিল না। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে এবার সে ছুটতে ছুটতে ধাপে ধাপে আকাশের দিকে টেক অফ নিতে শুরু করল। আমি ক্রমশ উপরের দিকে উঠে যাচ্ছি। গাড়ির জানালা দিয়ে নিচে তাকালাম, দেখা যাচ্ছে এই শহরের রাস্তাগুলো, যা কিনা সমস্ত শহরটাকে বিশাল এক অজগরের মতন পেঁচিয়ে আছে। আমার বাহন এবার আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে দু-খানা পাখা দু-দিক থেকে মেলে দিল, আর ঠিক পঙ্খিরাজের মত ভেসে চলল আকাশে। বিশাল সৌরজগতের পূর্বদিকের আকাশটাকেই সে বেছে নিল।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৩:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




