কেমন যেন একটা ফাঁকা অনুভূতি। মাঝে মধ্যে এমন হয়। অনেক হৈ চৈ কোলাহলের পর একদম নিস্তরঙ্গ জীবনে ফিরে গেলে শূন্যতা দারুণ ভাবে যন্ত্রণা দেয় কিছু দিন। তেমনি এক অনুভূতি কদিন থেকে তোলপাড় তুলছে অন্তরে।
শূন্যতা নয়, ব্যস্ততায় কাটছে সময় তবু মনের ভিতর ঝড়ো হাওয়ার দাপট শেষের নিস্তরঙ্গ অনুভূতি। ফাঁকা অসীম থেকে মন ছুটে যাচ্ছে ব্যস্ত মুখর হাজার হাজার মাইল দূরে, অনেক অনেক দিন আগের সময়ে।
নস্টালজিক কথাটা দ্বারা আমরা প্রায় সময় আক্রান্ত হই এ যেন তেমনি এক আক্রান্ত হওয়া। উঠতে বসতে কাজ করতে মাথার ভিতর অনেক স্মৃতি ঘুরে বেড়ায়। কোন এক সময় ছিল, ঐতিহ্যের কোলাহল ছিল, গড়ে তোলার ইতিহাস ছিল, সংশয় আর ভয়, রুখে দাঁড়ানোর শক্তি মিলে মিশে আনন্দ মিলন মেলার উচ্ছ্বাস, বিজয়ের আনন্দ উৎসব ছিল।
সময়টা সাতাশি সনের জানুয়ারি। এক নাগারে হরতাল চলছে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায়। স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, হরতাল, প্রতিরোধে সোচ্চার সচেতন মানুষ। কলকারখানা, স্কুল, বাজার, অফিস, হারতালে প্রায় নিরব নিথর হয়ে যায়। হরতালের দিনগুলো মানুষ ঘরে বসে আনন্দ করে আড্ডা দেয়। যেন মজা করে ছুটির সময় কাটায়। সাত বছর ধরে জগদ্দল হয়ে বসে থাকা স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর ছাড়িয়ে সারা দেশের মানুষের মনে পৌঁছে গেছে, অনেক বেশী শক্তি সঞ্চয় করেছে। মানুষের মাঝে সারা ফেলেছে পরিবর্তনের।
এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার কোন ছেলে পুলে নাই। লোকে রাজাকে আঁটকুড়ে বলে। হঠাৎ একদিন ঘোষণা শোনা গেলো রাজার ছেলে হয়েছে। রাণীর ক্ষমতা অসীম তাকে না জিজ্ঞেস করে, রাস্তা ঘাট বিল ইজারা পর্যন্ত করা যায় না। রাণীর হাত বিশাল লম্বা সারা দেশের গ্রাম গঞ্জ পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায়। সাহেব বিবির সচিত্র প্রতিবেদনের কর্মকাণ্ডে মুখর থাকে সাহেব বিবির বাক্স। আগের দিন লাল ফিতা কাটা টানটান রাণীর কোলজুড়ে হাসে সদ্য ভূমিষ্ঠ পুত্র সন্তান। তার নিজের পেটের সন্তান। গরিব দেশের মানুষের দুঃখে পানির উপর দিয়ে হাঁটা গামবুট রাজার ঘরে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিমিষে যোগাযোগ করেন রাজা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে। রাজার জীবন বড়ই সুখের, বিলাসীতার। সব কিছু তার ইচ্ছা হয়। প্রতিবাদী মনুষদের, ট্রাক দিয়ে পিষে ফেলা হয়, ঝুলিয়ে মারা হয় আর জেলে পুড়ে রাখা হয়। দেশের মানুষের নড়ন চরন চলন বলন রাজার ইচ্ছায় বাঁধা। নিজ দেশ রংপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত গড়ে উঠে ঝকঝকে পিচের রাস্তা। আহা গরিব দেশে কি রাস্তা! রোদের আলোয় মনে হয় মরীচিকা, নদী যেন সামনে। চাঁদের আলোয় সেই পথ ধরে রাজা চলে যান নিজে লং ড্রাইভ করে সুন্দরী বিদুষী রমণীদের সাথে করে সীমান্ত এলাকায় তৈরী রাজকীয় আবাসন অবকাশে অবকাশ যাপন করতে। রাজার অঙ্ক সঙ্গী হওয়ার জন্য রমণী কুল সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় লাইন দিয়ে আছে রাজার সহচর্য পাওয়ার জন্য। টাকার খেলায় কবি নিজের লেখা বিলিয়ে দিয়েছেন রাজার চরণে, সবাই জানে, রাজা গান বেঁধেছেন, সে গান সাহেব বিবির বাক্সে প্রতিদিন বাজে, রাজার অনেক গুণ সাহিত্য পাতায় তার কবিতা ছাপা হয়। অনেক কিছু পাওয়া হলো এবার রাজার সাধ জাগল কবির আসর করার। জানুয়ারি খবর পাওয়া গেলো স্বঘোষিত কবি প্রেসিডেন্ট, নিজের কবিত্ব বিদেশবাসীর কাছে প্রচার করার জন্যে, দেশ বিদেশের কবিদের আমন্ত্রণ করে কবিতার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠান হবে ফেব্রুয়ারি এক ও দুই তারিখে।
আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান, শামসুর রাহমান নির্মলেন্দু গুণ সহ দেশের সব নামী কবির কাছে আমন্ত্রণ পত্র এলো। দেশ বিদেশের কবি আসছেন তাই শুনে অনেক কবি কাছা খুলে দৌড় দিলেন, কে আমন্ত্রণ করছেন তা না ভেবেই। আল মাহমুদ যার কবিতা যৌবনের মুখে মুখে, বড় ভাললাগার কবি হৃদয়ের কাছের কবি, মাটির কাছের কবি। তিনিও রাজসভার আমন্ত্রণে ভুলে গেলেন নিজের অস্তিত্ব। উন্মাদ বিদ্রোহী, নজরুরের মতন কবি প্রতিবাদ শুরু করলেন। খাওয়া ঘুম হারাম এই কবি সভায় যেতে দেয়া যাবেনা দেশের প্রধান কবিদের কি করে ঠেকানো যায়? রাজ কবি সভা হবে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় সেখানে ক’জন কবি আর প্রতিবাদ করতে যাবেন সাহস করে। আর গুলাগুলির মুখে ঠেলে দেয়া যায় না দেশের কবিকুলকে। কবি অস্থির চিন্তায়, অস্থির মাথা থেকে বের হলো এক বিকল্প সমাধান কবি সভার প্রতিবাদ জানাতে হবে কবিতার মাধ্যমে। দেশের সকল কবিদের জড়ো করে করতে হবে কবিতা উৎসব। গুটিকয় সহযোগী নিয়ে অল্প কদিনের অমানুষিক পরিশ্রমে পৌঁছে গেলো খবর দেশের আনাচে কানাচে। সে সময় তো মানুষের হাতে হাতে এমন মুঠো ফোন ছিল না। দুরালাপনী? ছিল না সবার বাড়িতে। সায়দাবাদ, গাবতলি, কমলাপুর থেকে দেশের দূর দূরান্তের পথে চলা প্রতিটি ড্রাইভারের কাছে দেয়া হলো হাতে লেখা আমন্ত্রণ বার্তা প্রতিটি শহরে পৌঁছে দেয়ার জন্য। এছাড়া ঢাকা থেকে যে অন্য শহরে যাচ্ছে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে কবিতা উৎসবের খবর। প্রতিটি শহরের কবিতা প্রেমী প্রতিবাদী কবিরা আগ্রহী হয়ে নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট দল তৈরী করে ঢাকায় যাবার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করল। তৈরী করল নিজেদের শ্রেষ্ঠ লেখাটিও সেই সাথে কবিতা উৎসবের মঞ্চে পড়ার জন্য। প্রতিবাদী সব কবিতা ছড়া রচিত হতে লাগল দেশ ব্যাপী।
আল মাহমুদকে কিছুতেই ফিরানো গেলো না রাজ কবি সভায় যাওয়া থেকে। যুবকরা পণ করেছে শামসুর রাহমানকে আমাদের পক্ষে রাখতেই হবে। শামসুর রাহমান নির্বিবাদী মানুষ। সভা সমিতি পছন্দ নয় তেমন। আপন মনে কবিতায় সমৃদ্ধ করেছেন বাঙলা সাহিত্য। তিনি জনগনের পক্ষে চলে এলেন,কবিতায় প্রতিবাদ করতে আগ্রহী হলেন। পথে পথে ঘুরছেন দেশের সেরা সব কবিরা অনুষ্ঠান করার জন্য টাকা যোগারের জন্য। সোনালী ব্যাংকের ডিরেক্টর, পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর হয়েছিলেন, রম্য লেখক, ছড়াকার লুৎফুর রহমান সরকার, ছড়াকার সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দা আনোয়ারা হক, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, হুমাযুন আজাদ, মহাদেব সাহা, রবিউল হোসাইন, বেলাল চৌধুরী, হায়াৎ মামুদ, আসাদ চৌধুরী, আবু সালেহ, সমুদ্র গুপ্ত, রবীন্দ্র গোপ,আনোয়ার আহমেদ, অসীম সাহা। রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কামাল চৌধুরী, নিশাত খান, কাজি রোজী, রুবি রহমান, খালেদা এদিব চৌধুরী , খুশনূর আলমগীর। একঝাঁক উজ্জ্বল রোদ যেন এক সাথে। নাম এবং মানুষ গুলোর দিকে তাকালেই সমীহ এবং ভাললাগায় ভরে উঠে মন। সবার এক ইচ্ছে কবিতা উৎসবকে সফল করতে হবে। যার যতটুকু করার সুযোগ আছে, সে সেই জায়গা থেকে সুযোগ নিচ্ছেন কবিতা উৎসবের জন্য। সবার পিছন থেকে চারপাশে চোখ রাখছেন এর প্রধান স্বপ্নদ্রষ্টা যার ইচ্ছার ফলশ্রুতিতে দেশের এতগুলো স্বনামধন্য মানুষ, লেখক কবি, বুদ্ধিজীবী একত্রিত হয়েছে। এছাড়া উঠতি মুখ লুৎফুর রহমান লিটন, গোলাম কিবরিয়া পিনু, প্রদীপ মিত্র, আনিসুল হক মিঠুন, মোজ্জাম্মেল বাবু, লুৎফুল বাবু, শ্যামল জাকারিয়া, তারিক সুজাত,ইউসুফ হাসান, শিমুল মেস্তফা, ইস্তেকবাল হোসেন, মজনু শাহ. আমিরুল, পাপ্পু, বাশিরা শান্তি আরো যে কত শত নাম, মহা উৎসাহে প্রতিদিন নিজেদের নিয়োজিত করছে আন্দোলনে, প্রাণের টানে। সারা দেশে উৎসব সফলের সাড়া পড়ে গেছে। রাত নেই দিন নেই, নানা রকম কর্মকাণ্ডের সমন্বয় সাধনে ব্যস্ত স্বপ্নদ্রষ্টা। খবর নেই নিজের আহার নিদ্রার। এতগুলো মানুষকে পরিচালনার দায়িত্ব উনার মাথায়। উনার ডাকে সারা দিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন বাংলার কবিকুল। বিরামহীন প্রস্তুতি চলছে।
দিন দশের মধ্যে জমজমাট হয়ে উঠল আয়োজন। টি এসসির একটা রুমে বিকাল হলেই সব কবিরা একত্রিত হচ্ছেন। রাত নটা দশটা পর্যন্ত চলছে বিভিন্ন বিষয়ে মিটিং, প্রস্তুতি, কার্য নির্ধারণ। দলে দলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চলে আসছেন কবিরা পোটলা পিটে ফেলে। পঞ্চাশ টাকা দিয়ে নিবন্ধন করছেন কবিতা পড়ার জন্য। একপাশে বসেছে একদল কবি উৎসবে পড়ার কবিতাটি বাছাই করে মনোনীত করার কাজে। কেউ নিবন্ধন করানোর দায়িত্বে। কখনও চা, সিঙ্গারা আসছে। টি,এসসির ফটোগ্রাফার পিয়ারু এসে ঐতিহাসিক ছবি তুলে রাখছে কবিদের। এক দিকে রাজার মহা আয়োজনে প্রাচুর্যের ছড়াছড়ি অন্যদিকে নিঃম্ব কবি কুলের সর্বাত্মক চেষ্টা প্রতিবাদ সফল করার। গানের শিল্পী, চিত্র শিল্পী, নাট্য কর্মী, আবৃত্তি, শিল্পীরাও চলে আসছেন দেখতে। একাত্মতা প্রকাশ করছেন কবিদের আন্দোলনে। বর্ষিয়ান কবি সুফিয়া কামাল বলেছেন, কবিদের সাথে আছেন, অনুষ্ঠানে আসবেন। তাঁকে দিয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করা হবে। শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা। শৃঙ্খল মুক্তিকামী মানুষ কথায় কলমে ছড়িয়ে দিতে চাইলেন প্রতিবাদ। উদ্বোধনী সংগীত করবেন ফকির আলমগীর। অনেকে গান জমা দিয়ে ছিলেন তার থেকে রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লার গান নির্বাচিত হয়েছে। গানের রির্হাসেল চলছে। চারুকলার ছেলে মেয়েরা মঞ্চ বানানো, আল্পনা আঁকার দায়িত্ব নিয়েছে। টিএসসির সামনের বিশাল তিন রাস্তার মোড়ে প্যানডেল বাঁধা হচ্ছে। ডেকোরেশনের লোক, মাইকের লোকরাও অল্প পয়সায় সেবা দিয়ে নিজেদের জড়িত করছে আন্দোলনের সাথে। বিভিন্ন দল সংঘটনের নেতারাও কবিদের আন্দোলনের সমর্থনে আসা যাওয়া করছেন। উৎসব বিয়ে বাড়ির আয়োজনের মতনই ব্যস্ততায় ভরপুর। তবে ভয় এবং শংকা কাজ করে সাথে যে কোন সময় মিলিটারী আক্রমণে ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে আয়োজন অনুষ্ঠান। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সব দলের ছেলেরা মিলে পাহারা দেয় কবিতা উৎসবের মঞ্চ। কবিদের নিরাপত্তায় চোখ রাখে। প্রচার এখন ছড়িয়ে পরেছে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে। সাংবাদিকরাও খবর সংগ্রহের কারণে আসা যাওয়া করছেন। সাহেব বিবির বাক্সও চলে এসেছে ছবি ধারণ করতে। প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে জানানো হয় কবিতা উৎসবের কমিটির খবর দেশবাসীকে প্রেসক্লাব থেকে। জাতীয় পর্যায়ের একটা অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে কবিতা উৎসব। যার চিন্তা আলোচনার সূত্রপাত আমার ঘরে এক হরতালের দুপুরে শুরু হলো। বিদ্রোহী কবি আর চৌকস এক সদ্য তরুণের কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে যে নতুন ঘটনা শোনার তৃতীয় ব্যক্তি আমি । অল্প কদিনের মধ্যেই দেখলাম তার বাস্তবায়ন হতে শূন্য থেকে যেন বিশাল উত্তাল ঢেউ ভেঙ্গে সমুদ্র বিলাসের আয়োজন হলো।
ব্যস্ত এক জীবনে জড়িয়ে রাত বিরাত পর্যন্ত আমরা কবিতা উৎসবের বিষয়েই কথা বলতে থাকি। আমার সব বোনগুলো কেউ আবৃত্তি, কবিতা পাঠ,গান, আলপনা আঁকা, মঞ্চ নির্মাণ অতিথি অভ্যর্থনা, অফিস, দপ্তর দেখাশোনা এক একটা বিষয়ে জড়িয়ে আছি। কেউ সবগুলোতেই প্রায়।
বাড়ি ফিরে খাওয়া পড়া, ঘুমানের সময় কেমন যেন খালি খালি লাগে। সারা দিনমান ব্যস্ততা। অনুষ্ঠানের আগের রাতে চারুকলার ছেলে মেয়েরা সাজাচ্ছে মঞ্চ, আঁকছে আলপনা। আমার বোন ওদের সাথে কাজ করছে। গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তার উপর গান হল্লা কাজ। ওদের সাথে মাঝ রাতে বাড়ি ফেরা। যে মেয়েরা হলে ফিরতে পারছে না তারা আমার বাড়ি এসে ঘুমাচ্ছে। সকালে আবার সাজ সাজ অনুষ্ঠানে রওনা হওয়া। কবিতা উৎসবের জন্য টাঙ্গাইলের নতুন শাড়ি কিনতাম প্রতি বছর।
বিভিন্ন মত মানসিকতার অনেক পথের পথিক এক সাথে এক মঞ্চে মিলিত হলেও সবার ভাবনা যে এক এমন নয়। কেউ এসেছেন সত্যিকারের আবেগ থেকে, কেউ দোদুল্যমান অবস্থায়, দেখা যাক কোথায় যায় ভালো হলে জড়িয়ে পড়ব। কেউ আবার প্রথম থেকেই হৈ হল্লা করে নিজের উপস্থিতি প্রমাণিত করার জন্য ব্যস্ত থাকলেন। কারো ইচ্ছা বড় কবিদের পাশাপাশি থাকা, বড় মঞ্চে কবিতা পড়া। কেউ ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে যাচ্ছেন। অনেকের অনেক রকম ইচ্ছের মাঝেও সবাই একত্রিত হয়ে একটা সফল উৎসব করা হলো দুদিন ব্যাপী। ফেব্রুয়ারি এক দুই তারিখ যখন রাজ কবি সভা হবে তখন সারাদেশের গণ কবিদের অংশ গ্রহণে দুদিন ব্যাপী লাগাতার অনুষ্ঠান চলবে রাস্তার উপর। সকাল দশটায় জাতীয় সঙ্গীত ও উদ্বোধনী সঙ্গীত এক সাথে গাইছে শ খানেক শিল্পী বিশাল মঞ্চে পাশে পতাকা উত্তোলন করছেন সুফিয়া কামাল, সাথে শামসুর রাহমানসহ দেশের সব শ্রেষ্ঠ বরণ্যে কবি, সুধী জনও এসেছেন আর অগনিত মানুষ। মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বেলুন। হাজার হাজার মানুষ চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে শ্রদ্ধায়, ভালোলাগায় মিশেল মন নিয়ে, চারপাশ কেমন শান্ত সমাহিত ভাব এত মানুষের ভীড়েও। এরপর শহীদ মিনারে পুষ্পার্পণ করে জাতীয় কবির মাজারে ফুল দিয়ে মূল মঞ্চে ফিরে আসা। মূল আলোচনা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু মুখবন্ধ পাঠ। দ্বিতীয় পর্বে কবিতা পাঠ শুরু যা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। হাজার খানেক কবি কবিতা পড়েছেন। হাজার দশেক মানুষের সমাগমে মুখরিত। কবিতা উৎসব প্রাঙ্গণ সকাল থেকে রাত একটা পর্যন্ত। বিকাল থেকে সন্ধ্যা লোকে লোকে লোকারণ্য। মানুষ দাঁড়িয়ে আছে বসার ঠাঁই না পেয়ে কবিতা শোনার জন্য শীত রাতকে উপেক্ষা করে গভীর রাত পর্যন্ত সে এক অভূতভূর্ব দৃশ্য। এত অল্প সময়ে এমন অসাধ্য সাধন, দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধি বুদ্ধিজীবীদের এক করে প্রতিবাদে সামিল করা, পিছনের এই জন্ম যন্ত্রনার সাথে যারা জড়িত ছিলেন তারাই শুধু অনুভব করতে পারবেন। অনেকে অংশ গ্রহণ করলেও সব কিছুর একক আয়োজক ছিলেন সেই বিদ্রোহী কবি। সংগঠিত করে কাজ করিয়ে নিয়েছেন সবাইকে দিয়ে। নিজের প্রয়োজনে নয় দেশের সার্বিক সুন্দরের পক্ষে।
প্রথম দিনের রাতের জমজমাট অনুষ্ঠানে হঠাৎ একটু হৈ চৈ উঠল। জানা গেলো তসলিমা নাসরিন রুদ্রের বউ হয়ে কবিতা উৎসবের সব আয়োজনে আসছে সে নাকি এশিয়া উৎসব অর্থাৎ রাজার আয়োজনের কবিতা অনুষ্ঠানে গেছে দুপুরে। রুদ্র নিজেই সে কথা জানায় মূল আয়োজক কে। না করার পরও তসলিমা ওখানে ঘুরে এসছে। ও মঞ্চে তখন উপস্থাপনের কাজ করছিল। একথা শোনে ওকে তখন মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। নিষিদ্ধ করা হয় কবিতা উৎসবে। কতটা নীতিহীন, নির্লজ্জ মানুষ হলে যে আয়োজনের প্রতিবাদে এই অনুষ্ঠান হচ্ছে সেখানে ঘুরে এসে আবার এই উৎসবের সাথে নিজেকে জড়াতে পারে এবং পুরো বিষয়টাই গোপন করে। বিবেকহীন সুযোগ সন্ধানীরাই এমন করতে পারে ।
কবিতা উৎসবের পর বইমেলায় গীতাঞ্জলির দোকানে শুনি আমার কবিতা আবৃত্তি বাজছে। কামাল আহমেদ একখানা ক্যাসেট আমাকে উপহার দিলেন। স্ব-প্রণোদিত হয়ে সমস্ত কবির কবিতা ধারণ করেছেন তিনি।
জমে উঠে কবিতা উৎসব প্রথম বারেই। ওদিকে ফাঁকা মাঠে গুটি কয় কবি নিয়ে রাজকীয় অনুষ্ঠান শেষ হয়। যখন জমজমাট লোকে লোকারণ্য কবিতা উৎসব প্রাঙ্গণ খবর ছড়িয়ে যায় গোটা দেশে।
আয়োজন হয় দ্বিতীয় উৎসবের এবার একটু গোছানো অবস্থা। দ্বিতীয় দিনে ঘন মানুষের ঠাঁস বুনন পেরিয়ে রাত আটটার দিকে শেখ হাসিনা চলে এলেন অনুষ্ঠানে। সামনের সারিতে বসলেন তিনি। মঞ্চে তখন চিত্রকর কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে কবিতা পাঠ চলছে বিকাল পাঁচটা থেকে এক নাগারে । কামরুল হাসান পাশে বসা রবীন্দ্র গোপের ডাইরীতে ভয়াল এক মুখের স্কেচ করেন, বিশ্ব বেহায়ার মুখ কবিতা শুনতে শুনতে। হঠাৎ তিনি ঢলে পরেন খারাপ লাগছে বলে। প্রধান কর্তা ব্যক্তি দ্রুত এগিয়ে যান। এগিয়ে যান শেখ হাসিনা। উনার গাড়িতে করে দ্রুত কামরুল হাসানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ফেলেন।
দুঃখজনক এই ঘটনার খবর পেয়ে গভীর রাতে রবীন্দ্র গোপের বাড়ি থেকে তার ডাইরী উদ্ধার করা হয়, মহা কাহিনী করে। গোপের বাড়ি চেনা ছিলনা কারো শুধু জানা ছিল কোন এলাকায় থাকেন। কয়েকজন রাস্তা থেকে গভীর রাতে নাম ধরে চিৎকার করে ডাকা ডাকি করে তাকে উঠানো হয়। তিনি আবার ভীষণ ভয় পেয়ে যান নাম ধরে চিৎকার শুনে গভীর রাতে। ছাপাখানায় নিয়ে ভোর রাতের মধ্যেই কামরুল হাসানের শেষ স্কেচ বিশ্ব বেহায়ার লক্ষ লক্ষ কপি ছড়িয়ে যায় মানুষের মাঝে।
এক এক বছর পেরুয় নানান অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে, আনন্দ উদ্যোমতায় এগিয়ে যায় কবিতা উৎসব। একবার জাপানি কবি এলেন তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতও করেন। দর্শকের অনুরোধে কতবার যে তাকে গান শোনানোর জন্য মাইকের সামনে যেতে হলো। শাড়ি পড়ে বাঙালী সেজে, জাপানী উচ্চারণে রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে দর্শকদের মন জয় করলেন তিনি। এছাড়া নিজের লেখা কবিতা শুনালেন।
একবার আমাকে দেয়া হলো ভিডিও ধারণের দায়িত্ব আমি তখন নতুন একটা ভিডিও ক্যামেরা কিনেছিলাম। ব্যাক্তিগত ক্যামেরা দিয়ে অনুষ্ঠান ধারণ করেছিলাম।
তখন যাদের লেখার শুরু বিশ পঁচিশ বছরের তরুণ । কবিতা উৎসবের মঞ্চ যাদের প্রথম আত্ম প্রকাশ, চেনাজানা বরেণ্য কবি সাহিত্যিকের সাথে তাদের অনেকে আজ প্রতিষ্ঠিত লেখক।
দশ বছর যুগ্ম সম্পাদকের ভূমিকায় থাকেন কবিতা উৎসবের স্বপ্নদ্রষ্টা, স্রষ্টা। তিনি ছেড়ে দিতে চাইলেও তাকে ছাড়া এই বিশাল আয়োজন চলতে পারে এটা কেউ ভাবতে পারেন না। তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি নিজের নাওয়া খাওয়ার কথা পর্যন্ত ভুলে যান কাজের প্রয়োজনে, বাস্তবে রূপ দিতে পারেন অসম্ভবকে। তাকে ছাড়া হতে পারে না এই আয়োজন। অন্য সম্পাদক বদল হলেও তার আসনটি সর্ব সম্মতি ক্রমে বহাল থাকে বারবার। বিস্তার লাভ করে কবিতা উৎসবের। দেশে বিদেশের কবিরা আসেন এখন। উৎসবে যোগ দিতে। ভারত, নেপাল, জাপান, থাইল্যান্ড থেকে ফোন আসে আমার ঘরে, তখন বাংলা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলা দুরূহ ব্যাপার ছিল অথচ বিভিন্ন ভাষার কবিদের সাথে কথা বলতে হতো আমার ইংরেজীতে। তারা অনুষ্ঠানে আসতে চায়, খবর জানতে চায়। আমার ঘরের কাজগুলো স্তিমিত হয়ে যায় উৎসবের সময়। সব কাজ গৌণ শুধু উৎসবের আয়োজন প্রাধান্য পায়।গাড়ি খানা ব্যস্ত থাকে এয়ারপোর্টে যাতায়াত করতে বা অন্য কোন আনা নেয়ার কাজে উৎসবের প্রয়োজনে। নব্বইয়ে যখন স্বৈরাচারীর পতন হলো শামসুর রাহমান থেকে অনেকেই তখন কবিতা উৎসব বন্ধ করে দেয়ার পক্ষে ছিলেন। কবিদের একটা উৎসব থাকুক তার জন্যও তখন আন্দোলন করতে হলো পক্ষে বিপক্ষের কবিদের নিয়ে। একটা জাতীয় অনুষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে কবিতা উৎসব এইধারা চালু থাকুক। প্রয়োজনে এই সংগঠন জনগনের কথা বলবে আবার। কবিতা পরিষদ নামকরণ করা হয়। উৎসব হবে প্রতি এক দুই ফেব্রুয়ারি। তাছাড়া কবিতা পরিষদের ব্যানারে নানা রকম কাজ করা হয় কবিতা পরিষদ থেকে। আটাশি সনের বন্যায় কবিরা ত্রান বিতরণ করেন। নব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ে সাহায্য। এছাড়া কবিদের সুখে দুঃখে একত্রিত হয়ে পাশে দাঁড়ানো, সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়ানো। দশ বছর পর প্রধান রূপকার নিজেকে গুটিয়ে নিলেন সত্যি সত্যি যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকে। তার অসংখ্য অনুগত ভক্ত চোখের পানিতে ভেসেছে। পা ধরে রাস্তার উপর বসে থেকেছে ছোটরা যাতে তিনি পদ না ছেড়ে দেন। কিন্তু তিনি মহত্ত্ব দেখিয়ে অর্পণ করলেন দায়িত্ব ছোট ভাইয়ের মতন ভালোবাসার কবির উপর। যাকে ভালোবেসে বই উৎসর্গ করেছেন, যিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখে নিজেই অস্মিতা। তাকে শেখ হাসিনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন একজন আওয়ামী লীগের কর্মী হিসাবে। যদিও প্রধান রূপকার আওয়ামী লীগ না করলেও শেখ হাসিনা তাকে পছন্দ করতেন। তাকে আরও অনেক নামী দামী লোকের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। সে একজন সাদা মনের নির্মল মানুষ এই ধারনায়। ছোট একটি কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদ পাওয়ানোর জন্য নানা রকম চেষ্টা তদবির করে সাফল্য লাভ করে মহা খুশিতে ভাসেন ছোট ভাইয়ের সফলতায়। যাকে ভালোবেসে হাত ধরে তুলে এনে প্রধান রূপকার, নিজের যুগ্ম সম্পাদকের আসনে বসিয়ে দিলেন। আস্তে আস্তে দেখতে পেলেন তার স্বরূপ। দীর্ঘ হাত বিস্তার করে চারপাশে চাটুকার আরো কয়েকজনের সহযোগীতায় দলীয় করণ করে একটা আবরণ তৈরী করলেন। এই মানুষের হাতে কবিতা পরিষদ প্রথম বার খোলা রাস্তা ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা কোনায় ঢুকে পড়ে। অনেক রকম জটিলতায় জড়িয়ে ছোট হতে থাকে বিস্তার। বিশ বছরের একটা সংগঠন যা অনেক ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে নিজের জীবন কে তুচ্ছ করে গড়ে তুলেছেন আদরে ভালোবাসায় মমত্বে, সেখান থেকে জনক মানুষটিকে দূর করে দেয় হাত ধরে তুলে আনা ভিজা বেড়াল টাইপের স্বার্থপর মানুষটি। পত্রপত্রিকায় তার বিরুদ্ধে নানা রকম কুৎসা পর্যন্ত লিখাতে দ্বিধা করে না। আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়, সব কিছুই তাদের কুক্ষিগত, সব সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তারা। একটি বইয়ের নাম দিয়ে ছিলাম, ‘সবুজ চাদরে ঢাকা রক্তাক্ত ছুড়ি’ এ যেন ঠিক সবুজ চাদরে ঢাকা ছুড়ি রক্তাক্ত করে দিল একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষকে নিজের সংকীর্ণতা আর কুটিল মন দিয়ে। নিজের রক্ত পানি করে, জীবন তুচ্ছ করে বিপদ মাথায় নিয়ে গড়ে তোলা সংগঠনে আজ যখন অনুষ্ঠান হয় তখন সে একাকী ঘরের কোনে। যাকে মহা সম্মানে মঞ্চের মধ্যখানে বসিয়ে রাখার কথা তাকে দূরে ঢেলে দিয়েছে। আর অবাক হয়ে দেখি ঐ মেরুদণ্ডহীন মানুষগুলোকে যারা অনুষ্ঠানে একজন ভণ্ড মুখোশধারী পাশে হাসিমুখে বসে থাকে। যারা সব কিছুই জানে কিন্তু কোন প্রতিবাদ করে না। হুমাযুন আজাদের সাথে অনেক বিষয়ে তর্ক করতে দেখেছি তাকে কিন্তু বিপদে ওদের একে ওপরের পাশে দাঁড়াতেও দেখেছি। ওরা সরাসরি কথা বলা পছন্দ করতেন। ভিতরে ভিতরে ছুড়ি মারতেন না। কাল একজন একটা ছবি দিয়েছে ফেইসবুকে দেখলাম ক্যাপসন সব কিছু ভণ্ডদের অধিকারে যাবে তাই দেখে আমার মনে হলো ঠিক তাই ভণ্ডরাই দখল করে বসে আছে সব খানে সব কিছু । মাথার ভিতর নেচে যায় অনেক জমজমাট ব্যস্ততা, আড্ডা, অস্থিরতা, টেনশন,ভয়, সুখ ভাললাগা কষ্ট আনন্দ। স্বার্থপর মীরজাফরের কর্মকাণ্ড আর কবে থামবে এই বাংলায়? পঁচিশ বছর পার হয়ে গেলো। আজ বড় ঘটা করে কবিতা উৎসবের রজতজয়ন্তী পালন হচ্ছে হয়তবা। পিছনের জন্ম যন্ত্রনার ইতিহাস হয়ত নতুন অনেকে জানেন না জানবেন না কোন দিন। কতটা রক্তক্ষরণের মাঝে ভূমিষ্ঠ হয়েছে আজকের পঁচিশ বছরের ইতিহাস। একটা বিষয়ে খুব অবাক হই যারা জানে তারা সবাই কেন সত্যিকে অকপটে বলে না। নিজেকে বাঁচিয়ে সুসম্পর্ক রেখে চলে কী ভাবে অসদাচরণকারীর সাথে। আমার স্মৃতিরপাতায় হেঁটে যাচ্ছে অনেক মুখ তীব্রতা, ফাঁকাফাঁকা, হতাশা, যন্ত্রনা আনন্দ, সাফল্যের সোনা ঝরা দিন আর স্বার্থপর মীরজাফরের মুখ।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১২:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



