শয়তান যে মানুষকে নেক সুরতে ধোকা দেয়, এ বিষয়টি ভালভাবে অনুধাবন করেছিল শয়তানের অনুচর ইহুদী এবং খৃষ্টানরা। মুসলমানদের সোনালী যুগ এসেছিল শুধু ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণের ফলে। শয়তানের চর ইহুদী খৃষ্টানরা বুঝতে পেরেছিল মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য, সংঘাত সৃষ্টি করতে পারলেই ইসলামের জাগরণ এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে মুসলমানদের উত্থান ঠেকানো যাবে। আর তা করতে হবে ইসলামের মধ্যে ইসলামের নামে নতুন মতবাদ প্রবেশ করিয়ে। শুরু হয় দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা যার মূলে থাকে খৃষ্টীয় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ। জন্ম হয় ওহাবী মতবাদের। ওহাবী মতবাদ সৃষ্টির মূলে থাকে একজন বৃটিশ গুপ্তচর- হ্যাম্পার। মিশর, ইরাক, ইরান, হেজাজ ও তুরস্কে তার গোয়েন্দা তৎপরতা চালায় মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য। বৃটিশ গোয়েন্দা হ্যাম্পার তুরস্কের শায়খ ইফেন্দীর নিকট ছদ্ধবেশী মুসলমান সেজে কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ চর্চা করে মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাবের একান্ত বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয় নিয়ে তাদের (উভয়ের) মধ্যে যে আলাপ-আলোচনা হয়, তা হ্যাম্পার তার ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করে। বৃটিশ গোয়েন্দা হ্যাম্পারের উক্ত ডায়েরীটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানীর হস্তগত হয়, তখন জার্মান পত্রিকা ইসপিগল তা "Memoirs of Hempher, The British Spy to The Middle East" শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে। এতে বৃটিশদেরকে বিশ্ব সমাজের কাছে অত্যন্ত লজ্জিত হতে হয়। ডায়েরীটি ফরাসী পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। জনৈক লেবাননী বুদ্ধিজীবী তা আরবীতে অনুবাদ করেন। তুরস্কের ওয়াকফ্ ইখলাছ প্রকাশনা হ্যাম্পাররের স্বীকারোক্তি মূলক উক্ত ডায়েরীটি "Confession of British Spy and British enmity against Islam" নামে গ্রন্থাকারে ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করে। হ্যাম্পারের স্বীকারোক্তির তুর্কী অনুবাদ এবং লেখক এম. সিদ্দিক গূমূজের ব্যাখ্যা মিলিয়ে ইংরেজীতে এটি প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ের প্রথম অনুচ্ছেদ হতে বৃটিশ গুপ্তচরের স্বীকারোক্তমূলক জবানবন্দীর বঙ্গাণুবাদ তুলে ধরা হলো।
▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓▓
(ধারাবাহিক)
তার মুতা বিবাহের তৃতীয় দিনে ‘শরাব হারাম নয়’ এ বিষয়ে নজদের মুহম্মদের সাথে খুব লম্বা একটা বিতর্ক হয়ে গেলো। যদিও সে অনেক আয়াত শরীফ এবং হাদীছ শরীফের উদ্বৃতি দিলো যাতে প্রমাণ হয় শরাব পান করা হারাম কিন্তু সবগুলোই খন্ডন করলাম এবং পরিশেষে বললাম, ‘এটা সত্য যে ইয়াজিদ, উমাইয়া এবং আব্বাসীয় খলীফারা শরাব পান করেছেন। তারা সবাই ভুল করেছেন আর শুধু তুমিই সঠিক তাতো নয়? নিঃসন্দেহে তারা তোমার চাইতে বেশী কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ জানতেন। তারা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকেই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, শরাব পান করা মাকরূহ, হারাম নয়। যদিও ইহুদী ও খৃষ্টানদের কিতাবে লেখা আছে শরাব পান করা মুবাহ্। সব ধর্মইতো আল্লাহ পাক-এর আদেশ। বস্তুত: এমন বর্ণনাও আছে যে, “তোমরা এসব থেকে বিরত থাকবে কি? অর্থাৎ বিরত থাক।” (সূরা মায়েদা-৯১) এ আয়াত শরীফ নাযিল হবার আগ পর্যন্ত হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শরাব পান করেছেন। শরাব হারাম হলে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চয়ই তাঁকে ছেড়ে দিতেন না। যেহেতু তিনি কোন শাস্তি পাননি, ধরে নেয়া যেতে পারে শরাব হারাম নয়।’
[সত্য হচ্ছে, শরাব হারাম হওয়ার আগ পর্যন্ত হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যদিও তা কিছু পান করে থাকেন না কেন কিন্তু শরাব নিষিদ্ধ হওয়ার পর আর কোনদিনই শরাব পান করেননি। পরবর্তীতে যদিও কয়েকজন উমাইয়া এবং আব্বাসীয় খলীফা শরাব পান করেও থাকেন তাতে এটা প্রমাণিত হয় না যে, এলকোহল সহযোগে পানীয় গ্রহণ করা মাকরূহ্ বরং এটাই প্রমাণ করে যে, তারা ছিলো এ ব্যাপারে গুণাহগার। কেননা তারা হারাম কাজ করেছিলো। হ্যাম্পার কর্তৃক উদ্ধৃত আয়াত শরীফ এবং অন্যান্য আয়াত শরীফ ও হাদীছ শরীফ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, শরাব পান করা হারাম। “রিয়াদ-উন-নাসিহীন” কিতাবে বলা হয়েছে, প্রথমদিকে শরাব পান করার ব্যাপারে আদেশ বা নিষেধ কোনটাই ছিলো না। হযরত উমর, সাদ ইবনে ওয়াক্কাছ ও অন্যান্য কয়েকজন সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম শরাব পান করতেন। পরবর্তীতে সূরা বাক্বারা-এর ২১৯ নং আয়াত শরীফে ঘোষনা করা হলো এটি গুরুতর পাপ। কিছুদিন পরে সূরা নিসা-এর ৪২ নং আয়াত শরীফ নাযিল হলো এবং ঘোষনা করা হলো “মাদকাসক্ত অবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়োনা।” পরিশেষে, সূরা মায়েদা-এর ৯৩ নং আয়াত শরীফের মাধ্যমে শরাবকে একেবারে হারাম করে দেয়া হয়। হাদীছ শরীফেও নিম্নরূপ বলা হয়েছে, ‘যা বেশী পরিমাণ গ্রহণ করলে নেশাগ্রস্ত করবে তা অল্প পরিমাণ গ্রহণ করাও হারাম।’ ‘শরাব পান করা নিকৃষ্ট পর্যায়ের গুনাহ্।’ আর ‘যারা শরাব পান করে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না। তাদের জানাযায় যেও না। তাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করো না।’ ‘শরাব পান করা মূর্তিপুজার সমতুল্য।’ ‘যারা শরাব পান করে, বিক্রি করে এবং সরবরাহ করে তাদের উপর আল্লাহ পাক-এর লা’নত।’ -এম সিদ্দিক গূমুজ।]
নজদের মুহম্মদ বললো, কিছু কিছু বর্ণনাতে পাওয়া যায়, হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু পানি মিশিয়ে এলকোহলীয় পানীয় গ্রহণ করতেন এবং বলতেন পান করলে নেশাগ্রস্ত না হলে শরাব পান করা হারাম নয়।
বললাম, হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ধারণাটা সঠিক। [তার এ বক্তব্য হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রতি মিথ্যা তোহমতের শামিল। মূলত: সে নিজেই শরাব পান করতো তা প্রমাণ করার জন্যই এরূপ বক্তব্য প্রদান করেছে।]
কেননা, কুরআন শরীফে উল্লেখ রয়েছে, “শরাব পান এবং জুয়ার মাধ্যমে শয়তান তোমাদের মধ্যে শত্রুতা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, এবং আল্লাহ পাক-এর যিকির এবং নামায থেকে বিরত রাখে। তোমরা এসব থেকে বিরত থাকবে কি? অর্থাৎ বিরত থাক।” (সূরা মায়েদা-৯১) এই আয়াত শরীফে বর্ণিত গুনাহসমূহের মত এলকোহল জাতীয় পানীয় গুনাহের কারণ নয় যতক্ষণ না তাতে নেশার সৃষ্টি হয়। ফলে শরাব পানে নেশা না হলে, মদ হারাম হবে কেন?” (যা বেশী পরিমাণ গ্রহণ করলে নেশাগ্রস্ত করবে তা অল্প পরিমাণ গ্রহণ করাও হারাম।)
আমি শরাব সংক্রান্ত এ বিতর্কের কথা সাফিয়াকে জানালাম এবং নজদের মুহম্মদকে কড়া শরাব পান করানোর ব্যাপারে নির্দেশ দিলাম। পরে সাফিয়া আমাকে জানায়, ‘তোমার কথা মত আমি কাজ করেছি এবং তাকে প্রচুর শরাব পান করিয়েছি। সে বেশ নাচানাচি করেছে এবং রাতে কয়েক দফা সাক্ষাত হয়েছে।’ সেই থেকে নজদের মুহম্মদ সাফিয়া ও আমার পুরো নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
উপনিবেশ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আমাদের বিদায় অনুষ্ঠানে বলেছিলো, ‘আমরা অবিশ্বাসীদের (এখানে মুসলমানদের বলা হচ্ছে) নিকট থেকে স্পেনকে দখল করেছি শরাব এবং ব্যভিচারের মাধ্যমে। চলো এ দু’টো শক্তির মাধ্যমে আমরা এবার আমাদের হারানো ভূখণ্ড ফেরত আনি।’ এখন বুঝতে পারছি তার বক্তব্য কত সত্য।
একদিন আমি নজদের মুহম্মদের সাথে রোজা নিয়ে কথা শুরু করলাম। বললাম, “কুরআন শরীফে বলা আছে, ‘রোজা রাখা অনেক গৌরবের।’ (সূরা বাক্বারা-১৮৪) কিন্তু তাতে বলা হয়নি রোজা ফরজ। তার মানে ইসলাম ধর্মে রোজা সুন্নত, ফরয নয়।”
সে প্রতিবাদ করলো এবং বললো, “তুমি কি আমাকে আমার বিশ্বাস থেকে সরিয়ে নিতে চাইছো?”
উত্তরে বললাম, ‘কারো বিশ্বাস হচ্ছে তার হৃদয়ের পবিত্রতা এবং গুনাহ্ থেকে পবিত্র থাকা কিন্তু অন্যের হক নষ্ট করে গুনাহ্ করা নয়। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেননি যে, বিশ্বাস হচ্ছে ভালবাসা?’ আল্লাহ পাক কি কুরআন শরীফে বলেননি, ‘ইয়াক্বীন না আসা পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদত করো?’ (সূরা হিজর ৯৯) [এটা মূলত: বাতিলপন্থী ফক্বিরদের আক্বীদা যা কুফরী। প্রকৃতপক্ষে এখানে ইয়াক্বীন অর্থ হচ্ছে মৃত্যু।]
কাজেই যখন কেউ আল্লাহ পাক-এর প্রতি এবং ক্বিয়ামত দিবসের প্রতি ইয়াক্বীন কায়িম রাখতে সক্ষম হবে এবং সৎ কাজের মাধ্যমে নিজের হৃদয়কে সুন্দর ও পবিত্র করবে তখনই সে হবে মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে পূণ্যবান।’ সে আমার কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলো।
একবার তাকে বললাম, ‘নামায ফরয নয়।’ সে বললো কি করে নামায ফরয নয়?’ আমি বললাম, আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে বলেছেন, ‘তোমরা নামাযের মাধ্যমে আমাকে স্মরণ করো।’ (সূরা ত্ব-হা ১৪) সুতরাং নামাযের উদ্দেশ্য আল্লাহ পাককে স্মরণ করা। সুতরাং নামায না পড়েও আল্লাহ পাককে স্মরণ করতে পারো। [এ বক্তব্যও কুফরী। এখানে সঠিক ব্যাখ্যা হচ্ছে যে, নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ পাক-এর দায়িমী হুযূরী হাছিল হয়। যেমন হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে, “নামায হচ্ছে মু’মিনদের মি’রাজ।”]
নজদের মুহম্মদ বললো, হ্যাঁ আমি শুনেছি কিন্তু মানুষ নামাযের পরিবর্তে আল্লাহ পাক-এর যিকির করে।
তার এই বক্তব্যে আমি খুবই খুশী হয়েছি। আমি এই জাতি প্রতিষ্ঠা করতে এবং তার হৃদয় অধিগ্রহন করতে প্রাণন্তর চেষ্টা করেছি। তারপর থেকে আমি লক্ষ্য করলাম যে সে নামায আদায়ের ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব দেয় না এবং মাঝে মধ্যে নামায আদায় করে। সে নামায আদায়ের ব্যাপারে বিশেষত ফজরের নামায আদায়ের ব্যাপারে খুবই অমনোযোগী ছিল। আমি তার সাথে মধ্যরাত পর্যন্ত আলাপচারিতা করতাম যাতে সে ঘুমাতে না পারে। ফলে সে এত বেশী পরিশ্রান্ত থাকত যে ফজরের নামায আদায় করতে পারত না।
(হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘নামায ইসলামের স্তম্ভ। যে নামায পড়লো সে ইসলামকে ক্বায়িম রাখলো। আর যে নামায পড়লোনা সে ইসলামকে ধ্বংস করলো।” অন্য হাদীছ শরীফে আছে, ‘আমি যেভাবে পড়ি সেভাবে নামায পড়ো। নামায না পড়া কবীরাহ গুনাহ। আর নামায সঠিকভাবে আদায় করলে হৃদয়ের পবিত্রতা থাকে।)
নজদের মুহম্মদের কাধ থেকে আমি ধীরে ধীরে বিশ্বাসের চাদর সরিয়ে ফেলতে থাকি এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কেও নজদের মুহম্মদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হলাম। নজদের মুহম্মদ বললো, ‘এখন থেকে তুমি যদি এ বিষয়ে আমার সাথে আলাপ করো তাহলে আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।’
এরপর থেকে ভয়ে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে কোন আলাপ-আলোচনা করা বাদ দিলাম যাতে আমার সব চেষ্টা বিফলে না যায়। আমি নজদের মুহম্মদকে সুন্নী ও শিয়া মতের বাইরে নতুন একটি মতে চলতে উপদেশ দেই। সে আমার এই নতুন ধারণাটাকে পছন্দ করলো, বস্তুত: সে ছিল একজন অহঙ্কারী ব্যক্তি। সাফিয়াকে ধন্যবাদ, তার সাহায্যেই আমি নজদের মুহম্মদের জীবনকে থামিয়ে দিতে পেরেছি।
কোন এক উপলক্ষে আমি তাকে বললাম, ‘আমি শুনেছি যে, আমাদের নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণদের পরস্পর ভাই বলে তৈরী করেছিলেন। বিষয়টি কি সত্যি? সে সম্মতি প্রকাশ করলো। আমি জানতে চাইলাম, এই ইসলামী নীতি কি স্থায়ী ছিলো, না অস্থায়ী। সে ব্যাখ্যা করে বললো, এটা ছিল একটা স্থায়ী ব্যবস্থা। কেননা, ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত আমাদের নবী হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা হালাল করেছেন তা হালাল থাকবে আর যা হারাম করেছেন তা হারাম থাকবে। তখন আমি তাকে আমার ভাই হবার আহ্বান করলাম এবং আমরা পরস্পর ভাই হয়ে রইলাম। সেদিন থেকে আমি তাকে কখনও ত্যাগ করিনি। আমরা একে অপরের সঙ্গী হয়ে রইলাম, এমনকি সফরেও। সে ছিলো আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমার জীবনের অনেক মূল্যবান দিনগুলো ব্যয় করে যে চারা বপন করেছিলাম এখন সে ফল দিতে শুরু করেছে।
আমি লন্ডনে উপনিবেশ মন্ত্রণালয়ে মাসিক প্রতিবেদন পাঠালাম। এর উত্তরটি ছিল খুবই উৎসাহব্যঞ্জক ও প্রত্যয়দৃপ্ত। নজদের মুহম্মদ আমার আঁকা রাস্তা অনুসরণ করছে। আমার কর্তব্য ছিল তাকে স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও সন্দেহপ্রবণতার স্বাদ উপভোগ করতে অনুপ্রাণিত করা। আমি সর্বদা তার প্রশংসা করে বলতাম যে, একটি উজ্জল ভবিষ্যত তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
একদিন আমি মিথ্যা স্বপ্নের কথা বললাম, “গতরাতে আমি স্বপ্নে আমাদের নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি। আমি হিজাজে যে লক্বব মুবারক শিখেছিলাম সে লক্ববে তাঁকে সম্বোধন করলাম। তিনি একটি মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর চারপাশে আলিমরা ছিল যাদেরকে আমি চিনিনা। তুমি প্রবেশ করলে। তোমার চেহারা ছিল নূরের মতো উজ্জল। তুমি নবীজি (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দিকে এগিয়ে গেলে এবং তুমি যখন তাঁর খুব নিকটবর্তী হলে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন ও তোমার দু'চোখের মধ্যবর্তী স্থানে চুম্বন করলেন। তিনি বললেন, ‘তুমি আমার নামে নামধারী, আমার জানা মতে তুমি আমার পার্থিব ও ধর্মীয় বিষয়ে সহকারী।’ তুমি বললে, ‘হে আল্লাহ পাকের রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি লোকদের কাছে আমার ইলম বর্ণনা করতে ভয় পাচ্ছি।’ ‘তুমি সর্বোত্তম, ভীত হয়োনা’, নবীজি (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতত্তুর করলেন।” (নাঊজুবিল্লাহ মিন যালিক)
মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাব স্বপ্নের কথা শুনে বুনো আনন্দে মেতে উঠে। সে বার বার জিজ্ঞাসা করছিল আমি সত্য বলছি কিনা এবং প্রত্যেকবারই সে হ্যাঁ সূচক উত্তর পেয়েছে। পরিশেষে সে নিশ্চিত হলো আমি তাকে সত্য বলছি। তখন থেকে আমার ধারণা হলো আমি তাকে যে ধ্যান-ধারণায় অনুপ্রাণিত করেছি তা প্রচার করতে এবং নতুন একটি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করতে সে দৃঢ়চিত্ত।
(তৎকালীন ইস্তাম্বুলের দারুল ফুনান বিশ্ববিদ্যালয়ের আক্বিদা-ই-ইসলামিয়া-এর মুদাররিস (অধ্যক্ষ) বাগদাদের জামাল ছিদ্দিক্বী যাহাবী ইফেন্দী লিখিত আল ফজরুস সাদিক্ব কিতাবে বর্ণিত আছে, “মুহম্মদ বিন আব্দুল ওহাব কর্তৃক ১১৪৩ হিজরীতে [১৭৩০ খৃষ্টাব্দে] নজদে ইসলামী ধর্ম মতের বিপরীত ধ্যান-ধারণা সম্বলিত ওহাবী সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সে ১১১১ হিজরীতে [১৬৯৯ খৃষ্টাব্দে] জন্মগ্রহন করে এবং ১২০৭ হিজরীতে [১৭৯২ খৃষ্টাব্দে] মৃত্যুবরণ করে। দারিয়ার আমির মুহম্মদ বিন সউদের দ্বারা অসংখ্য মুসলমানের রক্তের বিনিময়ে এই সম্প্রদায় বিস্তৃতি লাভ করে। ওহাবীরা, যেসব মুসলমান তাদেরকে মেনে নেয়নি তাদেরকে মুশরিক বলে। তারা (ওহাবীরা) বলে যারা ওহাবী নয় তারা যদি পূর্বে হজ্জ করেও থাকে তাদেরকে আবার অবশ্যই হজ্জ করতে হবে এবং ঘোষণা দেয় যে, ৬০০ বছর ধরে তাদের সকল পূর্বপুরুষরাও কাফির। যারা ওহাবী সম্প্রদায়কে মেনে নিতোনা তাদেরকে হত্যা করত এবং তাদের সম্পত্তি গণিমতের মাল হিসাবে লুট করত। তারা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি কুৎসিত মন্তব্য আরোপ করত। তারা ফিক্বাহ, তাফসির ও হাদীসের কিতাব পুড়িয়ে ফেলে। তাদের মনগড়াভাবে কুরআনুল কারীমের ব্যাখ্যা করে। মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য নিজেকে হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী বলতো। এ কারণে অধিকাংশ হাম্বলী মাযহাবের আলিমরা তাদের যুক্তিখন্ডন করে কিতাব লিখেন এবং ব্যাখ্যা করেন যে তারা কাফির। তারা কাফির, কারণ তারা হারামকে হালাল বলে এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আউলিয়া কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মর্যাদা খর্ব করে। ওহাবী ধর্মটি ১০টি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত: ১) আল্লাহ পাক একজন দৈহিক সত্ত্বা। তাঁর হাত, মুখ ও দিক আছে। [এটি খৃষ্টান ধর্মমতের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত [পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা]; ২) তারা তাদের নিজস্ব উপলদ্ধি দ্বারা কুরআনুল কারীম-এর ব্যাখ্যা করে; ৩) তারা হযরত সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের ইজমাকে অস্বীকার করে; ৪) তারা আলিমদের ক্বিয়াসকে অস্বীকার করে; ৫) তারা বলে, যে ব্যক্তি চার মাযহাবের যে কোনটি অনুসরণ করবে সে কাফির; ৬) তারা বলে ওহাবীরা ছাড়া সবাই কাফির; ৭) তারা বলে, যে ব্যক্তি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আউলিয়া কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণকে ওসীলা হিসাবে গ্রহন করবে তারা প্রত্যেকে কাফির হয়ে যাবে; ৮) তারা বলে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা মুবারক এবং আউলিয়া কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের মাযার শরীফ জিয়ারত করা হারাম; ৯) তারা বলে, যে ব্যক্তি আল্লাহ পাক ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করবে সে নাস্তিক হয়ে যাবে। ১০) তারা বলে, আল্লাহ পাক ছাড়া অন্য কারো জন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান করলে কিংবা আউলিয়া কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের মাযার শরীফে পশু জবাই করলে সে নাস্তিক হয়ে যাবে। এই কিতাবে দলীল দিয়ে প্রমান করা হয়েছে যে, এই ১০টি ধর্মীয় মতবাদ ভূল। ওহাবী ধর্মের এই ১০টি মূলনীতি হ্যাম্পার কতৃক নজদের মুহম্মদকে প্ররোচিত ধর্মীয় নীতির অনুরূপ।
বৃটিশরা খৃষ্টীয় ধর্মমত প্রচারের অবলম্বন হিসাবে হ্যাম্পারের স্বীকারোক্তি প্রকাশ করেছিল। মুসলমান শিশুদের ভূল পথে পরিচালিত করার জন্য ইসলামী শিক্ষার নামে ভূল এবং মিথ্যার জাল বুনে। বৃটিশ ফাঁদ থেকে আমাদের যুবসমাজকে বাঁচানোর জন্য এই কিতাব লিখা হয়েছে যা তাদের মিথ্যা ও অপবাদ থেকে সঠিক পথ দেখাবে।) (চতুর্থ পর্ব-সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১১:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



