somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ ক্লান্ত পাখি

০৮ ই জুলাই, ২০০৯ রাত ১০:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



দুই দিন আগেও যদি এমন করতাম, পাশে বসা মানুষটা নিশ্চয়ই খেঁকিয়ে উঠত। কিন্তু, আজকে কিছু বলতে ইতস্তত করছে। মনে হচ্ছে, যেন একটা ক্ষমতার মালিক হয়ে গেছি। থাক, লোকটাকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। জানালাটা বরং একটু চাপিয়ে দেই। বৃষ্টির মধ্যে বাসের জানালাটা খুলে রেখেছিলাম। পানির ছাট মুখে আসছিল, ভাল লাগছিল। বৃষ্টির কেমন যেন একটা ঘ্রাণ আছে। চোখে দেখে বোঝা যায় না, চোখ বন্ধ রাখলে টের পাওয়া যায়।

এই রাস্তাটা চির চেনা। এই রাস্তা দিয়েই কলেজে যেতাম। এই বাসেই। এখন ত আর কোন কাজ-টাজ নেই। তাই আজকে ভাবলাম, এই বাসটাতেই উঠি। শেষ স্টপেজের টিকিট কিনে বাসে উঠে পড়েছি। শেষ স্টপেজ বোধ হয় দিয়াবাড়ি। কখনও যাই নি ওই দিকে। পরিচিত কেউ নেইও। ওখানে নেমে কী করব তা এখনও ঠিক করিনি। বাসের হেল্পারদের কিছু টাকা ধরিয়ে দিলে বেশি রাত হলে বাস থেকে না নামিয়ে এখানে ঘুমাতে দেবে না ? আপাতত এটাই প্ল্যান। কতদিনের চেনা এই রাস্তাটা আজকে একটুও চিনতে পারছি না। মানুষজন এলাকার নাম বলে ডাক না দিলে, হয়ত বলতেও পারতাম না যে, মাত্র কলেজটা পার করলাম।

মানুষের জীবনের এই এক মজা, তার পরিবর্তন না হলে হঠাৎ আশেপাশের সব পরিবর্তিত হয়। আবার, আশেপাশের সব যখন পরিবর্তন হয় না, তখন আর ব্যাক্তিরই খোঁজ থাকে না। এই যে আমি, দুই দিন আগেও কত লাফালাফি করতাম, আর এখন সব ঠান্ডা। এখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাই। এখন মনে হচ্ছে, এটা একটা ক্ষমতা, কেউ আমার কোন কিছুতে না বলতে পারে না।
পরশুদিনও এভাবে অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরি করেছিলাম। সেদিন কাঠফাঁটা রোদে মাথা ঘুরে যাবার মত অবস্থা। আজকে তাই জানালার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট ভাল লাগছিল। পাশে বসা ভদ্রলোক বোধহয় স্যুট পড়ে আছেন, নইলে এমন হালকা বৃষ্টির ছাঁটে বিরক্ত হবেন কেন ! অথবা, হয়ত, কিছু মানুষ থাকেনই এমন।

সেলফোনের হঠাৎ রিং এ আমার সতবিৎ ফিরল ,“হ্যালো”।“কীরে, কেমন আছিস?”, কণ্ঠটা চিনতে পারলাম না। “এই ত ভালই, আপনি যেন কে ?”, “আমার নাম্বার সেইভ করে রাখিস নি?”, সেলফোনের ভেতর থেকে কণ্ঠটা ভেসে আসল। “আপনি কে?”, ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করলাম। সেইভ হয়ত করে রেখেছি, কিন্তু, সেই জগতের আর কোন নিয়ম আমার বেলায় খাঁটে না এখন আর ! “আরে আমি রাসেল”, রাসেল হাসল। শুধু ওর কল দেয়াটাই বাকি ছিল। আর সব বন্ধুরাই খোঁজ নিয়েছে গত এক মাস ধরে।
“ কী রে তোর নামে ত এখন কত কিছু শুনি রে। আসল ঘটনা কী? ”
“ না রে রাসেল, কোন ঘটনা নেই। যা হয়েছে ভালই হয়েছে। এসব কোন ব্যাপার না। ”
“ মনটা খারাপ করিস না বন্ধু। যে কারও জীবনেই হতে পারে। আমদের যে কারও হতে পারত। ”
“ আমিও তাই ভাবি, আর কারও হল না, আমারই হল। থাক, বাদ দে। রাসেল, তোর ছোট ভাই এর এইচএসসি ছিলনা এবার ? কেমন হল ওর? ”
“ ওই হল কোন রকম। তোর কথা বল, কাঁচপুরের প্রজেক্টটার কী হল? ”
“ আমাকে ঐ প্রজেক্ট কেন দিবে? পড়তে পারিনা, লিখতে পারি না। হা হা হা। আমার ডিগ্রীগুলো এখন আর কাজের না। হা হা হা ।”
“ ইয়ে, তিথির খবর কী? ও জানে কিছু? ”
“ নাহ জানে না। জানাই নি। ওর এখন নতুন পরিবার। ও ত সুখেই আছে। মাত্র ত শুরু করল। এখন এসব পুরোনো ঘটনা টানাটানির দরকার কী? ”
“ শেষ পর্যন্ত এরকম হল কেন? তোদের ত এরকম হওয়ার কথা ছিল না। সেই কতদিন ধরে তোরা নিজেদের মত সব গুছিয়ে তুলছিলি। আর, তোর ত ডিগ্রী নেয়াটাও শেষ। তাহলে? ”
“ কিছু কিছু ব্যাপার আছে রাসেল। যেগুলো কোন কিছুর ভেতরে পড়ে না। আমাদের ব্যাপারটাও এমন। ওর বিয়েতে গিয়েছিলাম জানিস। শেষে কী হল, আর ঢুকলাম না। ”
“ ইয়ে দোস্ত, ফারহানার কল আসছে, তোর সাথে পড়ে কথা হবে । বাই। ”
টুঁট টুঁট আওয়াজে লাইনটা কেঁটে গেল। পাশের সিটের ভদ্রলোক উঠে গেছেন। এবার তাহলে জানালাটা খুলেই দেয়া যাক।
যা ভেবেছিলাম তাই, বৃষ্টিও থেমে গেছে। তবে, আবার হয়ত আসবে। তখন হয়ত পাশে আবারও কেউ বসবে। তবে আর, যাই হোক এবার আর আমি জানালা লাগাব না। নতুন পাওয়া এই ক্ষমতাটা ব্যবহার না করলে, কেমন দেখায় !

ঝিমাতে ঝিমাতে তন্দ্রার মত এসে পড়ছিল। অনেক রাত বোধহয় হয়ে গেল। “ স্যার, আজকের যাওয়া শ্যাষ। নাইম্যা যান।”, হেল্পারের কথায় বুঝলাম যে আজকের মত যাত্রাপথের সমাপ্তি। “ভাই, বাসে রাতটা থাকা যায় না? ড্রাইভার সাহেবকে বলেন না। দরকার হলে না হয়, কিছু টাকাও দিলাম।” হেল্পার কোন কথা না বলে চলে গেল। কিছু টাকা আছে হাতে, তাই না হয় দিলাম।

সারাটা রাত একা একা বাসের ভেতর থাকব। সকাল থেকে আবার যাত্রা শুরু। সকালে আবার এমন করব। আরেকটা বাসে উঠে একটা শেষ স্টপেজের টিকিট কিনব। দিয়াবাড়ি থেকে যাত্রাবাড়ি হয়ে ময়মনসিংহ যাব, কতদিন যাই না। তিথির সাথে প্ল্যান করেছিলাম একবার, এদিকে যাওয়া লাগবে। আচ্ছা যদি এমন হত, তিথি ওর হানিমুনে অন্য কোথাও না যেয়ে ময়মনসিংহে আসত ? হা হা হা, বোকার মত ভাবনা। কক্সবাজার, নেপাল, কাঠমুন্ডু ছেড়ে ময়মনসিংহ ! প্রতিটা লোক বুঝত ঘটনা কী! আর, ওখানে তিথির কেউ থাকেও না। আমার বন্ধু থাকে।
ও বলত ভোরের শিশির দেখার জন্য নাকি ওর বাসার উপর কিছু নেই। বিশাল জায়গা নিয়ে কাঠের বাড়ি করেছে সেই বন্ধু। আমার কাছে এখন রাত আর ভোর সব সমান। হুট করে ভোর হওয়া অথবা রাত হওয়ায় আর কিছু যায় আসে না। অদ্ভূত ক্ষমতা। তিথিকে একবার দেখিয়েছিলাম, সারাটা রাত শেষের পর কিছু সময়ের মাঝেই হঠাতৎ সব অন্ধকার গায়েব হয়ে অদ্ভুত একটা সাদা আলোয় চারিদিক ভরে যায়। সূর্য ওঠার ঠিক আগে। কিছু স্পষ্ট দেখা যায় না। অথচ, আলোয় ভরে গেছে।
বাস এখন গ্যারেজের দিকে যাচ্ছে। এদের গ্যারেজ কোথায় কে জানে ! ঢিমে তালে আগাচ্ছে। এই সময়টায় বাসের হেল্পার গাড়ি চালায়, বাস চালানো প্র্যাকটিস করে। এত রাতেও রাস্তায় টুং টাং রিকশা আর গাড়ির হর্ণের আওয়াজ।

“আম্মু, উনি এই রাতেও কালো সানগ্লাস পড়ে আছে কেন? আম্মু, আমিও পড়ব। আম্মু, আমাকে কিনে দাওনা , আম্মু, চল না,চল না”, বাসের পাশ দিয়ে রিকশায় যেতে যেতে কোন একটা পিচ্চি ছেলে আমাকে দেখিয়ে ওর মাকে টানাটানি শুরু করল। আমি হেসে ফেললাম। আমাকে এখন মানুষের চোখে পড়ে। এটাও একটা ক্ষমতা।
অসীম সময় ধরে শুনেছি সৃষ্টিকর্তার বিস্তৃতি। কোন কিছু সৃষ্টির আগে সৃষ্টিকর্তারও ত দেখার কিছু ছিল না। প্রথম সৃষ্টির আগের অসীম সময় ধরে, সৃষ্টিকর্তা কী নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন? আমার মতন উনার চারপাশেও কি অন্ধকার ছিল তখন?
“প্রজাপতি নাকি ঘাসফড়িং, কোনটা বেশি সুন্দর ?”, তার চেয়ে বরং এটাই ভাবি। সবুজ রঙের প্রজাপতি আছে নাকি ?

©আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১০:১৮
৩০টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×