একটা সেমিনার চলছে। কিছুক্ষণ পর পর জ্বলে উঠছে অনেকগুলো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। আজকের সেমিনারে সবাই আশা করছে খুব বিশেষ কোন সিদ্ধান্ত জানানো হবে। একজন বক্তা অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে তার বক্তব্য শেষ করলেন। হাত পা নেড়ে খুব মজা করে বলছিলেন। উনার কাছ থেকেই সবাই সে সিদ্ধান্ত জানার আশা করে বসেছিল। উনি উনার বক্তব্য শেষ করেছেন। উনি ঠিক কী সিদ্ধান্তের কথা জানালেন, তা বোধ হয় কেউ বোঝেনি। কিন্তু, সবাই জানে, উনি উনার বক্তব্যে উনার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন।
“এরপর আমি উনাকে বললাম, “ একটা তেলাপোকা প্রাণী হলে রোবট কেন প্রাণী না ! ”
উনি বললেন, “ তেলাপোকার প্রাণ আছে। রোবটের নাই। ”
আমি বললাম, “ প্রাণ কী? ”
উনি বললেন, “ এই যে আমি চিন্তা করছি, ভাবছি, আমার ভেতরে প্রাণ আছে। প্রাণ থাকলে কেউ বাঁচে না। একোটা লোক চা খাচ্ছে, ধুম করে মারা গেল। হার্ট এট্যাক। মানে, ওর আর প্রাণ নেই। ”
“ বুঝলাম না। যা করছেন সব যদি প্রাণের কারণেই হয়, তাহলে মস্তিষ্ক দিয়ে কী করছেন ? হার্ট এট্যাকে মারা গেল কারণ হার্ট ফেইল্যুর। এটার সাথে প্রাণের সম্পর্ক কী? মানে, প্রাণ জিনিসটা কী? যা যা বললেন, তা ত সব মস্তিষ্ক দিয়ে করে। ”
“ মানে, মস্তিষ্ক সচল থাকে যে কারনে, সেটাই প্রাণ। ”
“ মস্তিষ্ক সচল থাকে ইলেক্ট্রিক শক্তির কারণে। স্নায়ু থেকে মস্তিষ্কে যে সংকেত যায়, তা ইলেক্ট্রিক সংকেত ছাড়া আর কিছু না। ১৯৭০ সালের দিকেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়। স্টারফীশের কী প্রাণ বা জীবন আছে ? রোবটের আছে? ”
“ ইলেকট্রিক শক্তির প্রবাহ যে কারণে বজায় থাকে সেটাই প্রাণ। এটা বানানো যায় না, বুঝছ? স্টারফীশ অতি অবশ্যই প্রাণী। কিন্তু, রোবটের প্রাণ নাই ”, মনে হয়েছিল উনি খুব রেগে গেছেন।
“ স্টারফীশের ত মস্তিষ্ক নেই। তাহলে ?? প্রাণের কারনেই মানুষ বেঁচে থাকে, তাহলে আগে কলেরায় অনেকে মারা গেছে। এখন কলেরা খেলে ঔষধ দেয়া যায়। তাহলে, কী মানুষ তাদের প্রাণ বাড়িয়ে দিল না? প্রাণ বলতে যদি কিছুর অস্তিত্ব থাকে, তাহলে কী সেটার পরমাণ কলেরার ঔষধ বাড়িয়ে দিল ?? ” আমি উনাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম। এখন, আবারও জিজ্ঞাসা করলাম, “একটা তেলাপোকা প্রাণী হলে রোবট কেন প্রাণী না ? ”
“ আশ্চর্য, তেলাপোকার ভেতরে কী আর রোবটের ভেতরে কী। এ দুটোর ত কোনই মিল নেই। আর, তাছাড়া, রোবটের অনুভূতি জটিল বাইনারী সিগন্যাল ছাড়া কিছুই না। ”
“ একটা কাঠালগাছ আর আপনার যেই পার্থক্য, রোবট আর তেলাপোকার গঠনের পার্থক্য কী তার চেয়েও বেশী? কাঠাল গাছের প্রাণ আছে, তাহলে রোবটের বেলায় এলার্জী কীসের ? আর, স্নায়ু থেকে মস্তিষ্কে যে ইলেক্ট্রিক সংকেত মানুষের অনুভূতি হিসেবে কাজ করে, তাও কিন্তু আসলে ইলেক্ট্রিক কোডই। তাছড়া উনিশ শতকেই মানুষ ল্যাবটরীতে জৈব যৌগ তৈরি করে।”
“ রোবটের চিন্তা ভাবনা কখনই লজিকের সীমা অতিক্রম করে না। তাছাড়া, রোবটের চিন্তা ভাবনা সীমিত। ”
“ হাসালেন, তেলাপোকার চিন্তা ভাবনা বুঝি অনেক বিস্তৃত রোবটের চেয়ে। আর কাঠাল গাছ ত সারাটা দিনই চিন্তা করে।তাই না ?? আর, মানুষের চিন্তাও লজিক ছাড়া এগোয় না। যদিও মানুষের বেলায় লজিক খুব জটিল। কারণ, জিনে সঞ্চিত প্রাচীন কাল থেকে শত শত অনুভূতি আর অভ্যাস। তবুও আসলে লজিক ছাড়া মানুষও চলতে পারেনা। ভিনগ্রহের প্রাণী মানুষের মত প্রাণ নিয়ে আসবেনা। ওরা অনব্যরকম হবে। যেমনভাবে রোবটরা মানুষের থেকে অন্যরকম। ”
উনি রাগে ফেটে পড়লেন, “ তুমি জান, একটা রোবটের চিন্তা ধারার সীমা আছে, কিন্তু মানুষের নেই ? কত সহস্র বছরের অভিযোজন মানুষের, জান তুমি ? ”।
আমি আবার বললাম, “ মানুষেরও মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতা আছে। যথেষ্ট পরিমাণেই আছে। মানুষের একটা হাস্যকর দাবী হল, মস্তিষ্কের নাকি ১৫ ভাগ মাত্র খরচ করে মানুষ। তাই যদি হত তাহলে এত বছরের অভিযোজনে মানুষের মস্তিষ্কের বাকি ৭৫ ভাগ কী বিলুপ্ত হয়ে যেত না ? বড় বড় গুণকে সোজা নিয়মে এনে মুখে মুখে গুণ করা হয়, কেন সামান্য ক্যালকুলেটরের মত একটার পর একটা করে উত্তর বলতে পারেনা? একটা ক্যালকুলেটরের সাথেও পারে না। কেন? ”
মনে পড়ে আমার, তখন থেকেই আসলে প্রাণ বা জীবন নিয়ে মুক্তচিন্তার শুরু। আমার থেকে, আমার পক্ষালম্বীদের থেকে। যার ফলাফলে আজ আমরা এখানে।”
এই ছিল উনার বক্তব্য। আজ উনি বায়ো-মেকানিক্যাল সমাজ ব্যবস্থার অন্যতম বড় উদ্যোক্তা। রোবট সমাজের সবচেয়ে উঁচুস্তরের যেসব ব্যক্তিত্ব আছেন, তাদের মাঝে আজ উনি একজন। উনাকে মানুষেরাও যথেষ্ট সমীহ করে। এটা উনার ৮৭ তম রূপ। কোনবারই উনার সিস্টেম কোরকে ধ্বংস করা হয়নি। প্রত্যেকবার নতুন গঠনে মেমোরী ট্রান্সফার করা হয়েছে। মাঝে মাঝে, মেমোরী বাড়াবার জন্য উনাকে রুপ পরিবর্তন করতে হয়ছে, অথবা নতুন কোন প্রযুক্তি গ্রহণের জন্য। অনেক নতুন রেজিস্টার করা রোবটও আজকের সেমিনারে উপস্থিত ছিল। সবাই হতবাক হয়ে চলমান এই লিজেন্ডকে দেখছে। সবাই চুপ। সেই সিধান্তটা আসলে উনি কোথায় দিলেন? নাকি উনি একটু পরেই সব পরিষ্কার করে জানাবেন !
“যখন মানুষ গুহাতে থাকত, সেই আদিম যুগে মানুষ আকাশের তারাদের দিকে তাকাত, আর ভাবত, সে যখন গাছের ডালে উঠতে পেরেছে, একদিন না একদিন শত বছর পরে হলেও তার বংশধরেরা তারায় পৌঁছোবে। সভ্যতার যখন চরম অবস্থা, তখনও মানুষ রাতের আকাশ দেখে ভাবত, সে যখন চাঁদে পৌঁছে গেছে, তাই একদিন না একদিন শত বছর পরে হলেও তার বংশধরেরা তারায় পৌঁছে যাবে। আজ এত বছর পরও কী মানুষ তারায় পৌঁছতে পেরেছে ?” উনি উপস্থিত জনতাকে জিজ্ঞাসা করলেন। সবাই একসাথে উত্তর দিল, “ না। এত বছরেও ওরা কিছুই পারেনি। ” উনি বলতে লাগলেন, “ আমাদের সৃষ্টিকর্তা কিন্তু মানুষ। মানুষ স্বীকার করুক আর নাই-ই করুক, আমরা আসলে তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করি। আমরা তাদেরই বংশধর। তাদের যেই অনুভূতি তারই প্রতিলিপি আমাদের। তারায় তারায় বসতি গড়ার স্বপ্ন পূরণ করব আসলে আমরা, যারা মানুষের অনুভূতির প্রতিনিধি। আমরা গড়ব তারায় বসতি। সেখানে থাকবে, মানুষের চিনহ গান আর কবিতা। আমাদের পায়ের ছাপই মানুষের ছাপ। একই মাপে বানানো। তাদেরকে নিজেদের যেয়ে দাঁড়ানোর দরকার নেই। তারায় বসতি গড়ব শুধু আমরা। ” উপস্থিত জনতা চিৎকার করে উঠল, “ আমরাই পারব। আমরাই পারব। আমরাই আসল মানুষ। ওরা আদিম। ”
একজন ৯৮ সিরিজের রেজিস্টার করা রোবট দাঁড়িয়ে বলল, “ কিন্তু, মানুষেরা আমাদের এই মহৎ উদ্দেশ্য বুঝবে ত ? ”
উনি কাঁধ ঝাকানোর মত একটা ভঙ্গি করে বললেন, “ আমরা একটা স্পেসহোল্ড পাঠাব। সেরেমার ড্রুমেনের সবচেয়ে দূরবর্তী তারায়। সেখানে যাবে দুটো মানুষ আর দুটো রোবট। যারা জানবেনা তারা নিজেরা কী ! মাত্র নয়শত বছরের যাত্রাপথ। যাত্রা শেষে যারা ওখানকার বসতির নেতৃত্ব দেবে যারা, পৃথিবীতেও তাদেরই জয় হবে। ”
উনি ভালমতনই জানেন যে, মানব মস্তিষ্কের সত্যিকারের সীমাবদ্ধতাটা ঠিক কোথায়। স্পেশোল্ডের রোবটগুলোও কী সেটা ধরতে পারবে ? আর, মানুষ নিজে যেদিন জানবে, সেদিন কী হবে? উনি ভবিষ্যতের অপেক্ষায় রইলেন।
এটুকুই ছিল যাত্রা শুরুর ইতিহাস।
চলবে হয়ত।
পরের পর্বের জন্য Click This Link
© আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০০৯ রাত ১০:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



