অন্যদিনের মতই ক্লাস নিচ্ছিলাম। হঠাত্ করে পৌণে ন'টার দিকে আওয়াজ় উঠল টুইন টাওয়ারে বিমান হামলা হয়েছে। আমরা যারা স্কুল ভবনের পূর্ব পাশে ছিলাম তারা কিছুই দেখিনি। তাই ভাবছিলাম নিশ্চয়ই কোন দুষ্টু ছেলে মজা করার জন্য এরকম রব উঠিয়েছে। কিন্তু না! সব ক্লাস থেকে ছেলেরা বেরিয়ে স্কুলের পশ্চিম পাশের রুমগুলোর জানালার দিকে দৌড়াচ্ছিল। আমিও গেলাম। দেখলাম নর্থ টাওয়ারের মাঝখান থেকে একটু উপরে জ্বলছে। কি হলো বুঝতে না পেরে নিজের রুমে ফিরে এলাম।
কিছুক্ষণ পরে আবার রব উঠল আরেকটা প্লেন সাউথ টাওয়ারে আঘাত হেনেছে। আবারো দেখতে যাওয়ার পালা। আবার ফিরে আসা। এর আধাঘন্টা পর আবার রব উঠল টুইন টাওয়ার ধ্বসে পড়ে গিয়েছে। আগুন যেভাবে জ্বলতে দেখেছিলাম তাতে মনে হচ্ছিলনা ভবনগুলো ধ্বসে পড়বে। ধ্বসে পড়ার কথা শুনে একেবারেই বিস্ময়াবিভূত হয়ে পড়লাম। জানিনা কতলোকের প্রাণ গেল একটি সেন্সলেস সন্ত্রাসবাদী ঘটনায়।
স্কুল ছুটি হয়ে গেল। স্কুল ভবনের অবস্থা খুবই খারাপ। সে এতদূর থেকে ধুলোবালি এসে সব কিছু ভরিয়ে দিয়ে গেল। বাসায় ফিরে দেখি সেখানকার রাস্তাতেও ধুলোর আস্তর। তারপরের ঘটনা বিশ্ববাসীর কাছে খবর হয়ে পৌঁছে গেছে।
সেদিনের ঘটনায় নিউ ইয়র্ক শহরের বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র ছাড়াও আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগণে হামলা চালিয়েছিল সন্ত্রাসবাদীরা। পেন্টাগণের আংশিক ক্ষতি হয়। ঐ ঘটনার জের ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা প্রথমে আফগানিস্তান ও পরে ইরাকে অভিযান চালিয়ে দেশ দুটি দখল করে নেয়। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরদ্ধে যুদ্ধ বা "war on terror" নামে বিশ্বব্যাপী এক সংঘাতের জন্ম দেয় এর জের ধরে।
এ সংঘাতের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ। ইরাক এবং আফগানিস্তানে ইতোমধ্যে মিলিয়নের বেশী মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে যারা কোনভাবেই সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেননা। সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে বিনা বিচারে আটক করে রাখা হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরকে রাখা হয়েছে ভীতির মাঝে। ইউরোপ এবং আমেরিকায় মুসলমানরা প্রতিনিয়ত থাকছে চাপে - কখন কাকে ধরা হয় এ ভয়ে। গোপনে মানুষ ধরে নিয়ে অজ্ঞাত জায়গায় তাদেরকে বিনাবিচারে বন্দী করে রেখেছে আমেরিকানরা সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে। খোদ আমেরিকাতেই অনেক নাগরিক অধিকার খর্বকারী আইন পাশ করে মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে।
কিন্তু যেজন্য বিশ্বব্যাপী এ সংঘাত তার কি কোন কুল কিনারা উদঘাটন করা গেছে গত ৬ বছরে? বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার তদন্তে গঠিত কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে বছরাধিক কাল আগে। এ কমিটির রিপোর্ট ঘটনার সমাধানের পরিবর্তে আরো অনেক প্রশ্নের জন্মদান করেছে। অনেক আমেরিকানই ৯/১১ এর ঘটনার সরকারী ব্যাখ্যা মেনে নিতে রাজী নন। দেশের সাধারণ মানুষ থেকে বুদ্ধিজীবীদের বিরাট একটা অংশ এর মধ্যে পড়েন। কিন্তু এ ঘটনা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে সরকারীভাবে তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় অথবা শিকার হতে কোন না কোন বৈষম্যের। ফলে অনেকেই চুপ থাকেন। তবে অনেক আমেরিকানই ৯/১১ এর ঘটনার নতুন তদন্তের দাবী জানাচ্ছেন।
তাঁরা তাদের দাবীতে কিছু প্রশ্নকে জোর দিচ্ছেন। এরকম কিছু প্রশ্ন এখানে পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরা হলোঃ
১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের ৭ নং যে বিল্ডিংটি ধ্বসে পড়ে তা হলো ৪৭ তলা বিশিষ্ট WTC Building 7। ৯-১১ কমিশন কেন এই বিল্ডিংটির ধ্বসে পড়া তদন্ত করেনি?
এ বিল্ডিংটি খাড়া ভাবে ধ্বসে পড়ে বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে মাত্র ৬.৫ সেকেন্ডে এবং সাত তলা সমান উঁচূ ধ্বংসস্তুপ সৃষ্টি করে, যা মূলত নিয়ন্ত্রিত ডিমোলিশন বলে প্রতীয়মান হয়। যদি বিল্ডিংটির দক্ষিণভাগে টুইন টাওয়ারের কারণে কাঠামোগত ক্ষতি সাধিত হওয়ার ফলে এটা ধ্বংস হয়ে থাকে - যা রিপোর্টে দাবী করা হয়েছে - তাহলে গোটা বিল্ডিংটা এক দিকে কাত হয়ে পড়ে ধ্বংস হওয়ার কথা। যেভাবে সিমেট্রাকেলী বিল্ডিংটা ধ্বসে পড়েছে তাতে এর ৫৮টি পরিসীমা কলাম এবং ২৫টি কেন্দ্রীয় কলামকে ঠিক একই সময়ে কাটা পড়া দরকার। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত পেশাদার ডিমোলিশন এক্সপার্ট ছাড়া এরকম নিখুঁতভাবে তা করা সম্ভব নয়।
এছাড়াও ৯/১১ এর বেশ কদিন পরে নাসার বিমান ঐ স্থানের ধ্বংস্তুপের তাপমাত্রা ১২০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট রেকর্ড করেছে। অক্সিজেন শুন্য ধংস্তুপের মাঝে বিভাবে অফিস ফার্নিচার এবং কার্পেট এত উচ্চ তাপমাত্রায় জ্বলতে পারে?
ডাব্লিঊ.টি.সি. বিল্ডিং ৭ সত্যিকারভাবে ধ্বসে পড়ার আধা ঘণ্টা আগে থেকেই বিবিসি এবং সিএনএন এর খবর প্রচার করতে শুরু করে। তারা এটা কিভাবে জেনেছিল যখন ইতিহাসে ইস্পাতের ফ্রেমের কোন বিল্ডিংই শুধুমাত্র আগুনের কারণে এর আগে কখনো ধ্বসে পড়েনি? কোন্ সরকারী কর্মকর্তা তাদেরকে এটা জানিয়েছিল এবং কেন এটা রিপোর্টে উল্লেখ নেই?
সলোমন ব্রাদার্স বিল্ডিং নামের ঐ ভবনটিতে সি.আই.এ., এফ.বি.আই., ফেমা, এস.ই.সি., সহ অসংখ্য সরকারী অফিস ছিল। মেয়র জুলিয়ানীর ইমারজেন্সী কমাণ্ড বাংকারও ছিল এই ভবনটির ২০ তলায়। আর এটা করা হয়েছিল এর কাঠামোগত দৃঢ়তার কথা বিবেচনা করেই। স্বাভাবিকভাবেই এ ভবনটির এসব অফিসসহ ভার্টিকাল-সিমেট্রিকালী পূরোপূরি ধ্বংস হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কিন্তু ৯/১১ কমিশন এই ভবনটি সম্পর্কে কোন তদন্তই করেনি বা রিপোর্টে কিছুই উল্লেখ করেনি।
এটা কি কোন কাকাতালীয় বিষয় যে ঘটনার দিন সকালে ইউ. এস. মিলিটারী ছিনতাইকৃত বিমান কোন বিল্ডিংয়ে আঘাত হানার বিষয়ে সিমূলেশন করছিল?
সেই দূর্ভাগ্যজনক দিনে ১২ টি বিভিন্ন সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছিল যার কোন কোনটা ছিল বিমান নিয়ে WTC বা অন্য এরকম আরো টার্গেটে হামলার সিমুলেশন। এজন্য এটা একটা সন্দেহ জনক বিষয়।
ট্রান্সপোর্টেশন সেক্রেটারী নরমান মিনেটা ৯/১১ কমিশনে সাক্ষী দিতে গিয়ে বলেছেন যে যখন ফ্লাইট ৭৭ পেন্টাগণের দিকে আসছিল তখন তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট চেনীর সাথে ইমারজেন্সী অপারেটিং সেন্টারে ছিলেন। সেই সময় “এক যুবক ভিতরে এসে ভাইস প্রেসিডেন্টকে বলল, ‘প্লেনটি ৫০ মাইল দূরে, প্লেনটি ৩০ মাইল দূরে।’ আর যখন এটা ‘আর মাত্র ১০ মাইল দূরে’ যুবকটি তখন ভাইস প্রেসিডেন্টকে বলল, ‘নির্দেশগুলো কি এখনও বহাল থাকছে?’ ভাইস প্রেসিডেন্ট তখন তাঁর ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ‘অবশ্যই নির্দেশ এখনও বহাল আছে। তুমি কি এর চেয়ে ভিন্ন কিছু শুনেছ নাকি?”
চেনী আসলে কিসের নির্দেশ দিচ্ছিলেন? কমিশন এ ব্যাপারেও কোন তদন্ত করেনি বা তদন্ত রিপোর্টে কিছুই উল্লেখ করেনি এ সম্পর্কে।
কেন ফ্লাইট ৭৭ এর ডাটা রেকর্ডার ৯-১১ কমিশনের ঘোষিত ফ্লাইট পথের চেয়ে ভিন্ন পথ নির্দেশ করে? কেন পেণ্টাগণের বাইরের আশির অধিক ভিডিও রিলিজ করা হয়নি?
বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের এত অধিক পরিমান ইস্পাত কি করে গলিত ধাতুতে পরিণত হল তার কোন ব্যাখ্যা কেন দেয়া হয়নি?
কোন্ শক্তি বিল্ডিংগুলোর কঙ্ক্রীট ও অফিসের আসবাবকে ধুলায় পরিণত করে দিয়েছে কিন্তু ইস্পাতের বীমগুলোকে বাতাসে নিক্ষিপ্ত করেছে?
ইত্যাদি আরো নানা প্রশ্ন সাধারণ মানুষদের এবং কন্সপিরেসী থিওরী বিশ্বাসীদের। ৯/১১ এর ঘটনা আসলে কারা ঘটিয়েছিল এবং পিছনে কি মোটিভ ছিল তা হয়তো আমাদের প্রজন্মে জানাও যাবেনা। যে সমস্ত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে তাতে অনেক প্রশ্নবোধক বিষয় থেকে গেছে।
এ ঘটনা যারাই ঘটাক তারা মানবতার বিরুদ্ধে বিরাট এক অপরাধ করেছে। এ ঘটনার জের ধরেই আমাদের পৃথিবীকে অনেক বেশী অশান্ত ও নিরাপত্তাহীন করে তোলা হয়েছে। জাতিগুলোর মধে অবিশ্বাস এবং বিশ্ব সম্প্রদায়গুলোকে ঠেলে দেয়া হয়েছে ঘৃণা ও সংঘাতের দিকে। কে জানে কখন আবার ঘৃণা-বিদ্বেষের দেয়াল ভেঙ্গে সম্প্রীতির সুবাতাস বইবে?
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সকাল ৮:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



