১
সন্ধ্যা আসন্নপ্রায়। বড্ড ক্লান্ত হেলিওস। দিনভর ভ্রমণে অবসন্ন এই মহান সূর্যদেব। অন্ধকারাচ্ছন্ন নিক্সের শীতল শাসানিতে সে টেনে ধরেছে তার আলোকোজ্জ্বল রথের লাগামখানি। ‘আজ এখানেই ক্ষান্ত দাও হেলিওস!’ – তমসাচ্ছন্ন কুটিল হাসিমুখ নিক্সের। ছায়াতুল্য, অস্পষ্ট, অশরীরী অবয়বধারী এই নিক্স। আদিকালিক রাত্রি-দেবী।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে তাই। অবশ্যম্ভাবী এই সন্ধ্যা।
একটু দূর হতেই এই নিত্যকালীন স্নায়ুযুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করে হাই তুললেন এক মহান দেবী। ঢুলু ঢুলু চোখজুড়ে তাঁর দুপুরের বিষণ্ণতা। ‘হেলিওস আজ বড়ই উত্তেজিত ছিলো! আবেগকম্পিত ছিলো! এত উত্তেজনাময় আবেগ সহ্য হয় না!’ হ্যাঁ, ক্ষণিকের মধ্যেই আবার দেখা মিলবে আরেক উত্তেজিত ও আবেগাপ্লুত ইউরেনাসের। সন্ধ্যা আসন্ন প্রায়, নিশ্চয়ই তাই ব্যাকুল ঐ ইউরেনাস! কাতর সে, নিশ্চয়ই! রাত্রির ভালোবাসায় দেবীকে জড়াতে আসবে সে। অন্ধকারাচ্ছন্ন ভালোবাসার সেই চাঁদোয়া। অতঃপর মিলন হবে। মৃত্তিকা-অম্বরের সে মিলনমেলা! ‘উফ্! যদি শুধু ইউরেনাস আমার সন্তানদের একটু ভালোবাসতো! স্নেহে জড়াতো!’ – দেবীর ক্ষেদোক্তি। ‘আমার সন্তান ওরা! আমার গর্ভজাত ওরা! আমার ওসিনাস, কাইয়াস, ক্রিয়াস, থেমিস, হাইপেরিয়ন! আর তোমার ঘৃণা ইউরেনাস! ভুলে গেছো? আমিও তোমায় ধারণ করেছিলাম একদা! তুমিও ছিলে আমার মধ্যেই! ওদের মতই তোমার অস্তিত্বও একদা ছিলো আমার মধ্যেই! ভুলে গেছো তুমি!’
অবসাদ দূর করতে এবার কিছুটা কর্মচাঞ্চল্য খুঁজলেন মহান দেবী। পরম মমতায় দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন যৌগিক ও দুর্বোধ্য মর্ত্যের মানবদের প্রতি। ক্ষণিকের জন্য ভাবনার জালে আটকালেন বুঝি! এক নীরব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অতঃপর দৃষ্টি প্রসারিত করলেন সুদূরে। তাকালেন জ্ঞানী বৃক্ষদের প্রতি। দেখলেন প্রজ্ঞার অধিকারি পর্বতশৃঙ্গ। সত্যবাদী পাহাড়। পরম সহিষ্ণু পাথর। আবেগতাড়িত আগ্নেয়গিরি। শুদ্ধ গিরিপথ। বিমুক্ত জলরাশি। আর গুরুগম্ভীর অরণ্য। নিবিষ্ট চিত্তে পর্যবেক্ষণ করলেন অনুজীবগুলোর যাপিত জীবন। খুঁজে দেখলেন প্রাণীকুলের জীবনপ্রবাহে ত্রুটির ঘনঘটা। সাম্যাবস্থা থেকে বিচ্যুতির সম্ভাবনা। নাহ্! প্রক্রিয়া প্রণালীবদ্ধ মনে হচ্ছে। বেশ সাংশ্রয়িক, ক্রমানুসারী, সুশৃঙ্খল। বটে! স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই হঠাৎ তাঁর কর্ণকুহরে কিসের গুঞ্জন শোনা গেল! তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো দেবীর শ্রবনশক্তি। বুঝে উঠতে চাইলেন তাঁর সুনিয়ত সম্বন্ধের মধ্যে একযোগে কর্মরত অংশ-সমষ্টির মাঝে কোথায় এই অস্থিরতা! খুঁজে দেখতে চাইলেন তাঁর সুচিন্তিত অলঙ্করণের সাম্যাবস্থার মাঝে এই বিচ্যুতি কোথায়! অসীম ধৈর্য আর সহিষ্ণু চিত্তে এই ত্রুটি নিরূপণে বদ্ধপরিকর হন দেবী। ‘একটু চেষ্টা করলেই বের করা যাবে! ইউরেনাস আসার আগেই আমি পারবো......’ – আত্মবিশ্বাসে জ্বলজ্বল করছে দেবীর নেত্র!
কিছুক্ষণ পর।
ধীরচিত্তে রাত্রির চাঁদোয়া জড়িয়ে স্বয়ং আকাশ-দেবতা ইউরেনাসের আবির্ভাব। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেবীর গৃহে অনুপ্রবেশ করেই তিনি উপলব্ধি করলেন যে মহান পৃথিবী-দেবী গায়া তাঁর সুনিয়ত সম্বন্ধের মধ্যে একযোগে কর্মরত অংশ-সমষ্টির সাম্যাবস্থায় আরও একটি ত্রুটি নিরূপণে সক্ষম হয়েছেন এবং সেই বিচ্যুতি সঠিককরণে উদ্যত।
ইউরেনাস চুপটি করে বসলেন। তিনি জানেন, এই কর্মটি কত গুরুত্বপূর্ণ! তিনি দেবী গায়াকে কিছুক্ষণ একাকী থাকতে দিলেন। লেট হার হ্যাভ্ সাম স্পেস!
২
বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর ষাটের দশক। নাসা’য় কর্মরত ছিলেন চল্লিশোর্ধ এক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী। তার দায়িত্ব ছিলো পৃথিবীবহির্ভূত গ্রহসমূহ এবং তাদের বায়ুমণ্ডল ও ভূমির গঠনপ্রণালী বিশ্লেষণে সক্ষম কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের উদ্ভাবন এবং উন্নতিসাধন। স্পুটনিকের সফল উত্তরণের পর কিছুটা দিশাহারা জেট-প্রোপালশন-ল্যাব ও নাসা। স্বনামধন্য এই বিজ্ঞানীকে তারা তাদের মঙ্গল্গ্রহে প্রাণের সন্ধানের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করায়। নাসার এই কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা সেই বিজ্ঞানী এই পৃথিবীকেই যেন এক মহাজাগতিক চোখে দেখলেন। একজন বহিরাগত হিসেবেই তিনি দেখলেন তার প্রিয় এই বাসস্থানকে। সূর্য হতে তৃতীয় এক গ্রহ! নানান বিশ্লেষণ ও প্রমাণে তার কাছে মনে হল, এই গ্রহ শুধুই প্রাণচাঞ্চল্যে সমৃদ্ধ এক ‘গ্রহ’ই শুধু নয়, এটা এক মহিমান্বিত, রূপান্তরিত, স্ব-বিবর্তিত, স্ব-নিয়ন্ত্রিত জীবিত system! সংজ্ঞা অনুযায়ী, এই গ্রহ নিজেই এক জীবিত সত্তার যোগ্যতাসম্পন্ন! এক জীবন্ত ‘প্রাণী’র বৈশিষ্টসম্পন্ন!
এই বিজ্ঞানীর নাম জেমস্ লাভলক। একাধারে এক স্বাধীন বিজ্ঞানী, গবেষক, গ্রন্থকার, পরিবেশবাদী ও ফিউচারিষ্ট। ১৯১৯ সালের ২৬শে জুলাই তার জন্ম ইংল্যাণ্ডের হার্টফোর্ডশায়ারের লেচওয়র্থ গার্ডেন সিটিতে।
১৯৬৫ সালে তিনি এক সায়েন্টিফিক পেপার প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, এই পৃথিবী এক পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ও নির্ভরশীল এবং সমন্বিতভাবে ক্রিয়াশীল অংশ নিয়ে গঠিত এক মহা-প্রাণীসত্তা। সুপার-অরগানিজম! এটাই গায়া-হাইপোথিসিস (The Gaia Hypothesis) নামে পরিচিত।
এই হাইপোথিসিস বলতে চায়, এই ভূ-মণ্ডলের তাপমাত্রা এবং কম্পোজিশন এই গ্রহের ‘প্রাণ-সমষ্টি’র দ্বারাই প্রত্যক্ষভাবেই নিয়ন্ত্রিত। এই হাইপোথিসিস আরও বলছে, if changes in the gas composition, temperature or oxidation state of the Earth are caused by extraterrestrial, biological, geological, or other disturbances, life responds to these changes by modifying the biotic environment through growth and metabolism! সহজকথায়, biological responses tend to ‘regulate’ the state of the Earth's environment in their favor! কি চমৎকার!
লাভলক গায়া’কে দেখছেন এক জটিল সত্তা (complex entity) হিসেবে যেটা কিনা এই পৃথিবীর biosphere, atmosphere, oceans এবং soil দ্বারাই গঠিত। আর এই সমস্তই এক feedback অথবা cybernetic সিষ্টেমের দ্বারা সম্পর্কযুক্ত। এই সিষ্টেমের উদ্দেশ্য/তাড়ণা একটাই – To seek an optimal physical and chemical environment for life on this planet! প্রাণ-চাঞ্চল্যে সমৃদ্ধ প্রত্যেকটি সত্তা/অস্তিত্ব এই সিষ্টেমের অন্তর্ভুক্ত। এবং সবকিছুই সম্পর্কযুক্ত এক পুনঃপ্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এটা অনেকটা এক হোমিওস্ট্যাটিক সিষ্টেমের (Homeostasis) মতন যেখানে ঐ সিষ্টেমের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে তার আভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এক ধ্রুব ও সুষম অবস্থার নিশ্চিতকরণ। লাভলকের হোলিষ্টিক চরিত্র তাই ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক William Golding’এর অনুরোধে এই সিষ্টেমের নামকরণ করে গ্রীক দেবী গায়া’র নামানুসারে। গায়া – এক গ্রীক আদিকালিক দেবী যা এই পৃথিবীরই এক মূর্ত রূপ। মাদার আর্থ।
লাভলক এই হাইপোথিসিসের পক্ষে কিছু যুক্তি উত্থাপন করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন কেন পৃথিবী পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মোটামুটি অপরিবর্তনীয় গত প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর ধরে যেখানে সূর্য-শক্তির বৃদ্ধি হয়েছে শতকরা প্রায় ত্রিশ ভাগ। তিনি প্রশ্ন তোলেন কেন বায়ুমণ্ডলের কম্পোজিশন অপরিবর্তনীয় যখন সেটা হওয়া উচিত ছিলো অস্থিতিশীল। তিনি প্রশ্ন তোলেন দীর্ঘদিন ধরেই মহাসাগরীয় লবণাক্ততা ৩.৪% এ স্থিতিশীল কেন? এই সবকিছুরই ব্যাখ্যা আছে। যা হোক...। প্রশ্ন আর প্রশ্ন! বেশ কয়েক বছর আগের সেই ঘটনার ব্যাখ্যা কি তাহলে, যখন কোন এক অজানা কারণে ব্রাজিলের রেইন-ফরেষ্ট শুষে নিচ্ছিলো অস্বাভাবিক পরিমাণ অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড? আর ওজন-হোল কতটাই বা ছিদ্রযুক্ত এখন? হুম!
সব বৈজ্ঞানিক ধারণার পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নতুন নয়। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত লাভলকের লেখা The Quest for Gaia বইটিই বৈজ্ঞানিক মহলে সোরগোল তোলে। এক্ষত্রেও এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন Stephen Jay Gould, Richard Dawkins প্রমুখ। তবে লাভলক তার সমালোচকদের সম্পর্কে শুধু বলেছিলেন যে ওদের নন-লিনিয়ার ম্যাথেমেটিক্স সম্পর্কে ধারণা কম! লাভলক এবং তার শুভানুধ্যায়ীরা এই ধারণাকে আর হাইপোথিসিস বলতে রাজি নন। তারা এটার নামকরণ করেছেন গায়া-থিউরী (Gaia theory), কেননা তাদের মতে, এটা সর্বপ্রকার সন্দেহ ও নিরীক্ষণ মুক্ত! সমালোচকরা অবশ্য এই থিউরীকে বলছেন neo-Pagan New Age religion! অন্যদিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান বলছেন এক মজার কথা! তিনি বলছেন, এক মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, ১৯৫৯ সালের পর হতে স্পেস-রকেটগুলোর পৃথিবীর বাইরে বিচরণ এটাই নাকি ইঙ্গিত করছে যে এই গ্রহ তার বীজ ছড়াতে চাচ্ছে! চাচ্ছে বংশবৃদ্ধি করতে!
অবশেষে, এক হোমিওস্ট্যাসিসের মধ্যে অবস্থানরত মানব-কীটদের কথা তুলতে ভুলছি না! এদের কি ভূমিকা হতে পারে? ২০০৬ সালে লাভলকের প্রকাশিত আরেকটি বই The Revenge of Gaia’তে তিনি তুলে আনেন মানবসভ্যতার গায়া’র প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাবের বিষয়টি। এই অশ্রদ্ধাবোধ গায়া’র ধীশক্তিকে চরম অবস্থার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে! হুম! মানব-সভ্যতা গায়া’র জন্য এক অশনি সঙ্কেত বুঝি! গায়া কীভাবে নিউট্রালাইজ করবে মানব কর্তৃক সৃষ্ট জটলা? সুনামি, মহামারি, মহারোগ! নিউট্রালাইজ হিউম্যান!
হাহ্! এই ছোট্ট পৃথিবীতেই যত খেলা! যত হানাহানি! যত মনোমালিন্য! যত হিংসা, ক্রোধ, ঘৃণা! যত আবেগ, ভালবাসা! যত দর্শন, সাহিত্য, যুক্তির অবতারণা! সবকিছুই সূর্য হতে তৃতীয় ছোট্ট এই গ্রহটির পৃষ্ঠভাগে! কি অদ্ভুত! তাই যত যাই হোক, নীল-সবুজ এই পৃথিবীর দিকে তাকালে হঠাৎ সত্যিই মনে হয় – এ গ্রহ কী জীবন্ত!
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



