শোনা যায়, লোকালয়ের খুব কাছের এক সান্দ্রবনের কথা। ভারাক্রান্ত গুরুগম্ভীর অরণ্য। শোনা যায়, নিবিড় সেই বনাকীর্ণের কোথাও নাকি আছে এক সৌম্য-হ্রদ। প্রসন্নচেতা। শান্তচিত্ত। শোনা যায়, মধ্যাহ্নের নির্জনতায় চুপচাপ সেই অরণ্যের নির্বিকার হ্রদে আলোছায়ার অভিঘাতে পর্যুদস্ত জলের কাঁপন কেউ দেখেনি।
একদিন তাই চুপচাপ অভিযাত্রা। পকেটে দু’টাকা বাস ভাড়ার সাথে শ্রমবিমুখ বিষাদ আর নৈরাজ্যবাদী অস্থিরতা। আর হাতের মুঠোয় শব্দহীনতা। অন্যমনস্কচিত্তে প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াতেই শুধু শোনা গেলো, ছেড়ে গেছে মধ্যাহ্নের দূরপাল্লা। অগত্যা পিচঢালা পথে মানবছায়া। কপালে মৃদু ঘাম। অবসন্ন পদযুগল তবে কিঞ্চিত আশ্বস্ত। শোনা গেছে, এমন এক সান্দ্রবনের কথা যা কিনা লোকালয়ের খুব কাছে।
কিছুদূর এগোতেই তাই রূপান্তরিত এ্যাজফাল্ট-কংক্রীট। পদতলে বৃষ্টিভেজা অরণ্য-মৃত্তিকা। ঘাস। পাতা। চোর-কাঁটা। কোন সুনির্দিষ্ট পথ নেই এখানে। মানুষ আসে। মানুষ যায়। মুক্তচিন্তার আরণ্যকীয় প্রতিফলন। শুধু প্রশস্ত হ্রদের কামনায় এসে খুঁজে পাওয়া যায় এক অবহেলিত ডোবা। আকস্মিক বিস্ময়ে উদ্দীপ্ত মানস। বিফল মনোরথে সে হয়তো বসে পড়ে নিবিড় অরণ্যের কোন এক অপ্রশস্ত জনশূন্য পতিত পুকুরপাড়ে।
অলস বিষণ্ণ মুহূর্তের শব্দজট। আঁকড়ে ধরা শব্দ-হাত। জাপটে ধরা শব্দ-শরীর। লেপটানো। সংবদ্ধ। ছাড়ানো যায় না। ওদের ছোটছোট শুকনো আঙুলে পর্বতসম শক্তি।
বিষণ্ণ মুহূর্তগুলো নীরব পুকুর-পাড়ের ছায়া। মহাসমুদ্রে রহস্য নেই, একটা নিস্তব্ধ পুকুরের যা আছে। মহাসাগরের উচ্ছলতা নেই ওতে, আছে জমাটবাঁধা আপেক্ষিক গুরুত্ব। চাপা ক্ষোভ। শব্দহীন অভিমান। অদৃশ্য বাতাসে দোলা সাম্যাবস্থা। রোদ-আলো নেই। আছে বৃক্ষকুলের নাতিশীতোষ্ণ ছায়া। অভিজ্ঞ পত্রমঞ্জরী। স্থির। চুপচাপ।
অতীত। এগুলো কেমন...পুরোনো। এগুলো কেমন...মোটা বইয়ের তিনশ এগারো নম্বর পৃষ্ঠার গন্ধ। এগুলো কেমন...অবশ করে। এগুলো যেন...নিস্তব্ধ পুকুরে স্তব্ধ জল। ঢিল ছুড়তে দ্বিধা। জল কাঁপুনি ভয়।
এখানে ওখানে কালো ঝোপঝাড়। অরণ্য-যত্নে লালিত এই ডোবা। অরণ্য-যত্ন। কৃত্রিম নয়। মেকি নয়। নয় লোকদেখানো। পরিপাটি নয়, অগোছালো নয়। বন্য। বুনো। মায়াবী।
শব্দগুলো এখনও...ওরা এখনও হাতের মুঠোয় ছটফট করছে। বলছে...কি বলছে?
বলছিলাম, স্তব্ধ ডোবার জল। বলছিলাম, চুপচাপ সময়ের কথা। আর বলতে চাইছিলাম, এই স্তব্ধ-জলের পাশেই নির্লিপ্ত বসে থাকার মানে এলোমেলো মুহূর্ত-বিসর্জন। কড়ে-আঙুলে জড়ানো সময়-রজ্জু তন্তু। ভেজা শুকনো পাতা।
গহীন অরণ্য। স্তব্ধ অন্ধকার ডোবা। তুমি এক অদৃশ্য ডুবুরী। তোমার বেঁচে থাকা মুহূর্তগুলোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন।
জল শুধু নিস্তব্ধ। ওর কোন অনুরণন নেই।
শোনা গেছে মোটামুটি ঠিকই। মধ্যাহ্নের নির্জনতায় চুপচাপ সেই অরণ্যে আলোছায়ার অভিঘাতে পর্যুদস্ত জলের কাঁপন কেউ দেখেনি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



