somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প ||| নৈঃশব্দে খসে পড়ে স্বপ্ন সিঁড়ি

১৪ ই মার্চ, ২০০৯ দুপুর ১২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ড্রইং রুমে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে যেতে যেতে মঈন দেখল, সাত্ত্বিকা দৌঁড়ে শাড়ী পরতে যাচ্ছে রুমে।
ঃ দেখো, তোমার চা খেতে খেতে শাড়ী পরা হয়ে যাবে।

মঈন কোনো উত্তর দেয় না। সে জানে সাত্ত্বিকার সময় জ্ঞান আছে, বরং মঈনেরই বেশী সময় লাগে; রুটিন ধরে এটা ওটা করা, বাথরুমে যাওয়া, পানি খাওয়া আরো কত কী। তাতে সাত্ত্বিকাও মেকাপের একটু বেশী সময় পায়। ওদের বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় বছর দুই। সুখী সংসার, মঈন ভীষণ ভালবাসে সাত্ত্বিকাকে, সাত্ত্বিকাও। কবে কখন ওদের ঝগড়া হয়েছে মঈন ঠিক মনে করতে পারে না। সে একটু অসস্তি বোধ করলেই সাত্ত্বিকা যেন টের পায়। ভাবতে ভাবতে মঈন সোফায় বসে, চায়ে চুমুক দেয়। ছুটির দিনে দুপুরে খাওয়ার পর চা নিয়ে বসে মঈনের খুব ভালো লাগে; সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা মনে পড়ে। আবারও চুমুক দেয় চায়ে।

আজ সন্ধ্যায় বন্ধুর বাসায় যাবে। প্রায় এক ঘন্টার ড্রাইভ। ওরা দু’জনেই লং ড্রাইভ পছন্দ করে। সাত্ত্বিকা আজ হালকা নীল শাড়ী পড়বে, মঈন জানে; আগে থেকেই ঠিক করেছে সাত্ত্বিকা। মঈন পরেছে সাত্ত্বিকার পছন্দের জামা। ভাবতে ভাবতে মঈনের মন পিছনে হাঁটে; সেবার দেশে গিয়ে বাবা-মার অনুরোধে সে বিয়ে করল। অবশ্য মঈনের তেমন কোনো পছন্দ ছিলো না - দেশে বা বিদেশে। যাইহোক, পারিবারিক ভাবে বিয়ে; কিন্তু ভীষণ মিলমিশ তাদের। মঈন চায়ে চুমুক দেয়। তার চোখে মুখে এক প্রশান্তির হাওয়া ওড়ে - হারায় আনমনে; যেনো নীল ধান খেতে অহেতুক বাতাসের দোল - অদম্য ঝির ঝির সুর।

মঈনের মনে পড়ে সেই ফেলে আসা দিনগুলো কথা। যদিও সে মনে করতে চায় না, তবুও মনে পড়ে। কে চায় ফিরে ফিরে দুঃখ পেতে! অতীতের সামান্য বোবা কান্নার সাথে সে মিশাতে চায় না এইসব হাসি-আনন্দের প্রহর। মঈন আবারও চায়ে চুমুক দেয়, নড়ে বসে সোফায়। শাড়ীটা মঈনই একদিন হঠাৎ কিনে এনেছিল। সাত্ত্বিকাও খুব পছন্দ করেছে হালকা নীল রংটা। এইতো সেদিন হাঁটতে হাঁটতে এক বাংলাদেশী দোকানে দেখেই; ওর জন্য কিনেছে সে। সাত্ত্বিকার খুব পছন্দ, তারপরও এক ধরনের অপরাধ বোধে ভোগে সে। ভীষণ অবাক করে মঈনের মনে পড়ে চৈতীর কথা। ওরও কী প্রিয় রং - হালকা নীল ছিলো; মঈন মনে করতে পারে না। তবে সেও নীল পড়ত অহরহ। সাত্ত্বিকার সাথে চৈতীর এমনিতেই অনেক অমিল। ফলে মঈনের এ নিয়ে এমন মাথা ব্যথাও নেই। তবে কেনো জানি আজ, এই নিরিবিলিতে তার কথা মঈনকে ভীষণ পীড়া দেয়।

চৈতী; বিশ্ববিদ্যালয়ে মঈনের সহপাঠী; ফেরেন্ডলী, স্মার্ট আর বেশ স্পষ্টবাদী ছিলো। মঈন আগাগড়াই সাধাসিধে বলেই জনপ্রিয় বন্ধুদের আড্ডায়; সবার সাথে খুব দ্রুত জমাতে পারতো সে। ক্লাশ শেষে জুটতো তাদের আড্ডা; মঈন, তিমির, মহিদ, স্বপন আর মাঝে মাঝে দলে যোগ হত হাসি-খুশী নুরুল আলম, সদা হাস্যোজ্জ্বল। ডিপ্টামেন্টের সামনে চায়ের দোকান, সবুজ ঘাসের মাঠ, ডিপ্টামেন্ট ব্লিডিং এর সিঁড়ি - বিভিন্ন জায়গায় বসে বসে জুড়তো তাদের গল্প আর দুষ্টুমীর প্রহর। আড্ডা প্রিয় ছিল এই বন্ধুরা। কিন্তু আড়ালে চৈতীকে-ভালো-লাগা অসুখটা মঈনের মাঝে প্রবল ভাবে দিন দিন বাড়ে কিন্তু তা আবার প্রতিদিন ক্ষয়ে গেছে বহু প্রশ্নের আড়ালে ... ছিঃ ছিঃ অন্যরা জানলে কী ভাববে ... বন্ধুরা তো টিপ্পনী কাটতে কাটতে ... মধ্যবিত্ত ছেলে সে কীভাবে এসবভাবে ... অনিদিষ্ট ভবিষ্যত ..... ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে সে ছিলো নিম্নমুখী মানুষ; দ্বিধায় থেমে গেছে বার বার। এমন কী সে কখনও চৈতীর সাথে কথা বলেছে কিনা আজ আর মনে করতে পারে না। মঈন আবারও চায়ে চুমুক দেয়; চায়ের কাপ প্রায় শেষ। যাগগে, সে আর ভাবতে চায় না। সেবার ফাইনাল পরীক্ষার পর, চৈতী চাকরী নিয়ে চলে গেলো ঢাকার বাইরে। মঈন তখনও বেকার, ঢাকায়। চাকরীর দরখস্ত, বিদেশে দরখস্ত; শ্রমে-বিশ্রমে বেশ কিছুদিন গেলো তার।

তারপর সত্যিই মঈনও একদিন দেশ ছেড়ে গেলো। দেশে আর যোগাযোগ রাখা হয়নি; নতুন জীবন-যাপনে। তারপর আর কী! হারাতে হারাতে একদিন মঈন দেখলো; তার আর কেহ নেই। সে সব-কথা মঈনের কাছে থেকে গেলো। ভাবতে ভাবতে মঈনের চায়ের কাপ শুষ্ক। সাত্ত্বিকা এসে দাঁড়াতেই মঈন থতমত; বিস্মত সময় থেকে সে দৌঁড়ে এলো; মুখে হাসির দ্রুত রেখা টেনে বলল, তোমাকে ভীষণ ভালো লাগছে আজ।
ঃ ইস; আগে যেনো দেখনি, ওঠো যাই।

মঈন স্পষ্ট টের পেলো, সাত্ত্বিকার প্রশ্নবোধক চোখ; প্রানময় হওয়ার আগেই সে চোখ রেখে বলল, হুম; তুমিতো প্রতিদিনই নতুন ... আমি নিয়ত আবিষ্কার করি তোমাকে ...

দু’জনে হাসতে হাসতে গাড়ীতে ওঠে। মঈন গাড়ী স্ট্যাড দিয়ে সিডি অন করলো। সাত্ত্বিকার একটা প্রিয় গান বাজচ্ছে এখন। সাত্ত্বিকাও গুনগুন সুর ধরেছে তার সাথে। মঈনের আর কথা বলতে ভালো লাগে না; বড় রাস্তায় উঠেই গাড়ীর গতি বাড়ায়; ভিতরে এক রুদ্ধ বোধ ক্রমাগত আহত করে তার - নিরাপদে; সে কী সাত্ত্বিকাকে ঠকাচ্ছে অহরহ!
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×