somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প ||| মেঘলা রোদে বৃষ্টি জল

১২ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাপ্তাহিক ছুটির দিন; একটু দেরীতেই শুরু হয় সব - ঘুম থেকে উঠা, সকালের নাস্তা। তারপর শুরু হয় স্বাভাবিক কাজ। বাজার করা, কাপড় পরিষ্কার, ভাঁজ করা, এটা ওটা ধোঁয়ামোছা ইত্যাদি আর ইত্যাদি। কাজের কোনো শেষ নেই।

কিন্তু আজ একটু ব্যতিক্রম ঘটে গেছে হঠাৎ, তাহেরের বেফাঁস মন্তব্যটাই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। পারুল সুযোগ বুঝেই চেপে ধরলো তাহেরকে। অবশ্য একটু আগেও বেশ ছিলো, পারুল পরেটা বানানোর সময় গুন গুন করে গান করছিলো। তাহের সুযোগ বুঝে সিডিটা বাড়িয়ে দিলো। মেয়েরা এক এক করে নেমে এলো। কাজ আর গানের মাঝে মাঝে বাজারের ফর্দ্দ তৈরী হচ্ছিলও বেশ - এটা কেনা ওটা শেষ, মেয়েদের স্কুল টিফিন মেনু। তাহেরও মনোযোগে লিখছিলো। তাদের কথার ঝড়, মেয়েদের খেলা হাসাহাসি বেশ ভরে উঠেছিলো ঘরটা। তার রেশ কাটতে না কাটতেই বেঁধে গেলো এই গিট্টু। ইতিমধ্যেই নাস্তাও শেষ হয়েছে এসেছে। যাকে বলে চায়ের কাপে ঝড়। পারুল যে কোন কথায় রাগে আর কোন কথায় হাসে তাহের সবসময় তা হিসাব করে উঠে পারে না। তাহেরের চা খাওয়া ডগে উঠলো। তাহেরও প্রচন্ড রেগে আছে, পারুল আজকাল রাগের কোনো বিষয়ই লাগে না। নেহাত অনেকদিনের সংসার নতুবা কি যে হত ... তাহের ভাবতে ভাবতে যেন বহুদূর যাচ্ছে; নিজকে সামলে নিয়ে বলে, ঠিক আছে অনেক হলো এবার থামা যাক। চলো বাজারে যাই। পারুল থামে না। তাহের এবার বলেই ফেললো

ঃ একদম চুপ! আর একবারও চেঁচাবে না। তোমার অনেক কথাই শুনেছি।

ঃ হা; কি করবে শুনি। মারবে তো, বাঙ্গালী পুরুষেরতো ও একটাই গুন আছে, বৌ পিটানো।

তাহের একেবারে নিভে এলো। পারুল কী করে বলল এই কথা। তাহেরতো সেধরনের লোক না। বরং পারুলও ভালোভাবে জানে তাহের খুব অপছন্দ করে এইসবকিছুর। মেয়েরাও চলে গেছে তাদের ঘরে। এযেনো নিত্য ব্যাপার। তাদের মাথা ব্যথা নেই। আর না থাকাই ভালো। তাহের গুছিয়ে নিলো নিজকে।

ঃ চলো, বাজারে যাই।

পারুল আর কিছুতেই যাবে না। একেবারে বেকে বসলো। চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে অগত্যা মেয়েদের ডাকলো। কে কে যাবে বাজারে। মেয়েরাও যেতে চাইলো না। ফলে তাহেরর একাই প্রস্তান। বাজারফর্দ্দ হাতে বের হয়ে পড়ল। সকালটাই তার কাছেই কেমন নিভে এলো।

বাজার থেকে দু'একবার কল করেছে তাহের কিন্তু কেউ রিসিভ করেনি। তাহের খুব সতর্কভাবেই বাজার করছে আজ। কোথাও যেন কোনো খুঁদ না থাকে। অবশ্য তাহের বাজার বেশ বুঝেশুনে করে - কার কি পছন্দ, কে কি খায়, পারুলের জন্য কি নিতে হবে সব দিকে খেয়াল থাকে তার।

ঘন্টা দু'য়েক লাগে বাজারে। আজ আর বেশী দেরী না করে সে সরাসরি বাড়ীতে এলো। পারুল তখন রান্নার আয়োজন করছে। ঘরে ঢুকেই শুনতে পেলো ওদিকে মেয়েদের দৌড়ঝাপ। তাহের এক এক করে বাজার ঘরে আনলো। ফ্রিজে সাজানো শুরু করল সে নিজেই। পারুলও হাত দিলো তাতে। তাহের মিটমিট করে হাসছে। পারুল মুখ অন্যদিকে সরিয়েই বলল কোনো লাভ নেই। তাহের জোরে হেসে উঠলো।

বাবার কন্ঠস্বর শুনে মেয়েরা ছুটে এলো। এব্যাগ খুলে ওব্যাগ খুলে এটা ওটা টেনে বের করলো। পারুলের কাজের মনোযোগ বেড়ে গেছে। গলায় আবারও গানের গুন গুন, তাহেরের জিভে চায়ের লোভ জেগে উঠছে কিন্তু বলতেও বলল না আর। একটু পরে পারুলই চট করে বলল চা করে দেই। তাহের হেসেই বলল, ঠিক আছে। তাহের হাতমুখ ধুয়ে এলো। পারুল চা হাতে নিয়ে এলো।

চা মুখে দিয়ে বাজারের গল্প, এটার ওটার দাম নিয়ে আলোচনা; এমনিতে সংসারের নানা গল্প। পারুলের মুখে তখন কথার খৈ। তাহেরের কাছে বেশ লাগছে দিনটা।

দুপুরের খাওয়াও শেষ। বিকেলে মেয়েদর নিয়ে পার্কে যায় খেলতে সবাই। ঘরে ফিরে গোছলে গেলো তারা। মেয়েদের চুল বেঁধে দিলো মা।

সন্ধ্যার চা শেষ করল তাহের। মেয়েরা স্কুলের পড়া নিয়ে ব্যস্ত, পারুল তাদের সাথে লেগে আছে। তাহের কিছু কাগজপত্র নিয়ে কী যেন হিসাব-নিকেশে বসে গেছে, বেশ মনোযোগী সে।

পড়া শেষে পারুল রান্নাঘরে রাতের খাওয়া গরম করতে গেলো, তাহেরও টেবিলে এটা ওটা আনছে। গল্পগুজবসহ ডিনার শেষ হল। মেয়েরা আর বেশীক্ষণ জাগতে পারে না, বিছানায় চলে যায়। আজ রাতেও তারা ব্রাশ করে বেডে গেলো। তাহের তার কাজের ব্যাগ গুছিয়ে নিল। টিভিতে খবর দেখছে তাহের। পারুল তাড়াহুড়ো রান্নাঘর পরিষ্কার করে সেও তাহেরের পাশে এসে বসল।

ঃ তোমার কাল সকালে একটা মিটিং আছে, মনে আছে তো।

ঃ হুম, ডকুমেন্ট শেষ।

ঃ চল, শুয়ে পড়ে।

ঃ হ্যা, তাই চল; বড্ড ক্লান্ত লাগছে আজ। আজতো আর কম দখল গেলো না আমার উপর।

পারুল হেসে হেসে বলল ঠিক আছে বাবা সরি বলছি। তাহেরের মনটা ভালো হয়ে গেলো। তাহের একটা ভালো লাগা নিয়ে তাকিয়ে থাকে পারুলের দিগে। ওদিকে মেয়েদের কথাবার্তা বদ্ধ, মানে ঘুমিয়ে পড়েছে। পারুল বসে হাই তুলছে। তাহের বলল চল বেডে যাই, কাল সকালে উঠতে হবে।

মাঝরাতে হঠাৎ তাহেরের ঘুম ভেঙে গেলো। ঘরের মৃদ আলোয় পারুলকে খুব ভালো লাগছে। পারুল তার বুকের কাছে মাথা গুঁজে শুয়ে আছে। সে অপলকে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। সারাদিন ছোটাছুটি করে কাজ করে তারা; সংসার কী কম কষ্টের - এটা সেটা করতে করতে কম দখল যায় না তাদের। পারুল কখনও রাগ, কখনও বকাবকি মিশে থাকে সারাদিনের কাজকামের মধ্যে। তবু রাতে এই কী সাচ্ছন্দ্যে ঘুমাচ্ছে যেনো কী পরম বিশ্বাস আর বন্ধুত্বের আলো ছড়িয়ে আছে সারা বিছানায়। বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছে, তাহের বিছানা ছেড়ে জানালায় দাঁড়ালো; তার চোখে বৃষ্টির অঝোর জলরাশি ভাবায়। সে ভাবতে থাকে এই জীবন যেনো মেঘলা রোদে বৃষ্টি জল - এই হাসি-কান্নায় যেনো জড়িয়ে আছে এই দু'টি প্রাণ।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:৩৯
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×