প্রতিটি কারাগারে রয়েছে বিশেষ দফা ও সুইপার দফা। বিশেষ দফার কাজ হলো জেলের অভ্যন্তরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মাটি কাটা, মাটি সরানো, ইট ভাঙ্গা, রং করা ইত্যাদি। সুইপার দফার কাজ হলো ময়লা পরিস্কার ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সুষ্ঠ্য রাখা। বিশেষ দফা ও সুইপার দফায় একজন করে কনভিক্ট ওভারশিয়ার রয়েছে, যাকে ওস্তাগার বলা হয়। কাজ করানোর জন্য এদেরকে জেল কর্তৃপক্ষ হেরোইন প্রদান করে থাকেন, নুতবা পয়-পরিস্কারের কাজ করানো দুরুহ হয়ে পরে বিশেষ দফা ও সুইপার দফায় যারা কাজ করে। তাদের মধ্যে ওস্তাগার বা ২/১ জন ছাড়া সকলেই হাজতী। এদরে অধিকাংশই নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা আসামী। জেলের বাহিরে এরা হেরোইন আসক্ত বলে এদের আত্নীয়-স্বজন আদালতের মাধ্যমে এদের নিরাপত্তা হেফাজতে কারাগারে পাঠিয়ে নিশ্চিত হতে চায়, কারাগারে এসে এরা অনেকই বিশেষ দফা ও সুইপার দফায় জড়িয়ে পরে নেশার কারনে।
সুইপার ও বিশেষ দফার বন্দীরা একসঙ্গে জেলে হেরোইন গাঁজা পাচারের কাজটা করে অতি সাবলীলভাবে। জেলের অভ্যন্তরে যে সমস্ত মাদক ব্যবসায়ী থাকে তাদের সাথে বিশেষ ও সুইপার দফায় একটা বিশেষ যোগাযোগ থাকে। মাদক ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ হিরোইন গাঁজা ও মাদক ট্যাবলেট কারাগারে ঢোকায়; বিশেষ দফা, সুইপার দফার বন্দীদের মাধ্যমে বিভিন্ন সেলে ও ওয়ার্ডে পাচার করে বা সরবরহে তাদের কোন বগে পেতে হয় না। এদের গায়ে লাল পোষাক থাকায় এখানে সেখানে যাওয়ার সুযোগে এরা বিভিন্ন এলাকায় গাঁজা ও হেরোইন সহজে বয়ে নিয়ে যেতে পারে।
সুইপার দফাগুলো হেরোইন সেবীদের জন্য বিশেষ স্পটে রুপ নেয়। সাধারণত কারাগারগুলোতে সেখানেই হেরোইন স্পট গড়ে তোলা হয়। সেখানে লক-আপ খোলার পর হতেই মাদক সেবনের কার্যক্রম শুরু হয় লক-আপের আগ পর্যন্ত তা চলতে থাকে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সুইপার দফাগুলো মাসিক ভাড়া হতো অন্ততঃ পক্ষে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। প্রতিদিন এই সমস্ত দফায় বিক্রি হতো ১লক্ষ টাকার মতো হেরোইন। সাবেক ডি.আই.জি (প্রীজম) মেজর সামছুল হায়দার সিদ্দীকির কারণে দফাগুলোতে হেরোইন স্পট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের প্রতিটি কারাগারে সুইপার দফার মাধ্যমে মাদক সামগ্রী পাচারের কাজটি এখনো চালু রয়েছে।
সুইপার ও বিশেষ দফার হাজতী বন্দীরা যখনই কোর্টে হাজিরা দিতে যায় তখনই তাদের মলদ্বারে করে হেরোইন গাঁজা নিয়ে এসে জেলে বিক্রি করে। এরা হেরোইন ও গাঁজা ব্যবসায়ীদের হেরোইন ও গাঁজা বহন এবং খুচরা বিক্রয়কারী হিসেবে কাজ করে আসছে। পয়-নিষ্কাশন ড্রেনের ভিতর দিয়ে বাহির থেকে হেরোইন ও গাঁজা জেলের ভিতরে পাচার করা হয়। লালগাড়ীর বন্দীরা কারা রক্ষীদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে ড্রেন দিয়ে কারাভ্যন্তরে মাদক সামগ্রী বহন করে নিয়ে আসে।
বিশেষ ও সুইপার দফায় বন্দীরা দুপুরের পরেই চৌকায় নিজ হাতে সবজি মসল্লা ও তেল নিয়ে সবজি রান্না করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ও সেলে বিক্রি করে। সবজি বা তরকারী বিক্রির টাকা দিয়ে তারা হেরোইন সেবন করে । সুইপার দফার বন্দীরা যেহেতু বিভিন্ন ওয়ার্ডে বা সেলে যেতে পারে সেই সুবাদে তারা পুরোনো প্লাষ্টিকের ড্রাম, বালতি, জগ, মগ, নারিকেল তেলের বোতল সংগ্রহ করে বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানী হিসেবে বিক্রি করে টাকা উপার্জন করে হেরোইন সেবন করে।
গুদাম ও চৌকা হতে এরা শুকনো মসল্লা চুরি করে এনে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ও সেলে যারা রান্না করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এমনকি চৌকার ওস্তাগার গুদামে রক্ষী রাইটার এদের মাধ্যমে তেল, চিনি, তরকারী, মসল্লা, শুকনো মরিচ, কাঁচা মরিচ, গোল আলু, বিক্রির ব্যবস্থা করে থাকেন। এথেকে বিশেষ দফা ও সুইপার দফার বন্দীরা। যা আয় করে তা দিয়ে হেরোইন গাঁজা সেবন করে থাকেন।
বিভিন্ন ওয়ার্ডে ও সেলে চুরি করা হলো এই বিশেষ দফা ও সুইপার দফার আরেকটি অন্যতম কাজ। এই দফার বন্দীরা তাদের কাজের জন্য বিভিন্ন এলাকায় সহজেই যেতে পারে বিধায়, এক এক এলাকায় গিয়ে সেখানে থেকে বন্দীদের মালামাল চুরি করে অন্য এলাকায় বিক্রি করে যে আয় হয় তা দিয়ে মাদক সেবন করে থাকে। এছাড়া কারারক্ষী বা জমাদারের কাছে গোপন তথ্য এরা সরবরাহ করে। সেই তথ্য মোতাবেক কারারক্ষী-জমাদার বন্দীর নিকট হতে টাকা উদ্ধার করে, তারপর কেইস টেবিল পুট-আপের হুমকি দিয়ে অর্ধেক টাকা হাতিয়ে নিয়ে বন্দীকে ছেড়ে দেয়। যে পরিমাণ টাকা বন্দীর নিকট হতে কারারক্ষী ও জমাদার হাতিয়ে নেয় তা কমিশন দিতে হয় সেই বিশেষ বা সুইপার দফার বন্দীকে। সেই বন্দী টাকা দিয়ে হেরোইন গাঁজা ও নেশার ট্যাবলেট সেবন করে। (চলবে........!)
বাংলাদেশ কারাগার - অনিয়ম (পর্ব -দশ) পড়তে somewherein এখানে অথবা bd news এখানে ক্লিক করুন ।
বাংলাদেশ কারাগার - অনিয়ম (পর্ব - এগার) :বিশেষ দফা : সুইপার দফাঃ মাদক চালানের কাজে নিয়োজিত
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
কবিতাঃ পাখির জগত

টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।
টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।
বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন
মোহভঙ্গ!

পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন
একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা এবং গর্জিয়াস প্রকাশনা উৎসব

পহেলা মে বিকেলে একটি আমন্ত্রণ ছিল। অনুষ্ঠানটি ছিল বই প্রকাশনার। এই আয়োজনটি শুরু হয়েছিল বলা যায় এক বছর আগে। যখন একটি লেখা দেওয়ার আমন্ত্রণ এসেছিল। লেখাটি ছিল বিদেশের জীবনযাপনের... ...বাকিটুকু পড়ুন
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি

কথা হচ্ছিলো একজন আর্ট সমঝদার মানুষের সাথে। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, জীবিতবস্থায় আমাদের দেশে আর্টিস্টদের দাম দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের নামকরা অনেক চিত্র শিল্পী ছিলেন, যারা জীবিতবস্থায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
মানুষ মারা যাবার পর আবার পৃথিবীতে আসবে?

আমার মনে হয়, আমরা শেষ জামানায় পৌছে গেছি।
পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে খুব শ্রীঘই। চারিদিকে অনাচার হচ্ছে। মানুষের শরম লজ্জা নাই হয়ে গেছে। পতিতারা সামনে এসে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।