যা হোক। একটু থিতু হয়ে দুই দিন পর গেলাম ভার্সিটির লাইব্রেরীতে।
বিশাল ব্যাপার, আস্ত কলাভবণ তার মধ্যে সেঁধিয়ে যাবে। এক বিখ্যাত ফুটবল কোচের (সকার নয়, মার্কিন তরিকার ফুটবলের গুরু) পয়সায় বানানো, স্বভাবতই তারই নামে। মজার ব্যাপার, ঢা.বি. তে আমরা বই-এর ধারে কাছেও ঘেঁসতে পারতাম না (কল নাম্বার লিখে দিয়ে লাইব্রেরিয়ানকে করুন স্বরে বলতে হতো: ভাই দেখুন তো এই বইটার পাতা না কাটা কোনো কপি...), আর এখানে বই-এর কাছে যাওয়া যায়, নেড়ে চেড়ে দ্যাখা যায়, তারপর ভালো লাগলে ইস্যু করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া যায়।
ভয়ে ভয়ে জিগ্গ্যেস করলাম: 'ভাই কয়টা বই এক সাথে ইস্যু করা যায়?'
- ' যে কয়টা আপনার ইচ্ছা।'
আমার তখনো ধন্দ: 'যে ক..য়..টা আমার ইচ্ছা? কোনো লিমিট নাই?!'
-' বল্লাম তো, ৫০ টা ১০০ টা..১০০০ টা যে কয়টা আপনার দরকার নিয়ে যান।'
: 'কয়দিন রাখতে পারবো?'
-'সারা সেমিস্টার, মানে পুরা চার মাস। আগামি সেমিস্টারেও আপনি আমাদের এখানে থাকলে তখনো এগুলো আপনার কাছে রাখতে পারবেন। শুধু অনলাইনে একটু ক্লিক ক'রে রিনিউ করে নিলেই হলো।'
আমার পুবের বাংগাল মনে তখনো অবিশ্বাস: 'আপনি বলছেন আজকে আমি ১০০০টা বই -ই ইস্যু করতে পারবো। কিন্তু কাল?'
-' কাল আবার এসে অন্য হাজার টা বই নেবেন। প্রতিদিন নিতে পারবেন।' লোকটা হাসছে।
একেকটা পশ্চিমা বই যা মোটা আর ভারী (ব্যাটারা মনে হয় নীলক্ষেতের চটি'র মতো হালকা প্রকাশনায় বিশ্বাসী নয়!) মনে চিন্তা করলাম, এরকম বই গোটা পাঁচেক নিলেই আমাকে আর হেঁটে ডর্মে ফিরতে হবে না, ক্যাব নিতে হবে। যা হোক ব্যাকপ্যাকে গোটা দুয়েক ঢোকলাম, হাতেও একটা নিয়ে নিয়ে গেলাম লাইব্রেরী চেক আউট কাউন্টারে। বেশ লম্বা ভীড়। মনে মনে ভাবলাম, এ দেশে বুঝি মধুর ক্যান্টিন নাই, বেচারা পোলাপানের আর যাওনের কোন জায়গা নেই, এই স্টেডিয়ামের মতো বিশাল লাইব্রেরী ছাড়া। ওদের জন্য বাংগাল মনে একটু মায়াও হ'লো। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে যখন সেই লাইব্রেরী-কর্মীর কাউন্টারে এলাম।
- 'নতুন বুঝি? বই চেক আউটের জন্য তো আমার কাছে আসার দরকার নেই, ঐ তো মেশিনে সেল্ফ চেক-আউট করছে সবাই।', ব্যাটা হাসতে হাসতে বল্লো।
: ' তা হোক। আমি তো তোমার কাছেও চেক আউট করতে পারি, পারি না?'
-' তা পারো। একি মাত্র তিন টা বই নিচ্ছ?', বিচ্ছু হাসিটা লেগেই আছে। সে যাত্রা কিছু নয়, গোল-টা বাধলো কয়েক সপ্তাহ পরে, বইগুলো ফেরত দিতে গিয়ে।
(কালচারাল শক-১খ-এ সমাপ্য)।
--------------------------------------------------
[পাদটিকা: প্রিয় ব্লগার, নিশ্চয়ই সহমত হবেন যে, পুবের মফিজ জীবনের প্রথম ম্যানহাটানে এসে, কিম্বা পশ্চিমের হ্যারি জিন্দেগীর পয়লা আমাদের হাতির পুলে আসিয়া দু-একটা সাংস্ক্রিতিক ছ্যাঁকামাইসিন, তথা 'কালচারাল শক' না খেলে কেমন যেন শুন্যতা থাকে, বিয়ে বাড়ীতে পোলাও কোর্মার পরে দই-মিস্টি পাতে না আসা অব্দি যেমন খালি খালি লাগে আর কি!
মাশাল্লা, আপনাদের দোয়ায় সেই কালচারাল ছ্যাঁকা , মানে ডেজার্ট খেতে বেশিদিন সবুর করতে হয়নি। সে সবের একটু আধটু আপনাদের সদয় আস্কারা পেলো মাঝে মধ্যে 'পুবের মন, পশ্চিমের ক্ষণ' শিরোনামে ব্লগর ব্লগর করতে ইচ্ছা রইলো।]
--------------------------------------------------
পুনশ্চ: সণ্ধ্যা থেকে মনে মনে নিয়ত করে আছি যিনি আজ এই পোস্টে প্রথম মন্তব্য করার মতো উদারতা দ্যাখাবেন, এই পোস্টটি আমি তাঁকে উত্সর্গ করবো। এই পোস্টটি তাই প্রিয় ব্লগার অরুণাভ-আপনাকে উত্সর্গ করলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

