নিজস্ব কিছু দুঃখ কথা - ০৩
আমার দুঃখ কথা - ০৩ এ আমার বাবার মারা যাওয়ার কথা লিখেছি। এমন এক বয়সে বাবাকে হারাই যখন ভালো মতো বুঝতে পারিনি, মরণ জিনিসটা আসলে কী। জীবনের বেশির ভাগ নির্মমতার সাথে আমার পরিচয় ছিল না।
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই শিখতে শুরু করলাম, মানুষকে যত চমৎকার ভেবেছি তারা আসলে তত চমৎকার মানুষ নয়।
বাবা মারা গেছেন। কোন রকম জানান না দিয়েই। আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। কাঠের ব্যবসা করতেন। আমার বড় ভাই সে সময় ক্লাশ নাইনে পড়ে। তার পক্ষে কাঠের ব্যবসা সামলানো সম্ভব হবে না, এটাই ছিল স্বাভাবিক। বাংলাদেশের সকল মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো আমাদের পরিবারও তখন হাবুডুবু খাচ্ছিল।
এ ব্যাপারগুলো তখন বুঝিনি। বুঝিনি বলেই হয়তো তখন এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যাতে করে জীবনের নির্মমতা খুব সহজে টের পাই। সে রকম একটি ঘটনা।
বাবা মারা গেছেন দুদিন। তার জন্য চারদিনের খরচ করতে হবে। আত্মীয় স্বজন চারদিনের খরচের হিসাব করছে। খাবারের আয়োজন কী কী হবে, তাই নিয়ে মামা, খালু ও চাচাদের বসচা চলছে। আমার মা কাউকে না করেন না।
শেষ পর্যন্ত সবার উৎসাহে চার দিনের বিশাল খরচের আয়োজন হল। মহল্লাবাসীসহ কাঠ ব্যবসায়ী ও আত্মীয় স্বজনরা এল এবং ভুরি ভোজনে বসে গেল। এই চার দিনের খরচ নাকি মিসকিনদের জন্য করা হয়। বাস্তবে মিসকিন যে কয়জন এল তারা তেমন সমাদর পেল না।
আমার খালু খুব অহংকারী লোক ছিলেন। নিজের পরিবার ছাড়া অন্য সবাইকে নিচু জাতের মনে করতেন। চার দিনের খরচের দিন তিনি রাগ করে কিছু খেলেন না। কারণ, আমরা নাকি কিপটা। গরুর মাংস দিয়ে চারদিনের খরচ করেছি। গরুর মাংস ফকির মিসকিন খায়। তাই তিনি সেটা খাবেন না। তিনি তো গরুর মাংস খাবেনই না। সঙ্গে তিনি তার স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদেরও গরুর মাংস খেতে দেবেন না।
ফলে বাধ্য হয়ে আমার বড় ভাইকে আবার ছুটতে হল বাজারে। মুরগী এনে রোস্ট করে দিতে হল। সেই রোস্ট পাওয়ার পর তারা চারজনের পরিবার পরিতৃপ্তি সহ খেলেন এবং আমাদের আরও বদনাম করতে লাগলেন। অভদ্র ও ছোটলোক বললেন আমাদের ও আমাদের বাবাকে। আমাদের বাবা অভদ্র ছিলেন বলেই নাকি আমরাও কোন আদব কায়দা শিখিনি।
সেই ঘটনা আমার বুকের শেল হয়ে বিঁধে ছিল দীর্ঘদিন। খালার বাসায় যাইনি দীর্ঘদিন। আমার বিয়ের সময় খালাকে দাওয়াত দিতে ইচ্ছা হয়নি। কিন্তু ভদ্রতা দেখাতে দিতে হয়েছিল।
সেই থেকে প্রতিজ্ঞা করেছি, আমার মরণের পর যেন কোন চার দিনের খরচ বা চল্লিশা না করা হয় তার জন্য কড়া নির্দেশ দিয়ে যাব। চার দিনের খরচ ও চল্লিশা সম্পর্কে অনেক ঘাটাঘাটি করে ইসলাম ধর্মের কোন সমর্থন পাইনি। আমাদের ধর্মে এ রকম লোক খাইয়ে শ্রাদ্ধ করার বিধার নাই। বরং এই বিধানটি হিন্দুদের শ্রাদ্ধ থেকে এসেছে বলে অনেকে জানিয়েছেন। আমি জানি না। তবে আমার তীব্র ঘৃণা রয়েছে এই জঘন্য অমানবিক প্রথাটির প্রতি। মানুষ মারা গেলে সেই উপলক্ষে অনেক লোক মিলে আনন্দ ফুর্তি করে খাওয়া দাওয়া করবে, এটা কি কখনও মানবিক ও ভদ্র নিয়ম হতে পারে ? এই নিয়মের বলি হচ্ছে কত অসহায় পরিবার তার কি খোঁজ রেখেছেন কেউ ?
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



