দিনটি ছিল ১৯৭৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। আমি মাত্র ক্লাশ টুতে উঠেছি। জানুয়ারি মাস বলে স্কুলে তেমন পড়ার চাপ নেই। কিন্তু আমাকে ক্লাশে যেতে হত। সকাল আটটায় ক্লাশ। তাই সকাল সাতটার দিকে আমাকে বিছানা থেকে টেনে উঠানো হত।
সেদিন কেউ আমাকে বিছানা থেকে টেনে ওঠায়নি। আমি নিজেই উঠেছি। ভোর বেলা। সূর্য উঠি উঠি করছে। আমাদের ঘরে এখনও রোদ আসেনি। দেখি আমি যে বিছানায় শুয়ে আছি তার চারপাশে মানুষ ভর্তি। এত ভোরে আমার বিছানার পাশে এত মানুষ কেন তা বুঝলাম না। আমার মনে হল, দৃশ্যটি স্বপ্নের। আমার ছোট্ট জীবনে এ ধরনের আজব ঘটনা ঘটার কোন সুযোগ নেই।
আমার যে খাটে ঘুমাতাম তা ছিল চারজনের বড় খাট। সদ্য ঘুম থেকে ওঠা আমি সবার দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছি। কেউ কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কথা বলছে না। অসহ্য নীরব সবাই। আমি বিছানায় উঠে বসে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। বুঝতে পারছি না। স্বপ্ন কি এত সহজে বোঝা যায় ?
আমি আমার বড় বোনের নেওটা ছিলাম। মায়ের চেয়ে বড় বোনের সান্নিধ্য বেশি ভাল লাগত। বড় পরিবার হলে এমন হয়। আমার বড় বোন আর আমার বয়সের পার্থক্য প্রায় বিশ বছর। আমি আমার অবোধ দৃষ্টি দিয়ে তাকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। সে নেই কোথাও।
এমন সময় গুণগুণ শব্দ আমার কানে এল। কেমন একঘেয়ে তালবিহীন নারীকণ্ঠের টানা শব্দ। শব্দের উৎস খুঁজতেই আমি ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে খাটের কিনারে আসতে লাগলাম।
আর তখনই কারো মুখের উপর গিয়ে আমার হাত পড়ল। সবাই হায় হায় করে উঠল। আমার হাতের ছোঁয়ায় চাদর সরে গিয়েছিল। দেখলাম তার মুখ। আমার বাবা। তিনি খাটের কিনারে লম্বালম্বি হয়ে শুয়ে আছেন। এত সকালে বাবা কেন এখানে শুয়ে আছে এভাবে ? আর কেন সারা শরীর এভাবে চাদরে ঢেকে রেখেছে ?
এর মধ্যে ভীড়ের মধ্য থেকে কে একজন আমাকে টেনে বিছানা থেকে নামাল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি আমার বাবার শুয়ে থাকা দেহের দিকে।
সবাই বলাবলি করছে, আমার বাবা নাকি মারা গেছে। আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। কই, মনে হচ্ছে না তিনি মারা গেছেন। বরং তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, এখনই ঘুম থেকে জেগে উঠবেন।
কিন্তু মানুষের ভীড়, কথাবার্তা আর কান্নায় আমি বুঝতে পারলাম আমার বাবা মারা গেছেন। কাল রাতে কোন এক সময়ে তিনি হঠাৎ মারা গেছেন। আমি ফ্যাল ফ্যাল করে সবার মুখের দিকে তাকাতে লাগলাম। আমার ছোটভাই তখনও বাবার পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১০:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



